ঢাকা শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চলনবিল জেলা ও সরদার মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ 

blank

সরদার মোহাম্মদ আবদুল হামিদ চলনবিলের স্বপ্নপুরুষ ছিলেন।  চলনবিলের নাটোর জেলার গুরুদাসপুর উপজেলার তৎকালীন সময়ে অনেক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার পটভূমিতে শিক্ষাবিদ সরদার আব্দুল হামিদের ধ্যান-ধারণার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। কখনো তিনি সরাসরি কাজ করেছেন আবার কখনো পরামর্শ দিয়েছেন। মোহাম্মদ আবদুল হামিদ চলনবিলের সব শ্রেণির মানুষের প্রিয় পাত্র ছিলেন।

 

মোহাম্মদ আবদুল হামিদ ১৯৫৩ সাল থেকে রংপুর কারমাইকেল কলেজ, পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ, সাতক্ষীরা কলেজ, গাইবান্ধা কলেজ ও যশোর এম.এম. কলেজে রসায়ন বিষয়ে শিক্ষকতা করেন। তিনি জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি মহীপুর হাজী মহসীন কলেজ ও বগুড়া এম আর মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি বগুড়া আজিজুল হক কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন ছিলেন।

 

১৯৩০ সালের ১ মার্চ নাটোর জেলার গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজীপুর গ্রামে মোহাম্মদ আবদুল হামিদ এক কৃষক পরিবারে সরদার জন্মগ্রহণ করেন। তিনি চলনবিল অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষার উদ্দেশ্যে একটি জাদুঘর স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বেসরকারি উদ্যোগে নাটোর জেলার গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজীপুর গ্রামে অস্থায়ীভাবে যাত্রা শুরু হয় চলনবিল জাদুঘরের। কিছুদিন পরে ১৯৮৯ সালের ২ জুলাই জাদুঘরটি প্রত্নতত্ত অধিদপ্তরের আওতায় আসে।

 

১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহা ছাত্রদের জীবন বাঁচাতে গিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে শহীদ হন। ড. শামসুজ্জোহার হত্যার প্রতিবাদে মোহাম্মদ আবদুল হামিদ টি.কে. খেতাব বর্জন করেন।   উল্লেখ্য, গবেষণা ও সমাজসেবামূলক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে তদানীন্তন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান এম. এ. হামিদকে ‘তমঘায়ে খেদমত (টি.কে.)’ খেতাব ও স্বর্ণপদক দিয়েছিলেন। শহীদ শামসুজ্জোহার স্মৃতির স্মরণে তৎকালীন নাটোরের গুরুদাসপুর থানা সদরে অবস্থিত কলেজটির নাম বিলচলন শহীদ শামসুজ্জোহা কলেজ করা হয়। এই কলেজের প্রতিষ্ঠা ও নামকরণে মোহাম্মদ আবদুল হামিদ জোড়ালো ভূমিকা পালন করেন।

 

এছাড়াও মোহাম্মদ আবদুল হামিদ চলনবিল অঞ্চলে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পাঠাগার, ক্লাব স্থাপন করে চলনবিল অঞ্চলের মানুষের মাঝে শিক্ষা বিস্তারে অবদান রাখেন। তিনি সাংবাদিকতাতেও বিশেষ অবদান রেখেছেন। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৭৮ সালে চলনবিলের উদীয়মান রিপোর্টারদের নিয়ে গুরুদাসপুরে “ চলনবিল প্রেসক্লাব” প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

blank

মোহাম্মদ আবদুল হামিদ ২৬ টি গ্রন্থ রচনা করেন। ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত চলনবিলের পুর্নাঙ্গ ইতিহাস- ঐতিহ্য নিয়ে ‘চলনবিলের ইতিকথা’ তার সেরা গবেষণামূলক গ্রন্থ। চলনবিলের ইতিকথা বইটির জন্য চলনবিলবাসী তাঁর কাছে বিশেষ ভাবে ঋণী।

 

অধ্যক্ষ সরদার মোহাম্মদ আবদুল হামিদ চলনবিল জেলা গঠনের প্রস্তাবনা করেছিলেন। তাঁর প্রস্তাবিত চলনবিল জেলায় আটটি উপজেলা স্থান পায় নাটোরের গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম, সিংড়া, পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, উল্লাপাড়া, রায়গঞ্জ ( সলঙ্গা)। এছাড়াও বগুড়ার নন্দীগ্রামের একটা অংশের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন।

সেই প্রস্তাবনার বাস্তবায়ন আজও হয়নি। চলনবিল জেলা গঠন চলনবিলের মানুষের প্রাণের দাবি। আজ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চলনবিলের সাধারণ মানুষ প্রভাবিত হচ্ছে। চলবিলের বাস্তুসংস্থান ধ্বংস হচ্ছে , মৎস্য সম্পদ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, মানুষের জীবন-জীবিকার পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে।  নদী দূষণ ঘটছে, নদীর গতি পরিবর্তন হচ্ছে, জমিতে অপরিকল্পিত সার-কীটনাশক ব্যবহার করার ফলে সুদূরপ্রসারিত প্রভাব পড়ছে। অপরিকল্পিত পুকুর খননে পরিবর্তিত হচ্ছে জল ও জীবনের গল্প। বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার কেউ কি আছেন? চলনবিলের আরো হাজার সমস্যা নিয়ে কথা বলার জন্য আজ অধ্যক্ষ হামিদের মতো মানুষের বড় প্রয়োজন ছিল। ২৪ আগস্ট সরদার মোহাম্মদ আবদুল  হামিদের ২০তম মৃত্যুবার্ষিকী। আমরা গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি চলনবিলের স্বপ্নপুরুষ মোহাম্মদ আবদুল হামিদকে। তাঁর প্রতি অতল শ্রদ্ধা।

—————————-

লেখকঃ ব্যাংকার ও গল্পকার
জনপ্রিয় খবর
blank

চলনবিল জেলা ও সরদার মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ 

চলনবিল জেলা ও সরদার মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ 

প্রকাশের সময় : ৭ মিনিট আগে
blank

সরদার মোহাম্মদ আবদুল হামিদ চলনবিলের স্বপ্নপুরুষ ছিলেন।  চলনবিলের নাটোর জেলার গুরুদাসপুর উপজেলার তৎকালীন সময়ে অনেক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার পটভূমিতে শিক্ষাবিদ সরদার আব্দুল হামিদের ধ্যান-ধারণার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। কখনো তিনি সরাসরি কাজ করেছেন আবার কখনো পরামর্শ দিয়েছেন। মোহাম্মদ আবদুল হামিদ চলনবিলের সব শ্রেণির মানুষের প্রিয় পাত্র ছিলেন।

 

মোহাম্মদ আবদুল হামিদ ১৯৫৩ সাল থেকে রংপুর কারমাইকেল কলেজ, পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ, সাতক্ষীরা কলেজ, গাইবান্ধা কলেজ ও যশোর এম.এম. কলেজে রসায়ন বিষয়ে শিক্ষকতা করেন। তিনি জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি মহীপুর হাজী মহসীন কলেজ ও বগুড়া এম আর মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি বগুড়া আজিজুল হক কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন ছিলেন।

 

১৯৩০ সালের ১ মার্চ নাটোর জেলার গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজীপুর গ্রামে মোহাম্মদ আবদুল হামিদ এক কৃষক পরিবারে সরদার জন্মগ্রহণ করেন। তিনি চলনবিল অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষার উদ্দেশ্যে একটি জাদুঘর স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বেসরকারি উদ্যোগে নাটোর জেলার গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজীপুর গ্রামে অস্থায়ীভাবে যাত্রা শুরু হয় চলনবিল জাদুঘরের। কিছুদিন পরে ১৯৮৯ সালের ২ জুলাই জাদুঘরটি প্রত্নতত্ত অধিদপ্তরের আওতায় আসে।

 

১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহা ছাত্রদের জীবন বাঁচাতে গিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে শহীদ হন। ড. শামসুজ্জোহার হত্যার প্রতিবাদে মোহাম্মদ আবদুল হামিদ টি.কে. খেতাব বর্জন করেন।   উল্লেখ্য, গবেষণা ও সমাজসেবামূলক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে তদানীন্তন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান এম. এ. হামিদকে ‘তমঘায়ে খেদমত (টি.কে.)’ খেতাব ও স্বর্ণপদক দিয়েছিলেন। শহীদ শামসুজ্জোহার স্মৃতির স্মরণে তৎকালীন নাটোরের গুরুদাসপুর থানা সদরে অবস্থিত কলেজটির নাম বিলচলন শহীদ শামসুজ্জোহা কলেজ করা হয়। এই কলেজের প্রতিষ্ঠা ও নামকরণে মোহাম্মদ আবদুল হামিদ জোড়ালো ভূমিকা পালন করেন।

 

এছাড়াও মোহাম্মদ আবদুল হামিদ চলনবিল অঞ্চলে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পাঠাগার, ক্লাব স্থাপন করে চলনবিল অঞ্চলের মানুষের মাঝে শিক্ষা বিস্তারে অবদান রাখেন। তিনি সাংবাদিকতাতেও বিশেষ অবদান রেখেছেন। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৭৮ সালে চলনবিলের উদীয়মান রিপোর্টারদের নিয়ে গুরুদাসপুরে “ চলনবিল প্রেসক্লাব” প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

blank

মোহাম্মদ আবদুল হামিদ ২৬ টি গ্রন্থ রচনা করেন। ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত চলনবিলের পুর্নাঙ্গ ইতিহাস- ঐতিহ্য নিয়ে ‘চলনবিলের ইতিকথা’ তার সেরা গবেষণামূলক গ্রন্থ। চলনবিলের ইতিকথা বইটির জন্য চলনবিলবাসী তাঁর কাছে বিশেষ ভাবে ঋণী।

 

অধ্যক্ষ সরদার মোহাম্মদ আবদুল হামিদ চলনবিল জেলা গঠনের প্রস্তাবনা করেছিলেন। তাঁর প্রস্তাবিত চলনবিল জেলায় আটটি উপজেলা স্থান পায় নাটোরের গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম, সিংড়া, পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, উল্লাপাড়া, রায়গঞ্জ ( সলঙ্গা)। এছাড়াও বগুড়ার নন্দীগ্রামের একটা অংশের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন।

সেই প্রস্তাবনার বাস্তবায়ন আজও হয়নি। চলনবিল জেলা গঠন চলনবিলের মানুষের প্রাণের দাবি। আজ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চলনবিলের সাধারণ মানুষ প্রভাবিত হচ্ছে। চলবিলের বাস্তুসংস্থান ধ্বংস হচ্ছে , মৎস্য সম্পদ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, মানুষের জীবন-জীবিকার পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে।  নদী দূষণ ঘটছে, নদীর গতি পরিবর্তন হচ্ছে, জমিতে অপরিকল্পিত সার-কীটনাশক ব্যবহার করার ফলে সুদূরপ্রসারিত প্রভাব পড়ছে। অপরিকল্পিত পুকুর খননে পরিবর্তিত হচ্ছে জল ও জীবনের গল্প। বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার কেউ কি আছেন? চলনবিলের আরো হাজার সমস্যা নিয়ে কথা বলার জন্য আজ অধ্যক্ষ হামিদের মতো মানুষের বড় প্রয়োজন ছিল। ২৪ আগস্ট সরদার মোহাম্মদ আবদুল  হামিদের ২০তম মৃত্যুবার্ষিকী। আমরা গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি চলনবিলের স্বপ্নপুরুষ মোহাম্মদ আবদুল হামিদকে। তাঁর প্রতি অতল শ্রদ্ধা।

—————————-

লেখকঃ ব্যাংকার ও গল্পকার
fattahtanvir@gmail.com