পূজার ছুটিতে কয়েকটি দিন চট্টগ্রামে কাটানোর সুযোগ হলো। ব্যস্ততার বাইরে একটু সময়, পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে শহর ও আশপাশের কিছু জায়গা দেখা—এই ছিল মূল উদ্দেশ্য। চার দিনের এই ভ্রমণে ইতিহাস, ঐতিহ্য, পাহাড়, সমুদ্র, লেক, পার্ক, স্থাপনা আর শহরের ব্যস্ত জীবনের সঙ্গে একসঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ, প্রতিটি দিনই ছিল নতুন কিছু দেখা ও জানার অভিজ্ঞতায় ভরা। যদিও ২০০৮/৯ এ চট্রগ্রাম এসে বেশ কিছুদিন ছিলাম মামার বাসায় ও আশেপাশে ঘুরে দেখেছিলাম। কক্সবাজার থেকে রাঙামাটি যাওয়ার পথে বিরতিও নিয়েছি।
যাহোক, ২১ অক্টোবর ২০২৬, সকালে নামাজ আদায় করেই স্যারদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম। পথে বিজিবি রেস্টুরেন্টে নাস্তা সেরে বেলা ১১টার দিকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের রেস্টহাউসে উঠলাম। দুপুর ১২টার দিকে পৌঁছালাম চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে। দুপুরের খাবার শেষে শহর দেখতে বের হলাম। প্রতিমা বিসর্জন উপলক্ষে শহরের কিছু সড়কে সেদিন প্রচণ্ড ব্যস্ততা থাকার কথা। তাই ভিড় এড়িয়ে অন্যদিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। প্রথম গন্তব্য চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক CRB—সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং। বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলীয় মহাব্যবস্থাপকের নিয়ন্ত্রণ কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত এই ভবনটি ১৮৭২ সালে নির্মিত। বন্দরনগরীর প্রাচীনতম ভবনগুলোর একটি এটি। এত বছর পরও ভবনটি তার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পুরোনো স্থাপত্যের সৌন্দর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

এরপর GEC মোড়—জেনারেল ইলেকট্রিক কোম্পানি—হয়ে গেলাম আর্মিদের তৈরি হিল ভিউ পার্কে। বেশ বড় জায়গাজুড়ে তৈরি পার্কটির অবস্থান ভাটিয়ারী নেভাল একাডেমি ও BMA-তে যাওয়ার পথে। আনাবিয়া রাইডে চড়ার পর ভাটিয়ারীর সুন্দর রাস্তা ধরে রওনা হলাম সানসেট পয়েন্টের দিকে। এরপর BMA-তে প্রবেশ করে আসরের নামাজ আদায় করলাম। পুরো ক্যাম্পাস ঘুরে দেখলাম, দেখলাম গলফ এলাকা। ভাটিয়ারী লেকের পাশ দিয়ে এগিয়ে প্রবেশ করলাম চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে। তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে আসায় জায়গাগুলো খুব একটা উপভোগ করা সম্ভব হলো না। সন্ধ্যার পর সার্কিট হাউসে ফিরে সাইদুজ্জামান পাঠান ভাইয়ের পরিবারের সঙ্গে গেলাম Sam’s Restaurant-এ। বাচ্চাদের খেলার ব্যবস্থা থাকায় চার বাচ্চাই নিজেদের মতো করে বেশ আনন্দ করল। খাওয়া-দাওয়া শেষে রাত সাড়ে ১০টার দিকে ফিরলাম। এভাবেই শেষ হলো প্রথম দিনের চট্টগ্রাম ভ্রমণ।
পরদিন ২২ অক্টোবর সকাল ৭টায় বেরিয়ে পড়লাম চট্টগ্রামের পাশের দুটি উপজেলা ঘুরে দেখার উদ্দেশ্যে। পথে আলিফ রেস্টুরেন্টে নাস্তা করলাম। সঙ্গে ছিল অসাধারণ চা—সকালের ভ্রমণে যা বেশ সতেজ করে দিল। এরপর গেলাম সন্দ্বীপ যাওয়ার ফেরিঘাটে। সেখান থেকে সীতাকুণ্ড ইকোপার্ক দেখে পরিষদে আসলাম। এরপর গন্তব্য গুলিয়াখালী বিচ। প্রচণ্ড রোদে সেখানে কিছুটা কষ্ট হয়েছে, তবে বিচটির বৈশিষ্ট্য ও পরিবেশ অন্যরকম হওয়ায় জায়গাটি ভালো লেগেছে। এরপর মীরসরাই উপজেলা পরিষদে দুপুরের খাবার খেয়ে গেলাম মহামায়া লেকে। কাপ্তাই লেক দেখার অভিজ্ঞতা থাকায় মহামায়া লেককে তুলনামূলকভাবে ছোট মনে হচ্ছিল। তবে পর্যটকদের জন্য এখানকার আয়োজন বেশ প্রশংসনীয়।

ফেরার পথে তিন উপজেলা মিলে গড়ে ওঠা EPZ এলাকা দেখে আসলাম। স্থানীয়দের কাছ থেকে শুনলাম, এই এলাকা তৈরির জন্য বিশাল রিজার্ভ ফরেস্ট ও ইলিশের প্রজননকেন্দ্রগুলো ধ্বংস হচ্ছে। বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই ভাবিয়ে তুলল—উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে রাখা যায়, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। রাতে একটি দাওয়াতে অংশ নিয়ে সার্কিট হাউসে ফিরতে ফিরতে প্রায় সাড়ে ১০টা। দীর্ঘ হলেও দিনটি ছিল বৈচিত্র্যময়।
তৃতীয় দিন ২৩ অক্টোবর সকালে নাস্তা করেই বের হয়ে পড়লাম শহর দেখতে। একে একে ঘুরে দেখলাম জেলা প্রশাসক কার্যালয়, টেরিবাজার, লালদিঘি ময়দান, আন্দরকিল্লা মসজিদ, চন্দনপুরা মসজিদ, ব্রিটিশ আমলে নির্মিত ফায়ার সার্ভিস অফিস, ঐতিহাসিক চেরাগের মোর, চেরাগের মোর পাহাড়, লাভ লেন, ডিসি হিল ও ডিসি বাংলো। এরপর গেলাম চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায়। চিড়িয়াখানাটি বেশ সমৃদ্ধ মনে হলো। প্রায় আটটি বাঘ, কুমির, ক্যাংগারু, শাম্বা হরিণ, গোকুল, রাইনোসহ বিভিন্ন প্রাণী রয়েছে। শিশুদের খেলাধুলার ব্যবস্থাও আছে। দর্শনার্থীদের জন্য বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। গাছের নিচে বসার জন্য রয়েছে বেশ কিছু সিমেন্টের স্থাপনা। সব মিলিয়ে পরিবার নিয়ে সময় কাটানোর মতো সুন্দর একটি জায়গা।

এরপর গেলাম ফয়েজ লেকে। ভেবেছিলাম পূজার ছুটিতে প্রচুর মানুষের ভিড় থাকবে। কিন্তু দুপুরে যাওয়ায় সম্ভবত লোকজন কম ছিল। আনাবিয়ার আবদারে আমাদেরও বিভিন্ন রাইডে উঠতে হলো। লেকের বাতাস আর চারপাশের পরিবেশে বেশ নির্মল আনন্দ পেলাম। এরপর GEC মোড়ে মেজ্জান হাইলে আইয়ুনে মেজবান খেলাম। দোকানটি ছোট হলেও পরিবেশনা ও খাবারের মান আমাদের কাছে বেশ ভালো মনে হয়েছে। এরপর বায়েজিদ বোস্তামির মাজার নামে পরিচিত মাজারে গেলাম, বড় বড় কুমির এখনো আছে দেখলাম। সবাই পুকুরের মাছ ও কুমিরদের খাওয়াচ্ছে নানাবিধ জিনিস, এতে পুরো জায়গাটা নোংরা হয়ে গেছে। এখানে ২০০৮ এ গিয়েছিলাম, কুমির ছাড়া কোন কিছুই মনে পড়ছিলো না। যাহোক, আজকের দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ডিসি পার্ক। প্রায় ১২ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এই পার্কে না গেলে হয়তো চট্টগ্রাম ভ্রমণের একটা অংশ অপূর্ণ থেকে যেত। চারটি লাগোয়া পুকুর, দুটি ডোবা, চারপাশের জঙ্গল এবং মাঝের জায়গাগুলোতে নানা ফুলের গাছ—সব মিলিয়ে জায়গাটি অনিন্দ্য সুন্দর। পার্কের দুই পাশে শিশুদের রাইড, বড়দের জন্য ফুড কর্নার, ওয়াশরুম, জিপলাইন, রাইডিং এবং অসংখ্য বসার ব্যবস্থা রয়েছে। বিকেলের তিন-চার ঘণ্টা আনন্দের সঙ্গে কাটানোর জন্য জায়গাটি অনন্য বলেই মনে হলো।

এর পাশেই ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ। পূজার ছুটিতে কলেজ বন্ধ থাকায় ক্যাডেটদের দেখা গেল না। তবে অন্যান্য ক্যাডেট কলেজের মতো এখানেও ছিমছাম ও পরিপাটি পরিবেশ চোখে পড়ল। কলেজের ক্যান্টিনের দায়িত্বে থাকা ফরিদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হলো। তিনি অত্যন্ত যত্ন-আতিথ্য করলেন এবং ছবি তুলে নিজের মোবাইলেও রেখে দিলেন।
আনাবিয়াও বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন পোজে ছবি তুলল। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিল। তার মধ্যে কিছুক্ষণ পরপর ট্রেনের শব্দ—পুরো ক্যাম্পাসের পরিবেশে এক অন্যরকম ভালো লাগা তৈরি করছিল।
সন্ধ্যায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে গেলাম বাতিঘর লাইব্রেরিতে। সবাই বলে, মানুষ এখন আর বই পড়ে না। কিন্তু বাতিঘরে গিয়ে যেন তার উল্টো চিত্র দেখলাম। প্রচুর মানুষের ভিড়, আর শিশুদের কর্নারে বাচ্চাদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। কেউ কেউ অবশ্য ছবি তোলার জন্যই এসেছে—তা বোঝা যাচ্ছিল। তবুও মানুষ নিজেকে বইপ্রেমী হিসেবে পরিচয় দিতে চায় এবং সে পরিচয়ে এখনো সমাদর পাওয়া যায়—বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবেই দেখতে ইচ্ছে হলো।
২৪ অক্টোবর শেষ দিন সকাল শুরু করলাম জিয়া জাদুঘর দিয়ে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে এখানে সংস্কারকাজ শুরু হলেও এখন পর্যন্ত চোখে পড়ার মতো কাজ হয়েছে—এমন কিছু পেলাম না ।
সেখান থেকে পুরোনো রেলস্টেশনে গেলাম। এরপর ১৮৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত গনি বেকারিতে। দোকানে তাদের পূর্বপুরুষদের ছবি ও প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস সংরক্ষিত আছে। কিছু বেকারি আইটেম কিনে আবার বেরিয়ে পড়লাম। এরপর গেলাম প্যারেড গ্রাউন্ডে। সিপাহি বিদ্রোহের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত এই জায়গাটি চট্টগ্রাম কলেজের পাশেই। তাই কলেজেও ঢুঁ মেরে আসা হলো। কলেজ ও প্যারেড গ্রাউন্ড পেরিয়ে চকবাজারের মসজিদ ওয়ালী খাঁ দেখলাম। পুরোনো মসজিদটি অক্ষুণ্ণ রেখে পাশেই নতুন আরেকটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে।
ছোট ভাই থাকায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু সময় হয়ে ওঠেনি। এবার মেয়েকে দেখানোর জন্য গেলাম। তবে চারপাশের প্রচণ্ড ভিড়, নোংরা ও অযত্নের চিত্র দেখে বেশ খারাপ লাগল।
প্রবর্তক মোড়ে আইয়ুব বাচ্চুর স্মরণে তৈরি গিটারটি দেখে কত পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ে গেল! সেখান থেকে গেলাম ওয়ার সিমেট্রিতে। জায়গাটির পরিবেশ খুব ভালো লাগল। হাজার হাজার রঙ্গন ফুল দিয়ে বেড়া দেওয়া এবং সারি সারি কবর—নীরব পরিবেশটি মন ছুঁয়ে গেল। এখানে যারা শায়িত আছেন, তারা সবাই ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সালের বিশ্বযুদ্ধে নিহত ব্যক্তিবর্গ। আশপাশে ইতিহাস সম্পর্কে তেমন কোনো লেখা বা তথ্য না থাকায় সেখানে কোনো লোকজনও না থাকায় গুগল থেকেই এর ইতিহাস জেনে নিলাম।
ফেরার পথে চোখে পড়ল এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব উইমেন। এরপর আগ্রাবাদ। এখানে এসে যেন ব্রিটিশ আমলের চট্টগ্রামের আরেকটি চেহারা চোখে পড়ল। প্রচুর দোকানপাট, মানুষের ভিড়—ব্যস্ত নগরজীবনের এক ভিন্ন রূপ। এরপর গেলাম জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘরে। বাংলাদেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে নিয়ে এত চমৎকার একটি জাদুঘর আছে—আগে জানা ছিল না। সেখানে দায়িত্বে থাকা উপপরিচালকের সঙ্গে কথা হলো। তিনি আমাদের লাইব্রেরিও দেখালেন। অনেক হারিয়ে যাওয়া বইয়ের সংগ্রহ সেখানে চোখে পড়ল। তবে বাজেটের সীমাবদ্ধতার কারণে সেগুলোকে খুব জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি।

এরপর জাম্বুরি পার্ক। গণপূর্ত বিভাগের তৈরি এই পার্কের জায়গাটি আগে ছিল খোলা মাঠ। এখন পুরো এলাকাজুড়ে পার্ক তৈরি করা হয়েছে এবং রয়েছে আটটি গেট। সবার জন্য সবসময় উন্মুক্ত নয়।
খুলশীতে ফয়েজ লেক ও সীতাকুণ্ড যাওয়ার রাস্তা হওয়ায় এই পথে আমাদের দুইবার যাওয়া হয়েছে। এদিকে অনেক নতুন স্থাপনা গড়ে উঠছে। তবে রাস্তাটির কিছু অংশ বেশ খারাপ—কাজ করা প্রয়োজন বলেই মনে হলো।
কক্সবাজার ফেরার সময়ও আমরা এই পথেই এলাম। পথে একটি দাওয়াতে অংশ নিয়ে রওনা হলাম। পতেঙ্গা হয়ে গাড়িতে মাত্র দুই মিনিটে কর্ণফুলী টানেল পার হলাম। এটি আমার দ্বিতীয়বার টানেল পার হওয়া। প্রথমবার রাঙামাটি যাওয়ার সময় এই পথ ব্যবহার করেছিলাম। ফেরার পথে নতুন একটি রাস্তা দিয়ে কক্সবাজার আসার চিন্তা করলাম। তাই আনোয়ারা উপজেলায় প্রবেশ করে উপজেলা পরিষদ ও আশপাশের এলাকা দেখতে দেখতে বরকল সেতু পার হয়ে লোহাগাড়া উপজেলা পরিষদে বিরতি নিলাম। সেখানে মাগরিবের নামাজ আদায় করে আবার রওনা হলাম। রাত পৌনে ১০টার দিকে বাসায় পৌঁছালাম।
আলহামদুলিল্লাহ—চার দিনের চট্টগ্রাম ভ্রমণ শেষ হলো। এই কয়েকটি দিনে শুধু পর্যটনকেন্দ্র নয়, চট্টগ্রামের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সামরিক স্থাপনা, ধর্মীয় স্থাপত্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিনোদনকেন্দ্র, নগরজীবন ও মানুষের জীবনযাত্রার নানা দিক দেখার সুযোগ হয়েছে। কোথাও মুগ্ধ হয়েছি, কোথাও আনন্দ পেয়েছি, আবার কোথাও উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্নও জেগেছে।
সব মিলিয়ে, পূজার ছুটির এই চার দিন ছিল দেখা, জানা, ভাবা আর পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার এক সুন্দর সময়। আলহামদুলিল্লাহ।
——————————–
লেখকঃ সিনিঃসহকারি সচিব
merinabiam2025@gmail.com

মোছাঃমেরিনা আফরোজ 










