একটি নির্দিষ্ট জনপদ যখন স্থবিরতা ও শিক্ষার আলোহীন অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকে, তখন সেখানে এমন কিছু আলোকবর্তিকাবাহী মানুষের জন্ম হয় যারা নিজেদের মেধা ও কর্মের মাধ্যমে সেই ভূখন্ডকে ইতিহাসের মূলধারায় যুক্ত করেন। বাংলাদেশের উত্তর জনপদের চলনবিল অঞ্চলের প্রেক্ষাপটে তেমনই এক কালজয়ী ব্যক্তিত্ব হলেন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও সমাজ-সংস্কারক অধ্যক্ষ সরদার মোহাম্মদ আবদুল হামিদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের মেধাবী ছাত্র হয়েও নাগরিক কোলাহল বা ক্ষমতার মোহ তাঁকে আকর্ষণ করেনি; বরং উচ্চশিক্ষার আলো বুকে নিয়ে তিনি ফিরে এসেছিলেন স্বীয় মাটির টানে। যদিও এই পরম শ্রদ্ধেয় কর্মবীরের সরাসরি সান্নিধ্য পাওয়ার সৌভাগ্য আমার ঘটেনি, তবে বিগত চৌদ্দ বছর ধরে প্রতিষ্ঠাকালীন এই অধ্যক্ষের কলেজ প্রাঙ্গণে শিক্ষকতা করে আপনি এবং তাঁর সৃষ্টি পাঠ করতে করতে উনার কালজয়ী ব্যক্তিমানসকে আমি প্রতিনিয়ত হৃদয়ে ধারণ করেছি।

অধ্যক্ষ সরদার আবদুল হামিদের কর্মজীবন ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময়। তিনি পাবনার ঐতিহ্যবাহী এডওয়ার্ড কলেজ এবং সরকারি আজিজুল হক কলেজের মতো স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে অধ্যাপনা করেছেন। তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হলো নিজ এলাকার পিছিয়ে পড়া মানুষের শিক্ষা বিস্তারের আন্দোলন। তিনি খুবজীপুর মোজাম্মেল হক ডিগ্রী কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে একটি কলেজকে শূন্য থেকে গড়ে তোলেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র, কৃষক ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের সন্তানদের উচ্চশিক্ষার আঙিনায় নিয়ে আসার পেছনে তাঁর যে অসামান্য অবদান, তা আজ চলনবিল অঞ্চলের ঘরে ঘরে শিক্ষিত প্রজন্মের মাঝে দৃশ্যমান।
সরদার আবদুল হামিদ অনুধাবন করেছিলেন যে, কেবল তাত্ত্বিক সংস্কার দিয়ে সমাজ বদলানো সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন টেকসই অবকাঠামোগত প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি। শিক্ষা প্রসারের পাশাপাশি তিনি খুবজীপুর পোস্ট অফিস প্রতিষ্ঠা করেন যা তৎকালীন সময়ে ওই অঞ্চলের যোগাযোগের ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল। এছাড়া কলেজের মাঠে একটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদ এবং একাংশে স্টেডিয়ামের গ্যালারি নির্মাণ তাঁর দূরদর্শিতা ও অকল্পনীয় সাংগঠনিক দক্ষতারই এক জীবন্ত প্রমাণ। ব্যক্তিজীবনে তিনি অত্যন্ত ধর্মভীরু ছিলেন, যার প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে। তিনি এলাকার সাধারণ ছাত্রদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখতেন এবং তাদের উদ্বুদ্ধ করতে নিজের হাতে নিয়মিত চিঠি লিখতেন, যা তাঁর ছাত্রবৎসল ও মানবিক হৃদয়ের পরিচয় বহন করে।
জাতীয় পর্যায় ও বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনেও এই মনীষীর অবদান চিরস্মরণীয়। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার শিক্ষা ক্ষেত্রে ও সমাজসেবায় তাঁর অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে ‘টিকে’ (TK) উপাধিতে ভূষিত করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে বাঙালির প্রতি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর তীব্র বৈষম্য, শোষণ ও নির্যাতনের প্রতিবাদে তিনি স্বাধিকার আন্দোলনের স্বপক্ষে সেই রাষ্ট্রীয় উপাধি ঘৃণাভরে বর্জন করেন যা তাঁর দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি বাংলা সনের তারিখ বৈজ্ঞানিক উপায়ে পুনর্নির্ধারণ ও সংস্কারের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন, যা জাতীয় পর্যায়ে তাঁর প্রজ্ঞা ও মননশীলতার স্বাক্ষর বহন করে।

সরদার আবদুল হামিদের সাহিত্যিক ও চিন্তাশীল মানস গড়ে উঠেছিল বিজ্ঞান এবং সমাজ-নৃতাত্ত্বিক গবেষণার এক অপূর্ব মেলবন্ধনে। রসায়নের ছাত্র হিসেবে যেমন তিনি বিজ্ঞানকে সহজ করে তুলে ধরেছেন, তেমনি চলনবিলের মাটি ও মানুষকে নিয়ে করেছেন আকর গবেষণা। তাঁর রচিত কালজয়ী গবেষণামূলক গ্রন্থ ‘চলনবিলের ইতিকথা’ (১৯৬৭) হলো চলনবিল অঞ্চলের নামকরণ, ভৌগোলিক বিবর্তন, সামাজিক নৃবিজ্ঞান এবং অর্থনৈতিক ইতিহাসের এক অকাট্য প্রামাণ্য দলিল। শিক্ষার্থীদের মাঝে বিজ্ঞানমনস্কতা ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে রসায়নের জটিল বিষয়কে সহজ ও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপিত করা একটি চমৎকার বিজ্ঞানভিত্তিক বই ‘রসায়নের তেলেসমাতি’। পাশাপাশি তিনি চলনবিলের লোকসাহিত্য এবং আমাদের গ্রামগঞ্জের লোকঐতিহ্য, গ্রামীণ সমাজ তথা আঞ্চলিক সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছেন। ইতিহাস সচেতনতা ও সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে রচিত গ্রন্থ ‘বঙ্গভঙ্গসমাজ’ এবং ‘জ্ঞানের মশাল’ যা তাঁর জ্ঞানের এক বিশাল ভাণ্ডার বা উৎসকে স্মরণ করিয়ে দেয়। অত্যন্ত বিচক্ষণ এই মনীষীর নানাদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতাও ছিল। যার ফলশ্রুতিতে, তার মাঝে সুদূরপ্রসারী বিশ্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় মেলে। ‘দেখে এলাম অস্ট্রেলিয়া’, ‘পশ্চিম পাকিস্তানের ডায়রি’ ও ‘পাশ্চাত্যের বৈশিষ্ট্য’ তাঁর অনন্য সৃষ্টিকর্ম। সুমহান ব্যক্তিত্ব এম এ হামিদের সাহিত্যকর্ম পাঠ করলে আমরা উপলব্ধি করতে পারি, কতটা শেকড়ের প্রোথিত কাহিনী তাঁর মাঝে বিদ্যমান ছিল!
প্রতি বছর কলেজের মিলনায়তনে প্রথাগত আনুষ্ঠানিকতায় তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হলেও সরদার আবদুল হামিদ কেবল অতীতে বেঁচে থাকা কোন নাম নয়। তিনি চলনবিলের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অবিনাশী আলোকবর্তিকা। ২৪ আগস্ট প্রয়াত এই মহান মনস্বীর স্মারকগ্রন্থে লেখার এই আহ্বান মূলত তাঁর রেখে যাওয়া মহান আদর্শ, দেশপ্রেম ও কর্মমুখী চেতনাকে প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার এক দৃঢ় অঙ্গীকার। এই বিশেষ ক্ষণে, চলনবিলের প্রবাদপ্রতিম এই মহান কর্মবীরের গৌরবময় কর্মযজ্ঞ ও স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র কৃতজ্ঞতা।
——————————–
লেখক: প্রভাষক, বাংলা বিভাগ
খুবজীপুর মোজাম্মেল হক ডিগ্রি কলেজ

মো: রাশিদুল ইসলাম রাসু 

















