পরিবেশ বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের অধীনে বন অধিদপ্তরের তত্বাবধানে রাজধানী ঢাকার শের-ই বাংলা নগর, আগারগাঁ খোলা মাঠে শুরু হয়েছে মাসব্যাপী জাতীয় বৃক্ষ ও পরিবেশ মেলা। ৯ জুলাই এই মেলার উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এবারের বৃক্ষমেলার প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে “বৃক্ষ রোপণে সাজাই দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ”। এই বৃক্ষমেলায় দেশের প্রতিটি জেলা উপজেলা ও বিভাগীয় শহর থেকে নার্সারী ব্যবসায়ী ও মালিকগণ অংশ নিয়ে থাকেন। এবারের মেলায় সর্বমোট ষ্টল সংখ্যা ১৫০ টি। নার্সারী মালিক ছাড়াও রয়েছে কৃষি ও বৃক্ষ সংক্রান্ত বিভিন্ন উপকরণ ও বালাই নাশকের ষ্টল। রয়েছে সুস্বাদু খাবারের দোকান। সরকারি পর্যায়ে অংশ নিয়েছে বিএডিসি, বাংলাদেশ বন শিল্প কর্পোরেশন এবং এলজিইিডি। আরো রয়েছে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন ও মডার্ন হারবাল নামের প্রতিষ্ঠানটি। এবারের মেলায় নতুনত্ব হচ্ছে সিনিয়র সিটিজেন বিশ্রামাগার, মহিলা ও শিশুদের জন্য আলাদা বসার স্থান ও ব্রেষ্ট ফিডিং সেন্টার। বিগত বছরগুলির তুলনায় এবারের মেলার ভিতর ও বাইরের পরিবেশ খুবই পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ও মনোরম বলে জানিয়েছেন মেলায় আগত ক্রেতা ও দর্শনার্থীগণ। মেলায় প্রবেশদ্বার রয়েছে ৪টি। উত্তর, দক্ষিন পূর্ব পশ্চিম। এই চারপাশ দিয়ে মেলায় প্রবেশ করা যায়। যে কারণে এবার যানজটের পরিমাণ নেই বললেই চলে। তবে ষ্টল মালিকরা জানিয়েছেন বৃষ্টির কারণে মেলায় ক্রেতার সংখ্যা অনেক কম। তবে শেষ কয়েকদিনে আবহাওয়া স্বাভাবিক থাকায় বিক্রি ভাল হয়েছে। এবার স্টল বরাদ্দ হয়েছে লটারীর মাধ্যমে যাতে কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে অংশীজনের কোনো অভিযোগ নেই।
বৃক্ষমেলার গুরুত্বঃ নামেই প্রকাশ বৃক্ষমেলা মানেই বৃক্ষ দ্বারা আচ্ছাদিত ও পরিবেষ্টিত একটি মেলা। এই মেলায় রয়েছে দেশী, বিদেশী সব ধরনের ফুল, ফলের গাছ। রয়েছে বনসাই ও বাহারি ওষধি গাছপালা। মেলায় অনেক দুর্লভ প্রজাতির বিলুপ্ত প্রায় অনেক গাছপালার সংগ্রহ রয়েছে। মানুষ এখন আগের তুলনায় বৃক্ষ রোপনের প্রতি অনেক বেশি সচেতন ও গুরুত্ব দিচ্ছেন। সে কারণে এই জাতীয় বৃক্ষমেলায় প্রতি বছর স্টল সংখ্যা ও ক্রেতা সংখ্যা বাড়ছে। অনেকেই এখন বাড়ির ছাদে রাস্তার ধারে পুকুর পাড়ে সরকারি ও বেসরকারী পতিত জায়গায় বৃক্ষ রোপনে এগিয়ে আসছেন। যাদের খোলা স্থান বা জমি রয়েছে তারাও ঐ জমিতে সব ধরনের গাছপালা রোপনের মাধ্যমে নিজে স্বাবলম্বী হচ্ছে এবং পরিবেশকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করছে। গাছপালা শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যবর্ধনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় এর মুল কাজ হচ্ছে অক্সিজেন তৈরির মাধ্যমে প্রাণীজগতকে বাঁচিয়ে রাখা। আর এই অক্সিজেন তৈরির কারখানা হচ্ছে সারা দেশে অযত্নে অনাদরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা নার্সারী গুলি। বিএডিসির এক তথ্য থেকে জানা যায় একটি গাছ বছরে ৯ হাজার কোটি অক্সিজেন উৎপন্ন করে থাকে। যা মানব দেহের জন্য একটি গুরুত্বপুর্ন উপাদান। একটি গাছ গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা ৯ ডিগ্রী ফারেনহাইট পর্যন্ত কমাতে পারে। আমরা জানি এই অক্সিজেন ছাড়া একমুহুর্তও বেঁচে থাকা যায় না। এছাড়াও গাছপালা তার সুশীতল ছায়া দিয়ে সকল জীবের ক্লান্তি দুর করে। গাছপালা থেকে তৈরি হয় মনোরম আসবাবপত্র। গাছপালা আমাদের অর্থের যোগান দিয়ে ব্যক্তি সমাজ ও দেশকে আর্থিকভাবে স্বনির্ভর করে তোলে। সর্বোপরি এই গাছপালা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অতি গুরুত্বপুর্ন ভূমিকা রাখে। একটি গাছ অথচ দুঃখের বিষয় আমাদের এই দেশে গাছপালা ও বনাঞ্চল পর্যায়ক্রমে হ্রাস পাচ্ছে। এক শ্রেণীর লোভী ও স্বার্থান্বেষী মহল গাছপালা কর্তন, বন ধ্বংস, নদীনালা ভরাট ও জোড় দখল করে পরিবেশের বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে আর অন্যদিকে দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় তারা বাধা হয়ে দাড়াচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে জন সচেতনতা ও গনজোয়ার সৃষ্টি করে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। শ্লোগান তুলতে হবে স্টপ ইকো-সাইড। দেশের প্রচলিত আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। ইকো সাইডকে জেনোসাইড এর মত অপরাধ বলে গণ্য করতে হবে। তা না হলে শুধুমাত্র বাংলাদেশ নয় বিশ্বব্যাপি দেখা দিবে অতিবৃষ্টি, খরা, বন্যা, ঘুর্ণিঝড় ও দাবানলের ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। প্রকৃতির এই বৈরীতা থেকে পরিবেশকে বাঁচাতে হলে সবার আগে বৃক্ষ রোপনের উপরে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সাথে খাল, বিল, নদী নালা, হাওড় বাওড় এর সুরক্ষা দিতে হবে। এই বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই খাল খননের মত বাস্তবমুখী কর্মসূচী হাতে নিয়েছেন। বর্তমান সরকার তাঁর মেয়াদকালে পর্যায়ক্রমে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপনের মত গুরুত্বপূর্ন প্রকল্পও হাতে নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী মনে করেন আগামী পৃথিবীতে গাছপালা হবে স্বর্ণের চেয়েও দামী। এ প্রসঙ্গে আমাদের অতিপরিচিত বাঁশ নিয়ে অবাক করা অজানা কিছু তথ্য ও উপাত্ত তুলে ধরা যায়। পৃথিবীতে ১৮ হাজার প্রজাতির বাঁশই রয়েছে। বাংলাদেশে বান্দরবানের লামায় কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের সুরক্ষিত বাগানে ২১০ প্রজাতির বাঁশের সংগ্রহ রয়েছে বলেও জানা যায়। এই বাঁশ আমাদের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত্য ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। বৃক্ষমেলায় কোয়ান্টাম ফউন্ডেশণের স্টলে বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশের চারা পাওয়া যাচ্ছে। বাশঁপাতার চা মানব দেহের জন্য খুবই উপকারী। এর ওষধি গুনাগুন লিখে শেষ করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশে ডঃ যোগেশ চন্দ্র ঘোষের হাত ধরে আয়ুর্বেদ চিকিৎসা শাস্ত্রের শুরু হয়েছিল। যার মুল উপাদান এই বাংলার গাছপালা ও প্রকৃতি থেকে সংগৃহীত হতো। বর্তমানে ডঃ আলমগীর মতি তার গবেষনালব্ধ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে মডার্ন হারবাল নামক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও চিকিৎসা সেবায় দীর্ঘ চল্লিশ বৎসর যাবত কাজ করে যাচ্ছেন। আমার উদ্ধৃত লেখা থেকে একটি বার্তা পরিস্কার যে, মানবজাতি ও পরিবেশের সুরক্ষায় বৃক্ষের কোন বিকল্প নেই। আমরা সকলেই কম করে হলেও তিনটি করে গাছ লগাবো।
বৃক্ষরোপণের সময়কালঃ বাংলাদেশে এখন প্রায় ১২ মাসই বৃক্ষ রোপন করা যায়। তা হলেও সব ঋতুতে সব গাছপালা সুস্থ সবলভাবে বেড়ে উঠার জন্য সহায়ক নয়। সাধারনত বৃক্ষ রোপন ও বাগান নির্মানের জন্য দোআশ মাটি ও আদ্র আবহাওয়া প্রয়োজন। সে জন্য বর্ষা মৌসুম অর্থ্যাৎ জুন থেকে সেপ্টেম্বর এই ৪ মাসই বৃক্ষ রোপনের জন্য উপযুক্ত সময়। একটি বিষয় গুরুত্বের সাথে অনুধাবন করা প্রয়োজন যে, বৃক্ষ রোপনের সাথে সাথে তার পরিচর্যা একটি গুরুত্বপুর্ন বিষয়। বাংলাদেশে সরকারি বেসরকারি ও ব্যাক্তি পর্যায়ে আমরা যে যেভাবেই বৃৃক্ষ রোপন করি না কেন তার পরিচর্যা সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞানের অভাবে টেকসই হয় না। তাই কোন সময়ে কোন মাটিতে কি জাতীয় বৃক্ষ রোপন করা দরকার সে সম্পর্কে সম্যক ধারনা ও প্রশিক্ষনের প্রয়োজন রয়েছে। এ ব্যাপারে সরকার দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন পর্যায়ে একটি করে নার্সারী তৈরী করতে পারেন এবং তা দেখভালের জন্য প্রশিক্ষিত মালি ও নার্সারী ম্যান নিয়োগ দিতে পারেন। এতে একদিকে যেমন নার্সারী ব্যবসা প্রসারিত হবে অন্যদিকে গ্রামীন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। অতএব জাতীয়ভাবে শুধুমাত্র বছরে একবারই আগারগাঁও মাঠে বৃক্ষমেলার আয়োজন যথেষ্ট নয়। পাশাপাশি ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে ৪ মাস অন্তর অন্তর এই মেলার আয়োজন করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে নার্সারী মালিকগণ যেমন উৎসাহিত হবে তেমনি বৃক্ষরোপনের প্রতি তৃণমুল পর্যায়ে মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে। একই সাথে নার্সারী মালিকদের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি তাদের পরামর্শ ও দিক নির্দেশনা আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নার্সারী ব্যবসাকে একটি শিল্প হিসাবে স্বীকৃতি দিলে বাংলাদেশ একদিন কারো পিছে নয় সবার আগেই থাকবে।
——————————
লেখকঃ কলামিস্ট ও পরিবেশ কর্মী

গোরা বিশ্বাস 


















