ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রোগীকে নয়, বদলাতে হবে স্বাস্থ্যব্যবস্থার পথচলা: এখনই গড়ে তুলতে হবে ‘হেলথ সিস্টেম চেইন’

blank

বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগে (OPD) সকাল থেকে দীর্ঘ লাইন। কেউ ভোর ৫টায় এসে সিরিয়াল নিয়েছেন, কেউ দূর-দূরান্ত থেকে কয়েক ঘণ্টা ভ্রমণ করে এসেছেন। কিন্তু চিকিৎসকের কক্ষে পৌঁছাতে দুপুর গড়িয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষার পর রোগী চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পান মাত্র পাঁচ থেকে সাত মিনিটের জন্য। এটি শুধু রোগীর কষ্টের বিষয় নয়; এটি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন।
প্রতিদিন চিকিৎসকদের ওপর যে বিপুল চাপ তৈরি হয়, তার একটি বড় কারণ রোগী বেশি—এটি সত্য। কিন্তু আরও বড় সত্য হলো, আমরা এখনো এমন একটি স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো গড়ে তুলতে পারিনি, যেখানে প্রত্যেক স্বাস্থ্য পেশাজীবী তাঁর নিজস্ব দক্ষতা অনুযায়ী কাজ করবেন এবং রোগী ধাপে ধাপে সঠিক ব্যক্তির কাছে পৌঁছাবেন। একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে আজও রোগীর ইতিহাস নেওয়া, রক্তচাপ মাপা, পূর্বের ওষুধের তালিকা দেখা, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ পরামর্শ দেওয়ার কাজও করতে হয়। ফলে তাঁর মূল্যবান সময়ের একটি বড় অংশ প্রাথমিক কাজেই ব্যয় হয়ে যায়।
এই বাস্তবতা বদলাতে হলে বাংলাদেশকে “Health System Chain” বা সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা চেইন চালু করার বিষয়ে এখনই গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। এটি কোনো নতুন তত্ত্ব নয়; বরং উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি পরীক্ষিত ও কার্যকর মডেল।

প্রথম ধাপেই রোগীকে সঠিক পেশাজীবীর কাছে পাঠাতে হবে
একজন সাধারণ রোগী হাসপাতালে এলে প্রথমেই তাঁর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং প্রথমে একজন মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট রোগীকে গ্রহণ করবেন। তিনি রোগীর প্রধান অভিযোগ, পূর্বের রোগের ইতিহাস, ওষুধ সেবনের তথ্য, অ্যালার্জি, পারিবারিক ইতিহাস সংগ্রহ করবেন। এরপর রক্তচাপ, পালস, শরীরের তাপমাত্রা, উচ্চতা, ওজন, রক্তে শর্করা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সম্পন্ন করবেন। এসব তথ্য ইলেকট্রনিক মেডিকেল রেকর্ড (EMR)-এ সংরক্ষিত থাকবে।
ভাবুন, একজন চিকিৎসকের সঙ্গে যদি পাঁচজন মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট কাজ করেন এবং প্রত্যেকে ২০ মিনিটে একজন রোগীর প্রাথমিক মূল্যায়ন সম্পন্ন করেন, তাহলে চিকিৎসক যখন একজন রোগী দেখছেন, তখন একই সময়ে পরবর্তী পাঁচজন রোগী ইতোমধ্যেই প্রস্তুত হয়ে যাচ্ছেন। চিকিৎসকের সামনে রোগীর সম্পূর্ণ তথ্য থাকবে। ফলে তিনি আর সময় নষ্ট না করে সরাসরি রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা পরিকল্পনা এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার নির্দেশ দিতে পারবেন।রোগীকে
এরপর রোগী আবার মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টের কাছেই ফিরে যাবেন। তিনি রোগীকে ওষুধ সেবনের নিয়ম বুঝিয়ে দেবেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরামর্শ দেবেন এবং পরবর্তী ফলোআপের সময় নির্ধারণ করবেন। এতে রোগীও বিভ্রান্ত হবেন না, চিকিৎসকের ওপরও অপ্রয়োজনীয় চাপ কমবে।

চোখের রোগীর প্রথম গন্তব্য হোক অপটোমেট্রিস্ট
বাংলাদেশে চক্ষু বহির্বিভাগের একটি সাধারণ দৃশ্য হলো—একই লাইনে ছানি রোগী, চশমার পাওয়ার পরিবর্তনের রোগী, ড্রাই আই রোগী, গ্লুকোমার সন্দেহভাজন রোগী এবং ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির রোগী সবাই অপেক্ষা করছেন। অথচ এদের সবার প্রথমেই একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
একজন অপটোমেট্রিস্ট সহজেই রোগীর দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা, রিফ্র্যাকশন, চোখের চাপ পরিমাপ, স্লিট ল্যাম্প পরীক্ষা, ড্রাই আই মূল্যায়ন, ফান্ডাস ফটোগ্রাফি, OCT এবং অন্যান্য প্রাথমিক মূল্যায়ন সম্পন্ন করতে পারেন। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী রোগীকে চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো হবে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একজন ডায়াবেটিস রোগী নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করাতে এসেছেন। যদি অপটোমেট্রিস্ট তাঁর রেটিনার ছবি তুলে প্রাথমিক মূল্যায়ন করে EMR-এ সংরক্ষণ করেন, তাহলে চক্ষু বিশেষজ্ঞ কয়েক মিনিটেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন রোগীর শুধু পর্যবেক্ষণ দরকার, লেজার চিকিৎসা দরকার, নাকি অস্ত্রোপচার প্রয়োজন।
এর ফলে প্রকৃত জটিল রোগীরা দ্রুত বিশেষজ্ঞের কাছে পৌঁছাবেন এবং অপেক্ষার সময়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।

অর্থোপেডিক রোগীর প্রথম মূল্যায়ন করবে ফিজিওথেরাপিস্ট
হাঁটু ব্যথা, কোমর ব্যথা, ঘাড়ের ব্যথা কিংবা পেশির সমস্যার জন্য প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ অর্থোপেডিক বহির্বিভাগে ভিড় করেন। কিন্তু এসব রোগীর বড় একটি অংশের প্রথম মূল্যায়ন একজন ফিজিওথেরাপিস্ট করলেই চিকিৎসা অনেক দ্রুত শুরু করা সম্ভব।
তিনি রোগীর হাঁটার ধরন, জয়েন্টের নড়াচড়া, পেশির শক্তি, ব্যথার মাত্রা এবং কার্যক্ষমতা মূল্যায়ন করবেন। এরপর অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন অনুযায়ী এক্স-রে, এমআরআই, ওষুধ কিংবা অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেবেন।
এভাবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তাঁর সময় ব্যয় করবেন জটিল সিদ্ধান্ত গ্রহণে, আর ফিজিওথেরাপিস্ট রোগীর পুনর্বাসন ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা পরিচালনা করবেন। এতে রোগী দ্রুত সুস্থ হবেন এবং হাসপাতালের বহির্বিভাগের চাপও কমবে।

মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় মনোবিজ্ঞানীর ভূমিকা বাড়াতে হবে
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সবচেয়ে বড় সংকট হলো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের স্বল্পতা। অনেক রোগী বিষণ্নতা, উদ্বেগ, পারিবারিক সমস্যা কিংবা মানসিক চাপে ভুগলেও তাঁদের প্রথমেই মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে হয়।
অথচ একজন মনোবিজ্ঞানী রোগীর বিস্তারিত মানসিক মূল্যায়ন, আচরণগত বিশ্লেষণ এবং কাউন্সেলিংয়ের কাজ দক্ষতার সঙ্গে করতে পারেন। এরপর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রোগ নির্ণয় করবেন, প্রয়োজনে ওষুধ দেবেন এবং চিকিৎসা পরিকল্পনা নির্ধারণ করবেন। পরে রোগী আবার মনোবিজ্ঞানীর কাছেই নিয়মিত থেরাপি ও কাউন্সেলিং নেবেন।
এতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা আরও কার্যকর, মানবিক এবং সহজলভ্য হবে।
এটি কোনো পেশার প্রতিযোগিতা নয়, এটি একটি দলগত স্বাস্থ্যব্যবস্থা
একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে—এই প্রস্তাব কোনো পেশাকে অন্য পেশার বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য নয়। বরং এটি একটি দলভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা (Team-Based Healthcare), যেখানে চিকিৎসক, মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট, অপটোমেট্রিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট, মনোবিজ্ঞানী, নার্স এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশাজীবী নিজ নিজ Scope of Practice বা আইনগত কর্মপরিধির মধ্যে থেকে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবেন।
বাংলাদেশে এই মডেল বাস্তবায়নের জন্য তিনটি বিষয় জরুরি। প্রথমত, প্রতিটি স্বাস্থ্য পেশার কর্মপরিধি আইনগতভাবে সুস্পষ্ট করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ধাপে ধাপে সব সরকারি হাসপাতাল ও বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে Electronic Medical Record (EMR) চালু করতে হবে। তৃতীয়ত, আন্তঃপেশাগত সহযোগিতাকে (Interprofessional Collaboration) স্বাস্থ্যনীতি ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে।
এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা আজ একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। জনসংখ্যা বাড়ছে, দীর্ঘমেয়াদি রোগ বাড়ছে, মানুষের প্রত্যাশা বাড়ছে। কিন্তু একই পদ্ধতিতে কাজ করে ভিন্ন ফল পাওয়ার আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।
রোগীর অপেক্ষার সময় কমাতে শুধু নতুন হাসপাতাল নির্মাণ বা চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না। স্বাস্থ্যসেবার পুরো রোগী ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা (Patient Flow) নতুনভাবে সাজাতে হবে। রোগীকে এমন একটি সুশৃঙ্খল চেইনের মধ্যে আনতে হবে, যেখানে প্রথম মূল্যায়ন করবেন উপযুক্ত স্বাস্থ্য পেশাজীবী এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তাঁর মূল্যবান সময় ব্যয় করবেন রোগ নির্ণয়, জটিল চিকিৎসা এবং জীবন রক্ষাকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণে।
একটি আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার পরিচয় শুধু উন্নত ভবন, ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি কিংবা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যায় নয়। একটি সফল স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রকৃত পরিচয় হলো—রোগী কত দ্রুত, কত নিরাপদ এবং কত সম্মানজনকভাবে সেবা পাচ্ছেন।
বাংলাদেশ যদি সত্যিই একটি স্মার্ট ও রোগীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, তবে এখনই হেলথ সিস্টেম চেইন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। সঠিক রোগীকে সঠিক সময়ে সঠিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর কাছে পৌঁছে দেওয়াই হবে আগামী দিনের স্বাস্থ্যসেবার সবচেয়ে বড় সংস্কার।
স্বাস্থ্যখাতের ভবিষ্যৎ অপেক্ষার দীর্ঘ লাইনে নয়; ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে সমন্বিত, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং দলগত স্বাস্থ্যসেবায়। এখন প্রশ্ন একটাই—আমরা কি সেই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত?

——————————————–

লেখকঃসহকারী অধ্যাপক ও রিসার্চ ফেলো

ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটি (এমএসইউ), মালয়েশিয়া

ভিশন সায়েন্টিস্ট ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক  এবং লেখক

জনপ্রিয় খবর
blank

ববিতে র‍্যাগিং ও বুলিং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ: প্রক্টরের কার্যালয় থেকে কড়া নির্দেশনা

রোগীকে নয়, বদলাতে হবে স্বাস্থ্যব্যবস্থার পথচলা: এখনই গড়ে তুলতে হবে ‘হেলথ সিস্টেম চেইন’

প্রকাশের সময় : এক ঘন্টা আগে
blank

বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগে (OPD) সকাল থেকে দীর্ঘ লাইন। কেউ ভোর ৫টায় এসে সিরিয়াল নিয়েছেন, কেউ দূর-দূরান্ত থেকে কয়েক ঘণ্টা ভ্রমণ করে এসেছেন। কিন্তু চিকিৎসকের কক্ষে পৌঁছাতে দুপুর গড়িয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষার পর রোগী চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পান মাত্র পাঁচ থেকে সাত মিনিটের জন্য। এটি শুধু রোগীর কষ্টের বিষয় নয়; এটি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন।
প্রতিদিন চিকিৎসকদের ওপর যে বিপুল চাপ তৈরি হয়, তার একটি বড় কারণ রোগী বেশি—এটি সত্য। কিন্তু আরও বড় সত্য হলো, আমরা এখনো এমন একটি স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো গড়ে তুলতে পারিনি, যেখানে প্রত্যেক স্বাস্থ্য পেশাজীবী তাঁর নিজস্ব দক্ষতা অনুযায়ী কাজ করবেন এবং রোগী ধাপে ধাপে সঠিক ব্যক্তির কাছে পৌঁছাবেন। একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে আজও রোগীর ইতিহাস নেওয়া, রক্তচাপ মাপা, পূর্বের ওষুধের তালিকা দেখা, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ পরামর্শ দেওয়ার কাজও করতে হয়। ফলে তাঁর মূল্যবান সময়ের একটি বড় অংশ প্রাথমিক কাজেই ব্যয় হয়ে যায়।
এই বাস্তবতা বদলাতে হলে বাংলাদেশকে “Health System Chain” বা সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা চেইন চালু করার বিষয়ে এখনই গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। এটি কোনো নতুন তত্ত্ব নয়; বরং উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি পরীক্ষিত ও কার্যকর মডেল।

প্রথম ধাপেই রোগীকে সঠিক পেশাজীবীর কাছে পাঠাতে হবে
একজন সাধারণ রোগী হাসপাতালে এলে প্রথমেই তাঁর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং প্রথমে একজন মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট রোগীকে গ্রহণ করবেন। তিনি রোগীর প্রধান অভিযোগ, পূর্বের রোগের ইতিহাস, ওষুধ সেবনের তথ্য, অ্যালার্জি, পারিবারিক ইতিহাস সংগ্রহ করবেন। এরপর রক্তচাপ, পালস, শরীরের তাপমাত্রা, উচ্চতা, ওজন, রক্তে শর্করা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সম্পন্ন করবেন। এসব তথ্য ইলেকট্রনিক মেডিকেল রেকর্ড (EMR)-এ সংরক্ষিত থাকবে।
ভাবুন, একজন চিকিৎসকের সঙ্গে যদি পাঁচজন মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট কাজ করেন এবং প্রত্যেকে ২০ মিনিটে একজন রোগীর প্রাথমিক মূল্যায়ন সম্পন্ন করেন, তাহলে চিকিৎসক যখন একজন রোগী দেখছেন, তখন একই সময়ে পরবর্তী পাঁচজন রোগী ইতোমধ্যেই প্রস্তুত হয়ে যাচ্ছেন। চিকিৎসকের সামনে রোগীর সম্পূর্ণ তথ্য থাকবে। ফলে তিনি আর সময় নষ্ট না করে সরাসরি রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা পরিকল্পনা এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার নির্দেশ দিতে পারবেন।রোগীকে
এরপর রোগী আবার মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টের কাছেই ফিরে যাবেন। তিনি রোগীকে ওষুধ সেবনের নিয়ম বুঝিয়ে দেবেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরামর্শ দেবেন এবং পরবর্তী ফলোআপের সময় নির্ধারণ করবেন। এতে রোগীও বিভ্রান্ত হবেন না, চিকিৎসকের ওপরও অপ্রয়োজনীয় চাপ কমবে।

চোখের রোগীর প্রথম গন্তব্য হোক অপটোমেট্রিস্ট
বাংলাদেশে চক্ষু বহির্বিভাগের একটি সাধারণ দৃশ্য হলো—একই লাইনে ছানি রোগী, চশমার পাওয়ার পরিবর্তনের রোগী, ড্রাই আই রোগী, গ্লুকোমার সন্দেহভাজন রোগী এবং ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির রোগী সবাই অপেক্ষা করছেন। অথচ এদের সবার প্রথমেই একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
একজন অপটোমেট্রিস্ট সহজেই রোগীর দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা, রিফ্র্যাকশন, চোখের চাপ পরিমাপ, স্লিট ল্যাম্প পরীক্ষা, ড্রাই আই মূল্যায়ন, ফান্ডাস ফটোগ্রাফি, OCT এবং অন্যান্য প্রাথমিক মূল্যায়ন সম্পন্ন করতে পারেন। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী রোগীকে চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো হবে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একজন ডায়াবেটিস রোগী নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করাতে এসেছেন। যদি অপটোমেট্রিস্ট তাঁর রেটিনার ছবি তুলে প্রাথমিক মূল্যায়ন করে EMR-এ সংরক্ষণ করেন, তাহলে চক্ষু বিশেষজ্ঞ কয়েক মিনিটেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন রোগীর শুধু পর্যবেক্ষণ দরকার, লেজার চিকিৎসা দরকার, নাকি অস্ত্রোপচার প্রয়োজন।
এর ফলে প্রকৃত জটিল রোগীরা দ্রুত বিশেষজ্ঞের কাছে পৌঁছাবেন এবং অপেক্ষার সময়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।

অর্থোপেডিক রোগীর প্রথম মূল্যায়ন করবে ফিজিওথেরাপিস্ট
হাঁটু ব্যথা, কোমর ব্যথা, ঘাড়ের ব্যথা কিংবা পেশির সমস্যার জন্য প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ অর্থোপেডিক বহির্বিভাগে ভিড় করেন। কিন্তু এসব রোগীর বড় একটি অংশের প্রথম মূল্যায়ন একজন ফিজিওথেরাপিস্ট করলেই চিকিৎসা অনেক দ্রুত শুরু করা সম্ভব।
তিনি রোগীর হাঁটার ধরন, জয়েন্টের নড়াচড়া, পেশির শক্তি, ব্যথার মাত্রা এবং কার্যক্ষমতা মূল্যায়ন করবেন। এরপর অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন অনুযায়ী এক্স-রে, এমআরআই, ওষুধ কিংবা অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেবেন।
এভাবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তাঁর সময় ব্যয় করবেন জটিল সিদ্ধান্ত গ্রহণে, আর ফিজিওথেরাপিস্ট রোগীর পুনর্বাসন ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা পরিচালনা করবেন। এতে রোগী দ্রুত সুস্থ হবেন এবং হাসপাতালের বহির্বিভাগের চাপও কমবে।

মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় মনোবিজ্ঞানীর ভূমিকা বাড়াতে হবে
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সবচেয়ে বড় সংকট হলো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের স্বল্পতা। অনেক রোগী বিষণ্নতা, উদ্বেগ, পারিবারিক সমস্যা কিংবা মানসিক চাপে ভুগলেও তাঁদের প্রথমেই মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে হয়।
অথচ একজন মনোবিজ্ঞানী রোগীর বিস্তারিত মানসিক মূল্যায়ন, আচরণগত বিশ্লেষণ এবং কাউন্সেলিংয়ের কাজ দক্ষতার সঙ্গে করতে পারেন। এরপর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রোগ নির্ণয় করবেন, প্রয়োজনে ওষুধ দেবেন এবং চিকিৎসা পরিকল্পনা নির্ধারণ করবেন। পরে রোগী আবার মনোবিজ্ঞানীর কাছেই নিয়মিত থেরাপি ও কাউন্সেলিং নেবেন।
এতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা আরও কার্যকর, মানবিক এবং সহজলভ্য হবে।
এটি কোনো পেশার প্রতিযোগিতা নয়, এটি একটি দলগত স্বাস্থ্যব্যবস্থা
একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে—এই প্রস্তাব কোনো পেশাকে অন্য পেশার বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য নয়। বরং এটি একটি দলভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা (Team-Based Healthcare), যেখানে চিকিৎসক, মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট, অপটোমেট্রিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট, মনোবিজ্ঞানী, নার্স এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশাজীবী নিজ নিজ Scope of Practice বা আইনগত কর্মপরিধির মধ্যে থেকে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবেন।
বাংলাদেশে এই মডেল বাস্তবায়নের জন্য তিনটি বিষয় জরুরি। প্রথমত, প্রতিটি স্বাস্থ্য পেশার কর্মপরিধি আইনগতভাবে সুস্পষ্ট করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ধাপে ধাপে সব সরকারি হাসপাতাল ও বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে Electronic Medical Record (EMR) চালু করতে হবে। তৃতীয়ত, আন্তঃপেশাগত সহযোগিতাকে (Interprofessional Collaboration) স্বাস্থ্যনীতি ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে।
এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা আজ একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। জনসংখ্যা বাড়ছে, দীর্ঘমেয়াদি রোগ বাড়ছে, মানুষের প্রত্যাশা বাড়ছে। কিন্তু একই পদ্ধতিতে কাজ করে ভিন্ন ফল পাওয়ার আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।
রোগীর অপেক্ষার সময় কমাতে শুধু নতুন হাসপাতাল নির্মাণ বা চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না। স্বাস্থ্যসেবার পুরো রোগী ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা (Patient Flow) নতুনভাবে সাজাতে হবে। রোগীকে এমন একটি সুশৃঙ্খল চেইনের মধ্যে আনতে হবে, যেখানে প্রথম মূল্যায়ন করবেন উপযুক্ত স্বাস্থ্য পেশাজীবী এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তাঁর মূল্যবান সময় ব্যয় করবেন রোগ নির্ণয়, জটিল চিকিৎসা এবং জীবন রক্ষাকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণে।
একটি আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার পরিচয় শুধু উন্নত ভবন, ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি কিংবা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যায় নয়। একটি সফল স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রকৃত পরিচয় হলো—রোগী কত দ্রুত, কত নিরাপদ এবং কত সম্মানজনকভাবে সেবা পাচ্ছেন।
বাংলাদেশ যদি সত্যিই একটি স্মার্ট ও রোগীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, তবে এখনই হেলথ সিস্টেম চেইন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। সঠিক রোগীকে সঠিক সময়ে সঠিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর কাছে পৌঁছে দেওয়াই হবে আগামী দিনের স্বাস্থ্যসেবার সবচেয়ে বড় সংস্কার।
স্বাস্থ্যখাতের ভবিষ্যৎ অপেক্ষার দীর্ঘ লাইনে নয়; ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে সমন্বিত, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং দলগত স্বাস্থ্যসেবায়। এখন প্রশ্ন একটাই—আমরা কি সেই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত?

——————————————–

লেখকঃসহকারী অধ্যাপক ও রিসার্চ ফেলো

ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটি (এমএসইউ), মালয়েশিয়া

ভিশন সায়েন্টিস্ট ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক  এবং লেখক