পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার মঙ্গল সুখ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে নিয়মিত পাঠদান না করা, শ্রেণিকক্ষে ঘুমিয়ে থাকা, নির্ধারিত সময়ের আগে বিদ্যালয় ত্যাগ, শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়তে চাপ দেওয়া, প্রাইভেট না পড়লে পরীক্ষায় কম নম্বর দেওয়ার ভয় দেখানো, শিক্ষার্থীকে বুলিং করা এবং শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছ থেকে অর্থ আদায়সহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া বিদ্যালয়ের বিভিন্ন নথিতে স্বাক্ষর জালিয়াতি এবং জামিল ও নাহির নামের এই দুই শিক্ষার্থীকে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি দেওয়ার অভিযোগও করেছেন অভিযোগকারী।
এসব অভিযোগের ভিত্তিতে কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী।
পাঠদানে অনিয়ম ও প্রাইভেট পড়তে চাপ দেওয়ার অভিযোগঃ
অভিযোগকারীর দাবি, বিদ্যালয়টিতে প্রায় ৭৭৮ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে ১৬ জন শিক্ষক রয়েছেন। তবে কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও পাঠদানে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে সহকারী শিক্ষক শিউলি বেগম, আমিনুল ইসলাম শামীম, রাবেয়া সুলতানা, সাবিনা ইয়াসমিন ও কানিজ ফাতেমা কলিসহ কয়েকজনের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারী।
অভিযোগ অনুযায়ী, কয়েকজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান না করে সময় কাটান। এমনকি শ্রেণিকক্ষে ঘুমিয়ে থাকার অভিযোগও রয়েছে। প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকলে কোনো কোনো শিক্ষক নির্ধারিত সময়ের প্রায় ৩০ মিনিট আগেই বিদ্যালয় ত্যাগ করেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে অভিযুক্ত শিক্ষকরা তাঁদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ একবাক্যে অস্বীকার করেছেন।
অভিযোগকারীর দাবি, সহকারী শিক্ষক শিউলি বেগম দীর্ঘ প্রায় ৩৪ বছর ধরে বিদ্যালয়ে কর্মরত এবং নিজ বাড়িতে প্রায় ১৫০ জন শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট বা কোচিং পড়ান। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়তে চাপ দেওয়া এবং প্রাইভেট না পড়লে পরীক্ষায় কম নম্বর দেওয়ার ভয় ও বুলিং এর অভিযোগও উঠেছে।
অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন অজুহাতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা সংশ্লিষ্ট নথি, সাক্ষ্য ও অন্যান্য তথ্যপ্রমাণের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
বিদ্যালয়ের নথিপত্রে স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগঃ
বিদ্যালয়ের নথিপত্র নিয়েও গুরুতর অভিযোগ করেছেন অভিযোগকারী। তাঁর দাবি, মা সমাবেশের খাতা এবং বিদ্যালয়ের কিছু নথিতে স্বাক্ষর জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি জামিল নামের এক শিক্ষার্থীকে শারীরিকভাবে শাস্তি দেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে।
অভিযোগকারীর ভাষ্য, এসব ঘটনার সমর্থনে তাঁর কাছে ভিডিওসহ কিছু তথ্যপ্রমাণ রয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এসব তথ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় তদন্ত করা জরুরি।
প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য ও শোকজের বিষয়ঃ
প্রধান শিক্ষকের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর তিনি নিপাহ ভাইরাসবিষয়ক প্রশিক্ষণে থাকাকালে সহকারী শিক্ষক সাবিনা ইয়াসমিন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত ছিলেন। এ সময় হাজিরা খাতায় তাঁর ছুটির (সিএল) কথা লেখা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন প্রধান শিক্ষক।
তিনি আরও জানান, ২২ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয়ে ফিরে অনলাইন ন্যাপ (NAPE) প্রশিক্ষণ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের কাছে জানতে পারেননি। পরে ২৪ সেপ্টেম্বর বিষয়টি নিয়ে সাবিনা ইয়াসমিনের কাছে জানতে চান এবং তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন বলে প্রধান শিক্ষক জানান।
প্রধান শিক্ষকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাবেয়া সুলতানা IPEMISএর password চুরি করে স্কুলের অতি গোপনীয় তথ্য বহিরাগতদের কাছে পাচার করে এ ছাড়া শিউলি বেগম এর বিরুদ্ধে কোচিং বাণিজ্যের ও বুলিং এর অভিযোগ আছে। পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র আয়মান মুরতাজ নাহিরকে শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার করার অভিযোগ পাওয়া যায় নাহির এর পিতা শিউলি ম্যাডামের কাছে জানতে চাইলে নাহির এর বাবাকে অপমান ও হুমকি প্রদান করে। এছাড় ও আমিনুল ইসলাম শামীম, রাবেয়া সুলতানা এবং কানিজ ফাতেমা কলিকেও বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে এর আগে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছে।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিঃ
মঙ্গল সুখ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী। তাঁর মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে বিদ্যালয়ের পাঠদানের পরিবেশ উন্নত হবে এবং শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে আস্থা বাড়বে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনো ধরনের প্রাইভেট বাণিজ্য বা শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থীদের লাঞ্ছনার সুযোগ নেই।
এ বিষয়ে পটুয়াখালী জেলা ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ মাসুদ করিম সাংবাদিকদের আরো জানান, বিষয়টি সম্পর্কে আগে আমার জানা ছিল না। সাংবাদিকদের মাধ্যমে যেহেতু বিষয়টি জানতে পেরেছি, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত সাপেক্ষে এ ব্যাপারে দ্রুত যথাযথ আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কলাপাড়া, পটুয়াখালী প্রতিনিধি 


















