গুরুদাসপুরে ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলাম হত্যা মামলায় নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুকে দ্বিতীয় দফায় আরও দুই দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
সোমবার (২ নভেম্বর) সকালে গুরুদাসপুর আমলি আদালতের বিচারক মাহমুদুল হাসান রিমান্ড শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।
এর আগে বুধবার বিকেলে আদালতে হাজির করে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আমীর সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করলে মিন্টুকে তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। ওই রিমান্ড শেষে গত শুক্রবার সন্ধ্যায় আসামিকে আদালতে হাজির করা হলে বিচারক রিমান্ড শুনানি না করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এরপর শুক্রবার থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন তিনি।
বিষয়টি নিশ্চিত করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ওসি মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ছাত্রদল নেতা শাকিল হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার মিন্টুকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দ্বিতীয় দফায় সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছিল। শুনানি শেষে আদালত দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। বর্তমানে মিন্টু ডিবি হেফাজতে রয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, এমপিপুত্রের প্রথম দফার রিমান্ডে দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে শুক্রবার ভোর ৩টার দিকে আলামিন হোসেন (২৬) ও আনিসুর রহমান (২৫) নামে দুজনকে আটক করা হয়। পরে তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে শনিবার কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত জানায়নি।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৪ অক্টোবর রাত ৯টার দিকে গুরুদাসপুর পৌর শহরের চাঁচকৈড় বাজারপাড়া এলাকায় হেলমেট পরা সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলাম (৩২)। এ সময় শাকিলকে কুপিয়ে জখম করে মোটরসাইকেলে পালিয়ে যান হামলাকারীরা। পরে তাকে উদ্ধার করে রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (সাবেক পিজি হাসপাতাল) ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় ১৯ অক্টোবর থানায় মামলা করেন শাকিলের বাবা রবিউল ইসলাম।
শাকিলের পারিবারিক সূত্র জানায়, হাসপাতালে ১২ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ২৬ অক্টোবর রাত সাড়ে ৮টার দিকে মারা যান তিনি। হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে ওই দিন রাত ১০টার দিকে নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুকে গ্রেপ্তার করে তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। মামলাটির তদন্ত করছে ডিবি। একই সঙ্গে মিন্টুকে যুবদলের যুগ্ম সম্পাদকের পদ থেকেও বহিষ্কার করা হয়েছে।
মঙ্গলবার শাকিলের জানাজা শেষে হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে আমেরিকা প্রবাসী রাসেলের শপিংমলে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়।
এসব ঘটনায় জনরোষে পড়েন সংসদ সদস্য আবদুল আজিজ। বুধবার সকাল থেকে তার একটি অশ্লীল ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে তাকে আপত্তিকর অঙ্গভঙ্গি করতে দেখা গেছে। ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
এমপি আজিজের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে নাটোর জেলা বিএনপি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে দেখা দিয়েছে তীব্র অসন্তোষ। আবদুল আজিজের নৈতিক স্খলন নিয়ে করণীয় নির্ধারণ করতে দীর্ঘ আট ঘণ্টার সভা করে জেলা বিএনপি। ওই সভায় শাকিল হত্যা মামলায় রিমান্ড শেষে কারাগারে থাকা এমপিপুত্র মিন্টুর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এবং আবদুল আজিজের ভাইরাল ভিডিও নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপনের পর সদস্যরা নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। পরে দলের গঠনতন্ত্র পর্যালোচনা করে আবদুল আজিজের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে সার্বিক বিষয় আনুষ্ঠানিকভাবে কেন্দ্রীয় বিএনপির কাছে তুলে ধরার সিদ্ধান্তে পৌঁছান তারা।
জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, ‘আমরা সবগুলো ঘটনা নিয়ে আলোচনা করেছি। আমাদের কাছে আবদুল আজিজের পরিচয় তিনি জেলার সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক। এ ছাড়া তিনি একজন সংসদ সদস্য। তাই গঠনতন্ত্র মোতাবেক জেলা কমিটির ক্ষমতা নেই কোনো যুগ্ম আহ্বায়কের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার। সর্বসম্মতিক্রমে এ বিষয়ে যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত দলের উচ্চপর্যায়ের ওপর ন্যস্ত করেছেন তারা।’
এদিকে বৃহস্পতিবার বিকেলে নিহত শাকিলের গুরুদাসপুর পৌরসভার খোয়ারপাড়া খামারনাচকৈড়ের বাড়িতে গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল হাসান রাকিব। অপরাধী যে-ই হোক, সঠিক বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন তারা।

গুরুদাসপুর প্রতিনিধি 










