২৫ আগস্ট—বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য একটি গভীর বেদনা ও স্মরণের দিন। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়-সমুদ্রঘেরা এলাকায় গড়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী বসতি।
প্রতিবছর এই দিনটি স্মরণে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (RRRC) কার্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি এনজিও ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতায় নানা কর্মসূচির আয়োজন করে। দেখতে দেখতে প্রায় নয় বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু সংকটের সমাধান হয়নি। বরং জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি, প্রত্যাবাসনের অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ কমে আসায় সংকটটি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে।
সাম্প্রতিক সময়ে খাদ্যসহায়তার বাজেট কমে যাওয়া এবং বিভিন্ন মানবিক সংস্থার অর্থায়ন সংকুচিত হওয়ার প্রভাবও শরণার্থী জীবনে পড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে আশ্রয়ে থাকা একটি জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, জীবিকা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা এখন আরও বড় চ্যালেঞ্জ।
এই সংকটকে আমি শুধু দূর থেকে দেখিনি। জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় আমি খুব কাছ থেকে এর সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রায় নয় মাস কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ক্যাম্প ইন-চার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সুযোগ হয়েছিল। আমার ক্যাম্প ছিল ১ ওয়েস্ট। প্রায় পাঁচ বছর আগের সেই সময়। সময় অনেকটা পেরিয়ে গেছে, কিন্তু ক্যাম্পের অসংখ্য মুখ, ঘটনা, পথ, বৃষ্টি, পাহাড়, মানুষের কথা—অনেক কিছুই এখনো স্মৃতিতে খুব জীবন্ত।
কক্সবাজার শহর থেকে প্রতিদিন ক্যাম্পে যেতাম। প্রায় সোয়া এক ঘণ্টার পথ। কখনো মেরিন ড্রাইভ দিয়ে, কখনো মূল সড়ক ধরে। ক্যাম্পে প্রথম যেদিন গেলাম, সবকিছুই নতুন ও অপরিচিত মনে হয়েছিল। ক্যাম্পের প্রবেশমুখেই সারি সারি সেল্টার, ছোট ছোট দোকান, এনজিওগুলোর অফিস—সব মিলিয়ে একেবারেই ভিন্ন এক জগৎ। ক্যাম্প ইন-চার্জের অফিসে প্রবেশ বা বের হওয়ার সময় অনেক শিশুকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখতাম। তারা কী ভাবত, কখনো জিজ্ঞেস করা হয়নি। কিন্তু সেই তাকিয়ে থাকা চোখগুলো আজও মনে পড়ে।

কুতুপালং বাজার হয়ে ক্যাম্পে ঢোকার পথে প্রচুর দোকানপাট থাকায় প্রায়ই যানজট হতো। ক্যাম্পের ভেতরেও জনসংখ্যার ঘনত্ব ছিল অনেক বেশি। অফিসের স্টাফদের নিয়ে প্রায়ই ক্যাম্পে ড্রাইভ দিতাম। মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতাম। অনুমোদন ছাড়া নির্মিত বা সম্প্রসারিত সেল্টার অপসারণ করতে হতো। পানি চলাচলের পথ বন্ধ করে সেল্টার নির্মাণ করা হলে তা সরিয়ে দিতে হতো। বিভিন্ন এনজিওর দেওয়া খাবার বা অন্যান্য সামগ্রী অবৈধভাবে সংগ্রহ করে বাইরে বিক্রির জন্য রাখা হলে সেগুলো জব্দ করার ঘটনাও ঘটেছে।
এসব কাজ করতে গিয়ে ক্যাম্পের প্রতিটি ব্লকে প্রচুর হাঁটতে হয়েছে। প্রতিটি ব্লকের মাঝি আমাদের কাজে অনেক সহযোগিতা করতেন। তারা স্থানীয় পরিস্থিতি, মানুষের সমস্যা, বিভিন্ন ঘটনা এবং প্রয়োজনীয় নানা তথ্য জানাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন। বিশেষ করে ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের সময় তাদের সহযোগিতা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ক্যাম্পে নিয়মিত শুনানি নিতাম। এসি ল্যান্ডের দায়িত্ব পালন শেষে সরাসরি ক্যাম্পে গিয়ে শুনানি নেওয়ার বিষয়টি আমার ভালো লাগত। প্রতিদিনই আসত মানুষের নানা ধরনের সমস্যা ও অভিযোগ। এর মধ্যে একাধিক বিয়ে, স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ না দিয়ে চলে যাওয়া—এ ধরনের পারিবারিক বিরোধের ঘটনা ছিল উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বা Gender-Based Violence (GBV)-এর ঘটনাও মোকাবিলা করতে হয়েছে।
প্রথমদিকে স্থানীয় স্টাফদের সাহায্য ছাড়া রোহিঙ্গাদের কথাবার্তা বোঝা কঠিন ছিল। কিন্তু দুই-তিন মাস পর তাদের ভাষার অনেক কথাই বুঝতে পারতাম। বলতে পারতাম না, কিন্তু শুনে অর্থ বুঝে নিতে পারতাম। মানুষের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাজ করতে করতে ভাষার বাইরেও এক ধরনের যোগাযোগ তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রাখাইন অঞ্চলের বিভিন্ন উৎসব ও সাংস্কৃতিক আয়োজনও হতো। এনজিওগুলো এসব আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত থাকত। বিশেষ করে বিশ্ব নারী দিবসের কথা আমার খুব মনে পড়ে। ইউএন উইমেনের উদ্যোগে ক্যাম্পে বড় আয়োজন হয়েছিল। অন্যান্য দেশি-বিদেশি সংস্থাও বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছিল।

সে সময় ইউএন উইমেন আমাকে নিয়ে একটি ফিচার করেছিল। পরে কক্সবাজারের হোটেল সি গালে একটি অনুষ্ঠানে আমাকে বিশেষ অতিথি হিসেবে রাখা হয়। সেখানে আমার জীবনের এ পর্যন্ত উঠে আসার গল্প বলতে বলা হয়েছিল। একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এমন একটি আন্তর্জাতিক আয়োজনে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার সুযোগ পাওয়া নিঃসন্দেহে আমার জন্য স্মরণীয় হয়ে আছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সঙ্গে বৃষ্টির স্মৃতিও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।
কক্সবাজারে মে মাসের শেষ দিক থেকেই বৃষ্টি শুরু হয়। জুন-জুলাইয়ে বৃষ্টির পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। পাহাড় ধস, জলাবদ্ধতা ও বন্যার আশঙ্কা তখন নিত্যদিনের বিষয়। বর্ষাকালে ক্যাম্প ইন-চার্জদের জন্য সময়টা ছিল অত্যন্ত কঠিন। বন্যা বা পাহাড় ধসের আশঙ্কা দেখা দিলে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হতো। কিন্তু অনেকেই তাদের সেল্টার ছেড়ে যেতে চাইতেন না। বারবার বোঝানোর পরও কেউ কেউ নিজের ঘর, সামান্য সম্পদ ও পরিচিত জায়গা ছেড়ে যেতে রাজি হতেন না। পাহাড় ধসে বিপদের সম্ভাবনা তৈরি হলেও তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়া সহজ ছিল না। সেই সময় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে ক্যাম্প ইন-চার্জদের যে মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হতো, তা বাইরে থেকে বোঝা কঠিন।
ক্যাম্পের প্রধান সড়কের যানজট কমানোর জন্য একবার বিপুলসংখ্যক অবৈধভাবে সম্প্রসারিত সেল্টার উচ্ছেদ করা হয়েছিল। পরে রাস্তার দুই পাশে গাছ লাগানো হয়। কাজটি তখন হয়তো একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ হিসেবেই মনে হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের মার্চে বহু বছর পর আবার ক্যাম্পে গিয়ে যখন দেখলাম, সেই গাছগুলোর অনেকগুলো এখনো বেঁচে আছে—বড় হয়েছে, আর কৃষ্ণচূড়ার গাছে ফুল ফুটেছে—তখন অদ্ভুত এক ভালো লাগা কাজ করছিল।
মনে হলো, সময় চলে যায়, মানুষ বদলে যায়, দায়িত্ব বদলে যায়; কিন্তু কিছু কাজ নীরবে নিজের অস্তিত্ব রেখে যায়।
ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের সময়টিও ছিল অত্যন্ত ব্যস্ত ও চ্যালেঞ্জিং। মানুষকে বোঝানো, মাঝিদের মাধ্যমে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা, তাদের উখিয়া ডিগ্রি কলেজে নিয়ে যাওয়া এবং সেখান থেকে বাসে করে ভাসানচরের উদ্দেশ্যে পাঠানো—প্রতিটি ধাপেই ছিল অনেক পরিশ্রম ও সমন্বয়।
সেই সময় ক্যাম্পের স্টাফ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দিন-রাত কাজ করেছেন। সিপিপি—Cyclone Preparedness Programme-এর স্বেচ্ছাসেবকরাও রাত-দিন দায়িত্ব পালন করেছেন। একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর স্থানান্তরের মতো জটিল কাজ বাস্তবায়নে প্রত্যেকের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ক্যাম্প ইন-চার্জের অফিসে একটি দরবার হল নির্মাণের জন্যও অনেক চাপ ও পরিশ্রম করতে হয়েছিল। আমার শেষ কর্মদিবসে সেই দরবার হলের নির্মাণকাজের উদ্বোধন করে ক্যাম্প থেকে বিদায় নিয়েছিলাম।
২০২৬ সালের মার্চে আবার ক্যাম্পে গিয়ে দেখলাম, সেই দরবার হলে মিটিং হচ্ছে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল, পাঁচ বছর আগে যে জায়গাটিকে নিয়ে এত ব্যস্ততা, এত আলোচনা ও এত কাজ—আজ সেখানে নিয়মিত কার্যক্রম চলছে। নিজের একটি ছোট্ট কর্মপ্রচেষ্টার বাস্তব ফলাফল চোখের সামনে দেখতে পাওয়া সত্যিই অন্যরকম অনুভূতি।
ক্যাম্পে দুপুরের খাবারও ছিল আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি অংশ। আমরা ক্যাম্পেই দুপুরে খেতাম। কখনো কখনো অন্যান্য সিনিয়র স্যারগণ তাদের ক্যাম্পে দাওয়াত দিতেন। ব্যস্ততার মধ্যেও সহকর্মীদের সঙ্গে সেই খাবারের সময়গুলো হয়ে উঠেছিল আনন্দ ও আন্তরিকতার মুহূর্ত।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাটানো নয় মাস ছিল একই সঙ্গে মধুর ও তিক্ত অভিজ্ঞতায় ভরা। সেখানে ছিল প্রশাসনিক দায়িত্ব, মানবিক সংকট, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা, পারিবারিক বিরোধ, বন্যা ও পাহাড় ধসের ভয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, মানবিক সহায়তা সমন্বয়—আর ছিল অসংখ্য মানুষের জীবনের গল্প।
আজ প্রায় নয় বছর ধরে রোহিঙ্গা সংকট চলমান। একটি প্রজন্ম শরণার্থী হিসেবে বেড়ে উঠছে। যারা ২০১৭ সালে শিশু ছিল, তাদের অনেকেই এখন কৈশোর বা তারুণ্যে পা দিয়েছে। অথচ তাদের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। আন্তর্জাতিক মনোযোগ কমে যাওয়া এবং মানবিক সহায়তার অর্থায়ন সংকুচিত হওয়া এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটকে আরও কঠিন করে তুলছে।
২৫ আগস্ট তাই শুধু একটি তারিখ নয়। এটি একটি জনগোষ্ঠীর বাস্তুচ্যুতির ইতিহাসের স্মারক, তাদের হারানো ঘরবাড়ি ও স্বজনদের স্মরণ করার দিন, একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি প্রশ্ন—এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের শেষ কোথায়?
আর আমার কাছে ২৫ আগস্ট মানে শুধু রোহিঙ্গা সংকটের কথা স্মরণ করা নয়। এই দিনটি আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় কক্সবাজারের সেই পাহাড়ঘেরা ক্যাম্পে, ১ ওয়েস্টের সেই অফিসে, অসংখ্য মানুষের মুখের সামনে, বর্ষার ভেজা রাস্তায়, মাঝিদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনায়, স্টাফদের নিয়ে ব্যস্ত দিনরাত্রিতে।
পাঁচ বছর পর যখন আবার ক্যাম্পে গিয়ে দেখি, কোনো কোনো গাছ বড় হয়ে গেছে, কৃষ্ণচূড়ায় ফুল ফুটেছে, আমাদের তৈরি করা দরবার হলে মিটিং হচ্ছে—তখন মনে হয়, সময় শুধু মানুষকে দূরে নিয়ে যায় না; কিছু স্মৃতিকে আরও গভীর করে তোলে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাটানো সেই নয় মাস আমার চাকরিজীবনের একটি অধ্যায় মাত্র নয়; এটি আমার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে জমে থাকা অসংখ্য গল্পের এক অনন্য অধ্যায়।
——————————
লেখকঃ সিনিঃসহকারি সচিব
merinabiam2025@gmail.com

মোছাঃমেরিনা আফরোজ 

















