সমাজভাষাবিজ্ঞান ভাষাবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। ভাষাবিজ্ঞানের যে শাখায় ভাষা ও সমাজের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সমাজ-সংগঠনের ভাষার ওপর প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়, সেটাই সমাজভাষাবিজ্ঞান। ভাষার গঠন, ব্যবহার ও পরিবর্তনের ওপর সমাজের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব অনুসন্ধান, বর্ণনা এবং বিশ্লেষণ করাই একজন সমাজভাষাবিজ্ঞানীর প্রধান দায়িত্ব।
একজন সমাজভাষাবিজ্ঞানীকে একটি জনপদের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের ভাষা ও উপভাষা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখতে হয়। তিনি যখন কোনো বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী নিয়ে গবেষণা করেন, তখন সমাজের পরিবেশ, বয়স, লিঙ্গ, শিক্ষা, পেশা, অর্থনৈতিক অবস্থান, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ভাষার ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলেছে, তা বিশ্লেষণ করেন। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের ভাষা ব্যবহারের পার্থক্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি শিশু, তরুণ ও প্রবীণদের ভাষাগত বৈচিত্র্যও তাঁর গবেষণার বিষয়। বন্ধু-বান্ধব, স্বামী-স্ত্রী, আত্মীয়স্বজন কিংবা কর্মক্ষেত্রে ভাষার ব্যবহার কীভাবে পরিবর্তিত হয়, তাও সমাজভাষাবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়।
এ ছাড়া সমাজভাষাবিজ্ঞানে ধ্বনি, রূপমূল, শব্দ, সম্বোধনসূচক রীতি, আত্মীয়তাসূচক পরিভাষা এবং ভাষার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবহার বিশ্লেষণ করা হয়। তবে একজন সমাজভাষাবিজ্ঞানীকে মনে রাখতে হবে, তিনি সমাজবিজ্ঞানী বা নৃবিজ্ঞানী নন; তিনি মূলত ভাষাবিজ্ঞানী। তাই তাঁর প্রধান দায়িত্ব হলো সমাজ ও ভাষার পারস্পরিক সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা এবং সমাজ কীভাবে ভাষাকে প্রভাবিত করে, তা বিশ্লেষণ করা।
একজন সমাজভাষাবিজ্ঞানী কোনো ভাষার পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণ রচনা করতে গেলে এক বা একাধিক তথ্যদাতার সহায়তা গ্রহণ করেন। তথ্যদাতাগণ গবেষকের প্রশ্নের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ভাষার ধ্বনি, রূপ, শব্দ, বাক্যগঠন ও ব্যবহার সম্পর্কে তথ্য প্রদান করেন। সংগৃহীত ভাষা-উপাত্ত সংশ্লিষ্ট ভাষার প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব করছে কি না, তাও যাচাই করা হয়। অতীতে ব্যাকরণবিদেরা প্রধানত সাধু ভাষায় রচিত গ্রন্থ এবং সংস্কৃত ব্যাকরণের কাঠামো অনুসরণ করতেন। কিন্তু আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান কথ্য ভাষার গুরুত্বকে বিশেষভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ফলে ভাষাবিজ্ঞানীর অন্যতম দায়িত্ব হলো সামাজিক সূত্রাবলি ও ভাষাতাত্ত্বিক সূত্রাবলির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয় করা এবং ভাষার গ্রহণযোগ্যতা, অগ্রহণযোগ্যতা ও বৈচিত্র্য বিশ্লেষণ করা।
পৃথিবীর প্রায় সব ভাষাতেই স্থান, কাল ও পাত্রভেদে ভাষাগত বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। সমাজের মর্যাদা, শিক্ষা, পেশা, ধর্ম, লিঙ্গ ও সাংস্কৃতিক পার্থক্যের কারণে ভাষার ব্যবহারেও ভিন্নতা সৃষ্টি হয়। উদাহরণস্বরূপ, ইংরেজি ভাষায় গাড়িকে ‘ কার’ বলা হলেও বিভিন্ন সমাজে উচ্চারণ ও ব্যবহারগত পার্থক্য দেখা যায়। তেমনি বাংলা ভাষাতেও অঞ্চল, শ্রেণি ও সামাজিক অবস্থানভেদে ভাষার রূপ পরিবর্তিত হয়।
স্বতন্ত্র শাস্ত্র হিসেবে সমাজভাষাবিজ্ঞানের চর্চা মূলত বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে সুসংগঠিত রূপ লাভ করে। তবে ভাষা ও সমাজের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণার ইতিহাস আরও পুরোনো। উনিশ শতকের শেষ ভাগ থেকেই ভাষা ও সংস্কৃতির পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা শুরু হয়। পরবর্তীকালে এডওয়ার্ড স্যাপির, ব্রনিস্লাভ ম্যালিনোভস্কি, মেরি হাস, চার্লস ফার্গুসন, জে. জে. গাম্পার্জ, ডেল হাইমস, জোশুয়া ফিশম্যান এবং উইলিয়াম ল্যাবভ সমাজভাষাবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
চার্লস ফার্গুসনের Diglossia (১৯৫৯) প্রবন্ধ, গাম্পার্জের ভাষা ও সমাজবিষয়ক গবেষণা, ডেল হাইমসের Ethnography of Speaking, জোশুয়া ফিশম্যানের ভাষা ও সমাজ সম্পর্কিত গবেষণা এবং উইলিয়াম ল্যাবভের The Social Stratification of English in New York City (১৯৬৬) সমাজভাষাবিজ্ঞানের বিকাশে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে।
সমাজভাষাবিজ্ঞানের বিকাশে যাঁদের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন—
- জে. জে. গাম্পার্জ— ভাষা, সমাজ ও যোগাযোগবিষয়ক গবেষণায় পথিকৃৎ।
- ডেল হাইমস— Ethnography of Speaking তত্ত্বের প্রবর্তক।
- চার্লস ফার্গুসন— Diglossia তত্ত্বের প্রবর্তক।
- জোশুয়া ফিশম্যান— ভাষা পরিকল্পনা, ভাষানীতি ও ভাষার সামাজিক ব্যবহারের ওপর গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেন।
- উইলিয়াম ল্যাবভ— আধুনিক সমাজভাষাবিজ্ঞানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ভাষার সামাজিক স্তরবিন্যাস নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে ভাষা ও সমাজের সম্পর্ককে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
একজন সমাজভাষাবিজ্ঞানীর মূল দায়িত্ব হলো ভাষা ও সমাজের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয় করা, ভাষার ওপর সামাজিক প্রভাব বিশ্লেষণ করা এবং ভাষার বৈচিত্র্যের কারণ অনুসন্ধান করা। সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে ভাষার পরিবর্তনও নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। তাই সমাজভাষাবিজ্ঞান ভাষার সামাজিক রূপ, ব্যবহার ও বিকাশ বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিদ্যাশাখা।
—————————————–
লেখকঃ অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞান বিভাগ
এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

অধ্যাপক ড. সাইদা আক্তার 


















