ভরা বর্ষায় চারদিকে থইথই পানি। বিলের বুকজুড়ে দুলছে ঢেউ। সেই পানির বুক চিরে ছুটে চলছে কলাগাছের তৈরি ছোট ছোট ভেলা। কারও হাতে লগি, কারও হাতে বৈঠা। ভেলার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছে মানুষের উচ্ছ্বাস, করতালি আর আনন্দধ্বনি। মনে হচ্ছিল—সময়ের স্রোত পেরিয়ে যেন ফিরে এসেছে গ্রামবাংলার সেই হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো।
একসময় গ্রামীণ জনজীবনে ‘ভুর’ বা ‘ভেলা’ ছিল নৌকার সহজ বিকল্প। বিশেষ করে বর্ষাকালে চলনবিলের বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যাতায়াতে এর ব্যবহার ছিল বেশ প্রচলিত। তিন-চারটি কলাগাছ পাশাপাশি বেঁধে তৈরি করা হতো এই ভেলা। পানিতে না ডুবে থাকা কলাগাছের ভেলায় দুই-তিনজন অনায়াসেই লগি কিংবা বৈঠা দিয়ে পাড়ি দিতেন বিলের এপার-ওপার।
কালের বিবর্তনে সেই চেনা ভেলা এখন প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই এটি যেন কেবল গল্পের বিষয়। হারিয়ে যেতে বসা সেই গ্রামীণ ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতেই রবিবার চলনবিলের কচুগাড়ী গ্রামে আয়োজন করা হয় ব্যতিক্রমী ভেলা বাইচ।
কচুগাড়ী মোল্লাপাড়া যুব সমাজের উদ্যোগে বিলের পানিতে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে তৈরি হয় উৎসবের আমেজ। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে নানা বয়সী মানুষ ভিড় করেন বিলপাড়ে। ভেলা যখন ঢেউ কেটে সামনে এগিয়ে যায়, তখন দর্শকদের করতালি আর উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ।
প্রতিযোগিতায় প্রতিটি ভেলায় অংশ নেন দুজন করে। একের পর এক ভেলা ছুটে চলে নির্ধারিত পথে। প্রতিযোগিতায় আনিস-জাহিদ জুটি প্রথম, মাসুদ-আলামিন জুটি দ্বিতীয় এবং আব্দুল্লাহ-শামসু জুটি তৃতীয় স্থান অর্জন করেন।
শুধু ভেলা বাইচ নয়, আয়োজনের অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত হয় সাঁতার প্রতিযোগিতা ও খোলা পানিতে হাঁস ধরার প্রতিযোগিতা। এসব প্রতিযোগিতাকে ঘিরে শিশু-কিশোরদের উচ্ছ্বাস আর দর্শকদের আনন্দে বিলপাড়ের পরিবেশ হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।
স্থানীয়দের কাছে এ আয়োজন ছিল নিছক বিনোদন নয়; বরং শৈশবের স্মৃতি ও গ্রামীণ জীবনের হারিয়ে যাওয়া কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে নতুন করে ছুঁয়ে দেখার সুযোগ। অনেক প্রবীণ দর্শকের চোখেমুখে যেন ফুটে ওঠে সেই পুরোনো দিনের ছবি—যখন বর্ষা এলেই বিলের পানিতে ভেসে বেড়াত কলাগাছের ভেলা, আর গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠত এমন সব খেলাধুলা।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কচুগাড়ী ফকিরবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা মজনু মো. ইসহাক। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সুজন আলম। এ সময় মোল্লাপাড়া ও কচুগাড়ী গ্রামের বিভিন্ন মুরুব্বি ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। আয়োজনটির পৃষ্ঠপোষকতায় ছিল অনলাইন বিজনেস প্রতিষ্ঠান ‘জিরো বাজার’।

কচুগাড়ীর বিলের বুকে সেদিন শুধু ভেলা ছুটেনি—ছুটেছে স্মৃতিও। ঢেউয়ের সঙ্গে ভেসে এসেছে হারিয়ে যাওয়া দিনের গল্প। প্রবীণদের স্মৃতির ভেলা যেন এক মুহূর্তের জন্য পৌঁছে গেছে সেই সময়ের কাছে, যখন গ্রামবাংলার জীবন ছিল আরও সহজ, আরও নির্মল, আরও আপন।
হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে ঘিরে কচুগাড়ীর এই আয়োজন যেন মনে করিয়ে দিল—ঐতিহ্য কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। মানুষের ভালোবাসা, স্মৃতি আর উদ্যোগ তাকে আবারও ফিরিয়ে আনতে পারে। তাই কচুগাড়ীর ভেলা বাইচ কেবল একটি প্রতিযোগিতা নয়; এটি শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার উৎসব, গ্রামীণ জীবনের স্মৃতিকে বুকে ধারণ করার আয়োজন এবং নতুন প্রজন্মের হাতে হারিয়ে যেতে বসা এক টুকরো ইতিহাস তুলে দেওয়ার আন্তরিক প্রয়াস।

রিফাত আহমেদ অর্পণ, কচুগাড়ী (বড়াইগ্রাম) থেকে 


















