ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
অধ্যক্ষ এম এ হামিদের ২০ তম মৃত্যুবার্ষিকী

গবেষক এম এ হামিদের দাবীকৃত চলনবিল জেলা কেন জরুরি

blank

গতবছরের ১৯ সেপ্টেম্বর নিজের ভ্যারিফাইড ফেসবুকে চলনবিলের নৌকাবাইচের একটা ভিডিও শেয়ার করে তৎকালীন সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরওয়ার ফারুকি লিখেন স্থানীয় উৎসবগুলো খুব তাড়াতাড়ি জাতীয় উৎসবে রুপান্তরিত হবে। চলনবিলের নাটোর জেলার বিলশা গ্রামে অনুষ্ঠিত ওই নৌকাবাইচের ভিডিওটি ফেসবুকে কয়েক কোটি ভিউ হয়েছিল। প্রতিযোগিতার দিন অসংখ্য মানুষ নৌকা বাইচ দেখতে গিয়েও ব্যর্থ হয়েছিলেন। এত ভিড় ছিল, কোথাও দাঁড়ানোর মতো ফাঁকা জায়গা অবশিষ্ট ছিল না। এই ভিড়ের কারণ আসলে চলনবিলের অপরূপ সৌন্দর্য এবং বর্ষায় জলপথে সহজ চলাচল ব্যবস্থা। আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনেছি, ‘বিল দেখতে চলন, গ্রাম দেখতে কলম’—প্রবাদের এই বিশাল চলনবিল কেবল একটি বিল নয়, এটি বাংলাদেশের জলজ বাস্তুতন্ত্র, মিঠা পানির মাছ ও কৃষি অর্থনীতির অন্যতম বৃহৎ প্রাণকেন্দ্র। নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়া—এই চার জেলার বিস্তৃত সীমান্ত জুড়ে ছড়িয়ে থাকা চলনবিল ঋতুভেদে তার রূপ বদলায়। বর্ষায় সাগরের মতো উত্তাল ও থইথই জলরাশি, শরতে শান্ত জলের বুক চিরে ফুটন্ত শাপলা ও সাদা মেঘের খেলা, হেমন্তে সোঁদা মাটি, কাদা পানিতে থাকা মাছ, আর পাখির সমারোহ। এবং শীতে ইরি ধানের মৌ মৌ গন্ধ, আর রবি ফসলের দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ-হলুদের গালিচা। তবে বাহ্যিক এই অপার রূপের আড়ালে চলনবিল আজ ভেতরে ভেতরে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার এক করুণ ট্র্যাজেডির মুখোমুখি।

 

ঐতিহ্যের চলনবিল ও বর্তমানের করুণ বাস্তবতা

প্রাচীনকাল থেকেই এই অঞ্চলটি ছিল সমুদ্রের মতো বিশাল আকৃতির জলভূমি। সাধারণ বিলের মতো স্থবির না হয়ে নদীর মতো জলপ্রবাহ ও স্রোত ছিল বলেই এর নামকরণ হয়েছিল চলন্তবিল বা ‘চলনবিল’। ১৮২৭ সালে জনবসতি এলাকা বাদ দিয়ে চলনবিলের জলমগ্ন অংশের আয়তন ছিল ৫০০ বর্গমাইলেরও বেশি। ১৯০৯ সালে জরিপ প্রতিবেদনে তা কমে দাঁড়ায় ১৪২ বর্গমাইলে, যার মধ্যে মাত্র ৩৩ বর্গমাইল এলাকায় সারা বছর পানি থাকত। মূলত ৩৯টি প্রধান বিলসহ মোট ৫০টিরও বেশি ছোট-বড় বিল, আত্রাই, গুড়, বড়াল, করতোয়াসহ ১৬টি নদী এবং ১২০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ২২টি খালের সমন্বয়ে এই জলভূমির বিশালতা গড়ে উঠেছিল। পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর; নাটোরের বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর, সিংড়া; সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, রায়গঞ্জ এবং বগুড়ার শেরপুর অঞ্চল জুড়েই এর মূল পরিধি। বর্তমানে এর ৬২টি ইউনিয়ন ও ৮টি পৌরসভার প্রায় ২০ লাখেরও বেশি মানুষের জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষভাবে এই বিলের ওপর নির্ভরশীল।

কিন্তু কালের বিবর্তনে তলদেশে পলি জমা, অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ, কালভার্ট ও  সড়ক নির্মাণ এবং নির্বিচারে দখলের কারণে বিলের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। বিলে স্বচ্ছ পানির বিশাল ঢেউ এর বদলে দেখা যাচ্ছে সবুজ শ্যাওলা আর কচুরিপানায় ভর্তি ডোবা পুকুরের মত স্থির পানি। এরফলে মানচিত্র থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে চলনবিলের সেই আদি বিশালতা।

blank

বিলীন হওয়ার পথে জীববৈচিত্র্য ও ‘মাছেদের বাড়ি’

একসময় চলনবিলকে বলা হতো ‘মাছেদের বাড়ি’। দেশি প্রজাতির সুস্বাদু রুই, কাতলা, চিতল, বোয়াল, পাবদা, শিং, মাগুর, কৈ, আইড় ও বাইম মাছে ভরপুর ছিল এই বিল। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, ব্রিটিশ ও পূর্ব-পাকিস্তান আমলে এই বিলের তাজা মাছ বিশেষ ট্রেনযোগে তৎকালীন ভারতের পশ্চিমবঙ্গে পাঠানো হতো, সেখানকার অভিজাত পরিবারগুলো চলনবিলের মাছ দিয়ে ভোজের আয়োজন করত।

আজ সেই ঐতিহ্য বিলুপ্তির পথে। বর্ষা বা শরতে এখনও সুতিজাল, ভেশাল কিংবা চাঁই দিয়ে মাছ ধরার ধুম চোখে পড়লেও, দিন দিন বিল সংকুচিত হওয়ায় মিঠা পানির মাছের বংশবৃদ্ধি চরম হুমকির মুখে। ক্ষতিকর চায়না জালের কারণে মাছের পাশাপাশি বিলীন হচ্ছে বিভিন্ন উপকারি জলজ প্রাণী। বিলীন হয়ে যাচ্ছে এসবের ওপর নির্ভরশীল বক, পানকৌড়ি, মাছরাঙাসহ নানা প্রজাতির স্থানীয় ও দেশি-বিদেশি পরিযায়ী পাখি। বিল ধ্বংসের এই ধারা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের কৃষি, মৎস্য উৎপাদন ও সামগ্রিক পরিবেশ ভয়াবহ ধরনের বিপদের মুখে পড়বে।

চার জেলার প্রশাসনিক জটিলতা ও ঐতিহাসিক দাবি

চলনবিলের এই মহা সংকটের আরেকটি বড় কারণ এর ভৌগোলিক বণ্টন। নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়া—এই চার ভিন্ন জেলার সীমান্তবর্তী আটটি উপজেলার অধীনে খণ্ড খণ্ডভাবে চলনবিল শাসিত হচ্ছে। চার জেলার প্রশাসনিক কাঠামোর কারণে কোনো একক জেলা প্রশাসনের পক্ষে পুরো চলনবিলের সুনির্দিষ্ট সমস্যা সমাধান, পলি অপসারণ, নদী-খাল খনন বা পরিবেশ সংরক্ষণে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয় না। এক জেলার গৃহীত প্রকল্প অন্য জেলার অসংগতির কারণে থমকে যায়, কিংবা আন্তজেলা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় মূল সমস্যাগুলো চিরকাল উপেক্ষিত থেকে যায়।

এই বাস্তবতা বহু আগেই অনুধাবন করেছিলেন, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও চলনবিল গবেষক অধ্যক্ষ এম এ হামিদ। ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত ‘চলনবিলের ইতিকথা’ গ্রন্থে তিনি চলনবিলের ইতিহাস, ভূপ্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, খণ্ডবিখণ্ড প্রশাসনের মাধ্যমে এই অনন্য জলভূমি রক্ষা সম্ভব নয়। তাই তিনি চলনবিল অঞ্চলের থানাগুলোকে একত্র করে একটি স্বতন্ত্র ‘চলনবিল জেলা’ গঠনের দাবিতে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে আমৃত্যু ধর্না দিয়েছেন। তৎকালীন আমলাতন্ত্র একজন শিক্ষাবিদের দূরদর্শী ভাবনাকে গুরুত্ব না দিলেও, আজকের বিপন্ন চলনবিলের দিকে তাকালে বোঝা যায়, তাঁর সেই দাবি কতটা বস্তুনিষ্ঠ ও যৌক্তিক ছিল।

blank

কেন জরুরি স্বতন্ত্র চলনবিল জেলা‘?

চলনবিলকে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও পরিবেশগত ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে একটি নির্দিষ্ট ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় আনা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। একটি পৃথক ‘চলনবিল জেলা’ গঠিত হলে যে পরিবর্তনগুলো সম্ভব:

  • সমন্বিত নদী ও বিল পুনরুদ্ধার: চার জেলার আলাদা আলাদা সিদ্ধান্ত না নিয়ে, একক জেলা প্রশাসনের অধীনে ১৬টি নদী ও ২২টি খালের পলি অপসারণ ও পুনখননের সুনির্দিষ্ট মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
  • মৎস্য সম্পদ ও কৃষি সুরক্ষা: মিঠা পানির মাছের অভয়ারণ্য গড়ে তোলা, ডিম ছাড়ার মৌসুমে মা-মাছ রক্ষা এবং বিলের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ধরে রেখে কৃষি জমিকে স্থায়ী জলাবদ্ধতা ও খরা থেকে রক্ষা করা যাবে।
  • পরিবেশবান্ধব পর্যটন ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ: খুবজিপুরের ‘চলনবিল জাদুঘর’, সিংড়ার তিশিখালিতে ঘাসি দেওয়ানের মাজার, বারুহাসের শাহ সুজার আমলের স্থাপত্য, তাড়াশের ঐতিহাসিক জিয়ন কূপ, হান্ডিয়ালের জগন্নাথ মন্দির, চাটমোহরের শাহি মসজিদ, নওগাঁ গ্রামে হয়রত শাহ শরিফ জিন্দানি রহ:-এর মাজার, বনওয়ারী নগর জমিদারবাড়ির মতো পুরাকীর্তিগুলোকে কেন্দ্র করে টেকসই পর্যটন গড়ে তোলা সহজ হবে। এতে স্থানীয় অর্থনীতি গতিশীল হবে এবং মাঝিদের নৌকাভ্রমণ ও আঞ্চলিক রন্ধনশৈলী নতুন মাত্রা পাবে।
  • একক আমলাতান্ত্রিক জবাবদিহিতা: আটটি থানাকে একটি প্রশাসনিক জেলার অধীনে আনলে সরকারি বরাদ্দ, পরিবেশ আইন প্রয়োগ ও অবকাঠামো নির্মাণের সমন্বয় তৈরি হবে, যা চার জেলার টানা হ্যাঁচড়ায় বর্তমানে অসম্ভব।

blank

উপসংহার

চলনবিল কেবল চার জেলার সীমানায় আটকে থাকা কোনো জলাশয় নয়; এটি বাংলাদেশের পরিবেশিক ভারসাম্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অন্যতম স্তম্ভ। অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন ও কাঠামোগত আগ্রাসনে যেভাবে বিলের বুক চিরে বাঁধ ও রাস্তা তৈরি করে এর রক্তনালীতুল্য নদী-খালগুলোকে হত্যা করা হচ্ছে, তাতে দ্রুত বলিষ্ঠ উদ্যোগ না নিলে খুব জলদি এটি কেবল ইতিহাস বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।

অধ্যক্ষ এম এ হামিদের রেখে যাওয়া সেই স্বপ্ন আর বর্তমান পরিবেশগত জরুরি অবস্থা আজ একই বিন্দুতে এসে মিলেছে। চলনবিলের প্রাণ-প্রকৃতি, বিরল জীববৈচিত্র্য, খাদ্য নিরাপত্তা ও ইতিহাসকে টিকিয়ে রাখতে আটটি প্রশাসনিক থানাকে একত্র করে একটি স্বতন্ত্র ‘চলনবিল জেলা’ গঠন এখন আর কোনো কাল্পনিক প্রস্তাব নয়, বরং এটি চলনবিলকে বাঁচিয়ে রাখার একমাত্র এবং অতি জরুরি প্রশাসনিক পূর্বশর্ত।

———————————-

লেখকঃ মরহুম এম এ হামিদের কনিষ্ঠ ভ্রাতা

mohiuddinmcj.ru@gmail.com

 

জনপ্রিয় খবর
blank

অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ টি কে ও আমার সাংবাদিকতার জগতে পথচলা

অধ্যক্ষ এম এ হামিদের ২০ তম মৃত্যুবার্ষিকী

গবেষক এম এ হামিদের দাবীকৃত চলনবিল জেলা কেন জরুরি

প্রকাশের সময় : ৫৭ মিনিট আগে
blank

গতবছরের ১৯ সেপ্টেম্বর নিজের ভ্যারিফাইড ফেসবুকে চলনবিলের নৌকাবাইচের একটা ভিডিও শেয়ার করে তৎকালীন সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরওয়ার ফারুকি লিখেন স্থানীয় উৎসবগুলো খুব তাড়াতাড়ি জাতীয় উৎসবে রুপান্তরিত হবে। চলনবিলের নাটোর জেলার বিলশা গ্রামে অনুষ্ঠিত ওই নৌকাবাইচের ভিডিওটি ফেসবুকে কয়েক কোটি ভিউ হয়েছিল। প্রতিযোগিতার দিন অসংখ্য মানুষ নৌকা বাইচ দেখতে গিয়েও ব্যর্থ হয়েছিলেন। এত ভিড় ছিল, কোথাও দাঁড়ানোর মতো ফাঁকা জায়গা অবশিষ্ট ছিল না। এই ভিড়ের কারণ আসলে চলনবিলের অপরূপ সৌন্দর্য এবং বর্ষায় জলপথে সহজ চলাচল ব্যবস্থা। আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনেছি, ‘বিল দেখতে চলন, গ্রাম দেখতে কলম’—প্রবাদের এই বিশাল চলনবিল কেবল একটি বিল নয়, এটি বাংলাদেশের জলজ বাস্তুতন্ত্র, মিঠা পানির মাছ ও কৃষি অর্থনীতির অন্যতম বৃহৎ প্রাণকেন্দ্র। নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়া—এই চার জেলার বিস্তৃত সীমান্ত জুড়ে ছড়িয়ে থাকা চলনবিল ঋতুভেদে তার রূপ বদলায়। বর্ষায় সাগরের মতো উত্তাল ও থইথই জলরাশি, শরতে শান্ত জলের বুক চিরে ফুটন্ত শাপলা ও সাদা মেঘের খেলা, হেমন্তে সোঁদা মাটি, কাদা পানিতে থাকা মাছ, আর পাখির সমারোহ। এবং শীতে ইরি ধানের মৌ মৌ গন্ধ, আর রবি ফসলের দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ-হলুদের গালিচা। তবে বাহ্যিক এই অপার রূপের আড়ালে চলনবিল আজ ভেতরে ভেতরে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার এক করুণ ট্র্যাজেডির মুখোমুখি।

 

ঐতিহ্যের চলনবিল ও বর্তমানের করুণ বাস্তবতা

প্রাচীনকাল থেকেই এই অঞ্চলটি ছিল সমুদ্রের মতো বিশাল আকৃতির জলভূমি। সাধারণ বিলের মতো স্থবির না হয়ে নদীর মতো জলপ্রবাহ ও স্রোত ছিল বলেই এর নামকরণ হয়েছিল চলন্তবিল বা ‘চলনবিল’। ১৮২৭ সালে জনবসতি এলাকা বাদ দিয়ে চলনবিলের জলমগ্ন অংশের আয়তন ছিল ৫০০ বর্গমাইলেরও বেশি। ১৯০৯ সালে জরিপ প্রতিবেদনে তা কমে দাঁড়ায় ১৪২ বর্গমাইলে, যার মধ্যে মাত্র ৩৩ বর্গমাইল এলাকায় সারা বছর পানি থাকত। মূলত ৩৯টি প্রধান বিলসহ মোট ৫০টিরও বেশি ছোট-বড় বিল, আত্রাই, গুড়, বড়াল, করতোয়াসহ ১৬টি নদী এবং ১২০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ২২টি খালের সমন্বয়ে এই জলভূমির বিশালতা গড়ে উঠেছিল। পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর; নাটোরের বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর, সিংড়া; সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, রায়গঞ্জ এবং বগুড়ার শেরপুর অঞ্চল জুড়েই এর মূল পরিধি। বর্তমানে এর ৬২টি ইউনিয়ন ও ৮টি পৌরসভার প্রায় ২০ লাখেরও বেশি মানুষের জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষভাবে এই বিলের ওপর নির্ভরশীল।

কিন্তু কালের বিবর্তনে তলদেশে পলি জমা, অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ, কালভার্ট ও  সড়ক নির্মাণ এবং নির্বিচারে দখলের কারণে বিলের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। বিলে স্বচ্ছ পানির বিশাল ঢেউ এর বদলে দেখা যাচ্ছে সবুজ শ্যাওলা আর কচুরিপানায় ভর্তি ডোবা পুকুরের মত স্থির পানি। এরফলে মানচিত্র থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে চলনবিলের সেই আদি বিশালতা।

blank

বিলীন হওয়ার পথে জীববৈচিত্র্য ও ‘মাছেদের বাড়ি’

একসময় চলনবিলকে বলা হতো ‘মাছেদের বাড়ি’। দেশি প্রজাতির সুস্বাদু রুই, কাতলা, চিতল, বোয়াল, পাবদা, শিং, মাগুর, কৈ, আইড় ও বাইম মাছে ভরপুর ছিল এই বিল। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, ব্রিটিশ ও পূর্ব-পাকিস্তান আমলে এই বিলের তাজা মাছ বিশেষ ট্রেনযোগে তৎকালীন ভারতের পশ্চিমবঙ্গে পাঠানো হতো, সেখানকার অভিজাত পরিবারগুলো চলনবিলের মাছ দিয়ে ভোজের আয়োজন করত।

আজ সেই ঐতিহ্য বিলুপ্তির পথে। বর্ষা বা শরতে এখনও সুতিজাল, ভেশাল কিংবা চাঁই দিয়ে মাছ ধরার ধুম চোখে পড়লেও, দিন দিন বিল সংকুচিত হওয়ায় মিঠা পানির মাছের বংশবৃদ্ধি চরম হুমকির মুখে। ক্ষতিকর চায়না জালের কারণে মাছের পাশাপাশি বিলীন হচ্ছে বিভিন্ন উপকারি জলজ প্রাণী। বিলীন হয়ে যাচ্ছে এসবের ওপর নির্ভরশীল বক, পানকৌড়ি, মাছরাঙাসহ নানা প্রজাতির স্থানীয় ও দেশি-বিদেশি পরিযায়ী পাখি। বিল ধ্বংসের এই ধারা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের কৃষি, মৎস্য উৎপাদন ও সামগ্রিক পরিবেশ ভয়াবহ ধরনের বিপদের মুখে পড়বে।

চার জেলার প্রশাসনিক জটিলতা ও ঐতিহাসিক দাবি

চলনবিলের এই মহা সংকটের আরেকটি বড় কারণ এর ভৌগোলিক বণ্টন। নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়া—এই চার ভিন্ন জেলার সীমান্তবর্তী আটটি উপজেলার অধীনে খণ্ড খণ্ডভাবে চলনবিল শাসিত হচ্ছে। চার জেলার প্রশাসনিক কাঠামোর কারণে কোনো একক জেলা প্রশাসনের পক্ষে পুরো চলনবিলের সুনির্দিষ্ট সমস্যা সমাধান, পলি অপসারণ, নদী-খাল খনন বা পরিবেশ সংরক্ষণে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয় না। এক জেলার গৃহীত প্রকল্প অন্য জেলার অসংগতির কারণে থমকে যায়, কিংবা আন্তজেলা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় মূল সমস্যাগুলো চিরকাল উপেক্ষিত থেকে যায়।

এই বাস্তবতা বহু আগেই অনুধাবন করেছিলেন, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও চলনবিল গবেষক অধ্যক্ষ এম এ হামিদ। ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত ‘চলনবিলের ইতিকথা’ গ্রন্থে তিনি চলনবিলের ইতিহাস, ভূপ্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, খণ্ডবিখণ্ড প্রশাসনের মাধ্যমে এই অনন্য জলভূমি রক্ষা সম্ভব নয়। তাই তিনি চলনবিল অঞ্চলের থানাগুলোকে একত্র করে একটি স্বতন্ত্র ‘চলনবিল জেলা’ গঠনের দাবিতে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে আমৃত্যু ধর্না দিয়েছেন। তৎকালীন আমলাতন্ত্র একজন শিক্ষাবিদের দূরদর্শী ভাবনাকে গুরুত্ব না দিলেও, আজকের বিপন্ন চলনবিলের দিকে তাকালে বোঝা যায়, তাঁর সেই দাবি কতটা বস্তুনিষ্ঠ ও যৌক্তিক ছিল।

blank

কেন জরুরি স্বতন্ত্র চলনবিল জেলা‘?

চলনবিলকে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও পরিবেশগত ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে একটি নির্দিষ্ট ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় আনা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। একটি পৃথক ‘চলনবিল জেলা’ গঠিত হলে যে পরিবর্তনগুলো সম্ভব:

  • সমন্বিত নদী ও বিল পুনরুদ্ধার: চার জেলার আলাদা আলাদা সিদ্ধান্ত না নিয়ে, একক জেলা প্রশাসনের অধীনে ১৬টি নদী ও ২২টি খালের পলি অপসারণ ও পুনখননের সুনির্দিষ্ট মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
  • মৎস্য সম্পদ ও কৃষি সুরক্ষা: মিঠা পানির মাছের অভয়ারণ্য গড়ে তোলা, ডিম ছাড়ার মৌসুমে মা-মাছ রক্ষা এবং বিলের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ধরে রেখে কৃষি জমিকে স্থায়ী জলাবদ্ধতা ও খরা থেকে রক্ষা করা যাবে।
  • পরিবেশবান্ধব পর্যটন ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ: খুবজিপুরের ‘চলনবিল জাদুঘর’, সিংড়ার তিশিখালিতে ঘাসি দেওয়ানের মাজার, বারুহাসের শাহ সুজার আমলের স্থাপত্য, তাড়াশের ঐতিহাসিক জিয়ন কূপ, হান্ডিয়ালের জগন্নাথ মন্দির, চাটমোহরের শাহি মসজিদ, নওগাঁ গ্রামে হয়রত শাহ শরিফ জিন্দানি রহ:-এর মাজার, বনওয়ারী নগর জমিদারবাড়ির মতো পুরাকীর্তিগুলোকে কেন্দ্র করে টেকসই পর্যটন গড়ে তোলা সহজ হবে। এতে স্থানীয় অর্থনীতি গতিশীল হবে এবং মাঝিদের নৌকাভ্রমণ ও আঞ্চলিক রন্ধনশৈলী নতুন মাত্রা পাবে।
  • একক আমলাতান্ত্রিক জবাবদিহিতা: আটটি থানাকে একটি প্রশাসনিক জেলার অধীনে আনলে সরকারি বরাদ্দ, পরিবেশ আইন প্রয়োগ ও অবকাঠামো নির্মাণের সমন্বয় তৈরি হবে, যা চার জেলার টানা হ্যাঁচড়ায় বর্তমানে অসম্ভব।

blank

উপসংহার

চলনবিল কেবল চার জেলার সীমানায় আটকে থাকা কোনো জলাশয় নয়; এটি বাংলাদেশের পরিবেশিক ভারসাম্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অন্যতম স্তম্ভ। অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন ও কাঠামোগত আগ্রাসনে যেভাবে বিলের বুক চিরে বাঁধ ও রাস্তা তৈরি করে এর রক্তনালীতুল্য নদী-খালগুলোকে হত্যা করা হচ্ছে, তাতে দ্রুত বলিষ্ঠ উদ্যোগ না নিলে খুব জলদি এটি কেবল ইতিহাস বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।

অধ্যক্ষ এম এ হামিদের রেখে যাওয়া সেই স্বপ্ন আর বর্তমান পরিবেশগত জরুরি অবস্থা আজ একই বিন্দুতে এসে মিলেছে। চলনবিলের প্রাণ-প্রকৃতি, বিরল জীববৈচিত্র্য, খাদ্য নিরাপত্তা ও ইতিহাসকে টিকিয়ে রাখতে আটটি প্রশাসনিক থানাকে একত্র করে একটি স্বতন্ত্র ‘চলনবিল জেলা’ গঠন এখন আর কোনো কাল্পনিক প্রস্তাব নয়, বরং এটি চলনবিলকে বাঁচিয়ে রাখার একমাত্র এবং অতি জরুরি প্রশাসনিক পূর্বশর্ত।

———————————-

লেখকঃ মরহুম এম এ হামিদের কনিষ্ঠ ভ্রাতা

mohiuddinmcj.ru@gmail.com