ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবনের কোলাহল পেরিয়ে সেদিন যেন হঠাৎ করেই প্রাণ ফিরে পেয়েছিল প্রিয় নাটোর। রাজধানীর বাংলাদেশ নৌবাহিনী সদর দপ্তরের সাগরিকা হল হয়ে উঠেছিল নাটোরের মানুষের মিলনমেলা—স্মৃতি, আবেগ, ভালোবাসা আর আত্মপরিচয়ের এক অনন্য ঠিকানা। ঢাকাস্থ নাটোর জেলা সমিতির উদ্যোগে জেলার ছয় সংসদ সদস্যের সম্মানে আয়োজিত জমকালো সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সেদিন মিলেছিল নাটোরের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রাণের স্পন্দন।
১২ সেপ্টেম্বর, শনিবার বিকেল থেকেই সাগরিকা হলে জড়ো হতে থাকেন ঢাকায় বসবাসরত নাটোরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। রাজনীতিক, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বসহ নানা পেশার মানুষের উপস্থিতিতে পুরো আয়োজনটি হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। মনে হচ্ছিল, রাজধানীর বুকের মাঝেই যেন জেগে উঠেছে আমাদের চিরচেনা নাটোর—তার মানুষ, তার সংস্কৃতি আর ভালোবাসার বন্ধন নিয়ে।

অনুষ্ঠানটি বিকেল ৫টায় শুরু হওয়ার কথা থাকলেও বিশেষ ব্যস্ততার কারণে কিছুটা বিলম্ব হয়। ওই সময় নাটোরের সংসদ সদস্যদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক থাকায় অতিথিদের আগমনে কিছুটা দেরি হয়। তবে সেই অপেক্ষাও যেন অনুষ্ঠানের আবেগকে আরও গভীর করে তোলে।
অনুষ্ঠানের শুরুটাও ছিল ব্যতিক্রমী। গতানুগতিক বক্তব্যের আনুষ্ঠানিকতা দিয়ে নয়, বরং সুর ও নৃত্যের মূর্ছনায় শুরু হয় আয়োজন। নাটোর থেকে বিশেষভাবে আগত বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী ইফতেখার রহমান সৌরভের নেতৃত্বে তাথৈ নৃত্যকলা একাডেমির শিল্পীরা পরিবেশন করেন মনোমুগ্ধকর নৃত্য। তাদের নান্দনিক পরিবেশনায় মুহূর্তেই প্রাণ ফিরে পায় সাগরিকা হল। নৃত্যের ছন্দে যেন ফুটে ওঠে নাটোরের মাটি ও মানুষের সংস্কৃতির চিরন্তন সৌন্দর্য।

সম্মানিত অতিথিরা অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছালে তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান ঢাকাস্থ নাটোর জেলা সমিতির সভাপতি ও প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান খান চৌধুরী, নির্বাহী সভাপতি খোন্দকার আবুল কাসেম, সাধারণ সম্পাদক ও মাগুরার জেলা প্রশাসক (যুগ্ম সচিব) মোতাকাব্বীর আহমেদ রাজু এবং সিনিঃ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহিম তুহিনসহ সমিতির অন্যান্য নেতৃবৃন্দ ।
পরে ফুলেল শুভেচ্ছা ও ক্রেস্ট প্রদানের মাধ্যমে নাটোরের ছয় সংসদ সদস্যসহ আমন্ত্রিত অতিথিদের সম্মাননা জানানো হয়। সংবর্ধিতদের মধ্যে ছিলেন নাটোরের চারবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমীন পুতুল, নাটোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. আনোয়ারুল ইসলাম, নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আজিজ, সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য আন্না মিনজ এবং সানজিদা ইয়াসমিন তুলিসহ অন্যান্য অতিথিবৃন্দ।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে নাটোরের সার্বিক উন্নয়ন ও জেলার মানুষের কল্যাণে দল-মত ও পেশার ঊর্ধ্বে উঠে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন জেলার ছয় সংসদ সদস্য। বিশেষ করে ঢাকাস্থ নাটোর জেলা সমিতির নিজস্ব জায়গা বরাদ্দ এবং সেখানে একটি স্থায়ী ভবন নির্মাণের বিষয়ে তারা সহযোগিতা ও উদ্যোগ নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
আয়োজনের সাংস্কৃতিক পর্বেও ছিল নাটোরের নিজস্বতার ছাপ। নাটোরের সাকাম নাট্যগোষ্ঠীর পরিবেশিত নাটক দর্শকদের মুগ্ধ করে। নাটকের গল্প, অভিনয় ও পরিবেশনায় উঠে আসে মানুষের জীবন, সমাজ ও শেকড়ের নানা অনুষঙ্গ। ফলে পুরো আয়োজনটি নিছক একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের সীমায় আবদ্ধ না থেকে পরিণত হয় নাটোরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের এক আবেগঘন মিলনমেলায়।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন আব্দুর রহিম তুহিন, মামুনুর রশিদ ও মাহবুবা সুলতানা মৌসুমি। প্রাণ গ্রুপের সৌজন্যে অতিথিদের জন্য চা, কফি, স্ন্যাকস, জুসসহ বিভিন্ন খাবারের আয়োজন করা হয়। সবশেষে নৈশভোজের মধ্য দিয়ে শেষ হয় বর্ণাঢ্য এই আয়োজন।
দীর্ঘদিন পর ঢাকাস্থ নাটোর জেলা সমিতির এমন আয়োজনকে ঘিরে নাটোরবাসীর মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্দীপনা। রাজধানীতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নাটোরের মানুষকে একই বন্ধনে আবদ্ধ করার পাশাপাশি এ আয়োজন পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করবে—এমন প্রত্যাশাই ব্যক্ত করেছেন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া অতিথিরা।
সেদিন সাগরিকা হলের আলো-আবেগে যেন বারবার ফিরে এসেছে নাটোর। দূরত্ব ছিল শুধু ঢাকার সঙ্গে নাটোরের; হৃদয়ের দূরত্ব ছিল না একটুও। তাই তো কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও সাগরিকা হল হয়ে উঠেছিল—এক টুকরো নাটোর।

তোজাম্মেল হক 


















