ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাজশাহীতে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের দাপট, বাড়ছে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি

blank

পরিচ্ছন্নতা, প্রশস্ত সড়ক ও শান্ত পরিবেশের ঐতিহ্যবাহী নগরী হিসেবে রাজশাহীর আলাদা পরিচিতি রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচলে নগরজীবনে বাড়ছে ভোগান্তি। নগরীর প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার অলিগলি—সবখানেই এখন এসব যানবাহনের অতিরিক্ত উপস্থিতি, যত্রতত্র চলাচল ও যানজটের চিত্র দেখা যাচ্ছে। এতে একদিকে প্রতিদিনের যাতায়াতে সময় নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনার আশঙ্কা।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) তথ্য অনুযায়ী, নগরীতে বর্তমানে নিবন্ধিত ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা ৫ হাজার ৮১৯টি এবং অটোরিকশা রয়েছে ৮ হাজার ৯৭০টি। সব মিলিয়ে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ১৪ হাজার ৭৮৯টি। তবে নগরবাসীর অভিযোগ, বাস্তবে সড়কে চলাচলকারী ব্যাটারিচালিত যানবাহনের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। রাসিক নতুন লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ রাখলেও অটোরিকশার সংখ্যা বাড়ছে। এর পেছনে স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা বিভিন্ন কারখানার ভূমিকা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী নগরীতে অটোরিকশা তৈরির প্রায় ৫০টি ছোট-বড় কারখানা রয়েছে। এসব কারখানা থেকে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৫০০টি নতুন যান তৈরি হয়ে সড়কে যুক্ত হচ্ছে। ফলে নিবন্ধিত যানবাহনের পাশাপাশি অনিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যাও বাড়ছে।

নগরীর জিরো পয়েন্ট, সাহেববাজার, লক্ষ্মীপুর, রেলগেট, তালাইমারী ও কোর্ট স্টেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে দিনের বড় একটি সময় যানজট লেগে থাকতে দেখা যায়। নির্ধারিত স্ট্যান্ড না থাকায় সড়কের ওপর গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো, একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে চালানো এবং উল্টো পথে চলাচলের কারণে যান চলাচলের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে।

নগরবাসীর ভাষ্য, অনেক ক্ষেত্রে পাঁচ মিনিটের পথ পাড়ি দিতেই আধা ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। এতে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও রোগীদের দৈনন্দিন সময়সূচি ব্যাহত হচ্ছে। এর সঙ্গে অটোরিকশাচালকদের অতিরিক্ত ভাড়া দাবি এবং নির্দিষ্ট দূরত্বে যেতে অনীহার অভিযোগও রয়েছে।

যানজটের পাশাপাশি বাড়ছে দুর্ঘটনার শঙ্কা

শুধু যানজট নয়, ব্যাটারিচালিত যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল সড়ক নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করেছে। রাজশাহী জেলা ও মহানগর পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক বছরে জেলা ও মহানগর এলাকায় মোট ১৬৯টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ১৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। দুর্ঘটনার একটি বড় অংশ অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্ট বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

তবে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন চান অটোরিকশাচালকদের একাংশও। শিরোইল এলাকার অটোরিকশাচালক মেহেদী হাসান বলেন, অনভিজ্ঞ চালক এবং নিয়মবহির্ভূত যানবাহনের কারণে সড়কে প্রায়ই বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। লাইসেন্সধারী ও দক্ষ চালকদের কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে লাইসেন্সবিহীন ও অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

সমন্বিত ব্যবস্থাপনার পরামর্শ

সড়কের এই বিশৃঙ্খলা নিরসনে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিচ্ছেন গবেষক ও নগর বিশেষজ্ঞরা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক স্বপ্নীল রহমান মনে করেন, অটোরিকশার সমস্যাকে আলাদাভাবে দেখলে এর স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সড়কের ধারণক্ষমতা, রুট ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা এবং ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে সমন্বিতভাবে সমস্যাটির সমাধান করতে হবে।

অন্যদিকে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আবদুল ওয়াকিল নম্বরপ্লেটের ভিত্তিতে সময়ভিত্তিক অথবা রুটভিত্তিক চলাচলের ব্যবস্থা চালুর পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা চালু করা গেলে একই সময়ে সড়কে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।

রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে, অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আরএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) নূর আলম সিদ্দিকী এবং পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত যানবাহনগুলোকে নিয়মের মধ্যে আনতে কাজ চলছে।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, আটক করা অবৈধ যানবাহন রাখার জন্য স্থায়ী ও পর্যাপ্ত জায়গাসম্পন্ন একটি ডাম্পিং স্টেশন গড়ে তোলা গেলে অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে চলমান অভিযান আরও জোরদার ও কার্যকর করা সম্ভব হবে।

নগরীর সামগ্রিক যাতায়াত ব্যবস্থা সুশৃঙ্খল করতে রাজশাহী সিটি করপোরেশনও উদ্যোগ নিয়েছে। রাসিক প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত যানবাহনগুলোকে নির্দিষ্ট শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে কাজ চলছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জনপ্রিয় খবর
blank

কলাপাড়ায় শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বুলিং, কোচিং বাণিজ্য এবং পাঠদানে অবহেলার অভিযোগ।

রাজশাহীতে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের দাপট, বাড়ছে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি

প্রকাশের সময় : ১০:৫২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬
blank

পরিচ্ছন্নতা, প্রশস্ত সড়ক ও শান্ত পরিবেশের ঐতিহ্যবাহী নগরী হিসেবে রাজশাহীর আলাদা পরিচিতি রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচলে নগরজীবনে বাড়ছে ভোগান্তি। নগরীর প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার অলিগলি—সবখানেই এখন এসব যানবাহনের অতিরিক্ত উপস্থিতি, যত্রতত্র চলাচল ও যানজটের চিত্র দেখা যাচ্ছে। এতে একদিকে প্রতিদিনের যাতায়াতে সময় নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনার আশঙ্কা।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) তথ্য অনুযায়ী, নগরীতে বর্তমানে নিবন্ধিত ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা ৫ হাজার ৮১৯টি এবং অটোরিকশা রয়েছে ৮ হাজার ৯৭০টি। সব মিলিয়ে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ১৪ হাজার ৭৮৯টি। তবে নগরবাসীর অভিযোগ, বাস্তবে সড়কে চলাচলকারী ব্যাটারিচালিত যানবাহনের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। রাসিক নতুন লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ রাখলেও অটোরিকশার সংখ্যা বাড়ছে। এর পেছনে স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা বিভিন্ন কারখানার ভূমিকা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী নগরীতে অটোরিকশা তৈরির প্রায় ৫০টি ছোট-বড় কারখানা রয়েছে। এসব কারখানা থেকে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৫০০টি নতুন যান তৈরি হয়ে সড়কে যুক্ত হচ্ছে। ফলে নিবন্ধিত যানবাহনের পাশাপাশি অনিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যাও বাড়ছে।

নগরীর জিরো পয়েন্ট, সাহেববাজার, লক্ষ্মীপুর, রেলগেট, তালাইমারী ও কোর্ট স্টেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে দিনের বড় একটি সময় যানজট লেগে থাকতে দেখা যায়। নির্ধারিত স্ট্যান্ড না থাকায় সড়কের ওপর গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো, একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে চালানো এবং উল্টো পথে চলাচলের কারণে যান চলাচলের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে।

নগরবাসীর ভাষ্য, অনেক ক্ষেত্রে পাঁচ মিনিটের পথ পাড়ি দিতেই আধা ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। এতে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও রোগীদের দৈনন্দিন সময়সূচি ব্যাহত হচ্ছে। এর সঙ্গে অটোরিকশাচালকদের অতিরিক্ত ভাড়া দাবি এবং নির্দিষ্ট দূরত্বে যেতে অনীহার অভিযোগও রয়েছে।

যানজটের পাশাপাশি বাড়ছে দুর্ঘটনার শঙ্কা

শুধু যানজট নয়, ব্যাটারিচালিত যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল সড়ক নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করেছে। রাজশাহী জেলা ও মহানগর পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক বছরে জেলা ও মহানগর এলাকায় মোট ১৬৯টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ১৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। দুর্ঘটনার একটি বড় অংশ অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্ট বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

তবে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন চান অটোরিকশাচালকদের একাংশও। শিরোইল এলাকার অটোরিকশাচালক মেহেদী হাসান বলেন, অনভিজ্ঞ চালক এবং নিয়মবহির্ভূত যানবাহনের কারণে সড়কে প্রায়ই বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। লাইসেন্সধারী ও দক্ষ চালকদের কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে লাইসেন্সবিহীন ও অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

সমন্বিত ব্যবস্থাপনার পরামর্শ

সড়কের এই বিশৃঙ্খলা নিরসনে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিচ্ছেন গবেষক ও নগর বিশেষজ্ঞরা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক স্বপ্নীল রহমান মনে করেন, অটোরিকশার সমস্যাকে আলাদাভাবে দেখলে এর স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সড়কের ধারণক্ষমতা, রুট ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা এবং ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে সমন্বিতভাবে সমস্যাটির সমাধান করতে হবে।

অন্যদিকে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আবদুল ওয়াকিল নম্বরপ্লেটের ভিত্তিতে সময়ভিত্তিক অথবা রুটভিত্তিক চলাচলের ব্যবস্থা চালুর পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা চালু করা গেলে একই সময়ে সড়কে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।

রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে, অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আরএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) নূর আলম সিদ্দিকী এবং পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত যানবাহনগুলোকে নিয়মের মধ্যে আনতে কাজ চলছে।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, আটক করা অবৈধ যানবাহন রাখার জন্য স্থায়ী ও পর্যাপ্ত জায়গাসম্পন্ন একটি ডাম্পিং স্টেশন গড়ে তোলা গেলে অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে চলমান অভিযান আরও জোরদার ও কার্যকর করা সম্ভব হবে।

নগরীর সামগ্রিক যাতায়াত ব্যবস্থা সুশৃঙ্খল করতে রাজশাহী সিটি করপোরেশনও উদ্যোগ নিয়েছে। রাসিক প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত যানবাহনগুলোকে নির্দিষ্ট শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে কাজ চলছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।