ঢাকা রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সাক্ষাতকার

দেশীয় বেনারশী শিল্পের প্রসার ও আন্তর্জাতিক বাজারে সম্প্রসারণের স্বপ্ন দেখছি- শামীম আকরাম

blank

ঐতিহ্য, আভিজাত্য ও নান্দনিকতার এক অনন্য সমন্বয় বেনারশী শাড়ি। বাঙালি নারীর সাজসজ্জা ও উৎসবের অনুষঙ্গে বেনারশী শাড়ির রয়েছে বিশেষ আবেদন। সময়ের পরিবর্তনে এই শিল্পে যুক্ত হয়েছে নতুন নকশা, আধুনিকতা ও বিপণনের নানা কৌশল। দেশীয় ঐতিহ্যকে ধারণ করে বেনারশী শিল্পের প্রসার এবং ক্রেতাদের কাছে মানসম্মত পণ্য পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছে ‘পাবনা বেনারশী মিউজিয়াম’। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠা, নামকরণের ভাবনা, পণ্যের বিশেষত্ব, তাঁতি ও কারিগরদের কর্মসংস্থান, বর্তমান বাজারের চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার শামীম আকরাম। দৈনিক চলনবিল প্রবাহের বিশেষ প্রতিনিধি আব্দুল্লাহ আল মামুন তাঁর মুখোমুখি হয়ে সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন। পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো।

চলনবিল প্রবাহঃ পাবনা বেনারশী মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠার পেছনে আপনার মূল উদ্দেশ্য কী ছিল? এই উদ্যোগের সূচনা কীভাবে হয়েছিল?

শামীম আকরাম: আমার বাড়ি পাবনায়। জন্মস্থান ও নিজ জেলার প্রতি ভালোবাসা থেকেই প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে ‘পাবনা’ যুক্ত করেছি। আমার উদ্দেশ্য ছিল, এই নাম দেখে পাবনার কোনো ক্রেতা আমাদের প্রতিষ্ঠানে এলে তিনি যেন তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য কিনতে পারেন। এতে একদিকে আমার ব্যবসা পরিচালিত হবে, অন্যদিকে ক্রেতারাও উপকৃত হবেন। একসময় আমি পাইকারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। পরবর্তী সময়ে ক্রেতাদের আরও ভালো সেবা দেওয়া এবং সরাসরি পণ্য বিক্রির চিন্তা থেকেই শোরুম প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিই।

চলনবিল প্রবাহঃ ‘বেনারশী মিউজিয়াম’ নামকরণের পেছনে বিশেষ কোনো ইতিহাস, ভাবনা বা অনুপ্রেরণা রয়েছে কি?

শামীম আকরাম: ‘মিউজিয়াম’ শব্দটির মধ্যেই একটি সমৃদ্ধ সংগ্রহশালার ধারণা রয়েছে। আমরা চেয়েছি, আমাদের প্রতিষ্ঠানে এসে ক্রেতারা যেন বেনারশী শাড়িসহ বিভিন্ন ধরনের বৈচিত্র্যময় ও নান্দনিক পণ্যের সমৃদ্ধ সংগ্রহ দেখতে পান। একটি জাদুঘরে যেমন নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী ও মূল্যবান নিদর্শন থাকে, তেমনি আমাদের প্রতিষ্ঠানেও ক্রেতারা যেন পছন্দ ও রুচি অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের পণ্য খুঁজে পান—এমন ভাবনা থেকেই এই নামকরণ।

চলনবিল প্রবাহঃ বাংলাদেশের বেনারশী শাড়ির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে আপনাদের প্রতিষ্ঠান কী ধরনের ভূমিকা রাখছে?

শামীম আকরাম: বাংলাদেশের বেনারশী শিল্পের ঐতিহ্য ও স্বাতন্ত্র্য ধরে রাখতে আমরা নিজস্ব উদ্যোগে কিছু বিশেষ ধরনের শাড়ি তৈরি করি। এর মধ্যে রয়েছে গুটি পোকার রেশম সুতা দিয়ে তৈরি সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ রেশমের শাড়ি। আমাদের নিজস্ব নকশা ও পরিকল্পনায় এসব শাড়ি তৈরি করা হয়। আমরা বিশ্বাস করি, দেশীয় বেনারশী শিল্পের নিজস্ব নকশা, ঐতিহ্য ও গুণগত মানকে আরও সমৃদ্ধ করার মধ্য দিয়েই এই শিল্পের প্রকৃত বিকাশ সম্ভব।

চলনবিল প্রবাহঃ পাবনা বেনারশী মিউজিয়ামের শাড়ি ও অন্যান্য পণ্যের বিশেষত্ব কী? মান ও নকশার দিক থেকে গ্রাহকেরা আপনাদের কেন বেছে নেবেন?

শামীম আকরাম: আমাদের পণ্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো গুণগত মান, রঙের বৈচিত্র্য এবং নান্দনিক নকশা। আমরা প্রতিটি পণ্যের ক্ষেত্রে আলাদা বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয়তা বজায় রাখার চেষ্টা করি। আমাদের শাড়ির রঙ, ডিজাইন ও কারুকাজে রয়েছে নিজস্বতা। ক্রেতাদের রুচি, পছন্দ ও সামর্থ্যের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে মানসম্মত পণ্য সরবরাহ করাই আমাদের অঙ্গীকার। এ কারণেই ক্রেতারা আমাদের পণ্য পছন্দ করবেন বলে আমরা আশাবাদী।

চলনবিল প্রবাহঃ বেনারশী শিল্পের সঙ্গে যুক্ত তাঁতি, কারিগর ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জীবনমান উন্নয়নে আপনাদের কী ধরনের উদ্যোগ রয়েছে?

শামীম আকরাম: বেনারশী শিল্পের সঙ্গে তাঁতি ও কারিগরদের জীবন-জীবিকা নিবিড়ভাবে জড়িত। আমরা তাঁদের দিয়ে কাজ করানোর ক্ষেত্রে নতুন নতুন নকশা ও ডিজাইনের পরিকল্পনা করি। এর ফলে তাঁতি ও কারিগরদের নিয়মিত কাজের সুযোগ তৈরি হয়। বিশেষ করে যারা কর্মহীন, তাঁদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করাও আমাদের উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। আমরা মনে করি, এই শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি এর সঙ্গে যুক্ত মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নও জরুরি।

চলনবিল প্রবাহঃ বর্তমান বাজারে দেশি-বিদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয় ও গ্রাহকের রুচির পরিবর্তন আপনাদের ব্যবসায় কী প্রভাব ফেলছে?

শামীম আকরাম: বর্তমান বাজারে প্রতিযোগিতা অনেক বেড়েছে। ক্রেতাদের রুচি ও চাহিদার পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা নিয়মিত নতুন নতুন ডিজাইনের পণ্য সরবরাহ করার চেষ্টা করি। পাশাপাশি সুলভ মূল্যে মানসম্মত পণ্য দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব দিই। তবে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে সুতা, রং, জরি ও অন্যান্য কাঁচামালের দাম ধারাবাহিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতি দেশীয় বেনারশী শিল্পের জন্যও উদ্বেগের কারণ।

blank

চলনবিল প্রবাহঃ বেনারশী শাড়ির ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এবং তরুণ ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে আপনারা কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন?

শামীম আকরাম: বেনারশী শাড়ির ঐতিহ্য ও সৌন্দর্য নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে আমরা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মেলা ও প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করি। পাশাপাশি অনলাইন মাধ্যমেও আমাদের পণ্য ও নকশা তুলে ধরা হচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশীয় ক্রেতাদের পাশাপাশি প্রবাসী বাঙালি ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছেও বাংলাদেশের বেনারশী শিল্পের পরিচিতি বাড়াতে চাই। আমরা চাই, নতুন প্রজন্ম ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠুক।

চলনবিল প্রবাহঃ অনলাইন ব্যবসা ও ডিজিটাল বিপণন বেনারশী শিল্পের প্রসারে কতটা ভূমিকা রাখছে? এ ক্ষেত্রে আপনাদের অভিজ্ঞতা কেমন?

শামীম আকরাম: অনলাইন ব্যবসা নিঃসন্দেহে বেনারশী শিল্পের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে দেশের দূরবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী ক্রেতা কিংবা প্রবাসীদের কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে অনলাইন মাধ্যম বেশ কার্যকর। তবে শাড়ির ক্ষেত্রে সরাসরি দেখে, কাপড়ের মান যাচাই করে, রং ও নকশা বুঝে কেনাকাটা করাই আমার কাছে বেশি ভালো মনে হয়। কারণ ছবির সঙ্গে বাস্তবে পণ্যের রং বা গুণগত মানের কিছুটা পার্থক্য থাকতে পারে। তাই অনলাইন ও সরাসরি বিক্রয়—দুই মাধ্যমকেই আমরা গুরুত্ব দিই।

চলনবিল প্রবাহঃ আগামী দিনে পাবনা বেনারশী মিউজিয়ামকে দেশব্যাপী পরিচিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে সম্প্রসারণের কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি?

শামীম আকরাম: অবশ্যই। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই বাংলাদেশি ও বাঙালি কমিউনিটির মানুষ বসবাস করছেন। তাঁদের কাছে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী বেনারশী শাড়ির ব্যাপক চাহিদা ও বাজার তৈরির সুযোগ রয়েছে বলে আমরা মনে করি। সে লক্ষ্যেই ভবিষ্যতে দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিচিতি বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিসরেও শোরুম প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা চাই, পাবনা বেনারশী মিউজিয়ামের মাধ্যমে বাংলাদেশের নিজস্ব নকশা ও ঐতিহ্য আন্তর্জাতিক বাজারে তুলে ধরতে।

চলনবিল প্রবাহঃ বেনারশী শিল্পের ভবিষ্যৎ, সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য আপনার বার্তা কী?

শামীম আকরাম: বেনারশী শিল্পের উন্নয়ন ও টিকে থাকার জন্য সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে তাঁতি ও কারিগরদের সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ, কাঁচামালের সহজলভ্যতা, প্রশিক্ষণ এবং দেশি-বিদেশি বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতা পাওয়া গেলে এই শিল্প আরও এগিয়ে যাবে।

নতুন যারা এই শিল্পে উদ্যোক্তা হতে চান, তাঁদের প্রতি আমার পরামর্শ—শুধু আবেগ বা আগ্রহের বশে ব্যবসা শুরু না করে আগে শিল্পটি সম্পর্কে ভালোভাবে জানুন। বাজার, পণ্যের মান, উৎপাদনব্যয়, ক্রেতার চাহিদা ও ব্যবসার বাস্তবতা সম্পর্কে যথাযথ ধারণা নিয়ে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে আসুন। কারণ না জেনে বা না বুঝে বিনিয়োগ করলে লোকসানের আশঙ্কা থাকে। সঠিক জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও পরিকল্পনা থাকলে এই শিল্পে ভালো করার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।

 

 

জনপ্রিয় খবর
blank

দেশীয় বেনারশী শিল্পের প্রসার ও আন্তর্জাতিক বাজারে সম্প্রসারণের স্বপ্ন দেখছি- শামীম আকরাম

সাক্ষাতকার

দেশীয় বেনারশী শিল্পের প্রসার ও আন্তর্জাতিক বাজারে সম্প্রসারণের স্বপ্ন দেখছি- শামীম আকরাম

প্রকাশের সময় : ৭ মিনিট আগে
blank

ঐতিহ্য, আভিজাত্য ও নান্দনিকতার এক অনন্য সমন্বয় বেনারশী শাড়ি। বাঙালি নারীর সাজসজ্জা ও উৎসবের অনুষঙ্গে বেনারশী শাড়ির রয়েছে বিশেষ আবেদন। সময়ের পরিবর্তনে এই শিল্পে যুক্ত হয়েছে নতুন নকশা, আধুনিকতা ও বিপণনের নানা কৌশল। দেশীয় ঐতিহ্যকে ধারণ করে বেনারশী শিল্পের প্রসার এবং ক্রেতাদের কাছে মানসম্মত পণ্য পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছে ‘পাবনা বেনারশী মিউজিয়াম’। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠা, নামকরণের ভাবনা, পণ্যের বিশেষত্ব, তাঁতি ও কারিগরদের কর্মসংস্থান, বর্তমান বাজারের চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার শামীম আকরাম। দৈনিক চলনবিল প্রবাহের বিশেষ প্রতিনিধি আব্দুল্লাহ আল মামুন তাঁর মুখোমুখি হয়ে সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন। পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো।

চলনবিল প্রবাহঃ পাবনা বেনারশী মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠার পেছনে আপনার মূল উদ্দেশ্য কী ছিল? এই উদ্যোগের সূচনা কীভাবে হয়েছিল?

শামীম আকরাম: আমার বাড়ি পাবনায়। জন্মস্থান ও নিজ জেলার প্রতি ভালোবাসা থেকেই প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে ‘পাবনা’ যুক্ত করেছি। আমার উদ্দেশ্য ছিল, এই নাম দেখে পাবনার কোনো ক্রেতা আমাদের প্রতিষ্ঠানে এলে তিনি যেন তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য কিনতে পারেন। এতে একদিকে আমার ব্যবসা পরিচালিত হবে, অন্যদিকে ক্রেতারাও উপকৃত হবেন। একসময় আমি পাইকারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। পরবর্তী সময়ে ক্রেতাদের আরও ভালো সেবা দেওয়া এবং সরাসরি পণ্য বিক্রির চিন্তা থেকেই শোরুম প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিই।

চলনবিল প্রবাহঃ ‘বেনারশী মিউজিয়াম’ নামকরণের পেছনে বিশেষ কোনো ইতিহাস, ভাবনা বা অনুপ্রেরণা রয়েছে কি?

শামীম আকরাম: ‘মিউজিয়াম’ শব্দটির মধ্যেই একটি সমৃদ্ধ সংগ্রহশালার ধারণা রয়েছে। আমরা চেয়েছি, আমাদের প্রতিষ্ঠানে এসে ক্রেতারা যেন বেনারশী শাড়িসহ বিভিন্ন ধরনের বৈচিত্র্যময় ও নান্দনিক পণ্যের সমৃদ্ধ সংগ্রহ দেখতে পান। একটি জাদুঘরে যেমন নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী ও মূল্যবান নিদর্শন থাকে, তেমনি আমাদের প্রতিষ্ঠানেও ক্রেতারা যেন পছন্দ ও রুচি অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের পণ্য খুঁজে পান—এমন ভাবনা থেকেই এই নামকরণ।

চলনবিল প্রবাহঃ বাংলাদেশের বেনারশী শাড়ির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে আপনাদের প্রতিষ্ঠান কী ধরনের ভূমিকা রাখছে?

শামীম আকরাম: বাংলাদেশের বেনারশী শিল্পের ঐতিহ্য ও স্বাতন্ত্র্য ধরে রাখতে আমরা নিজস্ব উদ্যোগে কিছু বিশেষ ধরনের শাড়ি তৈরি করি। এর মধ্যে রয়েছে গুটি পোকার রেশম সুতা দিয়ে তৈরি সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ রেশমের শাড়ি। আমাদের নিজস্ব নকশা ও পরিকল্পনায় এসব শাড়ি তৈরি করা হয়। আমরা বিশ্বাস করি, দেশীয় বেনারশী শিল্পের নিজস্ব নকশা, ঐতিহ্য ও গুণগত মানকে আরও সমৃদ্ধ করার মধ্য দিয়েই এই শিল্পের প্রকৃত বিকাশ সম্ভব।

চলনবিল প্রবাহঃ পাবনা বেনারশী মিউজিয়ামের শাড়ি ও অন্যান্য পণ্যের বিশেষত্ব কী? মান ও নকশার দিক থেকে গ্রাহকেরা আপনাদের কেন বেছে নেবেন?

শামীম আকরাম: আমাদের পণ্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো গুণগত মান, রঙের বৈচিত্র্য এবং নান্দনিক নকশা। আমরা প্রতিটি পণ্যের ক্ষেত্রে আলাদা বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয়তা বজায় রাখার চেষ্টা করি। আমাদের শাড়ির রঙ, ডিজাইন ও কারুকাজে রয়েছে নিজস্বতা। ক্রেতাদের রুচি, পছন্দ ও সামর্থ্যের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে মানসম্মত পণ্য সরবরাহ করাই আমাদের অঙ্গীকার। এ কারণেই ক্রেতারা আমাদের পণ্য পছন্দ করবেন বলে আমরা আশাবাদী।

চলনবিল প্রবাহঃ বেনারশী শিল্পের সঙ্গে যুক্ত তাঁতি, কারিগর ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জীবনমান উন্নয়নে আপনাদের কী ধরনের উদ্যোগ রয়েছে?

শামীম আকরাম: বেনারশী শিল্পের সঙ্গে তাঁতি ও কারিগরদের জীবন-জীবিকা নিবিড়ভাবে জড়িত। আমরা তাঁদের দিয়ে কাজ করানোর ক্ষেত্রে নতুন নতুন নকশা ও ডিজাইনের পরিকল্পনা করি। এর ফলে তাঁতি ও কারিগরদের নিয়মিত কাজের সুযোগ তৈরি হয়। বিশেষ করে যারা কর্মহীন, তাঁদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করাও আমাদের উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। আমরা মনে করি, এই শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি এর সঙ্গে যুক্ত মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নও জরুরি।

চলনবিল প্রবাহঃ বর্তমান বাজারে দেশি-বিদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয় ও গ্রাহকের রুচির পরিবর্তন আপনাদের ব্যবসায় কী প্রভাব ফেলছে?

শামীম আকরাম: বর্তমান বাজারে প্রতিযোগিতা অনেক বেড়েছে। ক্রেতাদের রুচি ও চাহিদার পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা নিয়মিত নতুন নতুন ডিজাইনের পণ্য সরবরাহ করার চেষ্টা করি। পাশাপাশি সুলভ মূল্যে মানসম্মত পণ্য দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব দিই। তবে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে সুতা, রং, জরি ও অন্যান্য কাঁচামালের দাম ধারাবাহিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতি দেশীয় বেনারশী শিল্পের জন্যও উদ্বেগের কারণ।

blank

চলনবিল প্রবাহঃ বেনারশী শাড়ির ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এবং তরুণ ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে আপনারা কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন?

শামীম আকরাম: বেনারশী শাড়ির ঐতিহ্য ও সৌন্দর্য নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে আমরা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মেলা ও প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করি। পাশাপাশি অনলাইন মাধ্যমেও আমাদের পণ্য ও নকশা তুলে ধরা হচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশীয় ক্রেতাদের পাশাপাশি প্রবাসী বাঙালি ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছেও বাংলাদেশের বেনারশী শিল্পের পরিচিতি বাড়াতে চাই। আমরা চাই, নতুন প্রজন্ম ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠুক।

চলনবিল প্রবাহঃ অনলাইন ব্যবসা ও ডিজিটাল বিপণন বেনারশী শিল্পের প্রসারে কতটা ভূমিকা রাখছে? এ ক্ষেত্রে আপনাদের অভিজ্ঞতা কেমন?

শামীম আকরাম: অনলাইন ব্যবসা নিঃসন্দেহে বেনারশী শিল্পের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে দেশের দূরবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী ক্রেতা কিংবা প্রবাসীদের কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে অনলাইন মাধ্যম বেশ কার্যকর। তবে শাড়ির ক্ষেত্রে সরাসরি দেখে, কাপড়ের মান যাচাই করে, রং ও নকশা বুঝে কেনাকাটা করাই আমার কাছে বেশি ভালো মনে হয়। কারণ ছবির সঙ্গে বাস্তবে পণ্যের রং বা গুণগত মানের কিছুটা পার্থক্য থাকতে পারে। তাই অনলাইন ও সরাসরি বিক্রয়—দুই মাধ্যমকেই আমরা গুরুত্ব দিই।

চলনবিল প্রবাহঃ আগামী দিনে পাবনা বেনারশী মিউজিয়ামকে দেশব্যাপী পরিচিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে সম্প্রসারণের কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি?

শামীম আকরাম: অবশ্যই। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই বাংলাদেশি ও বাঙালি কমিউনিটির মানুষ বসবাস করছেন। তাঁদের কাছে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী বেনারশী শাড়ির ব্যাপক চাহিদা ও বাজার তৈরির সুযোগ রয়েছে বলে আমরা মনে করি। সে লক্ষ্যেই ভবিষ্যতে দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিচিতি বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিসরেও শোরুম প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা চাই, পাবনা বেনারশী মিউজিয়ামের মাধ্যমে বাংলাদেশের নিজস্ব নকশা ও ঐতিহ্য আন্তর্জাতিক বাজারে তুলে ধরতে।

চলনবিল প্রবাহঃ বেনারশী শিল্পের ভবিষ্যৎ, সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য আপনার বার্তা কী?

শামীম আকরাম: বেনারশী শিল্পের উন্নয়ন ও টিকে থাকার জন্য সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে তাঁতি ও কারিগরদের সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ, কাঁচামালের সহজলভ্যতা, প্রশিক্ষণ এবং দেশি-বিদেশি বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতা পাওয়া গেলে এই শিল্প আরও এগিয়ে যাবে।

নতুন যারা এই শিল্পে উদ্যোক্তা হতে চান, তাঁদের প্রতি আমার পরামর্শ—শুধু আবেগ বা আগ্রহের বশে ব্যবসা শুরু না করে আগে শিল্পটি সম্পর্কে ভালোভাবে জানুন। বাজার, পণ্যের মান, উৎপাদনব্যয়, ক্রেতার চাহিদা ও ব্যবসার বাস্তবতা সম্পর্কে যথাযথ ধারণা নিয়ে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে আসুন। কারণ না জেনে বা না বুঝে বিনিয়োগ করলে লোকসানের আশঙ্কা থাকে। সঠিক জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও পরিকল্পনা থাকলে এই শিল্পে ভালো করার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।