যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলা চালালে লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দেব প্রণালী বন্ধ করার প্রস্তুতি নিতে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের নির্দেশ দিয়েছে তেহরান। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স তিনটি অবগত সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের শীর্ষ পর্যায়ে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং হুথিদের কাছেও সংশ্লিষ্ট বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা ও একটি আঞ্চলিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
তবে কীভাবে এই বার্তা পাঠানো হয়েছে কিংবা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দেওয়ার আগে নাকি পরে এটি পাঠানো হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো পক্ষই বিস্তারিত জানায়নি।
রয়টার্সের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও হুথি মুখপাত্র তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে মন্তব্য করেননি।
বাব আল-মান্দেবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মোতায়েন
হুথিদের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে জাহাজ চলাচল লক্ষ্য করে হামলার জন্য সংগঠনটি পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েছে।
সূত্রটির দাবি, ইয়েমেনের হোদেইদা অঞ্চল এবং এডেন উপসাগর-সংলগ্ন পার্বত্য এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মোতায়েন করা হয়েছে। এখন কেবল হামলার নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছে হুথি যোদ্ধারা।
এছাড়া ইয়েমেনে অবস্থানরত ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর প্রতিনিধিরাই কখন বাব আল-মান্দেব প্রণালী কার্যত বন্ধ করা হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন বলেও দাবি করেছে সূত্রটি।
বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে নতুন সংকটের শঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীতে চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর যদি বাব আল-মান্দেব প্রণালীও অচল হয়ে পড়ে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ একসঙ্গে সংকটে পড়বে।
এতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ আরও সীমিত হয়ে পড়তে পারে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সৌদি আরবের জন্যও বাড়ছে উদ্বেগ
হরমুজ প্রণালীতে চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর উপসাগরীয় অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল সৌদি আরবের পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে পরিবহন করা হচ্ছে। বর্তমানে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ৭ শতাংশ এই রুট দিয়ে যায়।
এর আগে গাজা যুদ্ধ চলাকালে হুথিদের হামলার কারণে বহু আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি লোহিত সাগর এড়িয়ে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল পথে পণ্য পরিবহন করতে বাধ্য হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এবার যদি ইয়ানবু বন্দর বা লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল সরাসরি হামলার মুখে পড়ে, তবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
আবারও বাড়ছে সৌদি-হুথি উত্তেজনা
সাম্প্রতিক ঘটনায় সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে উত্তেজনা নতুন করে বৃদ্ধি পেয়েছে।
হুথিদের দাবি, সোমবার তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি বিমানবন্দরে সৌদি আরব বিমান হামলা চালায়। এর জবাবে তারা সৌদি আরবের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এর ফলে চার বছর ধরে কার্যকর থাকা দুই পক্ষের যুদ্ধবিরতিও ভেঙে যায়।
ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ভেরিস্ক ম্যাপলক্রফট-এর মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক টরবিয়র্ন সলভেদত বলেন, এমন এক সময়ে এই উত্তেজনা বাড়ছে, যখন পুরো অঞ্চলই চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তার মতে, সংঘাত যদি আরও বিস্তৃত হয়ে লোহিত সাগরের জ্বালানি অবকাঠামো ও নৌপরিবহনে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানির অন্যতম বিকল্প পথও বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে।
রিয়াদের বাড়তি সতর্কতা
রিয়াদের ঘনিষ্ঠ দুটি আঞ্চলিক সূত্র জানিয়েছে, ইরান ও হুথিদের এই সম্ভাব্য পদক্ষেপকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে সৌদি আরব।
তাদের মতে, লোহিত সাগরসংক্রান্ত কৌশলগত সিদ্ধান্তে হুথিরা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ইরানের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ে কাজ করছে।
সংঘাতের প্রেক্ষাপট
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, চলমান উত্তেজনার সূচনা হয় এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়। এর জবাবে তেহরান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালীতে চলাচল বন্ধের পদক্ষেপ নেয়।
পরে জুন মাসে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে হওয়া নাজুক যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়লে পূর্ণাঙ্গ সংঘাতের আশঙ্কা আবারও বাড়তে থাকে।
বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা, হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব—এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ একযোগে অচল হয়ে পড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং নৌপরিবহন ব্যবস্থায় নজিরবিহীন সংকট সৃষ্টি হতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স

অনলাইন ডেস্ক 



















