ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গৌরবময় অর্ধশতাব্দীর অগ্রযাত্রায় চলনবিল প্রেসক্লাব: অতীত থেকে বর্তমান

blank

চলনবিল প্রেসক্লাব—একটি নাম, একটি ইতিহাস, একটি ঐতিহ্য। বৃহত্তর চলনবিল অঞ্চলের সাংবাদিকতার সূতিকাগার হিসেবে দীর্ঘ ৪৮ বছর ধরে গৌরবের সঙ্গে পথচলা অব্যাহত রেখেছে এই প্রতিষ্ঠান।

১৯৭৮ সালের ১ জুলাই তৎকালীন রাজশাহী জেলার নাটোর মহকুমার (বর্তমান নাটোর জেলা) গুরুদাসপুর থানায় (বর্তমান উপজেলা) চলনবিল অঞ্চলের একদল স্বপ্নবাজ সাংবাদিকের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘চলনবিল প্রেসক্লাব’। গুরুদাসপুরের চাঁচকৈড়ে অবস্থিত থানা শিক্ষা সংঘের একটি কক্ষে শুরু হয় এ সংগঠনের যাত্রা।

তৎকালীন বৃহত্তর চলনবিল অঞ্চল নাটোরের গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম ও সিংড়া; নওগাঁর আত্রাই; সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, রায়গঞ্জ, শাহজাদপুর ও উল্লাপাড়া; এবং পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর (বনওয়ারীনগর) ও বাঘাবাড়ি অঞ্চলের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল। সে সময় গুরুদাসপুরের চাঁচকৈড় হাট ছিল চলনবিলের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যকেন্দ্র এবং নৌ ও সড়ক যোগাযোগের প্রধান সংযোগস্থল।

রাজশাহী কিংবা পাবনায় সরকারি-বেসরকারি দাপ্তরিক কাজে যেতে হলে চলনবিলের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে নৌকা, গরু বা মহিষের গাড়ি, সাইকেল কিংবা পায়ে হেঁটে চাঁচকৈড়ে এসে বাসযোগে গন্তব্যে যেতে হতো। বর্ষাকালে কাদা-পানি পেরিয়ে, কখনও নৌকায়, কখনও হাঁটাপথে এসে চাঁচকৈড় বা গুরুদাসপুরে পোশাক পরিবর্তন করে যাত্রা অব্যাহত রাখতেন তারা। সঙ্গে থাকত ভাত, রুটি, চিড়া, গুঁড়সহ শুকনো খাবার।

আত্রাই, গুমানি ও নন্দকুঁজা নদীর ত্রিমোহনায় অবস্থিত চাঁচকৈড় ছিল কৃষি, বাণিজ্য, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। চলনবিল অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, সমস্যা, সম্ভাবনা এবং উন্নয়নের চিত্র দেশ-বিদেশে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা থেকেই একদল তরুণ সাংবাদিক, ছাত্র ও সমাজসচেতন মানুষ ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন চলনবিল প্রেসক্লাব। সেই থেকেই শুরু হয় চলনবিলের সাংবাদিকতার এক নতুন অধ্যায়।

আজ জুলাই ২০২৬। দীর্ঘ ৪৮ বছরের বন্ধুর পথ পেরিয়ে ১৯৭৮ সালে জন্ম নেওয়া সেই ছোট্ট সংগঠনটি এখন গৌরবময় অর্ধশতাব্দীর দ্বারপ্রান্তে। নানা প্রতিকূলতা, সংগ্রাম ও সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে চলনবিল প্রেসক্লাব আজও মাথা উঁচু করে এগিয়ে চলছে। ভবিষ্যতেও এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে—ইনশাআল্লাহ।

প্রতিষ্ঠাকালে বৃহত্তর চলনবিলের প্রায় ১০টি থানার সাংবাদিকতার প্রতিনিধিত্ব করতেন এই প্রেসক্লাবের সদস্যরা। সে সময় দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে ‘চলনবিল’ ডেটলাইনে সংবাদ, প্রতিবেদন ও ফিচার প্রকাশিত হতো। অনেক গণমাধ্যম তাদের পরিচয়পত্রেও জেলার সমমর্যাদায় চলনবিল’ নাম ব্যবহার করত। এটি ছিল চলনবিলের সাংবাদিকদের জন্য এক বিশেষ সম্মান ও গর্বের বিষয়।

সেই সময় প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সাংবাদিকদের নীতি-নৈতিকতা ও পেশাগত দায়িত্ববোধকে গভীর শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন।

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। বর্তমানে প্রায় প্রতিটি উপজেলা বা থানাতেই গড়ে উঠেছে স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠন ও প্রেসক্লাব। কিন্তু এসব পরিবর্তনের মধ্যেও চলনবিল প্রেসক্লাব’ তার ঐতিহাসিক পরিচয়, ঐতিহ্য ও মর্যাদা অটুট রেখে চলনবিলের নামকে বুকে ধারণ করে এগিয়ে চলেছে। দেশ-বিদেশে আজও চলনবিল প্রেসক্লাবকটি সুপরিচিত ও সম্মানিত নাম।

এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি রচনা করেছেন যাঁরা, তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মধ্যে ছিলেন প্রথিতযশা সাংবাদিক অধ্যাপক আতহার হোসেন, অধ্যাপক নজিবর রহমান আব্বাসী, কাজী মাওলানা রুহুল আমিন, এস. এম. আজিজুল হক কিরণ, আবুল হোসেন রাজু, অধ্যাপক দিলীপ কুমার সাহা, অসিত কুমার সরকার এবং আবু হেনা মোস্তফা কামাল (হ্যালো সুমন)। তাঁদের পাশাপাশি সম্মানিত উপদেষ্টা ও পথপ্রদর্শক অধ্যক্ষ আলহাজ আব্দুল হামিদ (টি. কে. বিলচলনী) এই সংগঠনের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

যাঁরা আজ আমাদের মাঝে নেই, আল্লাহ তাঁদের রুহের মাগফিরাত দান করুন। আর যাঁরা এখনও জীবিত আছেন, তাঁদের সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও কল্যাণ কামনা করছি। তাঁদের আদর্শ, সততা, নিষ্ঠা এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার শিক্ষা আগামী প্রজন্মের সাংবাদিকদের অনুপ্রাণিত করুক—এই আমাদের প্রত্যাশা।

——————————-

লেখক: প্রধান উপদেষ্টা ও  সাবেক সভাপতি
                চলনবিল প্রেসক্লাব
ই-মেইল: akalmazad7711@gmail.com

জনপ্রিয় খবর
blank

নোয়াখালীতে ব্যবসায়ীর বাড়িতে সশস্ত্র ডাকাতি, নগদ টাকা-স্বর্ণালঙ্কার লুট; আহত ৫

গৌরবময় অর্ধশতাব্দীর অগ্রযাত্রায় চলনবিল প্রেসক্লাব: অতীত থেকে বর্তমান

প্রকাশের সময় : ৪২ মিনিট আগে
blank

চলনবিল প্রেসক্লাব—একটি নাম, একটি ইতিহাস, একটি ঐতিহ্য। বৃহত্তর চলনবিল অঞ্চলের সাংবাদিকতার সূতিকাগার হিসেবে দীর্ঘ ৪৮ বছর ধরে গৌরবের সঙ্গে পথচলা অব্যাহত রেখেছে এই প্রতিষ্ঠান।

১৯৭৮ সালের ১ জুলাই তৎকালীন রাজশাহী জেলার নাটোর মহকুমার (বর্তমান নাটোর জেলা) গুরুদাসপুর থানায় (বর্তমান উপজেলা) চলনবিল অঞ্চলের একদল স্বপ্নবাজ সাংবাদিকের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘চলনবিল প্রেসক্লাব’। গুরুদাসপুরের চাঁচকৈড়ে অবস্থিত থানা শিক্ষা সংঘের একটি কক্ষে শুরু হয় এ সংগঠনের যাত্রা।

তৎকালীন বৃহত্তর চলনবিল অঞ্চল নাটোরের গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম ও সিংড়া; নওগাঁর আত্রাই; সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, রায়গঞ্জ, শাহজাদপুর ও উল্লাপাড়া; এবং পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর (বনওয়ারীনগর) ও বাঘাবাড়ি অঞ্চলের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল। সে সময় গুরুদাসপুরের চাঁচকৈড় হাট ছিল চলনবিলের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যকেন্দ্র এবং নৌ ও সড়ক যোগাযোগের প্রধান সংযোগস্থল।

রাজশাহী কিংবা পাবনায় সরকারি-বেসরকারি দাপ্তরিক কাজে যেতে হলে চলনবিলের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে নৌকা, গরু বা মহিষের গাড়ি, সাইকেল কিংবা পায়ে হেঁটে চাঁচকৈড়ে এসে বাসযোগে গন্তব্যে যেতে হতো। বর্ষাকালে কাদা-পানি পেরিয়ে, কখনও নৌকায়, কখনও হাঁটাপথে এসে চাঁচকৈড় বা গুরুদাসপুরে পোশাক পরিবর্তন করে যাত্রা অব্যাহত রাখতেন তারা। সঙ্গে থাকত ভাত, রুটি, চিড়া, গুঁড়সহ শুকনো খাবার।

আত্রাই, গুমানি ও নন্দকুঁজা নদীর ত্রিমোহনায় অবস্থিত চাঁচকৈড় ছিল কৃষি, বাণিজ্য, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। চলনবিল অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, সমস্যা, সম্ভাবনা এবং উন্নয়নের চিত্র দেশ-বিদেশে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা থেকেই একদল তরুণ সাংবাদিক, ছাত্র ও সমাজসচেতন মানুষ ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন চলনবিল প্রেসক্লাব। সেই থেকেই শুরু হয় চলনবিলের সাংবাদিকতার এক নতুন অধ্যায়।

আজ জুলাই ২০২৬। দীর্ঘ ৪৮ বছরের বন্ধুর পথ পেরিয়ে ১৯৭৮ সালে জন্ম নেওয়া সেই ছোট্ট সংগঠনটি এখন গৌরবময় অর্ধশতাব্দীর দ্বারপ্রান্তে। নানা প্রতিকূলতা, সংগ্রাম ও সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে চলনবিল প্রেসক্লাব আজও মাথা উঁচু করে এগিয়ে চলছে। ভবিষ্যতেও এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে—ইনশাআল্লাহ।

প্রতিষ্ঠাকালে বৃহত্তর চলনবিলের প্রায় ১০টি থানার সাংবাদিকতার প্রতিনিধিত্ব করতেন এই প্রেসক্লাবের সদস্যরা। সে সময় দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে ‘চলনবিল’ ডেটলাইনে সংবাদ, প্রতিবেদন ও ফিচার প্রকাশিত হতো। অনেক গণমাধ্যম তাদের পরিচয়পত্রেও জেলার সমমর্যাদায় চলনবিল’ নাম ব্যবহার করত। এটি ছিল চলনবিলের সাংবাদিকদের জন্য এক বিশেষ সম্মান ও গর্বের বিষয়।

সেই সময় প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সাংবাদিকদের নীতি-নৈতিকতা ও পেশাগত দায়িত্ববোধকে গভীর শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন।

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। বর্তমানে প্রায় প্রতিটি উপজেলা বা থানাতেই গড়ে উঠেছে স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠন ও প্রেসক্লাব। কিন্তু এসব পরিবর্তনের মধ্যেও চলনবিল প্রেসক্লাব’ তার ঐতিহাসিক পরিচয়, ঐতিহ্য ও মর্যাদা অটুট রেখে চলনবিলের নামকে বুকে ধারণ করে এগিয়ে চলেছে। দেশ-বিদেশে আজও চলনবিল প্রেসক্লাবকটি সুপরিচিত ও সম্মানিত নাম।

এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি রচনা করেছেন যাঁরা, তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মধ্যে ছিলেন প্রথিতযশা সাংবাদিক অধ্যাপক আতহার হোসেন, অধ্যাপক নজিবর রহমান আব্বাসী, কাজী মাওলানা রুহুল আমিন, এস. এম. আজিজুল হক কিরণ, আবুল হোসেন রাজু, অধ্যাপক দিলীপ কুমার সাহা, অসিত কুমার সরকার এবং আবু হেনা মোস্তফা কামাল (হ্যালো সুমন)। তাঁদের পাশাপাশি সম্মানিত উপদেষ্টা ও পথপ্রদর্শক অধ্যক্ষ আলহাজ আব্দুল হামিদ (টি. কে. বিলচলনী) এই সংগঠনের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

যাঁরা আজ আমাদের মাঝে নেই, আল্লাহ তাঁদের রুহের মাগফিরাত দান করুন। আর যাঁরা এখনও জীবিত আছেন, তাঁদের সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও কল্যাণ কামনা করছি। তাঁদের আদর্শ, সততা, নিষ্ঠা এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার শিক্ষা আগামী প্রজন্মের সাংবাদিকদের অনুপ্রাণিত করুক—এই আমাদের প্রত্যাশা।

——————————-

লেখক: প্রধান উপদেষ্টা ও  সাবেক সভাপতি
                চলনবিল প্রেসক্লাব
ই-মেইল: akalmazad7711@gmail.com