ঢাকা শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ধান কাটছেন, মজুরি নিচ্ছেন না, বিনিময়ে মিলছে গবাদিপশুর খড়

blank

সকালের হালকা কুয়াশা তখনও পুরোপুরি কাটেনি। চারদিকে মাঠজুড়ে ব্যস্ততা। কারও হাতে কাস্তে, কেউ ঝুঁকে ধান কাটছেন, আবার কেউ কাটা ধানের আঁটি বাঁধছেন। পাশেই চলছে মাড়াইযন্ত্র। যন্ত্রের শব্দের সঙ্গে জমিতে জমা হচ্ছে খড়ের স্তূপ। কাজ শেষে কেউ মাথায়, কেউ সাইকেলে, আবার কেউ ভ্যানযোগে সেই খড় নিয়ে ফিরছেন বাড়ির পথে।

ধান কাটার মৌসুমের এই চেনা দৃশ্যের মধ্যেই দেখা মিলছে ভিন্ন এক চিত্র। মাঠে ধান কাটতে আসা সবাই পেশাদার কৃষিশ্রমিক নন। কেউ কৃষক, কেউ অন্য পেশার সঙ্গে যুক্ত। তবে তাঁদের সবার বাড়িতেই রয়েছে গবাদিপশু। গরু-মহিষের গোখাদ্যের সংকট মেটাতে তাঁরা কোনো মজুরি না নিয়ে অন্যের আগাম পাকা আমন ধান কেটে দিচ্ছেন। বিনিময়ে নিয়ে যাচ্ছেন ধানের খড়।

ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন এলাকায় আগাম আমন কাটার সময় এভাবেই গড়ে উঠেছে এক ধরনের পারস্পরিক বিনিময়ব্যবস্থা, স্থানীয়ভাবে যাকে বলা হচ্ছে ‘খড় উৎসব’। এতে একদিকে কৃষকের ধান কাটা ও মাড়াইয়ের শ্রমিক খরচ কমছে, অন্যদিকে গবাদিপশু পালনকারীরা পাচ্ছেন প্রয়োজনীয় গোখাদ্য। আবার কেউ কেউ অতিরিক্ত পাওয়া খড় বিক্রি করে আয়ও করছেন।

blank

আগাম ধান, আগাম বিনিময়

ঠাকুরগাঁওয়ে সাধারণত অগ্রহায়ণ মাসে আমন ধান কৃষকের ঘরে ওঠে। তবে এবার জেলার বিভিন্ন এলাকায় আগাম জাতের আমন ধান আবাদ করা হয়েছে। এসব জমির ধান আগেই পেকে যাওয়ায় শুরু হয়েছে আগাম কাটাই-মাড়াই। এ সময় খড়ের সংকটে থাকা কৃষক ও গবাদিপশু পালনকারীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে এই বিনিময়ব্যবস্থা।

গত রোববার সকালে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ঠাকুরগাঁও-পীরগঞ্জ সড়কের পাশে মধ্য পারপুগী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, একটি জমিতে ১৮ থেকে ২০ জনের একটি দল ধান কাটছে। কেউ কাস্তে দিয়ে ধান কাটছেন, কেউ আঁটি বাঁধছেন। পরে সেসব আঁটি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মাড়াইযন্ত্রের কাছে। সেখানে ধান থেকে খড় আলাদা করা হচ্ছে। জমির এক পাশে ধীরে ধীরে জমছে খড়ের বড় স্তূপ।

blank

কৃষকের বেঁচে যাচ্ছে শ্রমিক খরচ

শিবগঞ্জ বাজার এলাকার কৃষক রেজাউল করিম দুই বিঘা জমিতে আগাম আমন আবাদ করেছেন। তিনি বলেন, তাঁর জমির ধান অন্যদের তুলনায় আগে পেকে গেছে। খবর পেয়ে প্রায় ২০ জন কৃষক-শ্রমিক সেখানে ধান কাটতে আসেন। তাঁরা ধান কাটা, মাড়াই এবং বস্তায় ভরে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার কাজও করেন। এর বিনিময়ে তাঁদের কোনো টাকা দিতে হয়নি।

রেজাউল করিম বলেন, ‘তাঁদের কাউকে টাকা দিতে হয়নি। তাঁরা খড় নিয়ে গেছেন। এতে আমার প্রায় ১২ হাজার টাকা শ্রমিকের খরচ বেঁচেছে।’

অন্যদিকে যাঁরা অন্যের জমিতে ধান কাটতে আসছেন, তাঁদেরও রয়েছে নিজস্ব জমি। তবে তাঁদের নিজেদের জমির ধান কাটার উপযোগী হতে আরও কয়েক সপ্তাহ সময় লাগবে। এর মধ্যে অনেকের বাড়ির গরু-মহিষের খড় শেষ হয়ে গেছে। বাজারেও খড়ের সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়েছে। ফলে টাকা দিয়ে খড় না কিনে অন্যের জমির ধান কেটে খড় সংগ্রহ করছেন তাঁরা।

রেজাউলের জমিতে ধান কাটতে আসা বিট বাজার এলাকার কৃষক আইনুল হকের বাড়িতে রয়েছে তিনটি গরু। তিনি বলেন, ‘বাড়ির খড় শেষ। নিজের জমির ধান কাটতে আরও সময় লাগবে। এখন খড় কিনতে গেলে দাম বেশি। তাই অন্যদের সঙ্গে এখানে ধান কাটতে এসেছি। খড় নিয়ে বাড়ি যাব।’

মাদারগঞ্জ গ্রামের কৃষিশ্রমিক কার্তিক বর্মণের বাড়িতে রয়েছে চারটি গাভি। বৃষ্টির কারণে আগের মৌসুমের খড় ঠিকমতো শুকাতে না পারায় গোখাদ্য নিয়ে সমস্যায় পড়েছেন তিনি। কার্তিক বলেন, ‘এবার বৃষ্টির কারণে বোরোর একটুও খড় শুকাতে পারিনি। বাজারে প্রতি পণ খড় ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এত টাকা দিয়ে খড় কিনে গরুকে খাওয়ানো কঠিন। তাই এখানে ধান কেটে খড় বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি।’

blank

খড় বিক্রি করেও আয়

পাশের একটি জমিতে প্রায় পৌনে দুই বিঘা জমিতে আগাম আমন আবাদ করেছেন কৃষক তানজিনা বেগম। সেখানে ১৬ জনের একটি দল ধান কাটছিল। দলের সদস্য সিরাজুল ইসলাম জানান, ধান কাটার পর প্রায় দেড় হাজার আঁটি খড় পাওয়া যেতে পারে। এর একটি অংশ তাঁরা প্রতি আঁটি সাত টাকা দরে একজন ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রির চুক্তি করেছেন।

সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘বিক্রি করে যে টাকা পাব, তা সবাই মিলে ভাগ করে নেব।’

তানজিনা বেগম বলেন, এই ব্যবস্থায় দুই পক্ষই লাভবান হচ্ছেন। তাঁর ধান কাটা ও মাড়াইয়ের খরচ বেঁচে যাচ্ছে। অন্যদিকে যাঁরা ধান কাটছেন, তাঁরাও প্রয়োজনীয় খড় পাচ্ছেন।

স্থানীয় শিক্ষক আতাউর রহমান জানান, কয়েক বছর ধরে এলাকায় আগাম আমন কাটার সময় এ ধরনের রীতি চলে আসছে। স্থানীয় কৃষকেরা এই পারস্পরিক সহযোগিতার ব্যবস্থাকে ‘খড় উৎসব’ নামে ডাকেন।

ঠাকুরগাঁও জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলায় গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া মিলিয়ে ১০ লাখ ৪৭ হাজারের বেশি গবাদিপশু রয়েছে। এসব পশুর খাদ্যের বড় একটি অংশ আসে ঘাস ও খড় থেকে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মাজেদুল ইসলাম বলেন, এবার টানা বৃষ্টির কারণে অনেক কৃষক বোরোর খড় ঠিকমতো শুকাতে পারেননি। ফলে কোথাও কোথাও খড়ের সংকট দেখা দিয়েছে। খড়ের বিনিময়ে ধান কাটার এই ব্যবস্থা একদিকে কৃষকের শ্রমিক খরচ কমাচ্ছে, অন্যদিকে গবাদিপশু পালনকারীরাও প্রয়োজনীয় গোখাদ্য পাচ্ছেন।

জনপ্রিয় খবর
blank

কলাপাড়ায় শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বুলিং, কোচিং বাণিজ্য এবং পাঠদানে অবহেলার অভিযোগ।

ধান কাটছেন, মজুরি নিচ্ছেন না, বিনিময়ে মিলছে গবাদিপশুর খড়

প্রকাশের সময় : ১০:১৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬
blank

সকালের হালকা কুয়াশা তখনও পুরোপুরি কাটেনি। চারদিকে মাঠজুড়ে ব্যস্ততা। কারও হাতে কাস্তে, কেউ ঝুঁকে ধান কাটছেন, আবার কেউ কাটা ধানের আঁটি বাঁধছেন। পাশেই চলছে মাড়াইযন্ত্র। যন্ত্রের শব্দের সঙ্গে জমিতে জমা হচ্ছে খড়ের স্তূপ। কাজ শেষে কেউ মাথায়, কেউ সাইকেলে, আবার কেউ ভ্যানযোগে সেই খড় নিয়ে ফিরছেন বাড়ির পথে।

ধান কাটার মৌসুমের এই চেনা দৃশ্যের মধ্যেই দেখা মিলছে ভিন্ন এক চিত্র। মাঠে ধান কাটতে আসা সবাই পেশাদার কৃষিশ্রমিক নন। কেউ কৃষক, কেউ অন্য পেশার সঙ্গে যুক্ত। তবে তাঁদের সবার বাড়িতেই রয়েছে গবাদিপশু। গরু-মহিষের গোখাদ্যের সংকট মেটাতে তাঁরা কোনো মজুরি না নিয়ে অন্যের আগাম পাকা আমন ধান কেটে দিচ্ছেন। বিনিময়ে নিয়ে যাচ্ছেন ধানের খড়।

ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন এলাকায় আগাম আমন কাটার সময় এভাবেই গড়ে উঠেছে এক ধরনের পারস্পরিক বিনিময়ব্যবস্থা, স্থানীয়ভাবে যাকে বলা হচ্ছে ‘খড় উৎসব’। এতে একদিকে কৃষকের ধান কাটা ও মাড়াইয়ের শ্রমিক খরচ কমছে, অন্যদিকে গবাদিপশু পালনকারীরা পাচ্ছেন প্রয়োজনীয় গোখাদ্য। আবার কেউ কেউ অতিরিক্ত পাওয়া খড় বিক্রি করে আয়ও করছেন।

blank

আগাম ধান, আগাম বিনিময়

ঠাকুরগাঁওয়ে সাধারণত অগ্রহায়ণ মাসে আমন ধান কৃষকের ঘরে ওঠে। তবে এবার জেলার বিভিন্ন এলাকায় আগাম জাতের আমন ধান আবাদ করা হয়েছে। এসব জমির ধান আগেই পেকে যাওয়ায় শুরু হয়েছে আগাম কাটাই-মাড়াই। এ সময় খড়ের সংকটে থাকা কৃষক ও গবাদিপশু পালনকারীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে এই বিনিময়ব্যবস্থা।

গত রোববার সকালে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ঠাকুরগাঁও-পীরগঞ্জ সড়কের পাশে মধ্য পারপুগী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, একটি জমিতে ১৮ থেকে ২০ জনের একটি দল ধান কাটছে। কেউ কাস্তে দিয়ে ধান কাটছেন, কেউ আঁটি বাঁধছেন। পরে সেসব আঁটি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মাড়াইযন্ত্রের কাছে। সেখানে ধান থেকে খড় আলাদা করা হচ্ছে। জমির এক পাশে ধীরে ধীরে জমছে খড়ের বড় স্তূপ।

blank

কৃষকের বেঁচে যাচ্ছে শ্রমিক খরচ

শিবগঞ্জ বাজার এলাকার কৃষক রেজাউল করিম দুই বিঘা জমিতে আগাম আমন আবাদ করেছেন। তিনি বলেন, তাঁর জমির ধান অন্যদের তুলনায় আগে পেকে গেছে। খবর পেয়ে প্রায় ২০ জন কৃষক-শ্রমিক সেখানে ধান কাটতে আসেন। তাঁরা ধান কাটা, মাড়াই এবং বস্তায় ভরে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার কাজও করেন। এর বিনিময়ে তাঁদের কোনো টাকা দিতে হয়নি।

রেজাউল করিম বলেন, ‘তাঁদের কাউকে টাকা দিতে হয়নি। তাঁরা খড় নিয়ে গেছেন। এতে আমার প্রায় ১২ হাজার টাকা শ্রমিকের খরচ বেঁচেছে।’

অন্যদিকে যাঁরা অন্যের জমিতে ধান কাটতে আসছেন, তাঁদেরও রয়েছে নিজস্ব জমি। তবে তাঁদের নিজেদের জমির ধান কাটার উপযোগী হতে আরও কয়েক সপ্তাহ সময় লাগবে। এর মধ্যে অনেকের বাড়ির গরু-মহিষের খড় শেষ হয়ে গেছে। বাজারেও খড়ের সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়েছে। ফলে টাকা দিয়ে খড় না কিনে অন্যের জমির ধান কেটে খড় সংগ্রহ করছেন তাঁরা।

রেজাউলের জমিতে ধান কাটতে আসা বিট বাজার এলাকার কৃষক আইনুল হকের বাড়িতে রয়েছে তিনটি গরু। তিনি বলেন, ‘বাড়ির খড় শেষ। নিজের জমির ধান কাটতে আরও সময় লাগবে। এখন খড় কিনতে গেলে দাম বেশি। তাই অন্যদের সঙ্গে এখানে ধান কাটতে এসেছি। খড় নিয়ে বাড়ি যাব।’

মাদারগঞ্জ গ্রামের কৃষিশ্রমিক কার্তিক বর্মণের বাড়িতে রয়েছে চারটি গাভি। বৃষ্টির কারণে আগের মৌসুমের খড় ঠিকমতো শুকাতে না পারায় গোখাদ্য নিয়ে সমস্যায় পড়েছেন তিনি। কার্তিক বলেন, ‘এবার বৃষ্টির কারণে বোরোর একটুও খড় শুকাতে পারিনি। বাজারে প্রতি পণ খড় ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এত টাকা দিয়ে খড় কিনে গরুকে খাওয়ানো কঠিন। তাই এখানে ধান কেটে খড় বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি।’

blank

খড় বিক্রি করেও আয়

পাশের একটি জমিতে প্রায় পৌনে দুই বিঘা জমিতে আগাম আমন আবাদ করেছেন কৃষক তানজিনা বেগম। সেখানে ১৬ জনের একটি দল ধান কাটছিল। দলের সদস্য সিরাজুল ইসলাম জানান, ধান কাটার পর প্রায় দেড় হাজার আঁটি খড় পাওয়া যেতে পারে। এর একটি অংশ তাঁরা প্রতি আঁটি সাত টাকা দরে একজন ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রির চুক্তি করেছেন।

সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘বিক্রি করে যে টাকা পাব, তা সবাই মিলে ভাগ করে নেব।’

তানজিনা বেগম বলেন, এই ব্যবস্থায় দুই পক্ষই লাভবান হচ্ছেন। তাঁর ধান কাটা ও মাড়াইয়ের খরচ বেঁচে যাচ্ছে। অন্যদিকে যাঁরা ধান কাটছেন, তাঁরাও প্রয়োজনীয় খড় পাচ্ছেন।

স্থানীয় শিক্ষক আতাউর রহমান জানান, কয়েক বছর ধরে এলাকায় আগাম আমন কাটার সময় এ ধরনের রীতি চলে আসছে। স্থানীয় কৃষকেরা এই পারস্পরিক সহযোগিতার ব্যবস্থাকে ‘খড় উৎসব’ নামে ডাকেন।

ঠাকুরগাঁও জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলায় গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া মিলিয়ে ১০ লাখ ৪৭ হাজারের বেশি গবাদিপশু রয়েছে। এসব পশুর খাদ্যের বড় একটি অংশ আসে ঘাস ও খড় থেকে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মাজেদুল ইসলাম বলেন, এবার টানা বৃষ্টির কারণে অনেক কৃষক বোরোর খড় ঠিকমতো শুকাতে পারেননি। ফলে কোথাও কোথাও খড়ের সংকট দেখা দিয়েছে। খড়ের বিনিময়ে ধান কাটার এই ব্যবস্থা একদিকে কৃষকের শ্রমিক খরচ কমাচ্ছে, অন্যদিকে গবাদিপশু পালনকারীরাও প্রয়োজনীয় গোখাদ্য পাচ্ছেন।