বিকেলের শেষ আলো গিয়ে পড়েছে নদীর ঘাটে। পুরোনো বটগাছের নিচে বসে অনিরুদ্ধ একটি ডায়েরির পাতা উল্টাচ্ছিল। হঠাৎ একটি মেয়ের কণ্ঠ ভেসে এলো—
—”এই ডায়েরিটা কি আপনার?”
মাথা তুলে সে দেখল, সাদা-নীল শাড়ি পরা এক তরুণী। তার চোখ দুটো অদ্ভুত শান্ত, অথচ যেন বহুদিনের চেনা।
অনিরুদ্ধ মৃদু হেসে বলল, —”ডায়েরি আমার, কিন্তু আপনাকে যেন কোথাও দেখেছি…”
মেয়েটিও থমকে গেল। -“আমারও ঠিক তাই মনে হচ্ছে।”
সেদিনের আলাপ শেষ হয়েছিল মাত্র কয়েকটি কথায়। কিন্তু সেই কয়েকটি কথাই যেন দুজনের জীবনে অজস্র অজানা স্মৃতির দরজা খুলে দিল।
এরপর প্রতিদিনই তারা নদীর ধারে দেখা করতে লাগল। দুজনেই অবাক হয়ে দেখল, একজনের অপ্রকাশিত ভাবনা অন্যজন সহজেই বুঝে ফেলে। একজন গান শুরু করলে অন্যজন অজান্তেই তার শেষ লাইনটি গেয়ে ওঠে। যেন পরিচয় আজকের নয়, বহু দূরের।
একদিন গ্রামের বৃদ্ধ গ্রন্থাগারিক তাঁদের হাতে একটি পুরোনো পুঁথি তুলে দিলেন। সেখানে লেখা ছিল—
“কিছু আত্মার মিলন এক জন্মের নয়। সময় তাদের আলাদা করে, কিন্তু ভালোবাসা বারবার তাদের পরিচয় করিয়ে দেয়।”
সেদিন রাতেই অনিরুদ্ধ স্বপ্ন দেখল—কখনও তারা রাজপ্রাসাদের দুই শিল্পী, কখনও যুদ্ধক্ষেত্রে হারিয়ে যাওয়া দুই বন্ধু, কখনও নদীর দুই পারে দাঁড়িয়ে থাকা প্রেমিক-প্রেমিকা, আবার কখনও মা ও সন্তানের অদ্ভুত বন্ধনে বাঁধা। জন্ম বদলেছে, নাম বদলেছে, কিন্তু এক অদৃশ্য টান কখনও বদলায়নি।
পরদিন অনিরুদ্ধ স্বপ্নের কথা বলতেই মেয়েটি বিস্ময়ে বলল, —”আমিও ঠিক একই স্বপ্ন দেখেছি।”
দুজনেই নীরব হয়ে গেল। তারা বুঝল, এই অনুভূতির কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হয়তো নেই, কিন্তু হৃদয়ের কিছু সত্য যুক্তির চেয়েও গভীর।
কয়েক মাস পর মেয়েটির বিদেশে চলে যাওয়ার খবর এল। বিদায়ের দিন সে অনিরুদ্ধের হাতে একটি ছোট্ট চিঠি দিল।
তাতে লেখা ছিল—
“যদি এ জন্মে আবার হারিয়ে যাই, খুঁজো না। কারণ সত্যিকারের পরিচয় খুঁজে নিতে হয় না। সময় নিজেই একদিন আমাদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে। শত জনম পেরিয়েও যে সম্পর্ক হারায় না, তার নামই পরিচয়।”
বহু বছর কেটে গেল।
এক বর্ষার সকালে অনিরুদ্ধ তার নাতনিকে নিয়ে সেই পুরোনো নদীর ঘাটে এল। হঠাৎ একটি ছোট্ট মেয়ে দৌড়ে এসে নাতনির হাত ধরে বলল,
—”চলো, আমরা বন্ধু হই।”
দুই শিশুর হাসিতে নদীর বাতাস ভরে উঠল।
অনিরুদ্ধ দূরে দাঁড়িয়ে তাদের মায়ের মুখের দিকে তাকাল। মুহূর্তের জন্য সময় যেন থেমে গেল। সেই একই শান্ত চোখ, সেই একই অচেনা অথচ চিরচেনা হাসি।
তারা কেউ কিছু বলল না।
শুধু দুজনেই মৃদু হাসল।
হয়তো নাম বদলায়, ঠিকানা বদলায়, জীবন বদলায়। কিন্তু কিছু সম্পর্কের পরিচয় জন্মসনদে লেখা থাকে না—তা লেখা থাকে আত্মার গভীরে।
সেই কারণেই, কিছু মানুষের সঙ্গে দেখা হলে মনে হয়—
“তোমাকে যেন আমি শত জনম ধরে চিনি।”

মাধুরী ব্যানার্জী 



















