ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে ‘বহিষ্কার’ শব্দ নেই; ভিন্নমত আইনজীবীদের, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের

জামায়াত থেকে বহিষ্কার গাজী নজরুল, এমপি পদ থাকবে কি? সিদ্ধান্ত নেবে ইসি

blank

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে নৈতিক স্খলনের অভিযোগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। দল জানিয়েছে, এ সিদ্ধান্তের বিষয়ে অবিলম্বে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) অবহিত করা হবে। তবে এর পরিপ্রেক্ষিতে গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকবে কি না, তা নিয়ে সাংবিধানিক ও আইনি মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বিতর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ। এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো সংসদ সদস্য রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত হওয়ার পর দল থেকে পদত্যাগ করলে বা সংসদে দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তার আসন শূন্য হবে। তবে দল থেকে বহিষ্কার হলে সদস্যপদ বাতিল হবে— এমন কোনো বিধান সেখানে সরাসরি উল্লেখ নেই।

এ কারণে আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, কেবল দলীয় বহিষ্কারই কোনো সংসদ সদস্যের পদ শূন্য হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। অন্যদিকে, আরেক অংশের মত হলো, দলীয় বহিষ্কারের ফলে বিষয়টি সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদের আওতায় নির্বাচন কমিশনের বিবেচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য ৭০ অনুচ্ছেদের আওতায় আসন হারিয়েছেন কি না— এ নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে বিষয়টি শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হবে এবং কমিশনের সিদ্ধান্তই প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন মনে করেন, গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকার সুযোগ নেই। তার ভাষ্য, নৈতিক স্খলনের অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কারের পর বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের কাছে যাবে এবং সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কমিশনের সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।

তিনি ১৯৯৬ সালের একটি নজির তুলে ধরে বলেন, বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় বহিষ্কৃত হন এবং পরবর্তীতে আদালতে গিয়েও সংসদ সদস্য পদ রক্ষা করতে পারেননি।

অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনিরও মত দিয়েছেন যে, গাজী নজরুলের সদস্যপদ বহাল থাকার সম্ভাবনা নেই। যদিও তিনি স্বীকার করেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে ‘পদত্যাগ’-এর কথা বলা হয়েছে, ‘বহিষ্কার’-এর কথা নয়।

তবে ভিন্ন মত পোষণ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান। তার মতে, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে দলীয় বহিষ্কারকে সংসদ সদস্যপদ শূন্য হওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে শুধু বহিষ্কারের ভিত্তিতে কোনো সদস্যের পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে— এমন ব্যাখ্যা সংবিধান সমর্থন করে না।

তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তও চূড়ান্ত অর্থে বিচারিক পর্যালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করতে পারেন এবং প্রয়োজনে আপিল বিভাগেও যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

এর আগে বুধবার (২২ জুলাই) বিকেলে রাজধানীর মিন্ট রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে গাজী নজরুল ইসলামকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান, এমপি।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সাংগঠনিক তদন্তে গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বহিষ্কারের সিদ্ধান্তটি অবিলম্বে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করা হবে।

এখন গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকবে কি না, সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার দিকেই নজর রয়েছে রাজনৈতিক ও আইন অঙ্গনের।

জনপ্রিয় খবর
blank

ড্রিলবিট রেখে সেলাইয়ের সংবাদ ‘তথ্য বিভ্রাট’: সংবাদ সম্মেলনে ডা. জাহেদুলের প্রতিবাদ

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে ‘বহিষ্কার’ শব্দ নেই; ভিন্নমত আইনজীবীদের, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের

জামায়াত থেকে বহিষ্কার গাজী নজরুল, এমপি পদ থাকবে কি? সিদ্ধান্ত নেবে ইসি

প্রকাশের সময় : ৪ ঘন্টা আগে
blank

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে নৈতিক স্খলনের অভিযোগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। দল জানিয়েছে, এ সিদ্ধান্তের বিষয়ে অবিলম্বে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) অবহিত করা হবে। তবে এর পরিপ্রেক্ষিতে গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকবে কি না, তা নিয়ে সাংবিধানিক ও আইনি মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বিতর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ। এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো সংসদ সদস্য রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত হওয়ার পর দল থেকে পদত্যাগ করলে বা সংসদে দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তার আসন শূন্য হবে। তবে দল থেকে বহিষ্কার হলে সদস্যপদ বাতিল হবে— এমন কোনো বিধান সেখানে সরাসরি উল্লেখ নেই।

এ কারণে আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, কেবল দলীয় বহিষ্কারই কোনো সংসদ সদস্যের পদ শূন্য হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। অন্যদিকে, আরেক অংশের মত হলো, দলীয় বহিষ্কারের ফলে বিষয়টি সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদের আওতায় নির্বাচন কমিশনের বিবেচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য ৭০ অনুচ্ছেদের আওতায় আসন হারিয়েছেন কি না— এ নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে বিষয়টি শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হবে এবং কমিশনের সিদ্ধান্তই প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন মনে করেন, গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকার সুযোগ নেই। তার ভাষ্য, নৈতিক স্খলনের অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কারের পর বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের কাছে যাবে এবং সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কমিশনের সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।

তিনি ১৯৯৬ সালের একটি নজির তুলে ধরে বলেন, বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় বহিষ্কৃত হন এবং পরবর্তীতে আদালতে গিয়েও সংসদ সদস্য পদ রক্ষা করতে পারেননি।

অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনিরও মত দিয়েছেন যে, গাজী নজরুলের সদস্যপদ বহাল থাকার সম্ভাবনা নেই। যদিও তিনি স্বীকার করেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে ‘পদত্যাগ’-এর কথা বলা হয়েছে, ‘বহিষ্কার’-এর কথা নয়।

তবে ভিন্ন মত পোষণ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান। তার মতে, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে দলীয় বহিষ্কারকে সংসদ সদস্যপদ শূন্য হওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে শুধু বহিষ্কারের ভিত্তিতে কোনো সদস্যের পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে— এমন ব্যাখ্যা সংবিধান সমর্থন করে না।

তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তও চূড়ান্ত অর্থে বিচারিক পর্যালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করতে পারেন এবং প্রয়োজনে আপিল বিভাগেও যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

এর আগে বুধবার (২২ জুলাই) বিকেলে রাজধানীর মিন্ট রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে গাজী নজরুল ইসলামকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান, এমপি।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সাংগঠনিক তদন্তে গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বহিষ্কারের সিদ্ধান্তটি অবিলম্বে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করা হবে।

এখন গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকবে কি না, সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার দিকেই নজর রয়েছে রাজনৈতিক ও আইন অঙ্গনের।