ঢাকা বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছর: স্বপ্নভঙ্গ ও নবজাগরণ

blank

স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ছিল বিদেশী শক্তির অত্যাচার, নিপীড়ণ ও শোষণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া। স্বাধীনতা সার্বভৌম রক্ষা করা। বিদেশী পরাশক্তিগুলোর সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সুসম্পর্ক বজায় রাখা। কারো গোলামী না করা।  একটি আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্র বিনির্মাণ করা। কিন্তু  এ জাতি বিগত পঞ্চান্ন বছর দেখেছে তাদের স্বজাতিরা (ক্ষমতাসীন   রাজনীতিবিদেরা) সাধারণত সত্যের মুখোমুখি হতে চায় না। সত্যের  আড়াল  থেকে মিথ্যাকে পুঁজি করে জনগণের সাথে  বেঈনসাফী করে। রাজনৈতিক গ্যাঁরাকলে পড়ে  শহর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষেরাও বিভাজিত হয় দলীয় পরিচয়ে। যা জাতির জন্য  এক অশনিসংকেত।  আইন এবং আদালতের  দোহাই দিয়ে যখন  আইনমন্ত্রী বিচারকার্য প্রভাবিত করে তখন প্রথিতযশা আইনজীবী  এস.কে সিনহাকে দেশ থেকে বিতাড়িত হতে হয়। কোন অপরাধী  অপরাধ  করলে একটা  মুখুস্থ বুলি ছুঁড়ে দিয়ে বলা হয় ‘  অপরাধী যেই দলেরই হোক না কেন আইনের আওতায় আনা হবে’। এই সহজ বুলি আওড়িয়ে প্রকৃত অপরাধীকে আড়াল করে দেওয়া যেন রাজনীতিবিদের প্রচলিত এক ঘৃন্য নগন্য প্রথা। আইনের আওতায় আনতেই যেন বেলা গড়িয়ে যায়। বিগত চুয়ান্ন বছরে আমরা দেখেছি কোন ঘটনা তদন্তের আগেই, প্রকৃত অপরাধীর নাম, পরিচয় না জেনে  বিরোধী দলের      লোকজনের ফাঁসির দাবীতে রাজপথ দখল যা জনমনে আরো অস্থিরতা তৈরি করে। যার ফলে প্রকৃত অপরাধী ধরাছোঁয়ার আড়ালে থেকে যায়। পরবর্তীতে নতুন  অপরাধ করার সাহস পায়।

 

গবেষণা ছাড়া  বিজ্ঞানী হয়ে নাম কামায়। কোন জার্নাল বা পাবলিকেশন নাই অথচ নামের আগে  ইঞ্জিনিয়ার  লিখে বস্তা ভর্তি  সস্তা প্রশংসা কুড়ায়। সংসদ ভবন বিনোদনের এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির স্বীকার হয়। জাতি বিভীষিকাময় পরিস্থিতির স্বীকার হয়। জাতীয় সংসদ ভবনে যখন  অধিবেশন চলে  তখন প্রতি মিনিটে কয়েক হাজার টাকা খরচ হয়। চাটুকার, দালাল,  অশিক্ষিত মমতাজের মতো মানুষকেও সংসদে দেখতে হয়েছে জাতিকে। এর চেয়ে লজ্জার আর কি হতে পারে?  শেখ হাসিনাকে খুশী করার জন তাকে নিয়ে প্রশংসাসূচক গান গেয়ে সংসদ ভবনের মতো জায়গা কলুষিত করেছে।  আরো পরিতাপের বিষয় হলো,  শেখ হাসিনাও গান শুনে টেবিল চাপড়িয়ে বাহবা জানিয়েছে।  অথচ  অধিবেশনের সময়  সমগ্র জাতি চেয়ে থাকতো এই পবিত্র অধিবেশন থেকে তাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হবে।  সে আশায়  গুড়েবালি। জনগণের কথা না বলে  কিভাবে নেতাকে  চাটুকারিতার মাধ্যমে খুশি করা যায়  এ দৃশ্য ছিল  নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। সংসদ অধিবেশন  যেন গানের আসর কখনো  বা ঝগড়া করার  এক আরামদায়ক পরিবেশ। তখন  প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন অশিক্ষিত শ্রমিক বা কৃষকও এমপি/মন্ত্রীদের কার্যক্রম দেখে  হাসাহাসি করতো। অথচ সংসদের  মাথামোটা  এমপি/মন্ত্রীর মাথায় এটা ঢুকত না। মেগা প্রকল্পের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে  পাচার  সাধারণ ঘটনা। সরকারের এমপি/ মন্ত্রী, আমলা, ব্যবসায়ীদের কানাডায় বেগম পাড়া কিংবা মালয়েশিয়া সেকেন্ড হোম তৈরি  বিবেক নাড়া দেওয়ার মতো।

 

সংসদের সাংবিধানিক  ভাষা পরিহার করে অসাংবিধানিক ভাষা প্রয়োগ ছিল মামুলি ব্যাপার। শিক্ষক রাজনীতির কারণে  বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বেহাল দশা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হওয়ার কথা  গবেষণার জায়গা।  কিন্তু লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতির প্রেক্ষিতে সেটা  দখলদারিত্বের এক নীলনকশা ঘর। ইউরোপ,  আমেরিকা  কিংবা জাপান  যখন  রোবট, মেশিন লার্নিং, পাইথন আবিষ্কার করছে  তখন আমাদের দেশের  মাথামোটাগুলো  আছে ‘ আমার ভাই,  তোমার ভাই,  অমুক ভাই,  তমুক ভাই।  অমুক ভাইয়ের চরিত্র,  ফুলের মতো পবিত্র ‘। পরে ফুলের মতো পবিত্র নেতা/ভাইয়ের  খোঁজ খবর নিয়ে জানা যায় সে চাল, ডাল এবং টিন চোর।

 

ভালো কাজের পুরস্কার না পাওয়া এদেশের নিত্য দিনের ঘটনা। কোন মেধাবী যদি ভালো কাজের পন্থা বের করে বা উদ্যোগ নেয় এবং সে যদি রাজনৈতিক আদর্শের বিরোধী হয় তাহলে তার সেই ভাল কাজের কদর নাই। আমরা বহু বছর ধরে শুনে আসছি  ‘যে দেশে গুণের কদর নাই  সেদেশে গুণীজন  তৈরি হয় না’। ভালো কিছু করার চেষ্টা করলে তাকে কিভাবে টেনে নিচে নামানো যায় সেটা বাঙালি খুব ভালো করে জানে। একজন ভালো কাজ করছে,  সমাজ তাকে ভালো চোখে দেখছে, সৎ পথে জীবিকা নির্বাহ করছে তাকে কিভাবে টেনে নিচে নামানো যায় সেটা করার জন্য প্রয়োজনে বেতনভভূক্ত কর্মচারী  নিয়োগ করবে তার পরেও তাকে নিচে নামাতে হবেই হবে। নিজের একটু ক্ষতি করে হলেও অন্যের ক্ষতি করার মধ্যে মহত্ত্ব খুঁজে পাওয়াই হল মাথা মোটা বাঙালির চিরায়ত বৈশিষ্ট্য। বরং রাজনৈতিক আদর্শের  একজন নিরপেক্ষ মেধাবীর কোন সম্মান নেই  যে দেশে সেদেশে আর যাই হোক মেধাবী তৈরি হবে না।

 

কোন অপরাধী যখন অপরাধ করে তখন দলীয় পরিচয় থাকার জন্য  অপরাধী ধরাছোঁয়ার আড়ালে চলে যায়। সরকার তখন নাটক সাজায়। আর তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করে। এই তিন সদস্য বিশিষ্ট  কমিটি বছরের পর বছর ধরে প্রতিবেদন নিয়ে খেলাখেলি করে। তার বাস্তব উদাহরণ  সাংবাদিক সাগর- রুনি হত্যার তদন্ত কমিটির নাটক প্রায় একযুগ হলো।

 

পড়ালেখা করে ডিগ্রি অর্জন আর গবেষণার কাজ আলাদা জিনিস। বাংলাদেশের ইতিহাসে কোন রেকর্ড নেই যে একজন নির্দলীয় গবেষককে শিক্ষামন্ত্রী বানাতে। বরং দলবাজ, চাটুকার, দালালকে সবসময় শিক্ষামন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যার ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বাণিজ্য, সরকারি চাকরির প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো জঘন্য কাজ সংগঠিত হয়েছে যুগের পর যুগ। এভাবে সকল সরকারি দল শিক্ষাকে ধ্বংস করেছে।  একজন্য জাতি দাসত্বের নির্মম শৃংখল থেকে বের হতে পারেনি। দালালী এবং তেলবাজি যেহেতু রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তিপর্যন্ত পছন্দ করে এবং প্রশংসা শুনে হেসে কুটিকুটি হয় তখন তেলবাজের তেল মালিশ করতে সুবিধা হয়। হাত ভর্তি তেল নিয়ে নেতাকে মালিশ করে জাতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে  আসে। তারপর তারা বিপদে পড়ে গা ঢাকা দেয়। দলীয় পরিচয়ে শিক্ষা মন্ত্রী হয় একজন চিকিৎসক। স্বাস্থ্য মন্ত্রী হয় ইংরেজিতে অনার্স-মাস্টার্স পাস করা এক দলবাজ অনভিজ্ঞ।

 

কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তির পড়াশোনা নাই, যোগ্যতা নাই, ব্যবসা নাই, পারিবারিক আর্থিক সচ্ছলতাও নাই তারপরও কিভাবে সংসারের যাবতীয় ব্যয় বহন করে তা এখন ভাববার বিষয়।

হলুদ সাংবাদিক যখন সাংবাদিকতার আড়ালে গিয়ে ক্ষমতাসীনদের দালালীতে ব্যস্ত তখন একদল সাহসী (মাহমুদুর রহমান, পিনাকী, ইলিয়াস, কনক, খোকন হক ) সাংবাদিকদের ভুমিকা জাতিকে আশা জাগায়।

সংসদে যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনমন্ত্রীর ভাষায় কথা বলে তখন  এ জাতি বিরক্ত হয়। আশাহত হয়। মানুষের সংশয় হয়। সংসদে যখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এবং  বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ এনসিপি   সংসদে সংবিধানের দোকান খোলে এ জাতি তখন বাংলাদেশের ভাগ্যাকাশে কালো অমানিশা দেখতে পায়।

 

তবুও বাংলাদেশের সংসদের ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী বিরোধী দল নিয়ে যখন বর্তমানের সংসদ অধিবেশন হয় তখন জাতি একটু আশায় বুক বাঁধে। দালাল,  চাটুকারদের বিরুদ্ধে গিয়ে যখন  তরুণ টুকু, হাসনাত, নাহিদ,  মাসুদ, রাজিব, রবিউল, মোমেনরা আলোচনায় সংসদ যখন সরগরম করে  তখন মনে হয় একটু শান্তি পাই। হাসিনা হটাও আন্দোলনে যাওয়াটা সার্থক মনে হয়।সরকারি দলের বিরুদ্ধে যখন ন্যায়সংগত তীব্র প্রতিবাদ হয়,বিরোধী দলের লোক নির্ভয়ে  কথা বলতে পারে, অতিকথনের জন্য যখন  দলীয় সাংসদকে সতর্ক করা হয়, যখন  অবাধ নিরপেক্ষ ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়, ৭০% ভোটের দ্বারা সরকার গঠিত হয়,  তখন দেশ কিছুটা আলোর মুখ দেখতে পায়।

 

খুনি, দালাল, চাটুকার ও বুড়ো  শয়তানদের দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে গিয়ে অর্থনৈতিক ভঙ্গুর ধ্বংসস্তুপের মধ্যে  দাঁড়িয়ে যখন তরুণ টুকু, রাজিব (প্রতিমন্ত্রী), হাসনাত (সাংসদ)  ও শেখ রবিউলেরা (মন্ত্রী)  দূর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজদের আতঙ্ক হয়ে সারাদেশ চষে বেড়াচ্ছেন তা দেখে  এ জাতি  আশায় বুক বাঁধতেই পারে।

——————————–

লেখকঃ শিক্ষক, ইংরেজি বিভাগ

এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

ইমেইলঃabdullah.cu9@gmail.com

blank

স্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছর: স্বপ্নভঙ্গ ও নবজাগরণ

স্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছর: স্বপ্নভঙ্গ ও নবজাগরণ

প্রকাশের সময় : ১৮ মিনিট আগে
blank

স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ছিল বিদেশী শক্তির অত্যাচার, নিপীড়ণ ও শোষণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া। স্বাধীনতা সার্বভৌম রক্ষা করা। বিদেশী পরাশক্তিগুলোর সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সুসম্পর্ক বজায় রাখা। কারো গোলামী না করা।  একটি আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্র বিনির্মাণ করা। কিন্তু  এ জাতি বিগত পঞ্চান্ন বছর দেখেছে তাদের স্বজাতিরা (ক্ষমতাসীন   রাজনীতিবিদেরা) সাধারণত সত্যের মুখোমুখি হতে চায় না। সত্যের  আড়াল  থেকে মিথ্যাকে পুঁজি করে জনগণের সাথে  বেঈনসাফী করে। রাজনৈতিক গ্যাঁরাকলে পড়ে  শহর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষেরাও বিভাজিত হয় দলীয় পরিচয়ে। যা জাতির জন্য  এক অশনিসংকেত।  আইন এবং আদালতের  দোহাই দিয়ে যখন  আইনমন্ত্রী বিচারকার্য প্রভাবিত করে তখন প্রথিতযশা আইনজীবী  এস.কে সিনহাকে দেশ থেকে বিতাড়িত হতে হয়। কোন অপরাধী  অপরাধ  করলে একটা  মুখুস্থ বুলি ছুঁড়ে দিয়ে বলা হয় ‘  অপরাধী যেই দলেরই হোক না কেন আইনের আওতায় আনা হবে’। এই সহজ বুলি আওড়িয়ে প্রকৃত অপরাধীকে আড়াল করে দেওয়া যেন রাজনীতিবিদের প্রচলিত এক ঘৃন্য নগন্য প্রথা। আইনের আওতায় আনতেই যেন বেলা গড়িয়ে যায়। বিগত চুয়ান্ন বছরে আমরা দেখেছি কোন ঘটনা তদন্তের আগেই, প্রকৃত অপরাধীর নাম, পরিচয় না জেনে  বিরোধী দলের      লোকজনের ফাঁসির দাবীতে রাজপথ দখল যা জনমনে আরো অস্থিরতা তৈরি করে। যার ফলে প্রকৃত অপরাধী ধরাছোঁয়ার আড়ালে থেকে যায়। পরবর্তীতে নতুন  অপরাধ করার সাহস পায়।

 

গবেষণা ছাড়া  বিজ্ঞানী হয়ে নাম কামায়। কোন জার্নাল বা পাবলিকেশন নাই অথচ নামের আগে  ইঞ্জিনিয়ার  লিখে বস্তা ভর্তি  সস্তা প্রশংসা কুড়ায়। সংসদ ভবন বিনোদনের এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির স্বীকার হয়। জাতি বিভীষিকাময় পরিস্থিতির স্বীকার হয়। জাতীয় সংসদ ভবনে যখন  অধিবেশন চলে  তখন প্রতি মিনিটে কয়েক হাজার টাকা খরচ হয়। চাটুকার, দালাল,  অশিক্ষিত মমতাজের মতো মানুষকেও সংসদে দেখতে হয়েছে জাতিকে। এর চেয়ে লজ্জার আর কি হতে পারে?  শেখ হাসিনাকে খুশী করার জন তাকে নিয়ে প্রশংসাসূচক গান গেয়ে সংসদ ভবনের মতো জায়গা কলুষিত করেছে।  আরো পরিতাপের বিষয় হলো,  শেখ হাসিনাও গান শুনে টেবিল চাপড়িয়ে বাহবা জানিয়েছে।  অথচ  অধিবেশনের সময়  সমগ্র জাতি চেয়ে থাকতো এই পবিত্র অধিবেশন থেকে তাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হবে।  সে আশায়  গুড়েবালি। জনগণের কথা না বলে  কিভাবে নেতাকে  চাটুকারিতার মাধ্যমে খুশি করা যায়  এ দৃশ্য ছিল  নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। সংসদ অধিবেশন  যেন গানের আসর কখনো  বা ঝগড়া করার  এক আরামদায়ক পরিবেশ। তখন  প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন অশিক্ষিত শ্রমিক বা কৃষকও এমপি/মন্ত্রীদের কার্যক্রম দেখে  হাসাহাসি করতো। অথচ সংসদের  মাথামোটা  এমপি/মন্ত্রীর মাথায় এটা ঢুকত না। মেগা প্রকল্পের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে  পাচার  সাধারণ ঘটনা। সরকারের এমপি/ মন্ত্রী, আমলা, ব্যবসায়ীদের কানাডায় বেগম পাড়া কিংবা মালয়েশিয়া সেকেন্ড হোম তৈরি  বিবেক নাড়া দেওয়ার মতো।

 

সংসদের সাংবিধানিক  ভাষা পরিহার করে অসাংবিধানিক ভাষা প্রয়োগ ছিল মামুলি ব্যাপার। শিক্ষক রাজনীতির কারণে  বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বেহাল দশা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হওয়ার কথা  গবেষণার জায়গা।  কিন্তু লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতির প্রেক্ষিতে সেটা  দখলদারিত্বের এক নীলনকশা ঘর। ইউরোপ,  আমেরিকা  কিংবা জাপান  যখন  রোবট, মেশিন লার্নিং, পাইথন আবিষ্কার করছে  তখন আমাদের দেশের  মাথামোটাগুলো  আছে ‘ আমার ভাই,  তোমার ভাই,  অমুক ভাই,  তমুক ভাই।  অমুক ভাইয়ের চরিত্র,  ফুলের মতো পবিত্র ‘। পরে ফুলের মতো পবিত্র নেতা/ভাইয়ের  খোঁজ খবর নিয়ে জানা যায় সে চাল, ডাল এবং টিন চোর।

 

ভালো কাজের পুরস্কার না পাওয়া এদেশের নিত্য দিনের ঘটনা। কোন মেধাবী যদি ভালো কাজের পন্থা বের করে বা উদ্যোগ নেয় এবং সে যদি রাজনৈতিক আদর্শের বিরোধী হয় তাহলে তার সেই ভাল কাজের কদর নাই। আমরা বহু বছর ধরে শুনে আসছি  ‘যে দেশে গুণের কদর নাই  সেদেশে গুণীজন  তৈরি হয় না’। ভালো কিছু করার চেষ্টা করলে তাকে কিভাবে টেনে নিচে নামানো যায় সেটা বাঙালি খুব ভালো করে জানে। একজন ভালো কাজ করছে,  সমাজ তাকে ভালো চোখে দেখছে, সৎ পথে জীবিকা নির্বাহ করছে তাকে কিভাবে টেনে নিচে নামানো যায় সেটা করার জন্য প্রয়োজনে বেতনভভূক্ত কর্মচারী  নিয়োগ করবে তার পরেও তাকে নিচে নামাতে হবেই হবে। নিজের একটু ক্ষতি করে হলেও অন্যের ক্ষতি করার মধ্যে মহত্ত্ব খুঁজে পাওয়াই হল মাথা মোটা বাঙালির চিরায়ত বৈশিষ্ট্য। বরং রাজনৈতিক আদর্শের  একজন নিরপেক্ষ মেধাবীর কোন সম্মান নেই  যে দেশে সেদেশে আর যাই হোক মেধাবী তৈরি হবে না।

 

কোন অপরাধী যখন অপরাধ করে তখন দলীয় পরিচয় থাকার জন্য  অপরাধী ধরাছোঁয়ার আড়ালে চলে যায়। সরকার তখন নাটক সাজায়। আর তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করে। এই তিন সদস্য বিশিষ্ট  কমিটি বছরের পর বছর ধরে প্রতিবেদন নিয়ে খেলাখেলি করে। তার বাস্তব উদাহরণ  সাংবাদিক সাগর- রুনি হত্যার তদন্ত কমিটির নাটক প্রায় একযুগ হলো।

 

পড়ালেখা করে ডিগ্রি অর্জন আর গবেষণার কাজ আলাদা জিনিস। বাংলাদেশের ইতিহাসে কোন রেকর্ড নেই যে একজন নির্দলীয় গবেষককে শিক্ষামন্ত্রী বানাতে। বরং দলবাজ, চাটুকার, দালালকে সবসময় শিক্ষামন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যার ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বাণিজ্য, সরকারি চাকরির প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো জঘন্য কাজ সংগঠিত হয়েছে যুগের পর যুগ। এভাবে সকল সরকারি দল শিক্ষাকে ধ্বংস করেছে।  একজন্য জাতি দাসত্বের নির্মম শৃংখল থেকে বের হতে পারেনি। দালালী এবং তেলবাজি যেহেতু রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তিপর্যন্ত পছন্দ করে এবং প্রশংসা শুনে হেসে কুটিকুটি হয় তখন তেলবাজের তেল মালিশ করতে সুবিধা হয়। হাত ভর্তি তেল নিয়ে নেতাকে মালিশ করে জাতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে  আসে। তারপর তারা বিপদে পড়ে গা ঢাকা দেয়। দলীয় পরিচয়ে শিক্ষা মন্ত্রী হয় একজন চিকিৎসক। স্বাস্থ্য মন্ত্রী হয় ইংরেজিতে অনার্স-মাস্টার্স পাস করা এক দলবাজ অনভিজ্ঞ।

 

কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তির পড়াশোনা নাই, যোগ্যতা নাই, ব্যবসা নাই, পারিবারিক আর্থিক সচ্ছলতাও নাই তারপরও কিভাবে সংসারের যাবতীয় ব্যয় বহন করে তা এখন ভাববার বিষয়।

হলুদ সাংবাদিক যখন সাংবাদিকতার আড়ালে গিয়ে ক্ষমতাসীনদের দালালীতে ব্যস্ত তখন একদল সাহসী (মাহমুদুর রহমান, পিনাকী, ইলিয়াস, কনক, খোকন হক ) সাংবাদিকদের ভুমিকা জাতিকে আশা জাগায়।

সংসদে যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনমন্ত্রীর ভাষায় কথা বলে তখন  এ জাতি বিরক্ত হয়। আশাহত হয়। মানুষের সংশয় হয়। সংসদে যখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এবং  বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ এনসিপি   সংসদে সংবিধানের দোকান খোলে এ জাতি তখন বাংলাদেশের ভাগ্যাকাশে কালো অমানিশা দেখতে পায়।

 

তবুও বাংলাদেশের সংসদের ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী বিরোধী দল নিয়ে যখন বর্তমানের সংসদ অধিবেশন হয় তখন জাতি একটু আশায় বুক বাঁধে। দালাল,  চাটুকারদের বিরুদ্ধে গিয়ে যখন  তরুণ টুকু, হাসনাত, নাহিদ,  মাসুদ, রাজিব, রবিউল, মোমেনরা আলোচনায় সংসদ যখন সরগরম করে  তখন মনে হয় একটু শান্তি পাই। হাসিনা হটাও আন্দোলনে যাওয়াটা সার্থক মনে হয়।সরকারি দলের বিরুদ্ধে যখন ন্যায়সংগত তীব্র প্রতিবাদ হয়,বিরোধী দলের লোক নির্ভয়ে  কথা বলতে পারে, অতিকথনের জন্য যখন  দলীয় সাংসদকে সতর্ক করা হয়, যখন  অবাধ নিরপেক্ষ ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়, ৭০% ভোটের দ্বারা সরকার গঠিত হয়,  তখন দেশ কিছুটা আলোর মুখ দেখতে পায়।

 

খুনি, দালাল, চাটুকার ও বুড়ো  শয়তানদের দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে গিয়ে অর্থনৈতিক ভঙ্গুর ধ্বংসস্তুপের মধ্যে  দাঁড়িয়ে যখন তরুণ টুকু, রাজিব (প্রতিমন্ত্রী), হাসনাত (সাংসদ)  ও শেখ রবিউলেরা (মন্ত্রী)  দূর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজদের আতঙ্ক হয়ে সারাদেশ চষে বেড়াচ্ছেন তা দেখে  এ জাতি  আশায় বুক বাঁধতেই পারে।

——————————–

লেখকঃ শিক্ষক, ইংরেজি বিভাগ

এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

ইমেইলঃabdullah.cu9@gmail.com