ঢাকা বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উচ্চ জনঘনত্বপূর্ণ বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিধারা: একটি পর্যালোচনা

blank

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি উচ্চ জনঘনত্বপূর্ণ উন্নয়নশীল দেশ। স্বাধীনতার পর সীমিত সম্পদ, বিপুল জনসংখ্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দারিদ্র্য, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং নানা সামাজিক-অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে দেশটি তার অর্থনৈতিক যাত্রা শুরু করে। দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে শিল্প, তৈরি পোশাক, প্রবাসী আয়, কৃষি ও সেবা খাতনির্ভর একটি বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলেছে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি ছিল কৃষি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পায়ন, নগরায়ন, বৈদেশিক বাণিজ্য, প্রবাসী কর্মসংস্থান এবং সেবা খাতের সম্প্রসারণ অর্থনীতির কাঠামোতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, কৃষি, নির্মাণ, পরিবহন, যোগাযোগ, আর্থিক সেবা এবং বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে।

তবে অর্থনীতির এই অগ্রযাত্রার পাশাপাশি নতুন কিছু চ্যালেঞ্জও দৃশ্যমান হয়েছে। মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, খেলাপি ঋণ, বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা, কর্মসংস্থানের ঘাটতি, দক্ষতার অসামঞ্জস্য, আয়বৈষম্য এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার গুণগত বৈষম্য বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে। ফলে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে মূল্যায়ন করা যথেষ্ট নয়; বরং সেই প্রবৃদ্ধি মানুষের জীবনমান, কর্মসংস্থান, আয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তায় কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো কৃষিনির্ভরতা থেকে ধীরে ধীরে শিল্প ও সেবাভিত্তিক অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হওয়া। কৃষি এখনো দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কিন্তু জাতীয় অর্থনীতিতে শিল্প ও সেবা খাতের গুরুত্ব ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে।

তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের শিল্প ও রপ্তানি অর্থনীতির কেন্দ্রীয় খাতগুলোর একটি। এই শিল্পে বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এবং বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে এর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তবে রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট কয়েকটি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিও সৃষ্টি করে। বৈশ্বিক বাজারে চাহিদার পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতি, শ্রমবাজারের পরিবর্তন কিংবা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব এ খাতে পড়তে পারে। তাই রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ বাংলাদেশের অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে কৃষি খাতেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে। আধুনিক কৃষিপদ্ধতি, সেচব্যবস্থা, উন্নত বীজ, কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার এবং কৃষিভিত্তিক ব্যবসার সম্প্রসারণ উৎপাদন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। তবে কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, কৃষি উপকরণের মূল্য, জলবায়ু পরিবর্তন, জমির খণ্ডায়ন এবং কৃষিজমি অন্য কাজে ব্যবহারের প্রবণতা ভবিষ্যতে কৃষির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম উচ্চ জনঘনত্বপূর্ণ দেশ। সীমিত ভূখণ্ডে বিপুল জনগোষ্ঠীর বসবাস একদিকে যেমন আবাসন, খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, পরিবহন ও পরিবেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, অন্যদিকে এই বিপুল জনগোষ্ঠী একটি বড় শ্রমশক্তি ও ভোক্তা বাজারও তৈরি করেছে।

জনসংখ্যা তখনই অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়, যখন সেই জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত, দক্ষ ও উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তর করা যায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তরুণ জনগোষ্ঠী একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর বড় অংশ যদি যথাযথ শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়, তাহলে দেশের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পেতে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও শক্তিশালী হতে পারে।

কিন্তু বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা না গেলে এই জনমিতিক সম্ভাবনা ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক বোঝায় পরিণত হতে পারে। তাই বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশলের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ ও উৎপাদনশীল মানবসম্পদে পরিণত করা।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির মূল্যায়নে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলেও এটি একমাত্র সূচক নয়। একটি দেশের অর্থনীতি কতটা সফলভাবে তার নাগরিকদের জীবনমান উন্নত করতে পারছে, সেটিও অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের আয়, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, আবাসন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং জীবনযাত্রার মানের উন্নতি প্রয়োজন। কোনো অর্থনীতির আকার বড় হলেও যদি সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় স্থবির থাকে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হয় এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য থাকে, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধিকে পুরোপুরি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন বলা কঠিন।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাই প্রবৃদ্ধির সঙ্গে মানুষের জীবনমানের সম্পর্ক নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হলে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির পরিসংখ্যান বাস্তব জীবনের অর্থনৈতিক স্বস্তিকে সবসময় প্রতিফলিত করতে পারে না।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় মূল্যস্ফীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়। খাদ্য, বাসস্থান, পরিবহন, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি চাপ সৃষ্টি করে।

মূল্যস্ফীতির প্রভাব শুধু পারিবারিক ব্যয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি মানুষের সঞ্চয়, বিনিয়োগ, পুষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যয়ের ওপরও প্রভাব ফেলে। ফলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং সাধারণ মানুষের আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করা জরুরি।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কর্মসংস্থান। প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। তাদের একটি অংশ দেশীয় শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজছে, আবার অনেকে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য যাচ্ছে।

শুধু শিক্ষাগত সনদ অর্জন করলেই কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা তৈরি হয় না। বর্তমান শ্রমবাজারে বাস্তব দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, যোগাযোগক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা এবং পরিবর্তিত কর্মপরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর যোগ্যতা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাই শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার সমন্বয় করা প্রয়োজন।

দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ক্ষেত্রে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ এবং কর্মমুখী শিক্ষার ওপর আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।

একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা অনেকাংশে নির্ভর করে তার জনগোষ্ঠীর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ওপর। বাংলাদেশে শিক্ষার বিস্তার ঘটলেও শিক্ষার গুণগত মান, সুযোগের সমতা এবং কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে।

অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষাগত সনদ অর্জন জ্ঞান ও বাস্তব দক্ষতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এর ফলে উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব ও দক্ষতার ঘাটতির মতো সমস্যা তৈরি হচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থাকে তাই শুধু পরীক্ষাভিত্তিক না রেখে জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও বাস্তব প্রয়োগের সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য খাতেও অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ ঘটেছে। কিন্তু মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ, চিকিৎসার ব্যয় এবং শহর-গ্রামের বৈষম্য এখনো বড় বিষয়। স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বৃদ্ধি অনেক পরিবারকে অর্থনৈতিক ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। তাই অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সর্বজনীন ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিল্প, কৃষি, ব্যবসা, অবকাঠামো ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের জন্য একটি শক্তিশালী ও সুশাসিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রয়োজন।

কিন্তু খেলাপি ঋণ, ঋণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, অনিয়ম এবং ব্যাংকিং খাতের আস্থার সংকট অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ব্যাংকিং খাত দুর্বল হলে উৎপাদনশীল খাতে অর্থের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়, বিনিয়োগ কমে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি মন্থর হতে পারে।

তাই ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ঋণ ব্যবস্থাপনার কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন। বিশেষ করে ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদনশীল খাতে ঋণের প্রবাহ নিশ্চিত করা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা যে অর্থ দেশে পাঠান, তা শুধু বৈদেশিক মুদ্রার জোগানই বাড়ায় না; দেশের অসংখ্য পরিবারের আয় ও জীবনমানের সঙ্গেও এটি সরাসরি যুক্ত।

তবে বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দক্ষতার গুরুত্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অদক্ষ বা স্বল্পদক্ষ শ্রমিকের পরিবর্তে দক্ষ কর্মী পাঠাতে পারলে বাংলাদেশ আরও বেশি আয় করতে পারে। এজন্য বিদেশগামী কর্মীদের ভাষা, প্রযুক্তি ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে প্রবাসী আয়ের অর্থকে শুধু ভোগে সীমাবদ্ধ না রেখে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা গেলে এর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুফল আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।

বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক শিল্পের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই ওষুধ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, জাহাজ নির্মাণসহ সম্ভাবনাময় অন্যান্য খাতকে আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী করে গড়ে তোলা প্রয়োজন।

রপ্তানি বহুমুখীকরণের জন্য মানসম্মত উৎপাদন, প্রযুক্তি, দক্ষ শ্রমশক্তি, অবকাঠামো, সহজ বাণিজ্যব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজার সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য কৃষি ও শিল্পকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে পরিপূরক হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কৃষিপণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণে শিল্পের ভূমিকা বাড়ানো গেলে কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান উভয়ই সম্ভব।

কৃষিভিত্তিক শিল্পের সম্প্রসারণ গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারে। একই সঙ্গে কৃষি প্রযুক্তির উন্নয়ন, আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্য বাজার নিশ্চিত করা গেলে কৃষি খাত আরও উৎপাদনশীল ও লাভজনক হতে পারে।

বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি ক্রমেই পরস্পরনির্ভরশীল হয়ে উঠছে। যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্য পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতি শুধু অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করলে চলবে না। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরিবর্তনকে বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে যেমন নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তেমনি সম্ভাবনাও কম নয়। বিশাল ভোক্তা বাজার, তরুণ জনগোষ্ঠী, কৃষি উৎপাদন, শিল্পায়নের সুযোগ, প্রবাসী শ্রমশক্তি, উদ্যোক্তা শ্রেণির বিকাশ এবং ভৌগোলিক অবস্থান বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।

এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ। কারণ প্রাকৃতিক সম্পদের তুলনায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার জনগোষ্ঠী। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে এই জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল মানবসম্পদে পরিণত করতে পারলে উচ্চ জনঘনত্ব বাংলাদেশের দুর্বলতা না হয়ে শক্তিতে পরিণত হতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরপর্ব অতিক্রম করছে। স্বাধীনতার পর সীমিত সম্পদ ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশটি কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে শিল্প, রপ্তানি, প্রবাসী আয় ও সেবাভিত্তিক বহুমাত্রিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের সক্ষমতা দেখিয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্প, কৃষি, প্রবাসী আয়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এবং সেবা খাত দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনই শেষ কথা নয়। প্রবৃদ্ধির সুফল কতটা মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে, কতটা কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, মানুষের প্রকৃত আয় ও জীবনমান কতটা উন্নত হচ্ছে এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য কতটা কমছে—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

উচ্চ জনঘনত্ব বাংলাদেশের জন্য একদিকে বড় চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে বিশাল সম্ভাবনা। এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে যদি দক্ষ, শিক্ষিত, সুস্থ ও উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তর করা যায়, তাহলে জনসংখ্যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে। এজন্য শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষি ও শিল্পের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, প্রবাসী আয়ের কার্যকর ব্যবহার, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা প্রয়োজন।

অতএব, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্য শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি হওয়া উচিত নয়; বরং প্রবৃদ্ধির সঙ্গে উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান, মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়, অর্থনৈতিক সমতা এবং মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত।

উচ্চ জনঘনত্বের বাংলাদেশকে টেকসই ও শক্তিশালী অর্থনীতিতে রূপান্তরের মূল চাবিকাঠি তাই এক কথায় বলা যায়—“জনসংখ্যাকে বোঝা নয়, দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করাই হবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান কৌশল।”

———————————————

লেখকঃবিভাগীয় প্রধান,  সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞান বিভাগ

এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ 

blank

চাটমোহরে বিএনপির বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত

উচ্চ জনঘনত্বপূর্ণ বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিধারা: একটি পর্যালোচনা

প্রকাশের সময় : ৩ ঘন্টা আগে
blank

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি উচ্চ জনঘনত্বপূর্ণ উন্নয়নশীল দেশ। স্বাধীনতার পর সীমিত সম্পদ, বিপুল জনসংখ্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দারিদ্র্য, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং নানা সামাজিক-অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে দেশটি তার অর্থনৈতিক যাত্রা শুরু করে। দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে শিল্প, তৈরি পোশাক, প্রবাসী আয়, কৃষি ও সেবা খাতনির্ভর একটি বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলেছে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি ছিল কৃষি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পায়ন, নগরায়ন, বৈদেশিক বাণিজ্য, প্রবাসী কর্মসংস্থান এবং সেবা খাতের সম্প্রসারণ অর্থনীতির কাঠামোতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, কৃষি, নির্মাণ, পরিবহন, যোগাযোগ, আর্থিক সেবা এবং বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে।

তবে অর্থনীতির এই অগ্রযাত্রার পাশাপাশি নতুন কিছু চ্যালেঞ্জও দৃশ্যমান হয়েছে। মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, খেলাপি ঋণ, বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা, কর্মসংস্থানের ঘাটতি, দক্ষতার অসামঞ্জস্য, আয়বৈষম্য এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার গুণগত বৈষম্য বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে। ফলে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে মূল্যায়ন করা যথেষ্ট নয়; বরং সেই প্রবৃদ্ধি মানুষের জীবনমান, কর্মসংস্থান, আয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তায় কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো কৃষিনির্ভরতা থেকে ধীরে ধীরে শিল্প ও সেবাভিত্তিক অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হওয়া। কৃষি এখনো দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কিন্তু জাতীয় অর্থনীতিতে শিল্প ও সেবা খাতের গুরুত্ব ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে।

তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের শিল্প ও রপ্তানি অর্থনীতির কেন্দ্রীয় খাতগুলোর একটি। এই শিল্পে বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এবং বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে এর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তবে রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট কয়েকটি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিও সৃষ্টি করে। বৈশ্বিক বাজারে চাহিদার পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতি, শ্রমবাজারের পরিবর্তন কিংবা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব এ খাতে পড়তে পারে। তাই রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ বাংলাদেশের অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে কৃষি খাতেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে। আধুনিক কৃষিপদ্ধতি, সেচব্যবস্থা, উন্নত বীজ, কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার এবং কৃষিভিত্তিক ব্যবসার সম্প্রসারণ উৎপাদন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। তবে কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, কৃষি উপকরণের মূল্য, জলবায়ু পরিবর্তন, জমির খণ্ডায়ন এবং কৃষিজমি অন্য কাজে ব্যবহারের প্রবণতা ভবিষ্যতে কৃষির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম উচ্চ জনঘনত্বপূর্ণ দেশ। সীমিত ভূখণ্ডে বিপুল জনগোষ্ঠীর বসবাস একদিকে যেমন আবাসন, খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, পরিবহন ও পরিবেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, অন্যদিকে এই বিপুল জনগোষ্ঠী একটি বড় শ্রমশক্তি ও ভোক্তা বাজারও তৈরি করেছে।

জনসংখ্যা তখনই অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়, যখন সেই জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত, দক্ষ ও উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তর করা যায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তরুণ জনগোষ্ঠী একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর বড় অংশ যদি যথাযথ শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়, তাহলে দেশের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পেতে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও শক্তিশালী হতে পারে।

কিন্তু বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা না গেলে এই জনমিতিক সম্ভাবনা ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক বোঝায় পরিণত হতে পারে। তাই বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশলের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ ও উৎপাদনশীল মানবসম্পদে পরিণত করা।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির মূল্যায়নে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলেও এটি একমাত্র সূচক নয়। একটি দেশের অর্থনীতি কতটা সফলভাবে তার নাগরিকদের জীবনমান উন্নত করতে পারছে, সেটিও অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের আয়, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, আবাসন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং জীবনযাত্রার মানের উন্নতি প্রয়োজন। কোনো অর্থনীতির আকার বড় হলেও যদি সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় স্থবির থাকে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হয় এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য থাকে, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধিকে পুরোপুরি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন বলা কঠিন।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাই প্রবৃদ্ধির সঙ্গে মানুষের জীবনমানের সম্পর্ক নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হলে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির পরিসংখ্যান বাস্তব জীবনের অর্থনৈতিক স্বস্তিকে সবসময় প্রতিফলিত করতে পারে না।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় মূল্যস্ফীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়। খাদ্য, বাসস্থান, পরিবহন, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি চাপ সৃষ্টি করে।

মূল্যস্ফীতির প্রভাব শুধু পারিবারিক ব্যয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি মানুষের সঞ্চয়, বিনিয়োগ, পুষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যয়ের ওপরও প্রভাব ফেলে। ফলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং সাধারণ মানুষের আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করা জরুরি।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কর্মসংস্থান। প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। তাদের একটি অংশ দেশীয় শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজছে, আবার অনেকে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য যাচ্ছে।

শুধু শিক্ষাগত সনদ অর্জন করলেই কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা তৈরি হয় না। বর্তমান শ্রমবাজারে বাস্তব দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, যোগাযোগক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা এবং পরিবর্তিত কর্মপরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর যোগ্যতা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাই শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার সমন্বয় করা প্রয়োজন।

দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ক্ষেত্রে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ এবং কর্মমুখী শিক্ষার ওপর আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।

একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা অনেকাংশে নির্ভর করে তার জনগোষ্ঠীর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ওপর। বাংলাদেশে শিক্ষার বিস্তার ঘটলেও শিক্ষার গুণগত মান, সুযোগের সমতা এবং কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে।

অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষাগত সনদ অর্জন জ্ঞান ও বাস্তব দক্ষতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এর ফলে উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব ও দক্ষতার ঘাটতির মতো সমস্যা তৈরি হচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থাকে তাই শুধু পরীক্ষাভিত্তিক না রেখে জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও বাস্তব প্রয়োগের সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য খাতেও অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ ঘটেছে। কিন্তু মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ, চিকিৎসার ব্যয় এবং শহর-গ্রামের বৈষম্য এখনো বড় বিষয়। স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বৃদ্ধি অনেক পরিবারকে অর্থনৈতিক ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। তাই অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সর্বজনীন ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিল্প, কৃষি, ব্যবসা, অবকাঠামো ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের জন্য একটি শক্তিশালী ও সুশাসিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রয়োজন।

কিন্তু খেলাপি ঋণ, ঋণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, অনিয়ম এবং ব্যাংকিং খাতের আস্থার সংকট অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ব্যাংকিং খাত দুর্বল হলে উৎপাদনশীল খাতে অর্থের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়, বিনিয়োগ কমে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি মন্থর হতে পারে।

তাই ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ঋণ ব্যবস্থাপনার কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন। বিশেষ করে ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদনশীল খাতে ঋণের প্রবাহ নিশ্চিত করা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা যে অর্থ দেশে পাঠান, তা শুধু বৈদেশিক মুদ্রার জোগানই বাড়ায় না; দেশের অসংখ্য পরিবারের আয় ও জীবনমানের সঙ্গেও এটি সরাসরি যুক্ত।

তবে বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দক্ষতার গুরুত্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অদক্ষ বা স্বল্পদক্ষ শ্রমিকের পরিবর্তে দক্ষ কর্মী পাঠাতে পারলে বাংলাদেশ আরও বেশি আয় করতে পারে। এজন্য বিদেশগামী কর্মীদের ভাষা, প্রযুক্তি ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে প্রবাসী আয়ের অর্থকে শুধু ভোগে সীমাবদ্ধ না রেখে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা গেলে এর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুফল আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।

বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক শিল্পের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই ওষুধ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, জাহাজ নির্মাণসহ সম্ভাবনাময় অন্যান্য খাতকে আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী করে গড়ে তোলা প্রয়োজন।

রপ্তানি বহুমুখীকরণের জন্য মানসম্মত উৎপাদন, প্রযুক্তি, দক্ষ শ্রমশক্তি, অবকাঠামো, সহজ বাণিজ্যব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজার সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য কৃষি ও শিল্পকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে পরিপূরক হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কৃষিপণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণে শিল্পের ভূমিকা বাড়ানো গেলে কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান উভয়ই সম্ভব।

কৃষিভিত্তিক শিল্পের সম্প্রসারণ গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারে। একই সঙ্গে কৃষি প্রযুক্তির উন্নয়ন, আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্য বাজার নিশ্চিত করা গেলে কৃষি খাত আরও উৎপাদনশীল ও লাভজনক হতে পারে।

বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি ক্রমেই পরস্পরনির্ভরশীল হয়ে উঠছে। যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্য পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতি শুধু অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করলে চলবে না। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরিবর্তনকে বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে যেমন নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তেমনি সম্ভাবনাও কম নয়। বিশাল ভোক্তা বাজার, তরুণ জনগোষ্ঠী, কৃষি উৎপাদন, শিল্পায়নের সুযোগ, প্রবাসী শ্রমশক্তি, উদ্যোক্তা শ্রেণির বিকাশ এবং ভৌগোলিক অবস্থান বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।

এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ। কারণ প্রাকৃতিক সম্পদের তুলনায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার জনগোষ্ঠী। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে এই জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল মানবসম্পদে পরিণত করতে পারলে উচ্চ জনঘনত্ব বাংলাদেশের দুর্বলতা না হয়ে শক্তিতে পরিণত হতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরপর্ব অতিক্রম করছে। স্বাধীনতার পর সীমিত সম্পদ ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশটি কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে শিল্প, রপ্তানি, প্রবাসী আয় ও সেবাভিত্তিক বহুমাত্রিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের সক্ষমতা দেখিয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্প, কৃষি, প্রবাসী আয়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এবং সেবা খাত দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনই শেষ কথা নয়। প্রবৃদ্ধির সুফল কতটা মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে, কতটা কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, মানুষের প্রকৃত আয় ও জীবনমান কতটা উন্নত হচ্ছে এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য কতটা কমছে—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

উচ্চ জনঘনত্ব বাংলাদেশের জন্য একদিকে বড় চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে বিশাল সম্ভাবনা। এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে যদি দক্ষ, শিক্ষিত, সুস্থ ও উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তর করা যায়, তাহলে জনসংখ্যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে। এজন্য শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষি ও শিল্পের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, প্রবাসী আয়ের কার্যকর ব্যবহার, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা প্রয়োজন।

অতএব, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্য শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি হওয়া উচিত নয়; বরং প্রবৃদ্ধির সঙ্গে উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান, মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়, অর্থনৈতিক সমতা এবং মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত।

উচ্চ জনঘনত্বের বাংলাদেশকে টেকসই ও শক্তিশালী অর্থনীতিতে রূপান্তরের মূল চাবিকাঠি তাই এক কথায় বলা যায়—“জনসংখ্যাকে বোঝা নয়, দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করাই হবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান কৌশল।”

———————————————

লেখকঃবিভাগীয় প্রধান,  সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞান বিভাগ

এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ