১৯৬৮ সালের কথা। বাবার কোলে চড়ে কিংবা হাত ধরে স্কুলে এসে নদীর কিনারে দাঁড়িয়ে দুটি বিশাল আকৃতির এবং একটি ছোট্ট লঞ্চ দেখতে পেলাম। বিশাল আকৃতির লঞ্চের একটিতে শেরওয়ানি পরিহিত, শ্মশ্রুমণ্ডিত এবং একটি এটাচি ব্যাগ হাতে সৌম্য ক্লান্তিময় চেহারার এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন। বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম উনি কে.? বাবা বললেন, ইনিই আমাদের বিখ্যাত হামিদ সাহেব।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খাঁন , খুবজীপুর হাই স্কুলে এসেছিলেন। সেই দিনই প্রথম আমার বাবার কাছ থেকে অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদের পরিচয় পেয়েছিলাম। তারপর তো জীবনের প্রায় ২৫ বছর কেটে গেছে, তার অনুপম সান্নিধ্যে,তখন তিনি আমার কাছে অধ্যাপক কিংবা অধ্যক্ষ নন, পরম ভালোবাসার হামিদ ভাই। তাঁরই আপন হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান খুবজীপুর মোজ্জামেল হক কলেজে আমাকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে আজীবন কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ করেছেন। জীবনের পরতে পরতে হামিদ ভাইয়ের অবদান|
আমি তাঁর শিক্ষকতা জীবন নিয়ে খানিকটা আলোকপাত করতে চাই। ১৯৫৩ সালের শুরু থেকে এম এসসি- পরীক্ষার ফল প্রকাশের পূর্ব পর্যন্ত অধ্যক্ষ এম এ হামিদ ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ থানার কলাতিয়া হাই স্কুলে শিক্ষকতা করেন। তারপর রংপুর কারমাইকেল কলেজ, পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ, যশোর এম এম কলেজ, মহিপুর হাজী মোহাম্মদ মহসিন কলেজ, ডেপুটেড অধ্যক্ষ, বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজ, অধ্যক্ষ মজিবুর রহমান সরকারি মহিলা কলেজে যোগদান এবং ১৯৮৮ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি তিনি অবসরে যান।

নিজ গ্রাম এবং বিভিন্ন অঞ্চলে নানা ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ ক্লাব, পাঠাগার, পোস্ট অফিস গড়ে তোলার পিছনে তার শিক্ষকতা সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। কারণ তিনি দেশের নামীদামী – কলেজে শিক্ষকতা করায়, তাঁরই ছাত্রেরা দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। সেই সুবাদে অধ্যক্ষ এমএ হামিদের পক্ষে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কাজটি সহজ হয়েছিল। A teacher is like a candle, it consumes itself to light the way for others. এই মহান শিক্ষক নিজে আলোকিত হয়ে অন্যকে আলোদান করেছেন। আলোকিত করেছেন তার আশেপাশের অন্ধকার। তাঁরই জ্বালানো দ্বীপ শিখায় আজ দেশের আনাচে কানাচে হাজারো প্রদীপ জ্বলছে ।
তিনি চলনবিলের ইতিকথার মত বিখ্যাত বই লেখার সাথে সাথে তাঁর প্রিয় ছাত্রদের জন্য Intermediate practical chemistry, Degree practical chemistry, রসায়নের তেলেসমাতী লিখেছেন। বহুচেষ্টা করেও এই বই গুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদের গুরু ভক্তি অচিন্ত্যনীয়। চাঁচকৈড় নাজিমুদ্দিন হাই স্কুলের প্রবাদ প্রতিম হেড মাস্টার জনাব রবিউল করিম ছিলেন তার প্রিয় শিক্ষক। এই প্রিয় শিক্ষকের মাথা ও হাত-পা টেপা,জামা কাপড় পরিষ্কার করা, গুরুর লেখা চিঠি গুরুদাসপুরে গিয়ে পোস্ট করা এ ছিল শিষ্যর নিত্যদিনের কাজ । আজকের দিনে এমন শিষ্য মেলা ভার।
সুখ -দুঃখের শেষ পরিণাম হিসেবে আমরা সবাই এক মুষ্টি ধুলো হয়ে যাব কিন্তু যার যা সৃষ্টি তা তাকে স্মরণে রাখবে যুগ যুগ ধরে।
অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু আছে তার বিশাল কর্মযজ্ঞ। তাঁকে মনে রাখার জন্য তাই যথেষ্ট।
তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম….।
—————————-
লেখকঃ অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক
খুবজীপুর এম হক ডিগ্রী কলেজ

মোঃ গোলাম মোস্তফা 

















