ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
অধ্যক্ষ এম এ হামিদের ২০ তম মৃত্যুবার্ষিকী

অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ: অনুকরণীয় এক জীবন, অনুসরণীয় এক আদর্শ

blank

মানুষ তার জীবন গড়ে তোলে মূলত অনুকরণ ও অনুসরণের মধ্য দিয়ে। সন্তান পিতা-মাতার কাছ থেকে শেখে, শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের কাছ থেকে জ্ঞান ও জীবনবোধ অর্জন করে। একজন নেতা-নেত্রীও দেশ-জাতির ইতিহাসে যাঁরা নেতৃত্বের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তাঁদের জীবন, কর্ম ও আদর্শ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন। যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয়ী সেনাপতিরা যেমন সফল যোদ্ধাদের রণকৌশল ও অভিজ্ঞতা অধ্যয়ন করেন, তেমনি মানুষের কল্যাণের পথও উন্মোচিত হয় ধর্মীয় নীতিমালা, মহামানবদের জীবন ও তাঁদের প্রদর্শিত আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে।

যাঁরা ত্যাগ, তপস্যা ও নিরলস কর্মের মধ্য দিয়ে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন, তাঁদের রেখে যাওয়া কীর্তি যুগের পর যুগ অন্যদের অনুপ্রেরণা জোগায়। তাঁদের জীবন ও কর্ম থেকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে জন্ম নেয় ত্যাগী, আদর্শবান ও মানবকল্যাণে নিবেদিত মানুষেরা।

অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ সাহেব ছিলেন তেমনই একজন অনুকরণীয় ও আদর্শ মানুষ। তিনি ছিলেন এক সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন ছিল অসাধারণ—গরিব, অসহায় ও অশিক্ষিত মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটানো। মানুষের কল্যাণ ও এলাকার উন্নয়নকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেই তিনি ধীরে ধীরে সমাজে একজন আদর্শ ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

যখন অধিকাংশ মানুষ নিজের ভবিষ্যৎ, নিজের পরিবার ও ব্যক্তিগত স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত, তখন আব্দুল হামিদ সাহেবের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল অন্যের কল্যাণ। মানুষের ভালো থাকা, এলাকার উন্নয়ন এবং পিছিয়ে পড়া মানুষকে এগিয়ে নেওয়াই হয়ে উঠেছিল তাঁর জীবনের অন্যতম ব্রত।

পিতার কঠোর শাসন এবং লেখাপড়ার প্রতি তাঁর অসীম উৎসাহ ও সহযোগিতা আব্দুল হামিদ সাহেবকে ছাত্রজীবনেই সাফল্যের পথে এগিয়ে দেয়। তিনি নিয়মিত ভালো ফলাফল অর্জন করতেন। ফলে ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর মেধা, অধ্যবসায় ও চরিত্রের প্রতি সহপাঠী, শিক্ষক ও এলাকার মানুষের শ্রদ্ধা ও প্রশংসা তৈরি হয়। তিনি কখনো লক্ষ্যচ্যুত হননি; বরং নিজের জীবন গড়ার পাশাপাশি অন্যদের জীবন গড়ার চিন্তাও সব সময় নিজের মধ্যে ধারণ করেছেন।

blank

তিনি ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ। তবে তাঁর ধর্মচেতনা ছিল কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বিশ্বাস করতেন—স্রষ্টাকে ভালোবাসার পাশাপাশি তাঁর সৃষ্টিকেও ভালোবাসতে হবে। সেই বিশ্বাস থেকেই ধর্ম, বর্ণ, উঁচু-নিচু কিংবা সামাজিক অবস্থানের কোনো পার্থক্য তিনি মানুষের মধ্যে করেননি। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সবাইকে তিনি সমানভাবে ভালোবাসতেন, পথ দেখাতেন এবং প্রয়োজনের সময় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেন।

স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতা মানুষের মহত্ত্বের পথে বড় বাধা। যে ব্যক্তি সব সময় শুধু নিজের কথা চিন্তা করে, সে অন্যের উপকার করতে পারে না, মানুষের দোয়া অর্জন করতে পারে না এবং স্রষ্টার সন্তুষ্টিও লাভ করতে পারে না। আব্দুল হামিদ সাহেব ছিলেন এর সম্পূর্ণ বিপরীত। নিজের সামর্থ্য, সময়, শ্রম ও সম্পদ—সবকিছু তিনি অন্যের কল্যাণে ব্যয় করেছেন।

বিভিন্ন এলাকা থেকে শিক্ষার্থীরা তাঁর বাড়িতে এসে থাকত। তিনি তাঁদের নিজের সন্তানের মতো আশ্রয় দিতেন এবং লেখাপড়া চালিয়ে গিয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জনে সহযোগিতা করতেন। নিজের প্রয়োজনের কথা না ভেবে অন্যের জীবন গড়ে দেওয়াকেই তিনি বড় করে দেখেছেন। তাঁর ব্যস্ততা কখনো তাঁকে মানুষের প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো থেকে বিরত রাখতে পারেনি।

কেউ বিপদে পড়েছে, কোথাও মানুষের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে কিংবা কোনো সামাজিক কাজে তাঁর উপস্থিতি দরকার—তিনি ছুটে গেছেন সেখানে। কারও কাছ থেকে সাহায্য বা অনুদান নিয়ে নয়; বরং অনেক সময় নিজের পকেট থেকে খরচ করেছেন। অর্থের সংকট দেখা দিলে প্রয়োজনে ধার করেও মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এমনকি তাঁর সঙ্গে যারা কোনো কাজে যেতেন, তাঁদের খরচও অনেক সময় তিনি নিজেই বহন করতেন।

তাঁর আতিথেয়তাও ছিল অনন্য। বাড়িতে মেহমান এলে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হতেন। ঘরে পর্যাপ্ত খাবার থাকুক বা না থাকুক, অতিথিকে তিনি সাদরে গ্রহণ করতেন। আমাদের দৈনন্দিন খাবার হয়তো ছিল ভাজি, ভর্তা, ডাল কিংবা পান্তা; কিন্তু অতিথি এলে তাঁর জন্য সাধ্য অনুযায়ী নানা ধরনের খাবারের আয়োজন করা হতো। তাঁর এই অসাধারণ আতিথেয়তার মধ্যে আমরা ইসলামের প্রাথমিক যুগের সাহাবায়ে কেরামের জীবনাদর্শের প্রতিফলন দেখতে পেতাম। তাই মাঝেমধ্যে আমরা মজা করে বলতাম—‘উনার তুলনা শুধু উনিই।’

blank

একজন বড় মানুষ হওয়ার জন্য প্রথম প্রয়োজন একটি পরিচ্ছন্ন ও উদার মন। অন্যের প্রতি বিদ্বেষ, হিংসা কিংবা খারাপ ধারণা পোষণ করে কেউ প্রকৃত অর্থে মহৎ হতে পারে না। স্রষ্টার ভালোবাসা পেতে হলে তাঁর সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ থাকা প্রয়োজন। আর সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হলে জ্ঞান অর্জনের বিকল্প নেই।

পৃথিবীর প্রতিটি ধর্মই স্রষ্টার উপাসনা, তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন, মানবসেবা, সৃষ্টির প্রতি দয়া এবং মানুষের প্রতি কর্তব্যবোধের শিক্ষা দেয়। কিন্তু জ্ঞান ছাড়া এসব মূল্যবোধ বাস্তব জীবনে যথাযথভাবে ধারণ ও প্রয়োগ করা কঠিন। তাই যাঁরা জ্ঞানী, উদার, মানবকল্যাণে নিবেদিত এবং ত্যাগের আদর্শে উজ্জীবিত, তাঁদের জীবন ও কর্ম পরবর্তী প্রজন্মের জন্য হয়ে ওঠে পথনির্দেশক।

শুধু বক্তৃতা দিয়ে মানুষ বড় হয় না। অধ্যয়ন, অধ্যবসায়, ত্যাগ, তিতিক্ষা এবং মানুষের কল্যাণে সক্রিয় অবদানই একজন মানুষকে সত্যিকার অর্থে মহৎ করে তোলে। অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ সাহেব ছিলেন জ্ঞানের এক বিশাল ভান্ডার। তাঁর বিভিন্ন লেখনীতে ছড়িয়ে আছে অগাধ জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও তথ্যের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার।

আজকের মতো যখন কম্পিউটার, ইন্টারনেট কিংবা আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা ছিল না, তখন বইপত্র অধ্যয়ন, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং নিরলস অনুসন্ধানের মাধ্যমেই জ্ঞান অর্জন করতে হতো। সেই সময়ে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করে সেগুলোকে লেখনীতে রূপ দেওয়া যে কত কঠিন ও শ্রমসাধ্য কাজ ছিল, তা সহজেই অনুমেয়। তাঁর জ্ঞানচর্চার ব্যাপকতা এবং নিরন্তর অধ্যয়ন তাঁকে জ্ঞানীদের কাতারে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান এনে দিয়েছিল। তাঁর জ্ঞান যেমন তাঁকে সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি অসংখ্য মানুষকে পথ দেখিয়েছে।

প্রথমেই বলেছি, মানুষ অনুকরণ ও অনুসরণের মধ্য দিয়েই জীবনের অনেক কিছু শেখে। তবে যাকে অনুসরণ করছি, সে ব্যক্তি বা আদর্শটি সঠিক কি না—সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যারা সত্যিকার অর্থে মানুষের কল্যাণ করতে চায়, স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জন করতে চায় এবং সুন্দর জীবন গড়তে চায়, তাদের উচিত সফল ও সৎ মানুষের জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া। শুধু গুণকীর্তন নয়; তাঁদের ভালো কাজ, আদর্শ ও মূল্যবোধ নিজের জীবনে প্রতিফলিত করাই হলো প্রকৃত অনুসরণ।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের নতুন প্রজন্মের একটি অংশ আজ নানা বিভ্রান্তি ও বিপথগামিতার শিকার। নেশা, হতাশা, মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, অসামাজিক কর্মকাণ্ডের প্রচার এবং অযোগ্য ও অনুকরণীয় নয়—এমন ব্যক্তিদের অনুসরণ তাদের জীবনের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। অনেক ক্ষেত্রে জ্ঞান ও তথ্যের ঘাটতি, অর্ধসত্যের ওপর নির্ভরতা এবং গঠনমূলক চিন্তার পরিবর্তে অকারণ সমালোচনার প্রবণতা তাদের সঠিক পথ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।

blank

এই বাস্তবতায় অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ সাহেবের জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মের জন্য একটি আলোকবর্তিকা হতে পারে। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—মানুষের জন্য বাঁচতে হয়, জ্ঞান অর্জন করতে হয়, নিজের সামর্থ্যকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাতে হয় এবং ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধকে জীবনে ধারণ করতে হয়।

তাঁর জীবন ও অর্জন সম্পর্কে বিশেষ করে ছাত্রসমাজের জানা প্রয়োজন। কারণ একটি আদর্শ সমাজ ও উন্নত দেশ গড়ে তুলতে হলে নতুন প্রজন্মকে সঠিক মানুষ ও সঠিক আদর্শ অনুসরণ করতে হবে। তাঁদের জানতে হবে, বড় হওয়ার অর্থ শুধু অর্থ-সম্পদ কিংবা পদ-পদবি অর্জন নয়; বরং মানুষের ভালোবাসা, দোয়া ও শ্রদ্ধা অর্জন করাই জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ সাহেব তাঁর জীবন দিয়ে সেই সত্যই প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। তিনি নিজের জন্য যতটা না বেঁচেছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি বেঁচেছেন মানুষের জন্য। তাঁর ত্যাগ, জ্ঞান, মানবিকতা, উদারতা, আতিথেয়তা ও সমাজসেবার আদর্শ আগামী প্রজন্মকে আলোকিত করুক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

আমরা তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। মহান আল্লাহ যেন তাঁর সকল নেক আমল কবুল করেন, তাঁকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন এবং আমাদের সবাইকে তাঁর দেখানো মানবকল্যাণের পথে চলার তৌফিক দান করেন।

আমাদের বিশ্বাস, নতুন প্রজন্ম যদি অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদের মতো আদর্শবান মানুষের জীবন ও কর্ম থেকে শিক্ষা নেয়, তাঁদের ভালো কাজগুলো নিজের জীবনে ধারণ করে এবং মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসে, তাহলেই ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সেই পথে চলার তৌফিক দান করুন। আমিন।

—————————–

লেখকঃ বিশিষ্ট  গ্যাস্ট্রোএন্টালোরজিস্ট 

মরহুম এম এ হামিদের ছোট ভাই 

জনপ্রিয় খবর

অধ্যক্ষ এম এ হামিদের ২০ তম মৃত্যুবার্ষিকী

অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ: অনুকরণীয় এক জীবন, অনুসরণীয় এক আদর্শ

প্রকাশের সময় : ১২ মিনিট আগে
blank

মানুষ তার জীবন গড়ে তোলে মূলত অনুকরণ ও অনুসরণের মধ্য দিয়ে। সন্তান পিতা-মাতার কাছ থেকে শেখে, শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের কাছ থেকে জ্ঞান ও জীবনবোধ অর্জন করে। একজন নেতা-নেত্রীও দেশ-জাতির ইতিহাসে যাঁরা নেতৃত্বের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তাঁদের জীবন, কর্ম ও আদর্শ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন। যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয়ী সেনাপতিরা যেমন সফল যোদ্ধাদের রণকৌশল ও অভিজ্ঞতা অধ্যয়ন করেন, তেমনি মানুষের কল্যাণের পথও উন্মোচিত হয় ধর্মীয় নীতিমালা, মহামানবদের জীবন ও তাঁদের প্রদর্শিত আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে।

যাঁরা ত্যাগ, তপস্যা ও নিরলস কর্মের মধ্য দিয়ে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন, তাঁদের রেখে যাওয়া কীর্তি যুগের পর যুগ অন্যদের অনুপ্রেরণা জোগায়। তাঁদের জীবন ও কর্ম থেকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে জন্ম নেয় ত্যাগী, আদর্শবান ও মানবকল্যাণে নিবেদিত মানুষেরা।

অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ সাহেব ছিলেন তেমনই একজন অনুকরণীয় ও আদর্শ মানুষ। তিনি ছিলেন এক সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন ছিল অসাধারণ—গরিব, অসহায় ও অশিক্ষিত মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটানো। মানুষের কল্যাণ ও এলাকার উন্নয়নকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেই তিনি ধীরে ধীরে সমাজে একজন আদর্শ ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

যখন অধিকাংশ মানুষ নিজের ভবিষ্যৎ, নিজের পরিবার ও ব্যক্তিগত স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত, তখন আব্দুল হামিদ সাহেবের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল অন্যের কল্যাণ। মানুষের ভালো থাকা, এলাকার উন্নয়ন এবং পিছিয়ে পড়া মানুষকে এগিয়ে নেওয়াই হয়ে উঠেছিল তাঁর জীবনের অন্যতম ব্রত।

পিতার কঠোর শাসন এবং লেখাপড়ার প্রতি তাঁর অসীম উৎসাহ ও সহযোগিতা আব্দুল হামিদ সাহেবকে ছাত্রজীবনেই সাফল্যের পথে এগিয়ে দেয়। তিনি নিয়মিত ভালো ফলাফল অর্জন করতেন। ফলে ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর মেধা, অধ্যবসায় ও চরিত্রের প্রতি সহপাঠী, শিক্ষক ও এলাকার মানুষের শ্রদ্ধা ও প্রশংসা তৈরি হয়। তিনি কখনো লক্ষ্যচ্যুত হননি; বরং নিজের জীবন গড়ার পাশাপাশি অন্যদের জীবন গড়ার চিন্তাও সব সময় নিজের মধ্যে ধারণ করেছেন।

blank

তিনি ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ। তবে তাঁর ধর্মচেতনা ছিল কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বিশ্বাস করতেন—স্রষ্টাকে ভালোবাসার পাশাপাশি তাঁর সৃষ্টিকেও ভালোবাসতে হবে। সেই বিশ্বাস থেকেই ধর্ম, বর্ণ, উঁচু-নিচু কিংবা সামাজিক অবস্থানের কোনো পার্থক্য তিনি মানুষের মধ্যে করেননি। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সবাইকে তিনি সমানভাবে ভালোবাসতেন, পথ দেখাতেন এবং প্রয়োজনের সময় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেন।

স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতা মানুষের মহত্ত্বের পথে বড় বাধা। যে ব্যক্তি সব সময় শুধু নিজের কথা চিন্তা করে, সে অন্যের উপকার করতে পারে না, মানুষের দোয়া অর্জন করতে পারে না এবং স্রষ্টার সন্তুষ্টিও লাভ করতে পারে না। আব্দুল হামিদ সাহেব ছিলেন এর সম্পূর্ণ বিপরীত। নিজের সামর্থ্য, সময়, শ্রম ও সম্পদ—সবকিছু তিনি অন্যের কল্যাণে ব্যয় করেছেন।

বিভিন্ন এলাকা থেকে শিক্ষার্থীরা তাঁর বাড়িতে এসে থাকত। তিনি তাঁদের নিজের সন্তানের মতো আশ্রয় দিতেন এবং লেখাপড়া চালিয়ে গিয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জনে সহযোগিতা করতেন। নিজের প্রয়োজনের কথা না ভেবে অন্যের জীবন গড়ে দেওয়াকেই তিনি বড় করে দেখেছেন। তাঁর ব্যস্ততা কখনো তাঁকে মানুষের প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো থেকে বিরত রাখতে পারেনি।

কেউ বিপদে পড়েছে, কোথাও মানুষের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে কিংবা কোনো সামাজিক কাজে তাঁর উপস্থিতি দরকার—তিনি ছুটে গেছেন সেখানে। কারও কাছ থেকে সাহায্য বা অনুদান নিয়ে নয়; বরং অনেক সময় নিজের পকেট থেকে খরচ করেছেন। অর্থের সংকট দেখা দিলে প্রয়োজনে ধার করেও মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এমনকি তাঁর সঙ্গে যারা কোনো কাজে যেতেন, তাঁদের খরচও অনেক সময় তিনি নিজেই বহন করতেন।

তাঁর আতিথেয়তাও ছিল অনন্য। বাড়িতে মেহমান এলে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হতেন। ঘরে পর্যাপ্ত খাবার থাকুক বা না থাকুক, অতিথিকে তিনি সাদরে গ্রহণ করতেন। আমাদের দৈনন্দিন খাবার হয়তো ছিল ভাজি, ভর্তা, ডাল কিংবা পান্তা; কিন্তু অতিথি এলে তাঁর জন্য সাধ্য অনুযায়ী নানা ধরনের খাবারের আয়োজন করা হতো। তাঁর এই অসাধারণ আতিথেয়তার মধ্যে আমরা ইসলামের প্রাথমিক যুগের সাহাবায়ে কেরামের জীবনাদর্শের প্রতিফলন দেখতে পেতাম। তাই মাঝেমধ্যে আমরা মজা করে বলতাম—‘উনার তুলনা শুধু উনিই।’

blank

একজন বড় মানুষ হওয়ার জন্য প্রথম প্রয়োজন একটি পরিচ্ছন্ন ও উদার মন। অন্যের প্রতি বিদ্বেষ, হিংসা কিংবা খারাপ ধারণা পোষণ করে কেউ প্রকৃত অর্থে মহৎ হতে পারে না। স্রষ্টার ভালোবাসা পেতে হলে তাঁর সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ থাকা প্রয়োজন। আর সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হলে জ্ঞান অর্জনের বিকল্প নেই।

পৃথিবীর প্রতিটি ধর্মই স্রষ্টার উপাসনা, তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন, মানবসেবা, সৃষ্টির প্রতি দয়া এবং মানুষের প্রতি কর্তব্যবোধের শিক্ষা দেয়। কিন্তু জ্ঞান ছাড়া এসব মূল্যবোধ বাস্তব জীবনে যথাযথভাবে ধারণ ও প্রয়োগ করা কঠিন। তাই যাঁরা জ্ঞানী, উদার, মানবকল্যাণে নিবেদিত এবং ত্যাগের আদর্শে উজ্জীবিত, তাঁদের জীবন ও কর্ম পরবর্তী প্রজন্মের জন্য হয়ে ওঠে পথনির্দেশক।

শুধু বক্তৃতা দিয়ে মানুষ বড় হয় না। অধ্যয়ন, অধ্যবসায়, ত্যাগ, তিতিক্ষা এবং মানুষের কল্যাণে সক্রিয় অবদানই একজন মানুষকে সত্যিকার অর্থে মহৎ করে তোলে। অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ সাহেব ছিলেন জ্ঞানের এক বিশাল ভান্ডার। তাঁর বিভিন্ন লেখনীতে ছড়িয়ে আছে অগাধ জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও তথ্যের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার।

আজকের মতো যখন কম্পিউটার, ইন্টারনেট কিংবা আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা ছিল না, তখন বইপত্র অধ্যয়ন, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং নিরলস অনুসন্ধানের মাধ্যমেই জ্ঞান অর্জন করতে হতো। সেই সময়ে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করে সেগুলোকে লেখনীতে রূপ দেওয়া যে কত কঠিন ও শ্রমসাধ্য কাজ ছিল, তা সহজেই অনুমেয়। তাঁর জ্ঞানচর্চার ব্যাপকতা এবং নিরন্তর অধ্যয়ন তাঁকে জ্ঞানীদের কাতারে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান এনে দিয়েছিল। তাঁর জ্ঞান যেমন তাঁকে সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি অসংখ্য মানুষকে পথ দেখিয়েছে।

প্রথমেই বলেছি, মানুষ অনুকরণ ও অনুসরণের মধ্য দিয়েই জীবনের অনেক কিছু শেখে। তবে যাকে অনুসরণ করছি, সে ব্যক্তি বা আদর্শটি সঠিক কি না—সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যারা সত্যিকার অর্থে মানুষের কল্যাণ করতে চায়, স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জন করতে চায় এবং সুন্দর জীবন গড়তে চায়, তাদের উচিত সফল ও সৎ মানুষের জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া। শুধু গুণকীর্তন নয়; তাঁদের ভালো কাজ, আদর্শ ও মূল্যবোধ নিজের জীবনে প্রতিফলিত করাই হলো প্রকৃত অনুসরণ।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের নতুন প্রজন্মের একটি অংশ আজ নানা বিভ্রান্তি ও বিপথগামিতার শিকার। নেশা, হতাশা, মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, অসামাজিক কর্মকাণ্ডের প্রচার এবং অযোগ্য ও অনুকরণীয় নয়—এমন ব্যক্তিদের অনুসরণ তাদের জীবনের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। অনেক ক্ষেত্রে জ্ঞান ও তথ্যের ঘাটতি, অর্ধসত্যের ওপর নির্ভরতা এবং গঠনমূলক চিন্তার পরিবর্তে অকারণ সমালোচনার প্রবণতা তাদের সঠিক পথ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।

blank

এই বাস্তবতায় অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ সাহেবের জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মের জন্য একটি আলোকবর্তিকা হতে পারে। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—মানুষের জন্য বাঁচতে হয়, জ্ঞান অর্জন করতে হয়, নিজের সামর্থ্যকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাতে হয় এবং ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধকে জীবনে ধারণ করতে হয়।

তাঁর জীবন ও অর্জন সম্পর্কে বিশেষ করে ছাত্রসমাজের জানা প্রয়োজন। কারণ একটি আদর্শ সমাজ ও উন্নত দেশ গড়ে তুলতে হলে নতুন প্রজন্মকে সঠিক মানুষ ও সঠিক আদর্শ অনুসরণ করতে হবে। তাঁদের জানতে হবে, বড় হওয়ার অর্থ শুধু অর্থ-সম্পদ কিংবা পদ-পদবি অর্জন নয়; বরং মানুষের ভালোবাসা, দোয়া ও শ্রদ্ধা অর্জন করাই জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ সাহেব তাঁর জীবন দিয়ে সেই সত্যই প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। তিনি নিজের জন্য যতটা না বেঁচেছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি বেঁচেছেন মানুষের জন্য। তাঁর ত্যাগ, জ্ঞান, মানবিকতা, উদারতা, আতিথেয়তা ও সমাজসেবার আদর্শ আগামী প্রজন্মকে আলোকিত করুক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

আমরা তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। মহান আল্লাহ যেন তাঁর সকল নেক আমল কবুল করেন, তাঁকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন এবং আমাদের সবাইকে তাঁর দেখানো মানবকল্যাণের পথে চলার তৌফিক দান করেন।

আমাদের বিশ্বাস, নতুন প্রজন্ম যদি অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদের মতো আদর্শবান মানুষের জীবন ও কর্ম থেকে শিক্ষা নেয়, তাঁদের ভালো কাজগুলো নিজের জীবনে ধারণ করে এবং মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসে, তাহলেই ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সেই পথে চলার তৌফিক দান করুন। আমিন।

—————————–

লেখকঃ বিশিষ্ট  গ্যাস্ট্রোএন্টালোরজিস্ট 

মরহুম এম এ হামিদের ছোট ভাই