পটুয়াখালীর কলাপাড়াতে টাকা চুরির অপবাদে ৬ষ্ঠ শ্রেণি পড়ুয়া এক এতিম শিশু শিক্ষার্থীকে অমানুষিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া শিশুটির মা তাকে বাঁচাতে এলে তিনিও নির্যাতনের শিকার হন। তবে এখানেই শেষ নয়, টানা দুই ঘণ্টা নির্যাতনের পর চিকিৎসা কেন্দ্রে যেতে না দিয়ে মা-ছেলেকে ৩ দিন ধরে বাড়িতে অবরুদ্ধ করে রাখা হয় বলে জানা গেছে।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) কলাপাড়া উপজেলার গামুড়িবুনিয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটলেও মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। নির্মম এ অত্যাচারের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং তার আপন ভাইয়ের বিরুদ্ধে। জানা যায়, মঙ্গলবার ভোররাতে শরীরের তীব্র যন্ত্রণা সইতে না পেরে স্থানীয় এক ব্যক্তির সহায়তায় তারা দুজন কলাপাড়া উপজেলা হাসপাতালে ভর্তি হন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায় , শরীরজুড়ে আঘাতের লালচে দাগ আর তীব্র ব্যথায় শয্যায় কাতরাচ্ছেন বিধবা মা নাজমা বেগম ও তার শিশু সন্তান জিসান। হাসপাতালের শয্যায় থেকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে নাজমা বেগম চলনবিল প্রবাহকে জানান, তার ছেলে জিসান হোসেন কলাপাড়া উপজেলার চাকামইয়া ইউপির তারিকাটা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। শুক্রবার রাত ১০টার দিকে গামুড়িবুনিয়া গ্রামে তাদের বাড়িতে গিয়ে জিসানকে ধরে নিয়ে আসেন আব্দুল হাই তালুকদার।
পরে বাড়িতে নিয়ে শিশুটিকে পাঁচ হাজার টাকা চুরির অপবাদে বাঁশের লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে গোয়ালঘরে শিকলে বেঁধে রাখা হয়। সন্তানের এমন খবরে মা সেখানে গেলে তার সামনেই ফের অমানবিক নির্যাতন চালান উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হাফিজুর রহমান চুন্নু তালুকদার। এ সময় ছেলেকে আর না মারার অনুরোধ করলে তাকেও নির্যাতন চালানো হয়।
এই নারীর অভিযোগ, তার স্বামী বাচ্চু হাওলাদার দেড় বছর আগে ব্রেন স্ট্রোকে মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি মারা যাওয়ার আগে আব্দুল হাই তালুকদারকে ১ লাখ টাকা দিয়ে যান জমি কেনার জন্য। তার দাবি সেই টাকা ফেরত না দিতে এবং জমি না দেওয়ার জন্যই চুরির নাটক সাজিয়ে এমন নির্যাতন চালানো হয়েছে।
নির্যাতনের শিকার ভুক্তভোগী শিশু শিক্ষার্থী জিসান চলনবিল প্রবাহ কে জানায়, মারতে মারতে প্রস্রাব করে দেওয়ার পরেও তাকে পেটাতে থাকেন চুন্নু তালুকদার। তিনদিন গৃহবন্দি করে রাখা হয়।
মা ও ছেলেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসা যুবক একজন ছাত্রদল নেতা। নাম না প্রকাশ করার শর্তে চলনবিল প্রবাহকে তিনি বলেন, সোমবার রাতে পালিয়ে আমাদের বাড়িতে ওঠে মা আর ছেলে। এ সময় তাদের পুরো শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখি। কিন্তু যারা মেরেছে, তাদের কথা শুনে আমিই প্রথমে ভয় পেয়ে যাই। তবে আহতদের যন্ত্রণা দেখে ভোররাতে হাসপাতালে নিয়ে এসেছি। কিন্তু আমার কথা জানতে পারলে আমারও সমস্যা হতে পারে।’
এ বিষয়ে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান চুন্নু সাংবাদিকদের বলেন, ওই ছেলেটা একটা চোর। সুযোগ পেলেই চুরি করে। আমাদের বাড়ি থেকে মানিব্যাগ চুরি করছে।’
তার ভাই উপজেলা বিএনপির সদস্য আব্দুল হাই বলেন, ‘ওই ছেলেটা চোর, তাই তাকে চর-থাপ্পড় দেওয়া হয়েছে।’
তাহলে কেন তার মাকে মারা হয়েছে, এ বিষয়ে জানতে চাইলে কোনো উত্তর দেননি। এছাড়া ওই ১ লাখ টাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘টাকা পাবে তাই তাদের জমি চাষ করতে দেই।’
এসময় তারা কোন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, সেটাও জানতে চান তিনি।
কলাপাড়া হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. মাহবুবুর রহমান চলনবিল প্রবাহকে বলেন, মা এবং ছেলে দুইজনের শরীরেই অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। যেহেতু এটা পুলিশি বিষয় তাই আমি লিপিবদ্ধ করে রেখেছি।
এ বিষয়ে কলাপাড়া থানার ওসি নজরুল ইসলাম চলনবিল প্রবাহকে বলেন, আমার কাছে এমন কোন অভিযোগ আসেনি। আমি হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে দেখছি। তবে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মো: রাকিবুল ইসলাম, কলাপাড়া প্রতিনিধি 


















