ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
অধ্যক্ষ এম এ হামিদের ২০ তম মৃত্যুবার্ষিকী

ভাইজানকে যেমন দেখেছি

blank

চলনবিলের কৃতি সন্তান অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ সাহেব ছিলেন আমার শ্রদ্ধেয় ‘হামিদ ভাইজান’। তার সাথে যখন আমার পরিচয় হয়েছিলো তখন আমি খুব সম্ভব সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। তার আব্বা দবির উদ্দিন সরদার ও আমার আব্বাজান এলাহী বকস সরকারের মধ্যে অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিলো। তিনি আমার আব্বাজানকে চাচাজান বলে ডাকতেন। যখনকার কথা বলছি তখন আব্বাজান বেশ অসুস্থ থাকায় তিনি তাকে দেখার জন্য আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। তখন তার সাথে আমার প্রথম দেখা। অবশ্য এর অনেক আগে থেকেই বিভিন্ন সময় তার নাম শুনে থাকলেও কখনও সামনাসামনি দেখার সৌভাগ্য হয়নি। আমার মনে আছে প্রথম দেখাতেই তিনি অত্যন্ত আন্তরিক ব্যবহার করেছিলেন ও আমার পড়াশোনা সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়ে ভালোভাবে লেখাপড়া করার জন্য অনেক উৎসাহ দিয়েছিলেন। তার পরণে ছিলো সাদা পায়জামা পাঞ্জাবী ও হাতে ছিলো একটা এটাচী কেস। বলতে গেলে এই এটাচী কেসটা ছিলো তার ট্রেড মার্ক। তিনি যেখানেই যেতেন, বিভিন্ন রকমের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে ঠাসা এই এটাচী কেসটা তার হাতে থাকতো। প্রথম দিন তাকে যে বেশে দেখেছিলাম সারাটি জীবন সেই একই বেশে দেখে এসেছি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এই ধরনের পোষাকই পরিধান করে থাকতেন। কালের বিবর্তনে তার শরীরে বার্ধক্যের ছাপ পড়া ছাড়া আর কোন পরিবর্তন হয়েছিলো বলে মনে পড়ে না।

 

অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ ১৯৫৪ সালে ‘গুরুদাসপুর থানা শিক্ষাসংঘ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলেন যেটার অবস্থান ছিলো গুরুদাসপুরের পাশে চাঁচকৈড় বাজারে। সেই সুবাদেই আমি প্রথম তার নাম শুনেছিলাম। শিক্ষাসংঘের বার্ষিক মুখপত্রের নাম ছিলো ‘অভিযান’। সেকালে এই পত্রিকায় কাঁচা হাতের লেখা ছাপার মাধ্যমে চলনবিল এলাকার অনেক উঠতি লেখকের লেখার জগতে পদার্পণে হাতেখড়ি হতো। উল্লেখ্য, পরবর্তীতে আমি নবম শ্রেণীতে পড়ার সময় ছাপার অক্ষরে আমার প্রথম লেখা ‘জাগরণ’ নামক কবিতাটিও এই পত্রিকাতেই ছাপা হয়েছিলো। এরপর স্কুল জীবনের পাট চুকিয়ে যখন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে আইএসসি-তে ভর্তি হলাম তখন তিনি ছিলেন সেই কলেজের রসায়ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। তাকে পেলাম একাধারে শিক্ষক ও অভিভাবক হিসেবে। কলেজে পড়ার সময় তার সাথে ধীরে ধীরে আমার ঘনিষ্ঠতা এতোটাই বৃদ্ধি পেয়েছিলো যে কখন আমাদের ছাত্র শিক্ষকের সম্পর্ক ছাপিয়ে বড়ভাই-ছোটভাইয়ের সম্পর্ক স্থান করে নিয়েছিলো ও তিনি আমার ‘ভাইজানে’ পরিণত হয়েছিলেন তা বুঝতে পারিনি। তিনি আমাকে কতোটা স্নেহ করতেন তার একটা উদাহরণ দিলে সহজে বুঝা যাবে। আইএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট আউটের সময় আমি ছিলাম চলনবিলের অনগ্রসর এলাকায় গ্রামের বাড়িতে। একালের মতো তখন যোগাযোগ  ব্যবস্থা মোটেই উন্নত ছিলো না। চিঠি, টেলিগ্রাম ও খবরের কাগজই ছিলো একমাত্র ভরসা যার সবগুলোই ছিলো বেশ সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। সেকালে আমাদের এলাকায় খবরের কাগজ পৌঁছাতে  দুই তিন দিন সময় লেগে যেতো। উল্লেখ্য, আমার ম্যাট্রিকুলেশনের রেজাল্ট বের হবার কয়েকদিন পরে খবরের কাগজেই প্রথম দেখেছিলাম। যাহোক, গ্রামে বসে আমি যখন আইএসসির রেজাল্টের জন্য হা-পিত্যেস করছিলাম তখন পাবনা থেকে ভাইজানের পোস্ট কার্ডে লেখা একটা চিঠির মাধ্যমে জানলাম যে, আমি প্রথম বিভাগে পাশ করেছি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নবম স্থান অধিকার করেছি। তখন কী যে খুশী লেগেছিলো তা বলার নয়। কলেজে রেজাল্ট পাওয়ার সাথে সাথেই ভাইজান আমার কথা মনে করে চিঠিটা লিখেছিলেন। অন্যথায় আমাকে রেজাল্টের জন্য আরো অপেক্ষা করতে হতো।

blank

ভাইজান ছাত্রদের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করতেন। তিনি সবাইকে মনোযোগের সাথে পড়াশোনা করার জন্য উৎসাহিত করতেন, এমন কি প্রণোদনাও দিতেন। কলেজে আমাদেরকে প্রথম বর্ষে Inorganic Chemistry ও দ্বিতীয় বর্ষে Organic Chemistry পড়ানো হতো। তিনি শুরুর দিকে একদিন ক্লাসে ঘোষণা করলেন যে, বার্ষিক পরীক্ষায় যে ছাত্র রসায়নে সর্বোচ্চ নাম্বার পাবে তাকে তিনি Organic Chemistry বইটি উপহার দিবেন। এই উপহারটা পেয়েছিলো মোহাম্মদ আলী নামে আমাদের এক সহপাঠী। ভাইজান এ সময় শালগাড়িয়া এলাকায় একটা ভাড়া বাসায় থাকতেন। তার সাথে আরো কয়েকজন ছাত্রও মেস করে থাকতো বলে মনে পড়ে। তার সম্পাদনায় এখান থেকে ‘আমাদের দেশ’ নামে একটা মাসিক পত্রিকা বের হতো। আমিসহ আরো কিছু ছাত্র মাঝে মাঝে সেখানে গিয়ে পত্রিকার কাজে তাকে সাহায্য করতাম। কখনো কখনো  যে প্রেসে পত্রিকা ছাপা হতো সেখানে গিয়ে প্রুফ দেখার কাজও করতাম। আইএসসি পাশ করার পর আমি তৎকালীন আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম। তখন ভাইজানের ছোট ভাই সোহরাব হোসেন এই কলেজে চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ছিলেন। সেই সুবাদে তিনি ঢাকায় এলে তার ভাই ও আমাকে দেখতে আসতেন। একবার এরূপ আমাদের হোস্টেলে এসে বললেনঃ ‘আমার সাথে চলো, তোমাকে একজন বিখ্যাত লোকের কাছে নিয়ে যাবো’। জিজ্ঞেস করে জানলাম তিনি তার শিক্ষক চাঁচকৈড় হাই স্কুলের এক সময়ের কিংবদন্তি প্রধান শিক্ষক রবিউল করীম সাহেবের বাসায় যাবেন। আমি আগে থেকেই ওনার নাম জানতাম। তিনি চাঁচকৈড় হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক থাকাকালে আব্বাজানও সেই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। তার কাছেই রবিউল করীম সাহেবের নাম শুনতাম। তাকে চাক্ষুস দেখার একটা আগ্রহ ছিলো। তাই সহজেই রাজী হয়ে গেলাম। যাহোক, আমরা যখন তার বাসায় পৌঁছলাম তখন সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে। তিনি ছোট্ট একটা বাসায় একা থাকতেন। তিনি চিরকুমার ছিলেন জন্য স্ত্রীপুত্রের বালাই ছিলো না। আমার পরিচয় পেয়ে খুব খুশি হলেন ও আব্বাজানের খোঁজখবর নিলেন। পরবর্তীতে ভাইজান ‘শিক্ষার মশালবাহী রবিউল করীম’ নামে ওনার ওপর একটা বই লিখেছিলেন।

 

অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ ছিলেন মূলতঃ একজন শিক্ষাবিদ। সারাটি জীবন তিনি শিক্ষকতার মহান পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। দীর্ঘ ৩৪ বছর তিনি একটানা  শিক্ষকতা করেছেন এবং তারই ফাঁকে ফাঁকে সাহিত্যচর্চা ও সমাজসেবাও করেছেন। তিনি একজন সুসাহিত্যিক ছিলেন একথা যেমন সত্য, তিনি একজন একনিষ্ঠ সমাজসেবক ছিলেন একথাও তেমনই সত্য। তার সমাজসেবামূলক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৬৪ সনে তদানীন্তন পাকিস্তান সরকার তাকে ‘তমঘায়ে খিদমত’ খেতাবে ভূষিত করেছিলো। তখন তাকে উল্লেখ করা হতো অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ টিকে বলে। অবশ্য পরবর্তীকালে ১৯৬৯ সনের আইয়ূব বিরোধী গণ আন্দোলনের সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জনাব শামসুজ্জোহাকে গুলি করে হত্যার প্রতিবাদে তিনি এই খেতাব বর্জন করার সৎ সাহসও দেখিয়েছিলেন।

blank

তার রচিত ১৫/২০টি বইয়ের মধ্যে অধিক উল্লেখযোগ্য হচ্ছে চলনবিলের ইতিকথা, জ্ঞানের মশাল, পশ্চিম পাকিস্তানের ডায়েরী, হজ্জের সফর, রসায়নের তেলেসমাতি, আমাদের গ্রাম, চলনবিলের লোকসাহিত্য, দেখে এলাম অস্ট্রেলিয়া, শিক্ষার মশালবাহী রবিউল করীম, পল্লীকবি কারামত আলী, কর্মবীর সেরাজুল হক, ইত্যাদি। ‘দেখে এলাম অস্ট্রেলিয়া’ বইটি সাবলীল ভাষায় রচিত একটি অনবদ্য ভ্রমণ কাহিনী। এ ছাড়া, তার অন্যান্য প্রকাশনাগুলিও মূলতঃ শিক্ষামূলক, ঐতিহাসিক এবং গ্রামের অবহেলিত শিক্ষক ও গুণীজনদের জীবনীমূলক বই। এসব লেখার মাধ্যমে তিনি চলনবিল এলাকার উন্নয়ন ও সমাজের বৃহত্তর কল্যাণের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করে গেছেন।

 

তার বহুল প্রচারিত ও প্রশংসিত ‘চলনবিলের ইতিকথা’ বইটি সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর এক অনন্য অবদান যার ঐতিহাসিক মূল্য অপরিসীম। এই বই লিখে তিনি প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। এটি লিখার পেছনে তার নিরলস প্রচেষ্টা ও পরিশ্রমের যে অলিখিত কাহিনী রয়েছে তা অনেকেরই অজানা। এই বইটি লিখবার আগে প্রয়োজনীয় মাল মশলা যোগাড় করতে তাকে চলনবিলের প্রায় প্রতিটি এলাকায় ব্যাপকভাবে ভ্রমণ করতে হয়েছে। প্রসঙ্গত এ কথাটি উল্লেখ করতে গর্ব বোধ করছি যে, এডওয়ার্ড কলেজে ছাত্র থাকাকালে আমার ও সহপাঠী বিলশার আফসার আলীর সৌভাগ্য হয়েছিলো এই উদ্দেশ্যে চলনবিলের হাণ্ডিয়াল এলাকায় ভ্রমণের সময় তার সফরসঙ্গী হবার। হাণ্ডিয়াল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাহেব এই সফরকালে আমাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থাসহ বিভিন্নভাবে আমাদেরকে সহযোগিতা করেছিলেন। তার আন্তরিক আতিথেয়তা কোনদিন ভুলবার নয়। আমরা হাণ্ডিয়ালে অবস্থান করে আশপাশের এলাকায় গিয়ে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করতাম। তখন ছিলো বর্ষাকাল। আমাদেরকে বেশীরভাগ সময় চলাফেরা করতে হতো নৌকাযোগে। সে সময় ভাইজানকে দেখেছি কী অপরিসীম ধৈর্য সহকারে ও অবর্ণনীয় কষ্ট স্বীকার করে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করতে। এ সব সফরের সময় তিনি গ্রামের তৃণমূল লোকদের সঙ্গে একান্তভাবে মিশে অনেক অজানা কাহিনী উদ্ধার করতেন।

blank

অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ সাহেব ছিলেন চলনবিল এলাকার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি পশ্চাদপদ চলনবিল এলাকার সার্বিক উন্নতির জন্য রাস্তাঘাট তৈরী ও স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠাসহ বহু জনহিতকর কাজের সাথে জড়িত ছিলেন। নিজ গ্রাম খুবজীপুরে তিনি ‘চলনবিল জাদুঘর’ নামে একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শুরুর দিকে জাদুঘরটির সংগ্রহশালার জন্য বিভিন্ন ধরনের দ্রব্যসামগ্রী সংগ্রহ করা ও সামগ্রিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ফাণ্ডের ব্যবস্থা করা এক দুরুহ ব্যাপার ছিলো। এর জন্য তাকে অমানবিক পরিশ্রম করতে হতো। এই পর্যায়ে তিনি বগুড়া আজিজুল হক কলেজের প্রিন্সিপাল থাকাকালে আমি কোন একটা কারণে আমার কর্মস্থল রাজশাহী হতে বগুড়া গিয়ে একদিন ভাইজানের বাসায় ছিলাম। তখন তিনি আমাকে জাদুঘরের আজীবন সদস্য হতে বললেন। আমি এক হাজার টাকা দিয়ে আজীবন সদস্য হলে তিনি এতো খুশি হলেন যে, সাথে সাথে তার এক মেয়েকে ডেকে বললেনঃ ‘দেখ, তোর চাচা আমার জাদুঘরের আজীবন সদস্য হয়েছে’। আমি পরে আমার সংগ্রহ থেকে জাদুঘরের জন্য বিভিন্ন দেশের কিছু ধাতব মুদ্রা পাঠিয়েছিলাম যা এর সংগ্রহশালায় রাখা আছে। এ ছাড়াও কোন এক সময়ে ভাইজানকে লেখা আমার এক পৃষ্ঠার একটা চিঠিও বাঁধাই করে সেখানে রাখা আছে। পরবর্তীকালে এই জাদুঘরটি পরিচালনার দায়িত্ব সরকার গ্রহণ করেছে। এটা এখন মোটামুটি ভালোভাবেই চলছে এবং চলনবিল এলাকার এক উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থাপনা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

 

১৯৭৪ সনে আমি সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় ওয়ার্কস ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন একটা বড় সেলুন কার মেরামত সম্পন্ন করার পর ট্রায়াল রানে নিয়ে যাচ্ছিলাম। আমার সাথে ক্যারেজ শপের ফোরম্যান ও সংশ্লিষ্ট কারিগরী স্টাফ ছিলো। পথে দুপুরের পর পাঁচবিবি স্টেশনে ট্রেন থামলে সেলুনটি মূল ট্রেন থেকে বিচ্ছিন্ন করে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হচ্ছিলো। কাজ শেষ হতে কিছুটা বিলম্ব হওয়ায় ট্রেনটি আমাদেরকে রেখে যথাসময়ে ছেড়ে দিলো। ফলে আমাদের সামনে পরবর্তী ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া কোন পথ ছিলো না। ভাইজান তখন এই স্টেশনের কাছেই মহীপুর কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তী ট্রেন আসা পর্যন্ত সময়টা কীভাবে কাটাবো ভাবতে ভাবতে তার কথা মনে পড়লো। একটা রিকসা নিয়ে কলেজের কাছেই ভাইজানের আস্তানায় গিয়ে হাজির হলাম। এই কলেজে শিকারপুরের লুতফর রহমান ভাইও অধ্যাপনা করতেন। তিনি ও ভাইজান একসাথেই থাকতেন। অপ্রত্যাশিতভাবে আমাকে পেয়ে তারা খুব খুশি হলেন। বিকেলে চা নাস্তা খেয়ে তাদেরকে সাথে নিয়ে স্টেশনে সেলুনে এলাম। সেখানেও আর এক দফা চা নাস্তা খাওয়া হলো। আমাদের ট্রেনের সময় হয়ে এলে তারা বিদায় নিলেন। ফলে অপেক্ষার সময়টা বেশ ভালোভাবেই কাটলো। পরবর্তীতে ভাইজান আমার সৈয়দপুরের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলেন।

blank

আমি ঢাকায় বদলী হয়ে আসার পর শাহজাহানপুর রেলওয়ে অফিসার্স কলোনীতে থাকতাম। ভাইজান সে সময় কোন কাজে ঢাকা এলে অবশ্যই আমার বাসায় আসতেন ও মাঝে মাঝে রাত্রিযাপন করতেন। বিদেশ ভ্রমণের সময় আমার বিচিত্র অভিজ্ঞতা নিয়ে বেশ কিছু লেখা সাপ্তাহিক বিচিত্রার ‘প্রবাস থেকে’ কলামে ছাপা হয়েছিলো। সেগুলো দেখে তিনি আমাকে লেখাগুলো একত্রিত করে একটা বই আকারে ছাপানোর জন্য উৎসাহ দিয়েছিলেন। শুধু উৎসাহ দিয়েই তিনি দায়িত্ব শেষ করলেন না। তার সাথে মোস্তফা হারুন নামে এক অনুবাদ গ্রন্থ লেখক ও সৌখিন প্রকাশনী নামক প্রকাশনা সংস্থার মালিকের ভালো পরিচয় ছিলো। তিনি একদিন আমাকে এজিবি কলোনীতে মোস্তফা হারুন সাহেবের বাসায় নিয়ে গিয়ে তার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন ও আমার লেখাগুলো বই আকারে প্রকাশের জন্য অনুরোধ করলেন। কিন্তু আমার লেখার সংখ্যা কম হওয়ায় তখন সেটা করা সম্ভব হয়নি। এর বেশ কিছুদিন পরে আরো কিছু ভ্রমণ সম্পর্কিত লেখা যোগ করে অন্য একজন প্রকাশকের মাধ্যমে ‘পথে প্রান্তরে’ নামে একটা বই প্রকাশ করেছিলাম। স্বীকার করতেই হবে এর পেছনে ভাইজানের উৎসাহ ও প্রেরণা কাজ করেছিলো।

 

পরিশেষে বলতে চাই স্বল্প পরিসরে ভাইজানের সাথে আমার স্মৃতির ঝাঁপিতে জমা থাকা সব কথা ও তার দীর্ঘ কর্মময় জীবনের ঘটনাবলী বিস্তারিত আলোচনা করা সম্ভব নয়। তবে এটুকু না বললেই নয় যে, তার বর্ণাঢ্য জীবনের অনেক কিছুই আমাদের জন্য অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় হয়ে রয়েছে।

—————————-

লেখকঃ সাবেক মহাপরিচালক

বাংলাদেশ রেলওয়ে             

 

জনপ্রিয় খবর

অধ্যক্ষ এম এ হামিদের ২০ তম মৃত্যুবার্ষিকী

ভাইজানকে যেমন দেখেছি

প্রকাশের সময় : এক ঘন্টা আগে
blank

চলনবিলের কৃতি সন্তান অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ সাহেব ছিলেন আমার শ্রদ্ধেয় ‘হামিদ ভাইজান’। তার সাথে যখন আমার পরিচয় হয়েছিলো তখন আমি খুব সম্ভব সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। তার আব্বা দবির উদ্দিন সরদার ও আমার আব্বাজান এলাহী বকস সরকারের মধ্যে অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিলো। তিনি আমার আব্বাজানকে চাচাজান বলে ডাকতেন। যখনকার কথা বলছি তখন আব্বাজান বেশ অসুস্থ থাকায় তিনি তাকে দেখার জন্য আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। তখন তার সাথে আমার প্রথম দেখা। অবশ্য এর অনেক আগে থেকেই বিভিন্ন সময় তার নাম শুনে থাকলেও কখনও সামনাসামনি দেখার সৌভাগ্য হয়নি। আমার মনে আছে প্রথম দেখাতেই তিনি অত্যন্ত আন্তরিক ব্যবহার করেছিলেন ও আমার পড়াশোনা সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়ে ভালোভাবে লেখাপড়া করার জন্য অনেক উৎসাহ দিয়েছিলেন। তার পরণে ছিলো সাদা পায়জামা পাঞ্জাবী ও হাতে ছিলো একটা এটাচী কেস। বলতে গেলে এই এটাচী কেসটা ছিলো তার ট্রেড মার্ক। তিনি যেখানেই যেতেন, বিভিন্ন রকমের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে ঠাসা এই এটাচী কেসটা তার হাতে থাকতো। প্রথম দিন তাকে যে বেশে দেখেছিলাম সারাটি জীবন সেই একই বেশে দেখে এসেছি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এই ধরনের পোষাকই পরিধান করে থাকতেন। কালের বিবর্তনে তার শরীরে বার্ধক্যের ছাপ পড়া ছাড়া আর কোন পরিবর্তন হয়েছিলো বলে মনে পড়ে না।

 

অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ ১৯৫৪ সালে ‘গুরুদাসপুর থানা শিক্ষাসংঘ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলেন যেটার অবস্থান ছিলো গুরুদাসপুরের পাশে চাঁচকৈড় বাজারে। সেই সুবাদেই আমি প্রথম তার নাম শুনেছিলাম। শিক্ষাসংঘের বার্ষিক মুখপত্রের নাম ছিলো ‘অভিযান’। সেকালে এই পত্রিকায় কাঁচা হাতের লেখা ছাপার মাধ্যমে চলনবিল এলাকার অনেক উঠতি লেখকের লেখার জগতে পদার্পণে হাতেখড়ি হতো। উল্লেখ্য, পরবর্তীতে আমি নবম শ্রেণীতে পড়ার সময় ছাপার অক্ষরে আমার প্রথম লেখা ‘জাগরণ’ নামক কবিতাটিও এই পত্রিকাতেই ছাপা হয়েছিলো। এরপর স্কুল জীবনের পাট চুকিয়ে যখন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে আইএসসি-তে ভর্তি হলাম তখন তিনি ছিলেন সেই কলেজের রসায়ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। তাকে পেলাম একাধারে শিক্ষক ও অভিভাবক হিসেবে। কলেজে পড়ার সময় তার সাথে ধীরে ধীরে আমার ঘনিষ্ঠতা এতোটাই বৃদ্ধি পেয়েছিলো যে কখন আমাদের ছাত্র শিক্ষকের সম্পর্ক ছাপিয়ে বড়ভাই-ছোটভাইয়ের সম্পর্ক স্থান করে নিয়েছিলো ও তিনি আমার ‘ভাইজানে’ পরিণত হয়েছিলেন তা বুঝতে পারিনি। তিনি আমাকে কতোটা স্নেহ করতেন তার একটা উদাহরণ দিলে সহজে বুঝা যাবে। আইএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট আউটের সময় আমি ছিলাম চলনবিলের অনগ্রসর এলাকায় গ্রামের বাড়িতে। একালের মতো তখন যোগাযোগ  ব্যবস্থা মোটেই উন্নত ছিলো না। চিঠি, টেলিগ্রাম ও খবরের কাগজই ছিলো একমাত্র ভরসা যার সবগুলোই ছিলো বেশ সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। সেকালে আমাদের এলাকায় খবরের কাগজ পৌঁছাতে  দুই তিন দিন সময় লেগে যেতো। উল্লেখ্য, আমার ম্যাট্রিকুলেশনের রেজাল্ট বের হবার কয়েকদিন পরে খবরের কাগজেই প্রথম দেখেছিলাম। যাহোক, গ্রামে বসে আমি যখন আইএসসির রেজাল্টের জন্য হা-পিত্যেস করছিলাম তখন পাবনা থেকে ভাইজানের পোস্ট কার্ডে লেখা একটা চিঠির মাধ্যমে জানলাম যে, আমি প্রথম বিভাগে পাশ করেছি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নবম স্থান অধিকার করেছি। তখন কী যে খুশী লেগেছিলো তা বলার নয়। কলেজে রেজাল্ট পাওয়ার সাথে সাথেই ভাইজান আমার কথা মনে করে চিঠিটা লিখেছিলেন। অন্যথায় আমাকে রেজাল্টের জন্য আরো অপেক্ষা করতে হতো।

blank

ভাইজান ছাত্রদের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করতেন। তিনি সবাইকে মনোযোগের সাথে পড়াশোনা করার জন্য উৎসাহিত করতেন, এমন কি প্রণোদনাও দিতেন। কলেজে আমাদেরকে প্রথম বর্ষে Inorganic Chemistry ও দ্বিতীয় বর্ষে Organic Chemistry পড়ানো হতো। তিনি শুরুর দিকে একদিন ক্লাসে ঘোষণা করলেন যে, বার্ষিক পরীক্ষায় যে ছাত্র রসায়নে সর্বোচ্চ নাম্বার পাবে তাকে তিনি Organic Chemistry বইটি উপহার দিবেন। এই উপহারটা পেয়েছিলো মোহাম্মদ আলী নামে আমাদের এক সহপাঠী। ভাইজান এ সময় শালগাড়িয়া এলাকায় একটা ভাড়া বাসায় থাকতেন। তার সাথে আরো কয়েকজন ছাত্রও মেস করে থাকতো বলে মনে পড়ে। তার সম্পাদনায় এখান থেকে ‘আমাদের দেশ’ নামে একটা মাসিক পত্রিকা বের হতো। আমিসহ আরো কিছু ছাত্র মাঝে মাঝে সেখানে গিয়ে পত্রিকার কাজে তাকে সাহায্য করতাম। কখনো কখনো  যে প্রেসে পত্রিকা ছাপা হতো সেখানে গিয়ে প্রুফ দেখার কাজও করতাম। আইএসসি পাশ করার পর আমি তৎকালীন আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম। তখন ভাইজানের ছোট ভাই সোহরাব হোসেন এই কলেজে চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ছিলেন। সেই সুবাদে তিনি ঢাকায় এলে তার ভাই ও আমাকে দেখতে আসতেন। একবার এরূপ আমাদের হোস্টেলে এসে বললেনঃ ‘আমার সাথে চলো, তোমাকে একজন বিখ্যাত লোকের কাছে নিয়ে যাবো’। জিজ্ঞেস করে জানলাম তিনি তার শিক্ষক চাঁচকৈড় হাই স্কুলের এক সময়ের কিংবদন্তি প্রধান শিক্ষক রবিউল করীম সাহেবের বাসায় যাবেন। আমি আগে থেকেই ওনার নাম জানতাম। তিনি চাঁচকৈড় হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক থাকাকালে আব্বাজানও সেই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। তার কাছেই রবিউল করীম সাহেবের নাম শুনতাম। তাকে চাক্ষুস দেখার একটা আগ্রহ ছিলো। তাই সহজেই রাজী হয়ে গেলাম। যাহোক, আমরা যখন তার বাসায় পৌঁছলাম তখন সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে। তিনি ছোট্ট একটা বাসায় একা থাকতেন। তিনি চিরকুমার ছিলেন জন্য স্ত্রীপুত্রের বালাই ছিলো না। আমার পরিচয় পেয়ে খুব খুশি হলেন ও আব্বাজানের খোঁজখবর নিলেন। পরবর্তীতে ভাইজান ‘শিক্ষার মশালবাহী রবিউল করীম’ নামে ওনার ওপর একটা বই লিখেছিলেন।

 

অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ ছিলেন মূলতঃ একজন শিক্ষাবিদ। সারাটি জীবন তিনি শিক্ষকতার মহান পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। দীর্ঘ ৩৪ বছর তিনি একটানা  শিক্ষকতা করেছেন এবং তারই ফাঁকে ফাঁকে সাহিত্যচর্চা ও সমাজসেবাও করেছেন। তিনি একজন সুসাহিত্যিক ছিলেন একথা যেমন সত্য, তিনি একজন একনিষ্ঠ সমাজসেবক ছিলেন একথাও তেমনই সত্য। তার সমাজসেবামূলক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৬৪ সনে তদানীন্তন পাকিস্তান সরকার তাকে ‘তমঘায়ে খিদমত’ খেতাবে ভূষিত করেছিলো। তখন তাকে উল্লেখ করা হতো অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ টিকে বলে। অবশ্য পরবর্তীকালে ১৯৬৯ সনের আইয়ূব বিরোধী গণ আন্দোলনের সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জনাব শামসুজ্জোহাকে গুলি করে হত্যার প্রতিবাদে তিনি এই খেতাব বর্জন করার সৎ সাহসও দেখিয়েছিলেন।

blank

তার রচিত ১৫/২০টি বইয়ের মধ্যে অধিক উল্লেখযোগ্য হচ্ছে চলনবিলের ইতিকথা, জ্ঞানের মশাল, পশ্চিম পাকিস্তানের ডায়েরী, হজ্জের সফর, রসায়নের তেলেসমাতি, আমাদের গ্রাম, চলনবিলের লোকসাহিত্য, দেখে এলাম অস্ট্রেলিয়া, শিক্ষার মশালবাহী রবিউল করীম, পল্লীকবি কারামত আলী, কর্মবীর সেরাজুল হক, ইত্যাদি। ‘দেখে এলাম অস্ট্রেলিয়া’ বইটি সাবলীল ভাষায় রচিত একটি অনবদ্য ভ্রমণ কাহিনী। এ ছাড়া, তার অন্যান্য প্রকাশনাগুলিও মূলতঃ শিক্ষামূলক, ঐতিহাসিক এবং গ্রামের অবহেলিত শিক্ষক ও গুণীজনদের জীবনীমূলক বই। এসব লেখার মাধ্যমে তিনি চলনবিল এলাকার উন্নয়ন ও সমাজের বৃহত্তর কল্যাণের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করে গেছেন।

 

তার বহুল প্রচারিত ও প্রশংসিত ‘চলনবিলের ইতিকথা’ বইটি সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর এক অনন্য অবদান যার ঐতিহাসিক মূল্য অপরিসীম। এই বই লিখে তিনি প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। এটি লিখার পেছনে তার নিরলস প্রচেষ্টা ও পরিশ্রমের যে অলিখিত কাহিনী রয়েছে তা অনেকেরই অজানা। এই বইটি লিখবার আগে প্রয়োজনীয় মাল মশলা যোগাড় করতে তাকে চলনবিলের প্রায় প্রতিটি এলাকায় ব্যাপকভাবে ভ্রমণ করতে হয়েছে। প্রসঙ্গত এ কথাটি উল্লেখ করতে গর্ব বোধ করছি যে, এডওয়ার্ড কলেজে ছাত্র থাকাকালে আমার ও সহপাঠী বিলশার আফসার আলীর সৌভাগ্য হয়েছিলো এই উদ্দেশ্যে চলনবিলের হাণ্ডিয়াল এলাকায় ভ্রমণের সময় তার সফরসঙ্গী হবার। হাণ্ডিয়াল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাহেব এই সফরকালে আমাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থাসহ বিভিন্নভাবে আমাদেরকে সহযোগিতা করেছিলেন। তার আন্তরিক আতিথেয়তা কোনদিন ভুলবার নয়। আমরা হাণ্ডিয়ালে অবস্থান করে আশপাশের এলাকায় গিয়ে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করতাম। তখন ছিলো বর্ষাকাল। আমাদেরকে বেশীরভাগ সময় চলাফেরা করতে হতো নৌকাযোগে। সে সময় ভাইজানকে দেখেছি কী অপরিসীম ধৈর্য সহকারে ও অবর্ণনীয় কষ্ট স্বীকার করে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করতে। এ সব সফরের সময় তিনি গ্রামের তৃণমূল লোকদের সঙ্গে একান্তভাবে মিশে অনেক অজানা কাহিনী উদ্ধার করতেন।

blank

অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ সাহেব ছিলেন চলনবিল এলাকার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি পশ্চাদপদ চলনবিল এলাকার সার্বিক উন্নতির জন্য রাস্তাঘাট তৈরী ও স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠাসহ বহু জনহিতকর কাজের সাথে জড়িত ছিলেন। নিজ গ্রাম খুবজীপুরে তিনি ‘চলনবিল জাদুঘর’ নামে একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শুরুর দিকে জাদুঘরটির সংগ্রহশালার জন্য বিভিন্ন ধরনের দ্রব্যসামগ্রী সংগ্রহ করা ও সামগ্রিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ফাণ্ডের ব্যবস্থা করা এক দুরুহ ব্যাপার ছিলো। এর জন্য তাকে অমানবিক পরিশ্রম করতে হতো। এই পর্যায়ে তিনি বগুড়া আজিজুল হক কলেজের প্রিন্সিপাল থাকাকালে আমি কোন একটা কারণে আমার কর্মস্থল রাজশাহী হতে বগুড়া গিয়ে একদিন ভাইজানের বাসায় ছিলাম। তখন তিনি আমাকে জাদুঘরের আজীবন সদস্য হতে বললেন। আমি এক হাজার টাকা দিয়ে আজীবন সদস্য হলে তিনি এতো খুশি হলেন যে, সাথে সাথে তার এক মেয়েকে ডেকে বললেনঃ ‘দেখ, তোর চাচা আমার জাদুঘরের আজীবন সদস্য হয়েছে’। আমি পরে আমার সংগ্রহ থেকে জাদুঘরের জন্য বিভিন্ন দেশের কিছু ধাতব মুদ্রা পাঠিয়েছিলাম যা এর সংগ্রহশালায় রাখা আছে। এ ছাড়াও কোন এক সময়ে ভাইজানকে লেখা আমার এক পৃষ্ঠার একটা চিঠিও বাঁধাই করে সেখানে রাখা আছে। পরবর্তীকালে এই জাদুঘরটি পরিচালনার দায়িত্ব সরকার গ্রহণ করেছে। এটা এখন মোটামুটি ভালোভাবেই চলছে এবং চলনবিল এলাকার এক উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থাপনা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

 

১৯৭৪ সনে আমি সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় ওয়ার্কস ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন একটা বড় সেলুন কার মেরামত সম্পন্ন করার পর ট্রায়াল রানে নিয়ে যাচ্ছিলাম। আমার সাথে ক্যারেজ শপের ফোরম্যান ও সংশ্লিষ্ট কারিগরী স্টাফ ছিলো। পথে দুপুরের পর পাঁচবিবি স্টেশনে ট্রেন থামলে সেলুনটি মূল ট্রেন থেকে বিচ্ছিন্ন করে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হচ্ছিলো। কাজ শেষ হতে কিছুটা বিলম্ব হওয়ায় ট্রেনটি আমাদেরকে রেখে যথাসময়ে ছেড়ে দিলো। ফলে আমাদের সামনে পরবর্তী ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া কোন পথ ছিলো না। ভাইজান তখন এই স্টেশনের কাছেই মহীপুর কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তী ট্রেন আসা পর্যন্ত সময়টা কীভাবে কাটাবো ভাবতে ভাবতে তার কথা মনে পড়লো। একটা রিকসা নিয়ে কলেজের কাছেই ভাইজানের আস্তানায় গিয়ে হাজির হলাম। এই কলেজে শিকারপুরের লুতফর রহমান ভাইও অধ্যাপনা করতেন। তিনি ও ভাইজান একসাথেই থাকতেন। অপ্রত্যাশিতভাবে আমাকে পেয়ে তারা খুব খুশি হলেন। বিকেলে চা নাস্তা খেয়ে তাদেরকে সাথে নিয়ে স্টেশনে সেলুনে এলাম। সেখানেও আর এক দফা চা নাস্তা খাওয়া হলো। আমাদের ট্রেনের সময় হয়ে এলে তারা বিদায় নিলেন। ফলে অপেক্ষার সময়টা বেশ ভালোভাবেই কাটলো। পরবর্তীতে ভাইজান আমার সৈয়দপুরের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলেন।

blank

আমি ঢাকায় বদলী হয়ে আসার পর শাহজাহানপুর রেলওয়ে অফিসার্স কলোনীতে থাকতাম। ভাইজান সে সময় কোন কাজে ঢাকা এলে অবশ্যই আমার বাসায় আসতেন ও মাঝে মাঝে রাত্রিযাপন করতেন। বিদেশ ভ্রমণের সময় আমার বিচিত্র অভিজ্ঞতা নিয়ে বেশ কিছু লেখা সাপ্তাহিক বিচিত্রার ‘প্রবাস থেকে’ কলামে ছাপা হয়েছিলো। সেগুলো দেখে তিনি আমাকে লেখাগুলো একত্রিত করে একটা বই আকারে ছাপানোর জন্য উৎসাহ দিয়েছিলেন। শুধু উৎসাহ দিয়েই তিনি দায়িত্ব শেষ করলেন না। তার সাথে মোস্তফা হারুন নামে এক অনুবাদ গ্রন্থ লেখক ও সৌখিন প্রকাশনী নামক প্রকাশনা সংস্থার মালিকের ভালো পরিচয় ছিলো। তিনি একদিন আমাকে এজিবি কলোনীতে মোস্তফা হারুন সাহেবের বাসায় নিয়ে গিয়ে তার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন ও আমার লেখাগুলো বই আকারে প্রকাশের জন্য অনুরোধ করলেন। কিন্তু আমার লেখার সংখ্যা কম হওয়ায় তখন সেটা করা সম্ভব হয়নি। এর বেশ কিছুদিন পরে আরো কিছু ভ্রমণ সম্পর্কিত লেখা যোগ করে অন্য একজন প্রকাশকের মাধ্যমে ‘পথে প্রান্তরে’ নামে একটা বই প্রকাশ করেছিলাম। স্বীকার করতেই হবে এর পেছনে ভাইজানের উৎসাহ ও প্রেরণা কাজ করেছিলো।

 

পরিশেষে বলতে চাই স্বল্প পরিসরে ভাইজানের সাথে আমার স্মৃতির ঝাঁপিতে জমা থাকা সব কথা ও তার দীর্ঘ কর্মময় জীবনের ঘটনাবলী বিস্তারিত আলোচনা করা সম্ভব নয়। তবে এটুকু না বললেই নয় যে, তার বর্ণাঢ্য জীবনের অনেক কিছুই আমাদের জন্য অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় হয়ে রয়েছে।

—————————-

লেখকঃ সাবেক মহাপরিচালক

বাংলাদেশ রেলওয়ে