১৯৮০ সালের মার্চ মাস। আমি তখন গুরুদাসপুর বিলচলন শহীদ ড. শামসুজ্জোহা কলেজের উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। আমাদের বাড়ি শিকারপুর গ্রামে। সেখান থেকে গুরুদাসপুর থানা সদরে অবস্থিত কলেজের দূরত্ব প্রায় ৬-৭ কিলোমিটার। মাঝখানে গুমানী নদী। নদীর দক্ষিণ পাড় ঘেঁষে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে নদীভাঙা, মেঠো ও দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে প্রতিদিন পায়ে হেঁটে কিংবা সাইকেলে বন্ধুদের সঙ্গে কলেজে যাতায়াত করতাম। তখনকার দিনে এখনকার মতো পাকা বা প্রশস্ত রাস্তা ছিল না। পায়ে হাঁটা কিংবা সাইকেলই ছিল একমাত্র ভরসা। আজও বামনকোলা, সালাম এমসিএর বাড়ি, কালীনগর, চুনাপাড়া, সাহাপুর হয়ে শিকারপুর হিন্দুপাড়া পর্যন্ত গুমানী নদীর পাড় ঘেঁষে সেই পুরোনো পায়ের রাস্তার অনেকটাই রয়েছে।
সেই আকস্মিক যাত্রা
একদিন সকাল ৮টার দিকে নাশতা করে কলেজে যাওয়ার জন্য সাইকেল নিয়ে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। এমন সময় চাঁচকৈড় থেকে দুই তরুণ সাংবাদিক—কিরণ ও আবুল—আমাদের বাড়িতে এসে হাজির। দুজনই আমার জুনিয়র এবং বয়সেও ছোট। তখন তারা চাঁচকৈড় নাজিম উদ্দিন হাইস্কুলের ছাত্র। আমি জানতে চাইলাম, —“তোমরা কোথায় যাচ্ছ?” কিরণ জানাল, তাড়াশ থানার সিও (রাজস্ব) অফিসে জমিজমা সংক্রান্ত একটি কাজ আছে। তাই তারা তাড়াশ যাচ্ছে। আমাকে সঙ্গে যাওয়ার প্রস্তাব দিল। আমি তখন কলেজে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতই ছিলাম। তাদের প্রস্তাব পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে কাউকে কিছু না জানিয়েই সাইকেল নিয়ে তাদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম। শিকারপুর থেকে বাহাদুরপাড়া হয়ে গুমানী নদীর ভাঙা পাড়ের পায়ে হাঁটার রাস্তা ধরে ধামাইচ বাজার ত্রিমোহনী ঘাটে পৌঁছে খেয়া পার হলাম। এরপর কুশাবাড়ি ও চরকুশাবাড়ির মধ্য দিয়ে চলনবিলের বিশাল খোলা মাঠে প্রবেশ করলাম। চলনবিলের সেই সময়কার রাস্তার অবস্থা ছিল ভয়াবহ। সাইকেল চালিয়ে যাওয়ার কোনো উপায়ই ছিল না। গরু-মহিষের পায়ের কাদার দাগ এবং গরুর গাড়ির চাকার দাগ শুকিয়ে শক্ত হয়ে ধারালো হয়ে থাকত। সেই পথে হাঁটাও ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। তার ওপর চৈত্রের কাঠফাটা রোদ। আমরা ঘেমে একাকার। কখনো সাইকেল ঠেলে, কখনো হেঁটে, আবার কখনো সাইকেলে চড়ে প্রায় ১০-১২ কিলোমিটার দুর্গম মেঠোপথ পাড়ি দিয়ে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাড়াশে পৌঁছালাম। প্রথমে সিও (রাজস্ব) অফিসে কিরণের জমির কাজ শেষ করলাম। এরপর চলনবিল প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সাংবাদিক আব্দুর রাজ্জাক—আমাদের সবার প্রিয় রাজু চাচা—এবং সাইদুর রহমান সাজু চাচা ও রুহুল আমিন মাস্টারের খোঁজ করলাম। তখন তাড়াশ বাজারে হাতে গোনা কয়েকটি দোকান। খোঁজ করতে করতে সাংবাদিকরা যে স্টলে বসতেন, সেখানে গিয়ে তিনজনকেই একসঙ্গে পেলাম। কিরণ ও আবুল তখনো হাইস্কুলের ছাত্র হলেও সাংবাদিকতা এবং চলনবিল প্রেসক্লাবের সঙ্গে আগে থেকেই যুক্ত ছিল।

সাংবাদিক হওয়ার স্বপ্নের শুরু
১৯৭৮ সালে এসএসসি পাস করে গুরুদাসপুর বিলচলন ড. শহীদ শামসুজ্জোহা ডিগ্রি কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই আমার সাংবাদিকতার প্রতি আগ্রহ তৈরি হতে থাকে। কলেজ ছুটির পর বাড়ি ফেরার পথে সুযোগ পেলেই চাঁচকৈড় শিক্ষা সংঘে যেতাম। সেখানে চলনবিল প্রেসক্লাবে বসে পত্রিকা পড়তাম। সেই সুবাদে কিরণ, আবুলসহ স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। তারা আমাকে পত্রিকায় লেখার জন্য উৎসাহ দিতেন। ধীরে ধীরে আমারও সাংবাদিক হওয়ার স্বপ্ন তৈরি হয়। এর পেছনে পারিবারিক প্রেরণাও ছিল। আমার আব্বা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ আব্দুল জব্বার মাস্টার ১৯৬৫ সাল থেকে দৈনিক ইত্তেফাকে লিখতেন। আমার মেঝ চাচা অধ্যাপক শামসুর রহমান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই সাংবাদিকতা করতেন। তিনিও ছিলেন চলনবিল প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। এই সূত্রে তাড়াশের রাজু চাচা, সাজু চাচা ও রুহুল আমিন মাস্টার চাঁচকৈড় প্রেসক্লাবে আসা-যাওয়ার পথে প্রায়ই আমাদের বাড়িতে উঠতেন। আমার পড়ার ঘরেই বসতেন। পড়াশোনার ফাঁকে তাঁদের কাছ থেকে পত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুনতাম। শামসু চাচা ইংরেজি পত্রিকায় লিখতেন। তাঁর কোনো লেখা প্রকাশিত হলে আব্বাকে তা দেখাতেন। এসবই আমার মনে সাংবাদিক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা আরও গভীর করে তোলে।

তাড়াশ থেকে বগুড়ার পথে
সেদিন তাড়াশে রাজু চাচা ও সাজু চাচা আমাদের তিনজনকে সেখানে উপস্থিত আরও কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমাদের নাশতা করালেন। দুপুরে হোটেলে খাওয়ার সময় কিরণ ও আবুল নতুন পরিকল্পনা করল—সাইকেল নিয়ে বগুড়া যাবে। বগুড়া আজিজুল হক কলেজে তখন ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে কর্মরত ছিলেন অধ্যাপক আব্দুল হামিদ টি কে। অধ্যাপক আব্দুল হামিদ টি কে ছিলেন চলনবিল প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা পৃষ্ঠপোষক এবং গুরুদাসপুর শিক্ষা সংঘের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। কিরণ ও আবুলকে তিনি শিশু সাংবাদিক হিসেবে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। তাঁর হাত ধরেই তাদের সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি।
আমার আব্বা ১৯৭০ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত গুরুদাসপুর থানা শিক্ষা সংঘের সেক্রেটারি ও আজীবন সদস্য ছিলেন। কলেজে পড়ার সময় আমিও প্রায়ই বই নেওয়ার জন্য শিক্ষা সংঘে যেতাম। সেই সুবাদে হামিদ স্যার সম্পর্কে আগে থেকেই কিছুটা জানতাম। কিরণ ও আবুলের প্রস্তাবে আমিও রাজি হয়ে গেলাম। তিনজন সাইকেল নিয়ে তাড়াশ থেকে বগুড়ার উদ্দেশে রওনা হলাম। আমাদের এই সিদ্ধান্ত শুনে তাড়াশের সাংবাদিকরা রীতিমতো হতবাক! সামনে দীর্ঘ পথ, মাথার ওপর চৈত্রের প্রখর রোদ, আর আমরা তিনজন সাইকেল নিয়ে বগুড়ার পথে! ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও ক্লান্তিতে একসময় শরীর ভেঙে পড়ছিল। তবু পথ যেন শেষ হচ্ছিল না। অবশেষে রাত ৮টার দিকে শেরপুরের মির্জাপুর হাটের মহাসড়কে উঠলাম। তখন বুঝলাম, এই ক্লান্ত শরীরে রাতে আর সাইকেল চালিয়ে বগুড়া যাওয়া সম্ভব নয়। কী করা যায় ভাবতে ভাবতেই মনে পড়ল—আমার এক ভাই খলিল শেরপুর সেনানিবাসে আর্মি মেডিকেল কোরে কর্মরত। সেখানেই রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। রাত ১০টার দিকে সেনানিবাসে খলিলের কাছে পৌঁছালাম। সাইকেল রেখে খাওয়া-দাওয়া শেষে সারাদিনের হঠাৎ ভ্রমণের গল্প করতে করতে রাত ১২টার দিকে ঘুমিয়ে পড়লাম।
বগুড়ায় অধ্যাপক আব্দুল হামিদ টি কে-এর স্নেহসান্নিধ্যে
ভোরে উঠে তিনজন বাসে করে বগুড়ার সাতমাথায় গেলাম। সেখান থেকে রিকশায় আজিজুল হক কলেজে পৌঁছালাম। কলেজের গেটসংলগ্ন পোস্ট অফিসে ঢুকে পোস্টমাস্টারের কাছে জানতে চাইলাম, অধ্যাপক আব্দুল হামিদ টি কে আছেন কি না। আমাদের ধারণা ছিল, পোস্ট অফিসের সঙ্গে হামিদ স্যারের যোগাযোগ খুব ঘনিষ্ঠ। তিনি নিয়মিত চিঠিপত্র পাঠাতেন এবং তাঁর নামে অসংখ্য চিঠি আসত। হামিদ স্যারের নাম শুনেই পোস্টমাস্টার শ্রদ্ধাভরে তাঁর প্রশংসা করলেন। পরে ফোনে আমাদের আগমনের কথা তাঁকে জানানো হলো। আমাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি একজন পিয়ন পাঠালেন। পিয়ন আমাদের ওয়েটিং রুমে বসালেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই চা-বিস্কুট এলো। এরপর ধবধবে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরা, হাস্যোজ্জ্বল মুখের সেই শ্রদ্ধাভাজন মানুষটি আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তিনি আমাদের জড়িয়ে ধরে স্নেহের পরশে ভরিয়ে দিলেন। আমরা আপ্লুত হয়ে পড়লাম। চেম্বারে নিয়ে বসে আমাদের বগুড়ায় আসার পুরো কাহিনি শুনে তিনি বিস্মিত হলেন। এরই মধ্যে বগুড়ার বিখ্যাত সিঙ্গারা, কেক ও চা এসে গেল। তখনো আমি আনুষ্ঠানিকভাবে সাংবাদিকতা শুরু করিনি। সদ্য এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছি। কিরণ ও আবুল আগে থেকেই সাংবাদিকতা করত। তাই হামিদ স্যার তাদের দুজনকে আগে থেকেই চিনতেন। আমি যখন নিজের পরিচয় দিলাম এবং বললাম আমি আব্দুল জব্বার মাস্টারের ছেলে, তখন তিনি খুব খুশি হলেন। আমাকে সাংবাদিকতা করার জন্য উৎসাহিত করলেন। আমি আগ্রহ প্রকাশ করলে তিনি আরও উৎসাহ দিয়ে বললেন, “সাতমাথায় দৈনিক উত্তরবার্তা পত্রিকা বের হয়। এর প্রকাশক ও সম্পাদক মাহবুবুর রহমান টোকন আমার ছাত্র। আমি ফোন করে বলে দিচ্ছি। আমার কথা বলবে।” বলেই তিনি দৈনিক উত্তরবার্তার সম্পাদক মাহবুবুর রহমান টোকন ভাইকে ফোন করলেন এবং আমাদের কথা জানালেন। এ ছাড়া তিনি আমাদের দৈনিক করতোয়া ও দৈনিক উত্তরাঞ্চল পত্রিকা অফিসেও যেতে বললেন। পত্রিকা অফিসের কাজ শেষ করে আবার কলেজে ফিরে তাঁর বাসায় দুপুরের খাবার খাওয়ার নির্দেশ দিলেন।

উত্তরবার্তা পত্রিকা অফিসে প্রথম পাঠ
আমরা প্রথমে বগুড়ার ঐতিহাসিক সাতমাথায় গিয়ে দৈনিক উত্তরবার্তা পত্রিকা অফিস খুঁজে বের করলাম। জরাজীর্ণ একটি পুরোনো ভবনের গেট দিয়ে ঢুকে দোতলায় উঠলাম। সেখানে ছিল বগুড়া প্রেসক্লাব। পত্রিকা অফিসটি ছিল একটি পুরোনো টিনশেড ঘরের টিনের বারান্দা বেড়া দিয়ে ঘেরা। সেখানে দু-তিনজন বসে ছিলেন। আমরা নিজেদের পরিচয় দিয়ে সম্পাদক মাহবুব ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে চাইলাম। আমাদের তাঁর কাছে নিয়ে যাওয়া হলো। পরিচয় দিতেই তিনি বললেন, “স্যার আপনাদের কথা ফোনে জানিয়েছেন।” এরপর চা-সিঙ্গারা দিয়ে আমাদের আপ্যায়ন করলেন। সেখানে আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো কলামিস্ট ও বুদ্ধিজীবী আব্দুল মতিন খালু, বার্তা সম্পাদক প্রদীপ ভট্টাচার্য শংকর দা, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার আশিষ উর রহমান শুভ, বিজ্ঞাপন ম্যানেজার হামিদ ভাই, সার্কুলেশন ম্যানেজার আবু বকর সিদ্দিকসহ আরও অনেকের সঙ্গে। আমরা চলনবিলের কৃতিসন্তান অধ্যাপক আব্দুল হামিদ স্যারের এলাকার মানুষ—এ কথা জানার পর সবাই আমাদের অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করলেন। তখন বুঝলাম, বগুড়ার মানুষের কাছেও অধ্যাপক আব্দুল হামিদ অত্যন্ত শ্রদ্ধার পাত্র। শুধু চলনবিলের একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ নন; তিনি ছিলেন ইতিহাসবিদ, সাহিত্যিক ও একজন আলোকিত মানুষ। সম্পাদক মাহবুব ভাই, শংকর দা ও শুভ—তাঁরা সবাই হামিদ স্যারের সরাসরি ছাত্র। তাঁদের মুখে হামিদ স্যারের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা দেখে আমরা গর্বিত হয়ে উঠলাম। কিরণ ও আবুল আমাকে ওই পত্রিকায় লেখার জন্য উৎসাহিত করল। আমিও রাজি হয়ে গেলাম।
সম্পাদক মাহবুব ভাই আমাকে সংবাদ লেখার প্রাথমিক কিছু দিকনির্দেশনা দিলেন। সংবাদ লেখার ‘ক’ও তখন বুঝি না। তবু অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথাগুলো শুনলাম। বার্তা সম্পাদক শংকর দা আমার নাম ও ঠিকানা লিখে রাখলেন। অন্যদিকে গুরুগম্ভীর ও বুদ্ধিদীপ্ত কলামিস্ট আব্দুল মতিন খালু আমাকে সংবাদ ও ফিচার লেখার বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে ধারণা দিলেন। চলনবিলের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সমস্যা, সম্ভাবনা, প্রয়োজনীয় সুপারিশ এবং চলনবিলের গুণীজনদের সাক্ষাৎকার ও জীবন-ইতিহাস নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে লেখার পরামর্শ দিলেন। সেদিনই যেন সাংবাদিকতার প্রথম পাঠ পেলাম।
আরও কয়েকটি পত্রিকা অফিসে
দৈনিক উত্তরবার্তার কয়েকটি কপি নিয়ে আমরা গেলাম দৈনিক উত্তরাঞ্চল পত্রিকা অফিসে। সেখানে প্রবীণ সাংবাদিক ও সম্পাদক দুর্গাদাস মুখার্জির সঙ্গে দেখা হলো। আমাদের পরিচয় শুনেই তিনি জানালেন, হামিদ সাহেব আমাদের কথা জানিয়েছেন। তিনিও চা-সিঙ্গারা দিয়ে আপ্যায়ন করলেন। কিরণ চলনবিলের সংবাদদাতা হিসেবে লেখার আগ্রহ প্রকাশ করলে তিনি অত্যন্ত খুশি হলেন। চলনবিলের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সমস্যা-সম্ভাবনা নিয়ে লেখার পরামর্শ দিলেন। আমাদের কিছু পত্রিকাও দিলেন। এরপর গেলাম দৈনিক করতোয়া পত্রিকা অফিসে। সেখানেও সম্পাদক হেলালুজ্জামান তালুকদারের সঙ্গে দেখা হলো। হামিদ স্যার আমাদের পাঠিয়েছেন—এ কথা শুনে তিনিও অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে আমাদের সঙ্গে কথা বললেন। সেদিনের প্রতিটি মুহূর্ত আমার জীবনে সাংবাদিকতার বীজ আরও গভীরভাবে বপন করেছিল।

যেভাবে শুরু হলো আমার সাংবাদিকতা
সবশেষে আমরা আজিজুল হক কলেজে ফিরে এলাম। তখন বেলা প্রায় ৩টা। হামিদ স্যার আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তিনি আমাদের নিয়ে বসালেন। তাঁর সঙ্গে দুপুরের খাবার খেলাম। খাওয়া শেষে সাংবাদিকতা, সমাজ, শিক্ষা, চলনবিলের ইতিহাস ও মানুষের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে তিনি আমাদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বললেন। তাঁর কাছ থেকে পেলাম নানা তথ্য, পরামর্শ ও উৎসাহ। সেদিনই, বলা যায়, তাঁর হাত ধরে আমার সাংবাদিকতার পথে যাত্রা শুরু। সেই যাত্রা আজও চলছে—বিরতিহীনভাবে।
স্যারের বাসা থেকে বাড়ির পথে
বিকেল ৫টার দিকে স্যারের বাসা থেকে বের হলাম। বগুড়া থেকে বাসে করে শেরপুর ক্যান্টনমেন্টে ফিরে এলাম। খলিল আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। রাত ৯টার দিকে আমাদের রাতের খাবারের জন্য নিয়ে গেলেন। সেখানে খাওয়া-দাওয়া শেষে আবার ক্যান্টনমেন্টে ফিরে আড্ডা দিয়ে রাত ১২টার দিকে ঘুমিয়ে পড়লাম। পরদিন ভোরে নাশতা করে সাইকেল নিয়ে রওনা হলাম। নন্দীগ্রাম–সিংড়া–কলম–নাজিরপুর হয়ে রাত ১১টার দিকে বাড়ি ফিরলাম। বাড়িতে ঢোকার সময় আব্বার ভয়ে বুক দুরুদুরু করছিল। কারণ তাঁকে না জানিয়েই আমি কয়েক দিনের জন্য এমন এক ‘অভিযানে’ বের হয়েছিলাম! বাড়ি ফিরে দেখি সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। মা টের পেয়ে চুপিচুপি আমার জন্য খাবার নিয়ে ঘরে এলেন। অপরাধীর মতো কেরোসিনের বাতি জ্বালিয়ে খাবার খেলাম। তারপর বিছানায় শুয়ে পড়লাম। আজ এত বছর পর সেই রাতের কথা মনে হলে বুকের ভেতর এক অদ্ভুত আনন্দ ও আবেগ জেগে ওঠে।

স্মৃতির পাতায় অধ্যাপক আব্দুল হামিদ টি কে
চলনবিলের কৃতিসন্তান, চলনবিলের ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রাণপুরুষ, চলনবিলের পরিচয় ও ইতিহাসের অন্যতম রূপকার, চলনবিল জাদুঘর, গুরুদাসপুর থানা শিক্ষা সংঘ, গুরুদাসপুর বিলচলন ড. শহীদ শামসুজ্জোহা সরকারি কলেজ, খুবজিপুর ডিগ্রি কলেজসহ বহু প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা এবং চলনবিল প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা পৃষ্ঠপোষক ছিলেন অধ্যক্ষ প্রফেসর সরদার আব্দুল হামিদ টি কে। তিনি ছিলেন চলনবিলের গর্ব, উন্নয়নচিন্তার পথিকৃৎ, শিক্ষাবিদ, ইতিহাসবিদ, সাহিত্যিক ও সমাজসেবক। আমার লেখালেখির প্রতি তাঁর ছিল বিশেষ উৎসাহ। আমার লেখনীর প্রশংসা করতেন। বগুড়া থেকে যখনই গুরুদাসপুরে আসতেন, আমাকে ডেকে নিতেন। এলাকার বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে তথ্য দিতেন এবং সেসব বিষয়ে লেখার জন্য উৎসাহিত করতেন। তাঁর সঙ্গে আমার জীবনের বহু স্মৃতি জড়িয়ে আছে। সময় ও সুযোগ হলে সেই স্মৃতিগুলো পর্যায়ক্রমে লেখার ইচ্ছা আছে। ২০০৬ সালের ২৪ আগস্ট তিনি তাঁর প্রাণের চলনবিলবাসীকে শোকসাগরে ভাসিয়ে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে না-ফেরার দেশে চলে যান।
তাঁর ২০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি সেই মহান মানুষটিকে—যাঁর স্নেহ, উৎসাহ ও দিকনির্দেশনা আমার সাংবাদিকতার পথচলার অন্যতম ভিত্তি। চলনবিল প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। মহান আল্লাহ অধ্যাপক প্রফেসর সরদার আব্দুল হামিদকে বেহেশতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন।
—————————
লেখকঃ সাবেক সভাপতি ও বর্তমান প্রধান উপদেষ্টা
চলনবিল প্রেসক্লাব, গুরুদাসপুর, নাটোর।
akalmazad7711@gmail.com

আবুল কালাম আজাদ 


















