ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নীতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী বা ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধের’ দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে মন্তব্য করেছে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস। পত্রিকাটির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নির্বাচনী প্রচারণায় নতুন যুদ্ধ নয়, বরং চলমান সংঘাতের অবসানের প্রতিশ্রুতি দিলেও ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প ঠিক উল্টো বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন।
বিশ্লেষণে বলা হয়, কোনো রাষ্ট্রই যুদ্ধ শুরুর সময় সেটিকে দীর্ঘস্থায়ী হবে বলে ধরে নেয় না। কিন্তু ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক প্রেসিডেন্ট এমন সংঘাতে জড়িয়েছেন, যা বছরের পর বছর ধরে চলেছে। শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক ব্যয় ও জনমতের কারণে পরবর্তী প্রশাসনগুলো যুদ্ধ শেষ করে সেনা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছে।
ইরানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের পর কখনো আলোচনা, কখনো নতুন হামলা—এভাবে সংঘাত চললেও এখন পর্যন্ত ট্রাম্পের ঘোষিত লক্ষ্য, অর্থাৎ ইরানের সরকার পরিবর্তন কিংবা দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ—কোনোটিই অর্জিত হয়নি।
বরং যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা নতুন সংকট তৈরি করেছে। ট্রাম্প যে সমঝোতা স্মারককে সব লক্ষ্য অর্জনের ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছিলেন, সেটিও এক মাসের মধ্যেই কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। এ স্মারক নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যেও ছিল ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলী ভায়েজের মতে, কোনো পক্ষই ওই সমঝোতাকে স্থায়ী শান্তির পথ হিসেবে দেখেনি। বরং এটি ছিল ভিন্ন কৌশলে সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার একটি মাধ্যম। তাঁর ভাষায়, দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কৌশল ছাড়া এ পরিস্থিতি আরেকটি ‘অনন্ত যুদ্ধের’ ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘অনন্ত যুদ্ধ’ ধারণাটি মূলত ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী বৈশ্বিক যুদ্ধ’ থেকে ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। আফগানিস্তান ও ইরাকে সরকার পরিবর্তনের পর বিদ্রোহ দমন ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর আটকে ছিল। বিপুল অর্থ ও প্রাণহানির পরও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জিত হয়নি।
যুদ্ধ বিশ্লেষক লরেন্স ডি. ফ্রিডম্যান বলেন, বড় শক্তিগুলো প্রায়ই মনে করে তারা দ্রুত সামরিক বিজয় অর্জন করবে। কিন্তু বাস্তবে সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় না নেওয়ায় যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়। তাঁর মতে, ইরানে ট্রাম্প এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন—উভয়েই এমন লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন, যা দ্রুত অর্জন করা সম্ভব ছিল না।
তিনি আরও বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক সাফল্যকে টেকসই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অর্জনে রূপ দিতে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন। অথচ ট্রাম্প স্থলবাহিনী পাঠাতে অনাগ্রহী; তিনি মূলত বিমান ও নৌবাহিনীর ওপর নির্ভর করছেন।

বিশ্লেষণে ১৯৯১ সালের পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধের উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। সে সময় প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ. ডব্লিউ. বুশের লক্ষ্য ছিল সীমিত—কুয়েত থেকে ইরাকি বাহিনীকে সরিয়ে দেওয়া। ফলে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হয়। কিন্তু পরবর্তীতে জর্জ ডব্লিউ. বুশ ইরাকে সরকার পরিবর্তনের পর রাষ্ট্র পুনর্গঠনের পথে এগোন, যার ফলাফল হিসেবে অঞ্চলটিতে ইরানের প্রভাব আরও বেড়ে যায়। একইভাবে আফগানিস্তানেও তালেবানকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর দীর্ঘ রাষ্ট্রগঠন প্রকল্প শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয় এবং তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসে।
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের সিনিয়র ফেলো অ্যারন ডেভিড মিলারের মতে, ইসরায়েলের প্রভাবেই ট্রাম্প এমন এক সংঘাতে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছেন, যা লেবানন, ফিলিস্তিন ও ইয়েমেনে ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমেও বিস্তৃত হচ্ছে।
তিনি বলেন, ট্রাম্প চাইলে এ পর্যায়ে সংঘাতকে রাজনৈতিকভাবে সফল হিসেবে তুলে ধরে সরে আসতে পারতেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি আরও গভীরভাবে এতে জড়িয়ে পড়ছেন, যদিও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সুস্পষ্ট কোনো কৌশল এখনো দৃশ্যমান নয়। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতে অঙ্গীকার এবং ওই জলপথে ইরানের প্রভাব বজায় রাখার অবস্থান দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উত্তেজনার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।
তবে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে বর্তমান সংঘাত আফগানিস্তান বা ইরাক যুদ্ধের মতো নয়। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ সময় বিপুলসংখ্যক সেনা মোতায়েন রেখেছিল। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে তারা একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের মুখোমুখি।
এ ছাড়া হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার সক্ষমতা ইরানের হাতে থাকায় বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে এই কৌশলগত অবস্থান থেকে তেহরান সহজে সরে আসবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বৈদেশিক নীতি বিষয়ক পরিচালক সুজান মালোনি বলেন, যুদ্ধের আগের পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়া এখন আর বাস্তবসম্মত নয়। তাঁর মতে, ইরাক যুদ্ধের মতোই ভুল মূল্যায়ন ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিয়েছে। ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রকে হয়তো আরও বেশি সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে হবে।
অন্যদিকে আলী ভায়েজের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে আলোচনার মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। কারণ, দুই পক্ষ একটি সমঝোতা পর্যন্ত টিকিয়ে রাখতে পারেনি। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে মাঝেমধ্যে সংঘর্ষের পরিবর্তে এটি শেষ পর্যন্ত একটি দীর্ঘস্থায়ী বা ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’-এ রূপ নিতে পারে।

অনলাইন ডেস্ক 


















