ঢাকা রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডেঙ্গুতে চলতি বছর হাসপাতালে ভর্তি ১ লাখ ৪৭ হাজার, মৃত্যু ৪৫৮

blank
বাংলাদেশে চলতি বছর মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা প্রায় ৯৩ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৮০ জন। এ সময়ে মারা গেছেন ৪৫৮ জন। অথচ ২০২৫ সালের একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৭৬ হাজার ৫১৪ এবং মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৩০৭।

দেশে ডেঙ্গু সংক্রমণের ইতিহাসে চলতি বছরের হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ২০০০ সালে ডেঙ্গুর তথ্য সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর কেবল ২০২৩ সালে এর চেয়ে বেশি ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। মৃত্যুর দিক থেকে চলতি বছরের অবস্থান তৃতীয়। এর আগে ২০২৩ সালে ১ হাজার ৭০৫ জন এবং ২০২৪ সালে ৫৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যমতে, শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৬৭৪ জন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৫ হাজার ৮২৬ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর মাসে ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন এবং মারা যান ১৪৮ জন। তবে অক্টোবর মাসে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭৪ জনে, যা চলতি বছরের এক মাসে সর্বোচ্চ প্রাণহানির রেকর্ড। নভেম্বরের প্রথম সাত দিনেই মারা গেছেন আরও ৩৫ জন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের মহামারি সংক্রান্ত বুলেটিনেও বাংলাদেশে ডেঙ্গু সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির চিত্র উঠে এসেছে।

 

কীটতত্ত্ববিদদের মতে, বছরব্যাপী বিজ্ঞানভিত্তিক ও কার্যকর মশকনিধন কার্যক্রম বাস্তবায়নে ব্যর্থতার কারণেই দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দীর্ঘায়িত হচ্ছে। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান কীটতত্ত্ববিদ তৌহিদ উদ্দিন আহমেদ অভিযোগ করেন, ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনগুলো বিজ্ঞানসম্মত পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘টুকরো টুকরো বা দায়সারা ব্যবস্থা দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।’

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম জানান, মশকনিধন কার্যক্রমে নগরবাসীকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাঁর মতে, জনসচেতনতা ও সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। অন্যদিকে, সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, মশা নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত লার্ভিসাইড স্প্রে ও ফগিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

 

এদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ডেঙ্গু শনাক্তে বিলম্ব এবং দেরিতে হাসপাতালে ভর্তির কারণে রোগীদের জটিলতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক কাজী আহমেদ জাকির নেতৃত্বে পরিচালিত সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনায় ১১৯ জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মৃত রোগীদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি হাসপাতালে ভর্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মারা গেছেন। মোট মৃত্যুর ৬২ দশমিক ৫ শতাংশের কারণ ছিল ডেঙ্গু শক সিনড্রোম এবং ৩১ দশমিক ২ শতাংশের ক্ষেত্রে দায়ী ছিল এক্সপান্ডেড ডেঙ্গু সিনড্রোম। চিকিৎসকদের মতে, জেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসা ছাড়াই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় আসার কারণে অনেক রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই সংকটাপন্ন অবস্থায় চলে যাচ্ছেন।

 

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রথম বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় ২০০০ সালে। সে বছর ৫ হাজার ৫৫১ জন হাসপাতালে ভর্তি হন এবং মারা যান ৯৩ জন। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালে ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ৫৭৫ জনের মৃত্যু ঘটে। ২০২৫ সালে বছরজুড়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ এবং মোট মৃত্যু হয়েছিল ৪১৩ জনের।

চলতি বছরের পরিসংখ্যান ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কার্যকর মশকনিধন কার্যক্রম, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠতে পারে।

জনপ্রিয় খবর
blank

দেশীয় বেনারশী শিল্পের প্রসার ও আন্তর্জাতিক বাজারে সম্প্রসারণের স্বপ্ন দেখছি- শামীম আকরাম

ডেঙ্গুতে চলতি বছর হাসপাতালে ভর্তি ১ লাখ ৪৭ হাজার, মৃত্যু ৪৫৮

প্রকাশের সময় : ১১ ঘন্টা আগে
blank
বাংলাদেশে চলতি বছর মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা প্রায় ৯৩ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৮০ জন। এ সময়ে মারা গেছেন ৪৫৮ জন। অথচ ২০২৫ সালের একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৭৬ হাজার ৫১৪ এবং মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৩০৭।

দেশে ডেঙ্গু সংক্রমণের ইতিহাসে চলতি বছরের হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ২০০০ সালে ডেঙ্গুর তথ্য সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর কেবল ২০২৩ সালে এর চেয়ে বেশি ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। মৃত্যুর দিক থেকে চলতি বছরের অবস্থান তৃতীয়। এর আগে ২০২৩ সালে ১ হাজার ৭০৫ জন এবং ২০২৪ সালে ৫৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যমতে, শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৬৭৪ জন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৫ হাজার ৮২৬ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর মাসে ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন এবং মারা যান ১৪৮ জন। তবে অক্টোবর মাসে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭৪ জনে, যা চলতি বছরের এক মাসে সর্বোচ্চ প্রাণহানির রেকর্ড। নভেম্বরের প্রথম সাত দিনেই মারা গেছেন আরও ৩৫ জন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের মহামারি সংক্রান্ত বুলেটিনেও বাংলাদেশে ডেঙ্গু সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির চিত্র উঠে এসেছে।

 

কীটতত্ত্ববিদদের মতে, বছরব্যাপী বিজ্ঞানভিত্তিক ও কার্যকর মশকনিধন কার্যক্রম বাস্তবায়নে ব্যর্থতার কারণেই দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দীর্ঘায়িত হচ্ছে। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান কীটতত্ত্ববিদ তৌহিদ উদ্দিন আহমেদ অভিযোগ করেন, ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনগুলো বিজ্ঞানসম্মত পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘টুকরো টুকরো বা দায়সারা ব্যবস্থা দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।’

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম জানান, মশকনিধন কার্যক্রমে নগরবাসীকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাঁর মতে, জনসচেতনতা ও সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। অন্যদিকে, সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, মশা নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত লার্ভিসাইড স্প্রে ও ফগিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

 

এদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ডেঙ্গু শনাক্তে বিলম্ব এবং দেরিতে হাসপাতালে ভর্তির কারণে রোগীদের জটিলতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক কাজী আহমেদ জাকির নেতৃত্বে পরিচালিত সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনায় ১১৯ জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মৃত রোগীদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি হাসপাতালে ভর্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মারা গেছেন। মোট মৃত্যুর ৬২ দশমিক ৫ শতাংশের কারণ ছিল ডেঙ্গু শক সিনড্রোম এবং ৩১ দশমিক ২ শতাংশের ক্ষেত্রে দায়ী ছিল এক্সপান্ডেড ডেঙ্গু সিনড্রোম। চিকিৎসকদের মতে, জেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসা ছাড়াই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় আসার কারণে অনেক রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই সংকটাপন্ন অবস্থায় চলে যাচ্ছেন।

 

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রথম বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় ২০০০ সালে। সে বছর ৫ হাজার ৫৫১ জন হাসপাতালে ভর্তি হন এবং মারা যান ৯৩ জন। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালে ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ৫৭৫ জনের মৃত্যু ঘটে। ২০২৫ সালে বছরজুড়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ এবং মোট মৃত্যু হয়েছিল ৪১৩ জনের।

চলতি বছরের পরিসংখ্যান ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কার্যকর মশকনিধন কার্যক্রম, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠতে পারে।