রানী ভবানী খ্যাত ঐতিহাসিক নাটোরের জেলার চলনবিলের গুরুদাসপুর থানার খুবজীপুর গ্রামের অতি সাধারণ এক কৃষক পরিবারে জন্ম অসাধারণ মেধার অধিকারী সরদার আব্দুল হামিদের (১৯৩০)। তিনি শিক্ষা জীবনে মেধার পরিচয় দিয়েছেন রাজশাহী গভ: কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাকালীন সময়েই। ভাষা আন্দোলনের তিনি একজন সক্রিয় সদস্যও ছিলেন।
অধ্যাপক আব্দুল হামিদ যেমন মেধাবী ছিলেন তেমন ছিলেন জ্ঞানী। মনে রাখা প্রয়োজন কেউ মেধাবী হলেই জ্ঞানী হয় না। জ্ঞানী হতে ধ্যানী হবার প্রয়োজন হয়। মেধাকে কাজে লাগিয়েই জ্ঞানী হতে হয়। যা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। অনেক সময় দেখা যায় অনেকেই শিক্ষা জীবনে প্রচন্ড রকমের মেধার পরিচয় দেওয়া সত্ত্বেও পরবর্তীতে সেই মেধাকে কাজে লাগিয়ে জ্ঞানী হতে পারেননি। মেধা হচ্ছে বোঝার বিষয়। এজন্য মেধাবীকে বলা হয় “ How much you understand” । আর জ্ঞান হচ্ছে জানার বিষয়। এজন্য বলা হয় “How much you know” । সরদার আব্দুল হামিদ উভয় ক্ষেত্রেই স্মরণীয় ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই নানা বিষয়ে জানার আগ্রহ ছিল প্রবল। সেই প্রবল আগ্রহ থেকেই তিনি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত জ্ঞান চর্চা করে গেছেন।

আব্দুল হামিদ যেমন মেধাবী, জ্ঞানী এবং সমাজ সচেতন ছিলেন তেমন ছিলেন ধর্মভীরু। তিনি পবিত্র ধর্মগ্রন্থ চর্চা করেছেন। তিনি জানতেন যে, আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন, ‘ভূ-পৃষ্ঠে ভ্রমণ করো এবং প্রত্যক্ষ করো- মিথ্যাচারীদের কি পরিণতি হয়েছে।’ জ্ঞানতাপস আব্দুল হামিদ আল্লাহর নির্দেশ ‘ভূ-পৃষ্ঠে ভ্রমণ করো’- এই মহৎ বাণীর কারণেই দেশ ভ্রমণে আগ্রহী হয়েছিলেন এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছিলেন। ভ্রমণ শেষে তার অর্জিত অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের কথা গ্রন্থ লিখে প্রকাশও করেছেন। যাতে সাধারণ মানুষ তার অভিজ্ঞতার কথাগুলো জানতে পারেন। ভ্রমণকালে প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের জীবনবোধ,ধর্ম-অধর্ম , নাস্তিক-আস্তিক, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, জায়েজ-নাজায়েজসহ নানা বিষয়ে ব্যাপক পার্থক্য লক্ষ করেছেন। প্রাচ্যের দেশগুলোতে দারিদ্রের নির্মম বিষয় থাকা সত্ত্বেও পাশ্চাত্যের চেয়ে যে নানা ক্ষেত্রে অনেক উন্নত সেটাও তিনি উপলব্ধি করেছেন। তার মতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যত শাখা প্রশাখা আছে তার প্রায় সব কিছুর আঁতুর ঘর হচ্ছে প্রাচ্যভূমি। মানব জীবনের শালীনতা, ধর্ম, ভ্রাতৃত্ববোধ, আত্মীয়তার বন্ধন প্রভৃতির শিক্ষাগারও যে প্রাচ্যের ভূখন্ড সে কথাও অকপটে উল্লেখ করেছেন তিনি। প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের প্রেক্ষাপটে মদ্যপানের বিষয় নিয়েও তিনি তাঁর অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে আমেরিকার অধিবাসীদের মধ্যে শতকরা ৯৫ জনই মদ পান করেন। অনেকে নেশাগ্রস্ত হয়ে অন্যায় অপকর্মেও লিপ্ত হন। এ কারণে ১৯১৯ সালে আমেরিকায় মদ্যপান নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু মদাসক্ত জাতি আইন অমান্য করে মদ্যপান অব্যাহত রাখে। এই অবস্থার প্রেক্ষিতে অবশেষে সরকার পুনরায় ১৯৩৩ সালে ‘মদ্যপান নিষিদ্ধ আইন’ বাতিল করে বাধ্য হয়। মানব রচিত আইন কিভাবে ব্যর্থ হয় অধ্যাপক হামিদ সেকথা বলতে গিয়ে আল্লাহর আইন কিভাবে সফল হয় সেকথা তুলে ধরেছেন। মদপান করে নামাজে অংশগ্রহণ করা নিষিদ্ধ হলে অনেকেই মদপান ছেড়ে দেন।
এরপর মদ হারাম করা হলে মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকেরা তা পালন করতে শুরু করেন। মদ নিষিদ্ধের আয়াত নাজিল হলে আরবের রাস্তায় ফেলে দেয়া মদের স্রোত বইয়ে গিয়েছিলো। মানব রচিত আইন আর আল্লাহর আইনের মধ্যে এটাই পার্থক্য।
পাশ্চাত্যের চিত্র আঁকতে গিয়ে তিনি দেখিয়েছেন বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মাকে কতটা অসহায় অবস্থায় থাকতে হয়। পক্ষান্তরে প্রাচ্যে যে পাশ্চাত্যের তুলনায় বাবা-মা অনেকটাই স্বাভাবিক জীবন যাপন করেন সেটাও তিনি দেখিয়েছেন। শুধু তাই নয় পাশ্চাত্যে যে বিবাহ বহির্ভূত অবস্থায়ও নারী-পুরুষ স্বামী-স্ত্রীর মত জীবনযাপন করতে পারে সে বিষয়কে বিস্তৃত বর্ণনায় প্রকাশ করেছেন। যা প্রাচ্যের দেশগুলোতে অবৈধ মনে করা হয়।
আমেরিকার সমাজ ব্যবস্থা কেমন , নারী-পুরুষরা কতটা ফ্রি, তাদের জীবন যাপন কতটা বাধাহীন তার বর্ণনা দিতে গিয়ে অধ্যাপক হামিদ বাংলাদেশের কবি ফারুক নওয়াজের এক ছড়ার উদ্ধৃতি দিয়েছে। ছড়ার অন্তর্নিহিত অভিব্যক্তি নিম্নরুপ-
“আজব দেশ আমেরিকা, সকল দেশের সেরা,
কল টিপলে খাবার আসে, চোখ টিপলে মেয়ে।”
আমেরিকায় অবস্থানকারী বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নারী-পুরুষও যে আমেরিকার মতই পাপ পূণ্যের কথা না ভেবে লাগামহীনভাবে জীবন যাপন করেন এবং অবৈধভাবে মেলামেশা করেন তারও রগরগে বর্ণনা দিয়েছেন অধ্যাপক আব্দুল হামিদ। এভাবেই তিনি প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের পার্থক্যের বিষয়গুলো বর্ণনা করেছেন তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে। তবে পাশ্চাত্যে যে, কিছু কিছু ধর্মভীরু পরিবারও বসবাস করেন সে কথাও বলতে ভুলেননি তিনি।
আমরা যে চিন্তার কথা বলি, ভাবনার কথা বলি সেই চিন্তা কিংবা ভাবনার কোন সরল ব্যাখ্যা নেই। বহুমুখী ব্যাখ্যা রয়েছে এ দুটি শব্দের। সহজ কথায় বললে ভালো এবং মন্দ এই দুই ভাবে চিন্তা এবং ভাবনাকে বিভক্ত করা যায়। এই ভালো-মন্দের আলোকেই বিজ্ঞ পন্ডিত আব্দুল হামিদ তাঁর সমস্ত বিষয়কে বিশ্লেষণ করেছেন। এই মহান শিক্ষাবিদ আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। ১৯৬৪-৬৫ সালে আমি যখন পাবনা সরকারী এডওয়ার্ড কলেজে পড়ি তখন তিনি আমাদের ক্লাস নিতেন কেমিষ্ট্রি বিষয়ে। সেই থেকে তার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক। তিনি আমাকে স্নেহ করতেন। আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে শিক্ষকতা করি তখন যতবার তিনি ঢাকায় এসেছেন ততবারই তিনি আমার বাসায় এসেছেন। তিনি কি কি করছেন, কি করতে চান ইত্যাকার বিষয়ে আলোচনা করতেন আমার সঙ্গে। দীর্ঘক্ষণ কথাবার্তা বলা এবং আপ্যায়নের পর তিনি বিদায় নিতেন। তার মৃত্যুর পুর্ব পর্যন্ত এ সম্পর্ক বজায় ছিল।

আজ থেকে বেশ কয়েক বছর পূর্বে সম্ভবত চাঁচকৈড় নাজিম উদ্দীন হাইস্কুল এন্ড কলেজের ৫০ বছর পূর্তি উৎসবে উপস্থিত থাকার জন্য তিনি আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। অনুষ্ঠানস্থল দর্শক শ্রোতায় পূর্ণ। আমি দর্শক সারিতে বসেছি। আমার পাশে বড়াইগ্রাম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল বারী এবং চাঁচকৈড়ের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ বসেছেন। এমতাবস্থায় অনুষ্ঠান শুরুর ঘোষণা দেয়া হলো মাইকে। আমি তখন অল্প বয়সের অনভিজ্ঞ একজন নগণ্য মানুষ। ঘোষণায় অনুষ্ঠানের অতিথিবৃন্দ এবং সভাপতির নাম ঘোষণা করে তাদেরকে মঞ্চে আসন গ্রহণ করতে বলা হলো। অনুষ্ঠানে সভাপতি হিসেবে আব্দুস সাত্তার এর নাম ঘোষণা করা হলো। সবাই যার যার মত গিয়ে মঞ্চে আসন গ্রহণ করলেন। কিন্তু সভাপতির আসনে কেউ বসলেন না। আমি ভেবেছি আব্দুস সাত্তার অন্য কোন অভিজ্ঞ প্রবীণ কেউ হবেন সেখানকার। সভাপতি হিসেবে আমাকে নির্বাচন করা হয়েছে এটাতো আমার ভাবনারও বাইরে। ফলে আমি বসেই রইলাম। পুনরায় আব্দুল হামিদ স্যার মাইকে ঘোষণা দিয়ে বললেন ঢাকার চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষক জনাব আব্দুস সাত্তারকে মঞ্চে সভাপতির আসন গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। ঘোষণার পরও আমি অস্বস্তিতে ভুগছি। কারণ আমার পাশে বসা আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক জনাব আব্দুল বারী। আমি ভাবছি বারী স্যারকে সভাপতি বানালেই মানানসই হতো। বারী স্যার আমার অসহায়ত্বের অবস্থা দেখে বললেন-যাও মঞ্চে গিয়ে বসো। এরপর মঞ্চে গিয়ে বসি। হামিদ স্যারের এই স্নেহ ও সম্মান দেয়ার বিষয়টি আমার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত স্মরণে থাকবে।
আমার নিরহঙ্কার,নির্লোভ এনং নীতি আদর্শের প্রতীক শ্রদ্ধেয় শিক্ষক আব্দুল হামিদ বাল্যকাল থেকেই ভ্রমণ পিপাসু ছিলেন। ফলে ছাত্রজীবনে তিনি চলনবিলের বিভিন্ন অঞ্চল,নাটোর,নওগাঁ,রাজশাহী,পাবনা,সিরাজগঞ্জ,কলকাতা, দার্জিলিং, এবং ঢাকা শহর ভ্রমণ করেছেন। কর্মজীবনে ভ্রমণ করেন পাকিস্তান, ভারত, সৌদি আরব। অবসর জীবনে থাইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, ইংল্যান্ড এবং আমেরিকা ভ্রমণ করেছেন। এসকল দেশ ভ্রমণের পেছনে তার মনস্তাত্ত্বিক বিষয় কাজ করেছে। তিনি মনে করতেন দেশ-বিদেশ ভ্রমণ ‘শিক্ষা-সফর’ তথা শিক্ষার অঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। পুঁথিগত শিক্ষার চেয়ে দেখে শেখাকে তিনি অধিক গুরুত্ব দিতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, বিদেশ ভ্রমণ হৃদয়কে প্রশস্ত ও উদার করে। আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব ও সৌহার্দ বৃদ্ধি করে। বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধও সৃষ্টি করে ভ্রমণ।

প্রবন্ধের শুরুতেই উল্লেখ করেছি যে, গবেষক আব্দুল হামিদ আল্লাহর অপার ক্ষমতা এবং ধর্মে গভীরভাবে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি প্রকৃতি এবং প্রকৃতির নানা বিষয়ে ভাবতেন এবং আল্লাহর ক্ষমতার প্রশংসা করতেন। তিনি ফুল নিয়েও ভেবেছেন। তিনি বলেছেন- বিভিন্ন প্রকার ফুল শুধু দেখতেই বিভিন্ন রূপ নয়, তাদের গন্ধও ভিন্ন ভিন্ন। প্রত্যেক ফুলের গন্ধ ও ফলের স্বাদ আলাদা আলাদা। কে করেছেন এসব সৃষ্টি?… বিশ্বের সকল বৈজ্ঞানিক মিলেও এমন প্রাণবন্ত ফুল-ফল সৃষ্টি করতে পারবেন না। সকল বৈজ্ঞানিকের মহাবিজ্ঞানী একমাত্র আল্লাহই পারেন সৃষ্টি করতে। ক্ষমতার দাপটে আমরা ধরাকে সরা জ্ঞান করি। আল্লাহর ও তার সৃষ্টির প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য ভুলে থাকি।
স্রষ্টার সৃষ্টির রহস্য পূর্ণমাত্রায় অনুভব করে কার সাধ্য। এটা গবেষক আব্দুল হামিদ উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও এ বিষয়ে সচেতন ছিলেন। তিনি বলেছেন ‘গোলাপের আছে বিশেষ আকার ও আয়তনের কতগুলো পাপড়ি, বোঁটা, তাকে ঘিরে আছে সবুজ পাতা। এই সমস্তকে নিয়েই বিরাজ করে ফুলের সৌন্দর্য। এই সৌন্দর্য রহস্যকে বিশ্লেষণ করে ব্যাখ্যা করবার অসাধ্য চেষ্টা করব না’।
মেধাবী এবং জ্ঞানীদের ভাবনা যে একই সূত্রে গাঁথা রবীন্দ্রনাথের এ বক্তব্য সে কথাই প্রমাণ করে।
সূত্র:
১. ‘পাশ্চাত্যের বৈশিষ্ট্য’- সরদার মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ
২. ‘প্রবাসী’- বৈশাখ ১৩৪১, ১ম খন্ড, ৩৪শ ভাগ।
———————————–
লেখকঃ সাবেক পরিচালক, চারুকলা ইনষ্টিটিউট
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
একুশে পদক জয়ী বরেণ্য শিল্পী

অধ্যাপক ড. মোঃ আব্দুস সাত্তার 


















