রাষ্ট্রপতি হিসেবে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বঙ্গভবন ছাড়লেন মো. সাহাবুদ্দিন। তার বিদায় যেমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ঘটনা, তেমনি রাজনৈতিকভাবেও তা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ, তার রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হওয়া থেকে শুরু করে বিদায় পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই ছিল নানা বিতর্ক, প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েন।
দুদকের কমিশনার, ইসলামী ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং সর্বশেষ রাষ্ট্রপতি— মো. সাহাবুদ্দিনের কর্মজীবনের প্রায় প্রতিটি পর্যায়েই বিতর্কের ছায়া ছিল। বিশেষ করে পদ্মা সেতু দুর্নীতি তদন্ত, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা, শেখ হাসিনার সঙ্গে সম্পর্ক, রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার ভূমিকা এবং পদত্যাগপত্র বিতর্ক তাকে বারবার আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
ছাত্রলীগ থেকে রাষ্ট্রপতি
মো. সাহাবুদ্দিনের রাজনৈতিক পরিচয় কখনোই আড়ালে ছিল না। পাবনায় ছাত্রলীগের রাজনীতির মাধ্যমে তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর কারাবরণ করেন।
পরবর্তীতে বিচার বিভাগে যোগ দিয়ে জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। ২০০১ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা তদন্ত কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১১ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার নিযুক্ত হন। মেয়াদ শেষে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হন এবং ২০২৩ সালে দলটির মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
পদ্মা সেতু তদন্ত নিয়ে বিতর্ক
দুদকে দায়িত্ব পালনকালে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগে কথিত দুর্নীতির অভিযোগ। বিশ্বব্যাংক দাবি করেছিল, উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা, কানাডীয় প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিনের প্রতিনিধিসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ঘুষের ষড়যন্ত্রের বিশ্বাসযোগ্য তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। সরকারের পদক্ষেপে সন্তুষ্ট না হয়ে বিশ্বব্যাংক ১২০ কোটি ডলারের ঋণ বাতিল করে।
২০১২ সালে দুদক সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা করলেও তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে আসামি করা হয়নি। এ সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশ্বব্যাংকের নিয়োগ করা বিশেষজ্ঞ প্যানেল প্রশ্ন তোলে এবং তদন্তের সীমাবদ্ধতার সমালোচনা করে।
সে সময় তদন্ত বিভাগের কমিশনার হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, বাংলাদেশের আইন ও বিদেশি আইনের ব্যাখ্যা এক নয় এবং বিশ্বব্যাংকের প্যানেল মামলা দায়েরে সন্তুষ্ট। তবে তৎকালীন দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান পরে জানান, প্যানেল এ ধরনের কোনো সন্তুষ্টি প্রকাশ করেনি। এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যও নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়।
২০১৪ সালের ক্লিনচিট, ২০২৫ সালে নতুন প্রশ্ন
প্রায় ২০ মাস তদন্ত শেষে ২০১৪ সালে দুদক জানায়, দুর্নীতি বা ঘুষের ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর অভিযুক্তরা অব্যাহতি পান। মো. সাহাবুদ্দিনও সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেন।
পরে কানাডার আদালতেও এসএনসি-লাভালিনের তিন সাবেক কর্মকর্তা খালাস পান। তবে সেই রায়ে প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আইনি সীমাবদ্ধতা ছিল; আদালত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে ঘোষণা করেনি।
২০২৫ সালে গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দুদক পুনঃতদন্ত শুরু করে। নতুন চেয়ারম্যান জানান, পরামর্শক নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রাথমিক আলামত পাওয়া গেছে এবং আগের তদন্তে যথাযথভাবে বিষয়টি অনুসন্ধান করা হয়নি। এতে পুরোনো বিতর্ক আবার সামনে আসে এবং প্রশ্ন ওঠে— ২০১৪ সালে যেসব তথ্য উপেক্ষিত হয়েছিল, সেগুলো কেন গুরুত্ব পায়নি।
ব্যক্তিগত দুর্নীতির প্রমাণ নেই, প্রশ্ন ছিল প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা নিয়ে
মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে ঘুষ গ্রহণের সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ কখনও সামনে আসেনি। তবে সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, দুদক কমিশনার হিসেবে তিনি সংস্থার নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন করেছেন এবং ক্ষমতাসীনদের বিষয়ে নমনীয় অবস্থান নিয়েছেন।
২০১৩ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের কয়েকজন প্রার্থীর সম্পদ বৃদ্ধির বিষয়ে তদন্ত নির্বাচন ব্যাহত করতে পারে— এমন মন্তব্যও বিতর্ক সৃষ্টি করে। পরে দুদক সেই অবস্থান থেকে সরে আসে।
এ ছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) সম্পর্কে তার কড়া মন্তব্যও সমালোচনার জন্ম দেয়। অনেকের মতে, তার বক্তব্য একজন দুদক কমিশনারের চেয়ে রাজনৈতিক নেতার বক্তব্যের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।
ইসলামী ব্যাংক ও এস আলম প্রসঙ্গ
দুদক থেকে অবসরের পর ২০১৭ সালে মো. সাহাবুদ্দিন ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক এবং পরে ভাইস চেয়ারম্যান হন। ওই সময় ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেয় এস আলম গ্রুপ।
পরবর্তী সময়ে ইসলামী ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ বের করে নেওয়া, প্রক্সি শেয়ারধারী এবং অস্বচ্ছ ঋণ বিতরণের অভিযোগ সামনে আসে। যদিও মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠেনি, তবু পর্ষদের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে যায়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার দিন তিনি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে পদত্যাগ করেন।
নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক
শেখ হাসিনার পা ছুঁয়ে সালাম করার একটি পুরোনো ছবি রাষ্ট্রপতি মনোনয়নের পর সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সমালোচকদের মতে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থাকা একজন ব্যক্তির ক্ষেত্রে এমন দৃশ্য রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বৈধতাও আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়েছিল। তবে হাইকোর্ট ও পরে আপিল বিভাগ সেই রিট খারিজ করে দেওয়ায় আইনগত বাধা দূর হয়। যদিও রাজনৈতিক বিতর্ক থেকে যায়।
৫ আগস্টের পর নতুন বাস্তবতা
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় তার নীরবতা নিয়ে সমালোচনা থাকলেও শেখ হাসিনার পতনের পর তিনিই দেশের প্রধান সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষ হিসেবে সংসদ ভেঙে দেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখেন এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে শপথবাক্য পাঠ করান।
শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র বিতর্ক
৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে ভাষণে মো. সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন এবং তিনি সেই পদত্যাগ গ্রহণ করেছেন।
পরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার পদত্যাগের কথা শুনেছেন, তবে তার কাছে কোনো লিখিত পদত্যাগপত্র ছিল না। এই দুই বক্তব্যের অসামঞ্জস্য নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়।
এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল তার বিরুদ্ধে শপথ ভঙ্গ ও অসত্য তথ্য দেওয়ার অভিযোগ তোলেন। ছাত্রদের একটি অংশ তার পদত্যাগ দাবি করে বঙ্গভবনের সামনে বিক্ষোভও করে। তবে বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল তখন রাষ্ট্রপতিকে অপসারণে সাংবিধানিক সংকটের আশঙ্কার কথা জানায়।
শেষ সময়ে সম্পর্কের অবনতি
অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে তার সম্পর্ক ক্রমেই শীতল হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি অভিযোগ করেন, প্রধান উপদেষ্টা দীর্ঘদিন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি, প্রেস বিভাগ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলো থেকেও তার ছবি নামিয়ে ফেলা হয়েছে। তিনি নিজেকে অপমানিত মনে করেছেন বলেও মন্তব্য করেন।
পদত্যাগের আগে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে কথিত ফোনালাপের খবরকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেন এবং দাবি করেন, তিনি সারাজীবন ন্যায়সংগতভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
অবশেষে শুক্রবার (২৪ জুলাই) তিনি মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
পদত্যাগের পরও শেষ হয়নি বিতর্ক
মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পরও তাকে ঘিরে বিতর্ক থেমে নেই। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম দাবি করেছেন, পদত্যাগের মাধ্যমে দায় শেষ হয় না; তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতি, শপথ ভঙ্গ এবং জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহে ভূমিকার অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
মো. সাহাবুদ্দিনের রাষ্ট্রপতিত্বের পুরো সময়কাল রাজনৈতিক আনুগত্য, সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং বিতর্কের এক জটিল সমীকরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তার বিদায় কেবল একজন রাষ্ট্রপতির অসমাপ্ত মেয়াদের সমাপ্তি নয়; বরং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা, জবাবদিহি এবং জনআস্থার প্রশ্নকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

অনলাইন ডেস্ক 


















