অধ্যক্ষ সরদার এম এ হামিদের সাথে আমার সান্নিধ্য শৈশবকাল থেকেই এবং সেটি পারিবারিক পর্যায় থেকে হলেও মূলতঃ সাহিত্য ও সমাজসেবার কারণেই। আমার পিতা মরহুম তোফায়েল উদ্দিন সিদ্দিকীর সাথে দেশভাগের আন্দোলনের সময় থেকে চলনবিল মুসলিম ছাত্র সমিতি (২০/০৬/১৯৪৭ খ্রিঃ), চলনবিল ডেভেলপমেন্ট কমিটি (বৃহত্তর রাজশাহী-পাবনা), গুরুদাসপুর থানা শিক্ষা সংঘ, চলনবিল পল্লী উন্নয়ন সমিতি (১৯৬৭ খ্রিঃ) প্রভৃতি সংঘ-সমিতি গঠণ এবং সেগুলির সাথে উভয়ে যুক্ত থাকায় পরষ্পরের বাড়ীতে নিয়মিত যাতায়াত ছিল। সেকারণেই আমার জীবনে শিশুভূলানো নাবিস্কো চকলেট-টফি থেকে তাঁর বাসার ডাইনিং টেবিল পর্যন্ত এবং শিক্ষা ও কর্মজীবনে অনেক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সভায় আমন্ত্রণে বা কার্যোপলক্ষ্যে সফরসঙ্গী ও সান্নিধ্যের সৌভাগ্য হয়েছে। সেই সুবাদে পরিচয় হয়েছে অনেক বিশিষ্টজনের সঙ্গে।

অধ্যক্ষ এম এ হামিদ একজন সত্যিকারের জ্ঞানী এবং সমাজহিতৈষী ব্যক্তি ছিলেন। সেকারণে তিনি জ্ঞানীগুণীর কদর বুঝতেন এবং সমঝদার ছিলেন, তাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন এবং মতবিনিময় করতেন। দেশে-বিদেশে যেখানে এবং যত দূর্গম এলাকাতেই যেতেন, সেখানকার গুণিজনের সাথে তাঁর প্রতিষ্ঠানে এমনকি বাড়ীতে যেয়ে দেখা করে আসতেন, নিজের লেখা বই উপহার দিতেন। তিনি বিশেষ করে আশির দশকে যেখানে যেতেন তাঁর উদ্ভাবিত এবং বাংলা একাডেমী ও কেবিনেট অনুমোদিত ‘আধুনিক বাংলা পঞ্জিকা’ বা ‘বঙ্গাব্দ সংষ্কারের’ প্রস্তাবের সমর্থনে স্বলিখিত এবং সাইক্লোস্টাইল করা হ্যান্ডবিল বিতরণ করতেন। এখানে আমার স্মৃতির অতল থেকে তেমনি কয়েকজন ব্যক্তির সাথে পরিচয়ের কথা বলবো।
অধ্যক্ষ এম এ হামিদ আমাকে একদিন বগুড়া থানা রোডের প্রজাবাহিনী প্রেসে নিয়ে গেলেন। সেখানে একজন একজন অশীতিপর বৃদ্ধকে দেখে তার সাথে মোসাফা করলেন। আমাকে বললেন, ‘ইনি হচ্ছেন কবি রোস্তম আলী কর্ণপূরী। বগুড়ার অনেক বড় কবি এবং সুলেখক।’ আমি ততদিনে তার কথা শুনেছি এবং লেখা পড়েছি। ঐদিন আরো জানলাম যে, তিনি বগুড়া জেলা স্কুলের কিংবদন্তী প্রধান শিক্ষক তাজমিলুর রহমার স্যারের শ্বশুর। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফর্সা দীর্ঘদেহী প্রেসের প্রৌঢ় মালিক সামনের একটি ভাঙ্গা দাঁতে উচ্ছ্বসিত হাসিসহ প্রবেশ করেই দু’জনের সাথে মোলাকাত করলেন। আমাকে বললেন ‘উনি হলেন বাচ্চু মিয়া তরফদার।’ পরে জানলাম তৎপিতা মরহুম রজিব উদ্দিন তরফদারই ছিলেন দৈনিক ‘প্রজাবাহিনী’ প্রেস ও পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা এবং উত্তরবঙ্গের প্রকাশনার অগ্রজ ও বিশিষ্ট লেখক। জনাব বাচ্চু মিয়া তফরফদার সেই পারিবারিক ঐতিহ্য বুকে আগলে ধরে রেখেছেন। পুরাতর ভাঙ্গাচোড়া টেবিলে সেদিন সেই ত্রিরত্নের জ্ঞানগর্ভ আলোচনা আমি অবাক বিস্ময়ে অনুধাবন করছিলাম।

একদিন বগুড়ার সপ্তপদী মার্কেটের করিডোরে কোনা ঝুলানো খদ্দরের পাঞ্জাবী পরিহিত নেতা গোছের কেউ ‘দোওয়া চাই, স্যার’ বলে একহাতে অধ্যক্ষ এম এ হামিদের পা’ ছুলেন । আমি বোবার মত মুখের দিকে তাকালে বললেন,‘ চেননা? এতো ফেরদৌস জামান মুকুল, কলেজের সাবার প্রিয় নেতা ছিল, এখন জননেতা’ বলে তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে থাকলেন। আমি আগেই মুকুল ভাইয়ের বিষয়ে শুনেছি সেদিন স্বচক্ষে দেখলাম।
একদিন পুলিশ বিভাগের এক আলোচনা সভায় ঢুকতেই অধ্যক্ষ এম এ হামিদ লেখিকা রোমেনা আফাজের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। গোয়েন্দা উপন্যাস বনহুর সিরিজের রোমেনা আফাজ এবং মাসুদ রানা সিরিজের কাজী আনোয়ার হোসেন আমাদের কাছে অত্যন্ত পাঠকনন্দিত ছিলেন। লাইব্রেরী থেকে বই ভাড়া নিয়ে বনহুর পড়তাম এবং পরবর্তী সংখ্যা প্রকাশের অপেক্ষা করতাম। ওনারা মঞ্চে গিয়ে বসলেন, আমি অডিয়েন্সে। পরিচিতি পর্বে রোমেনা আফাজ জানালেন যে তাঁর বাবা দারোগা (ইন্সপেক্টর) ছিলেন। তখন উপস্থিত সদর থানার ওসি তাঁর দিকে সেলুট ছুঁড়ে দিলেন। পরে খালাম্মার সাথে অনেকদিন যোগাযোগ ছিল। তাঁর পূত্র তখন বগুড়া মিনিবাস মালিক সমিতির সেক্রেটারী। আব্বার মৃত্যুসংবাদ জানার পর তাঁকে দাফনের জন্য অধ্যক্ষ এম এ হামিদ তার কাছে থেকেই একটি মাইক্রোবাস ভাড়া করে আমাকে নিয়ে শেষ বেলা রওয়ানা দিয়েছিলেন । কিন্ত সলঙ্গা নদী পর্যন্তই যেতেই রাত, মুষলধারে বৃষ্টি। খেয়া পার হয়ে আশ্রয় হলো যার বাড়ী পরে জানলাম তিনিও একজন বিশিষ্ট শিক্ষক, মরহুম আব্দুল আজিজ মাস্টার।
গুরুদাসপুর-তাড়াশ দুইটি উপজেলা সদর সংযুক্ত করে নাটোর-সিরাজগঞ্জ আন্তজেলা সড়ক নির্মানের জন্য প্রায় দশ বছর নিরলস পরিশ্রম করেছিলেন অধ্যক্ষ এম এ হামিদ। তাঁর নিকট আমি এ সংক্রান্ত দুইটি কোর্ট ফাইল ভর্তি চিঠিপত্র, ম্যাপ-নকশা দেখেছি। তখন চলনবিলবাসী যমুনাসেতু দিয়ে সড়কপথে সরাসরি ঢাকা যাওয়ার চিন্তাই করতে পারেননি, নাটোর থেকে পাবনা বা বগুড়া ঘুরে সিরাজগঞ্জ যেতে হতো। তখন তিনি সরকারি মজিবর রহমান মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ। আমাকে কলেজ অফিসে ডেকে নিলেন, সেখানে এক মহিলা বসেছিলেন তাকে দেখিয়ে বললেন, ইনি অধ্যাপক হোসনে আরা। পরে জানালেন তিনি প্রাকৃতিকভাবেই পুরুষ থেকে মহিলায় লিঙ্গান্তরিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি বিশিষ্ট এনজিও ব্যক্তিত্ব এবং এখনও টিএমএসএস এর কর্ণধার। তারপর আমাকে একটি খাম দেখিয়ে বললেন, মামা! একটা ভাল খবর আছে: তাড়াশ-খুবজীপুর-গুরুদাসপুরকে সংযুক্ত করেই মহাসড়কটি নির্মাণের গ্রীণ সিগন্যাল পেয়েছি। তুমি রাজশাহী সড়কভবনে যাও, ধামাইচ অথবা খুবজীপুর দুই ওয়েতেই সড়ক ও জনপথ বিভাগ থেকে সম্ভাব্যতা ও যৌক্তিকতা যাচাই করে পাঠাতে হবে। আমি হাতনকশা করে দিলাম, বাকীটা টেলিফোনে আলাপ করে নেব। পরদিন রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের বিপরীতে সড়কভবনে যার কাছে গেলাম তার নাম সম্ভবত: মোঃ ফজলুর রহমান, বেশ বড়সড় পদে ছিলেন। তিনি আমাকে আমার পিতৃপরিচয় সূত্রেই চিনলেন। বললেন, ‘তাড়াশের সগুনা (ধামাইচ- খুবজীপুর উভয় পথে কুন্দইল সংযোগ) সহ আটজন ইউপি ও দুইজন উপজেলা চেয়ারম্যানই ধামাইচের পক্ষে। এই দেশপ্রেমিক সমাজসেবকের স্বপ্ন শেষমেষ যে কি হবে, আল্লাহ মালুম।’
এরপর একদিন রাজশাহীতে অধ্যক্ষ এম এ হামিদের সফরসঙ্গী ছিলাম। নিয়ে গেলেন এক অফিসে যেখানে দুই স্তরের নিরাপত্তাবেষ্ঠিত একজন কর্মকর্তা, যিনি নিজে এগিয়ে এসে ভিতরে নিয়ে গেলেন। তিনি তখনকার রাজশাহীর সম্ভবত: ডিডিএনএসআই এবং নাম আমজাদ হোসেন। তবে আইন-শৃংখলা-নিরাপত্তা নয়, রাস্তাঘাট আর অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হলো ।

ছোটবেলা থেকেই আমার লেখালেখির প্রতি ঝোঁক, বগুড়ায় কোথাও একটু কাজ করতে চাই। তখন বগুড়া থেকে মোজাম্মেল হক লালু সম্পাদিত দৈনিক করতোয়া, মাহবুবুর রহমান ছোটন ভাইয়ের উত্তরবার্তা এবং দূর্গাদাস মূখার্জীর সম্পাদনায় দৈনিক উত্তরাঞ্চল প্রকাশিত হয়। এছাড়া, অধ্যাপক আব্দুর রউফ স্যারের সাপ্তাহিক জীবন নিয়মিত এবং অনেকটা অনিয়মিতভাবে সাপ্তাহিক কাঁকন প্রকাশিত হতো। করতোয়াকে তখন কেউ ‘মাটির ডাক’ (এরশাদের খাল খনন প্রকল্প) এর মুখপত্রও অর্থাৎ সরকারপন্থী কাগজ বলত। দৈনিক করতোয়া বেশী বেশী সরকারি বিজ্ঞাপন এবং রেশনের কাগজ পেত। অধ্যক্ষ এম এ হামিদ আমাকে দৈনিক উত্তরাঞ্চলে কাজ করার পরামর্শ দিলেন এবং একথাও বললেন, ‘দূর্গাদাস মুখার্জী একটু বামঘেঁষা হলেও অনেকটা বস্তুনিষ্ঠ।’ অমি স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে তাঁর কাগজে যোগ দিলেও রেডিওর খবর নোট করা, মফস্বল খবরের ডাক খোলা, প্রাথমিকভাবে নিউজ বাছাই এমনকি কোন কোন রাতে প্রুফও দেখতাম। দূর্গাদা মাঝে মাঝে দরদী কন্ঠে বলতেন, ‘রাঙ্গার মা, দেখতো ছেলেটা কিছু কি খেল!’ শাহ সুলতান কলেজের বাংলার অধ্যাপক তবিবুর রহমান স্যার এবং মারুফ কামাল খান সোহেল ভাই আমার ডেস্কের প্রাথমিক গুরু ছিলেন। অধ্যক্ষ এম এ হামিদ অধ্যাপক তবিবুর স্যারের সাথে পরিচয় এবং বেশ কয়েকদিন এ টি দেব এর ডিকশোনারি থেকে ও হাতেকলমে প্রুফ দেখা শিখিয়ে দিয়েছিলেন।
যে কারণে প্রসঙ্গটির অবতারণা : নভেম্বরের শেষের দিকে, দৈনিক উত্তরাঞ্চলের প্রতিষ্ঠাবর্ষিকীর অনুষ্ঠানে বদরুদ্দীন উমর আসবেন। অধ্যক্ষ এম এ হামিদ তখন প্রফেসর এবং সরকারি আযিযুল হক কলেজের ভাইস প্রিন্সিপ্যাল। দাওয়াতঁপত্র পেয়ে আমাকে বললেন অধ্যাপক ইউসুফ আলী সাহেবকে খবর দাও। দুইজনই তখন শহরের সেউজগাড়ীতে ভাড়া থাকেন। রাষ্ট্র বিজ্ঞানের ইউসুফ স্যার ও সুফিয়া ম্যাম দম্পতি কারমাইকেল রোড সংলগ্ন আর আমি মাঝামঝি ‘মৌমাছি খেলাঘর’ সংলগ্ন একটি বাসায় বারান্দার খোপে। ইউসুফ স্যারকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কলেজে রাস্ট্রবিজ্ঞানের বর্তমান কয়জন শিক্ষক বদরুদ্দির উমরের ছাত্র অছেন?’ স্যার বললেন ‘চার জন।’ তিনি পুনরায় বললেন, ‘ছাত্ররাও তো আছে, সবাইকে নিয়ে উনার একটি বক্তৃতার ব্যবস্থা করতে পারেন। শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের পরিধি বাড়বে। প্রফেসর বদরুদ্দিন উমর অনেক বড় মাপের বুদ্ধিজীবি এবং রাষ্ট্রচিন্তাবিদ। তার বাবা আবুল হাশিম বৃটিশভারতে একজন মুসলিম জাতীয়তাবাদী নেতা ছিলেন। সাতচল্লিশে ভারতবিভাগের বিরোধী থাকলেও, পঞ্চাশের পর তিনি জমিদারী ছেড়ে সপরিবারে তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানে চলে এসেছিলেন।.. ছেলে এখন কমিউনিষ্ট পার্টির আদর্শিক গুরু.. ।’ আরও অনেক কথা বললেন। সত্যি বদরুদ্দিন উমর স্যার কলেজের দোতলার হলঘরে প্রায় দুই ঘন্টা রাষ্ট্র, দর্শন এবং সমসাময়িক বিষয়ে পান্ডিত্যপূর্ণ বক্তৃতা ও অনেগুলি প্রশ্নের তাত্বিক ব্যাখ্যা দিলেন। রাস্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ ছাড়াও ছাত্র-শিক্ষক বিশেষ করে কৌতুহলী বাম-ডানপন্থী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের (তখন মওদুদীজমের নতুন পাঠকচক্র) ছাত্রনেতারা বিস্মিত হয়ে শুনলেন।
আমার এসএসসি সনদে পিতার নাম থেকে ‘খোন্দকার’ বাদ পড়েছিল। প্রধান শিক্ষক আলী আকবর স্যার সেকারণে পিপলার আযাদ স্যারকে ফরম পূরণের জন্য দোষারোপ করলেন। মূল সার্টিফিকেট বের হতে হতে ততদিনে এইচএসসি পরীক্ষাও হয়ে গিয়েছে। অধ্যক্ষ এম এ হামিদ স্যার পত্র লিখে মাউশিবো, রাজশাহীর তখনকার পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর তোজাম্মেল হোসেন স্যারের কাছে পাঠালেন। স্যার আমাকে চেয়ারম্যান প্রফেসর আবুল হোসেন স্যারের ( প্রাক্তন অধ্যক্ষ, সরকারি আযিযুল হক কলেজ) কক্ষে নিয়ে গেলেন। তিনি আমাকে সাথে দেখেই সাদরে বললেন, ‘আরে ওএসডি ( কলেজে অভিনিত আব্দুল্লাহ্ আল মামুনের নাটকে আমার চরিত্র) নাকি? এসো এসো।’ তখন স্যারদ্বয় গুরুত্বসহকারে আলোচনার পর ভারক্রান্ত মনে জানালেন, যেহেতু এসএসসি সনদে জন্ম তারিখ আছে, তাই ওটার পরিবর্তে এইচএসসি সনদ সংশোধন করে ‘বংশপদবী’টাই কেটে দিতে হবে এবং পড়ে নিরুপায় হয়ে তাই করা হয়েছিল।

১৯৯০ সালে আমি তখন রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায় চাকরি করি। উপজেলা চেয়ারম্যান এবং ভবাণীগঞ্জ কলেজের সত্তরের দশকের স্বনামধন্য অধ্যক্ষ আজহার আলী আমাকে ল্যান্ডফোনে ডেকে বললেন ‘দেখে যান, কে এসেছেন! নিয়ে যান।’ দ্রুত বাইক চালিয়ে গিয়ে দেখি অধ্যক্ষ এম এ হামিদ। তিনি রাজশাহী থেকে লক্কর-ঝক্কর মার্কা বাসে বাগমারা ডিঙ্গিয়েই উপজেলা সদরে চলে গিয়েছেন। নাস্তা -গল্প শেষে আমাকে বললেন ‘তোমার বাবা এবং আমাদের একসময়ের ঘনিষ্টজন মশিন্দা শিকারপুরের মওলানা ওমর ফারুকী, এখানকার বালানগড় মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল। অনেক বড় আলেম। তিনি নাকি এখানেই থাকেন।’ তাঁর বাসায় গেলাম। কুশলবিনিময় মোলাকাত কোলাকুলি হলো। তারপর বাইকে চড়ে বাগমারার ইউএনও আতাউর রহমান (আরমবাড়ীয়া, ঈশ্বরদী) এবং ওসি কাজী আতাউর রহমানের সাথে সাক্ষাৎ (পরে জানলাম ওসিভাবী প্রিন্সিপ্যাল ইব্রাহীম খাঁ’র বিশিষ্ট পরিবারের সদস্যা) এবং সবার অনুরোধ উপেক্ষা করে তিনি আমাদের ডক্টরস ডরমে ডালভাতে লাঞ্চ সারলেন। তারপর বাগমারা ও মোহনপুরের সর্বজন শ্রদ্ধেয় দুই প্রধান শিক্ষক যাঁরা এলাকায় শুধু ‘হেড স্যার’ নামে খ্যাত যথাক্রমে নূরুল ইসলাম এবং রাখাল চন্দ্র দাসের সাথে স্বাক্ষাৎ করলেন। সবার জন্য হাদিয়া ছিল স্বলিখিত বই এবং খুবজীপুর এম হক কলেজের সাহায্যের জন্য এক টাকা শুভেচ্ছামূল্যের টিকেট। বিকেলে মোহনপুর থেকে তাঁকে মান্দার প্রসাধপুরের উদেশ্যে নওগাঁগামী বাসে তুলে দিলাম।
অধ্যক্ষ এম এ হামিদের সৌজন্যে আমার বাংলা একাডেমীর দুইজন মহাপরিচালক ড. আশরাফ সিদ্দিকী, কাজী মুহম্মদ মনজুরে মওলা, পাবনার ভাষা সৈনিক ও সাংবাদিক রণেশ মৈত্র, কবি বন্দে আলী মিয়া, অধ্যাপক আবুল কাশেম, সমাজসেবার উপপরিচালক মমতাজ উদ্দিন ঢালীসহ অনেক প্রথিতযশা লেখক, বুদ্ধিজীবি শিক্ষক, সাংবাদিক, আলেম, পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা এবং সমাজসেবীর সাথে সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছে, সেসব বিস্তারিত লিখলে কলেবর অনেক বড় হয়ে যাবে। তাঁদের সাথে আমার মত নগণ্য ব্যক্তির নিজস্ব অবস্থান থেকে যোগাযোগের সামর্থ বা উপলক্ষ্য খুবই কম ছিল। অন্যদিকে অধ্যক্ষ এম এ হামিদকেও তাঁর মহান ব্যক্তিত্ব ও কর্মকান্ডের যৎকিঞ্চিৎ নিকট থেকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। হয়তোবা সেকাণেই আমার মরহুম পিতা আমাকে তাঁর শেষ কর্মস্থল বগুড়ার কলেজে পড়তে উৎসাহিত করেছিলেন।
ছোটবেলায় অধ্যক্ষ এম এ হামিদের পাবনার পৈলানপুরের বাড়ী থেকে শুরু করে আমার নিজের বাড়ী, বগুড়া, রাজশাহী ও ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন পারিবারিক সামাজিক, সাংষ্কৃতিক, ধর্মীয় ও দাপ্তরিক কার্যক্রমের সূত্র ধরে বিভিন্ন বরেণ্য ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎলাভ ও পরিচিতির সুযোগ হয়েছে যাঁদের অনেকের সাথে পরবর্তীতেও যোগাযোগ অব্যহত ছিল।
পরিশেষে বলতে চাই অধ্যক্ষ এম এ হামিদ একজন সত্যিকারের সমাজ সংস্কারক, মহৎপ্রাণ, আলোকিত ব্যক্তি ছিলেন; তাই তাঁর মহৎকর্ম ও বিচরণ ক্ষেত্রের ঘনিষ্ট সহচরগণের বেশীর ভাগই ছিলেন স্ব স্ব প্রতিভা ও মহিমা আলোকবর্তীকায় ভাস্বর ব্যক্তি। সেই মহাজনদের মাত্র কয়েকজনের সাথে সাক্ষাতের সুযোগে আমি অনেক উপকৃত এবং অনুপ্রাণিত হয়েছি। তাই কবির ভাষায় বলতে চাই-
“মহাজ্ঞাণী মহাজন, যে পথে করে গমন হয়েছেন প্রাতঃস্মরণীয়,
সেই পথ লক্ষ্য করে, স্বীয় কীর্তি ধ্বজা ধরে আমরাও হব বরণীয়।”
—————————
লেখকঃ প্রাবন্ধিক ও লেখক
অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা
shamsulchalonbil@gmail.com

শামসুল আলম সেলিম 

















