ঢাকা মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৫ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের শতবর্ষব্যাপী পরিকল্পিত নিপীড়ন: একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

blank

রোহিঙ্গারা আরাকান/রাখাইন উপকূলীয় অঞ্চলের একটি প্রাচীন মুসলিম জনগোষ্ঠী। ঐতিহাসিক দলিল, ঔপনিবেশিক নথি এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুসারে, মিয়ানমারে কয়েক প্রজন্ম ধরে বসবাসকারী এই জনগোষ্ঠী ২০তম শতকের মাঝামাঝি থেকে ধাপে ধাপে এক সুসংগঠিত systematic dehumanization-এর শিকার হতে থাকে। এর পরিণতি হিসেবে ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’-এর মুখে তারা জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।

 

এংলো-বার্মিজ যুদ্ধ ও ব্রিটিশদের সহযোগী হিসেবে রোহিঙ্গা ভূমিকা:

 ১৮২৪–২৬ সালের প্রথম এংলো-বার্মিজ যুদ্ধে ব্রিটিশদের সঙ্গে স্থানীয় আরাকান মুসলমানদের সহযোগিতার উল্লেখ পাওয়া যায়। এ সহযোগিতা তাদের পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে, কারণ বার্মিজ বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীরা পরবর্তী সময়ে এটিকে “ব্রিটিশ-ঘনিষ্ঠতার প্রমাণ” হিসেবে প্রচার করে।

 

১৯৬২ সালে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা ও রোহিঙ্গাদের অধিকার সংকোচন:

১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইনের সামরিক অভ্যুত্থানের পর রোহিঙ্গাদের উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়তে থাকে। ক্রমে তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, চলাচলের স্বাধীনতা, চাকরি ও জমির অধিকার সীমিত হয়। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন: আইনগতভাবে রাষ্ট্রহীনতার সূচনা ১৯৮২ সালের Burma Citizenship Law রোহিঙ্গাদের “জাতিগত গোষ্ঠী” তালিকা থেকে বাদ দেয় এবং তাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করে। এর ফলে তারা মিয়ানমারে কার্যত রাষ্ট্রহীন হয়ে যায়—যা ভবিষ্যতের নিপীড়নের কাঠামোকে বৈধতা দেয়।

blank

অস্ত্র সমর্পণ ও নিরাপত্তাহীনতা:

 ১৯৭০–৮০ এর দশকে সরকার-সমর্থিত “অস্ত্র সমর্পণ অভিযান” (disarmament drive)-এর সময় রোহিঙ্গাদের আত্মরক্ষার সামান্য ক্ষমতাও কেড়ে নেওয়া হয়, অথচ তাদের উপর হামলার বিরুদ্ধে কোনো রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা দেওয়া হয়নি।

 

স্বাধীন বিবাহ, পরিবার পরিকল্পনা ও চলাচল নিয়ন্ত্রণ:

রোহিঙ্গাদের বিয়ে করতে হলে বিশেষ অনুমতি নিতে হতো—যা প্রায়ই ঘুষ, হয়রানি ও মাসের পর মাস অপেক্ষার পর মঞ্জুর হতো।

অনেক অঞ্চলে তাদের সন্তান সংখ্যা দুটির বেশি হতে দেওয়া হতো না। রাখাইনে চলাচলের উপর কড়া নিষেধাজ্ঞা, রাতের

কার্ফিউ এবং ভ্রমণ পাস ছাড়া গ্রাম ছেড়ে যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল।

 

স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চনা:

 রোহিঙ্গাদের সরকারি হাসপাতালে ভর্তি, বিশেষ করে বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা নেওয়া প্রায় নিষিদ্ধ ছিল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, পরীক্ষায় অংশগ্রহণ, চাকরি পাওয়া—এসবও ক্রমে কঠোরভাবে সীমিত করা হয়।

 

২০১৭ সালের ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’: জাতিসংঘের ভাষায় “ethnic cleansing”

 ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড পুলিশ ও স্থানীয় মিলিশিয়ারা সমন্বিতভাবে রোহিঙ্গা গ্রামসমূহে হামলা চালায়, যার ফলে ৭ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন এটিকে “textbook example of ethnic cleansing” বলে চিহ্নিত করে।

 

 উপসংহার:

রোহিঙ্গাদের বর্তমান শরণার্থী সংকট কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্মিত এক systematic dehumanization-এর ফল। ইতিহাস, আইন, সামরিক পদক্ষেপ এবং প্রশাসনিক বৈষম্য—সবকিছু মিলিয়ে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার, সামাজিক মর্যাদা ও মানবিক অস্তিত্ব ধ্বংসের এক পরিকল্পিত প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়েছে।

বাংলাদেশ মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দিয়েছে, তবে সংকটের স্থায়ী সমাধান কেবল নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই স্বেচ্ছা প্রত্যাবর্তন-এর মাধ্যমেই সম্ভব।

 

তথ্যসূত্র: আন্তর্জাতিক জার্নাল / পত্রপত্রিকা

লেখকঃ এলামনাই, ডেভলপমেন্ট  স্টাডিজ

সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়, ইউকে

ইমেইলঃ aftabrrrc@gmail.com

blank

রূপপুরে আজ ইউরেনিয়াম লোডিং: পারমাণবিক বিদ্যুতের যুগে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক পদার্পণ

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের শতবর্ষব্যাপী পরিকল্পিত নিপীড়ন: একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

প্রকাশের সময় : ০৫:৫১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫
blank

রোহিঙ্গারা আরাকান/রাখাইন উপকূলীয় অঞ্চলের একটি প্রাচীন মুসলিম জনগোষ্ঠী। ঐতিহাসিক দলিল, ঔপনিবেশিক নথি এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুসারে, মিয়ানমারে কয়েক প্রজন্ম ধরে বসবাসকারী এই জনগোষ্ঠী ২০তম শতকের মাঝামাঝি থেকে ধাপে ধাপে এক সুসংগঠিত systematic dehumanization-এর শিকার হতে থাকে। এর পরিণতি হিসেবে ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’-এর মুখে তারা জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।

 

এংলো-বার্মিজ যুদ্ধ ও ব্রিটিশদের সহযোগী হিসেবে রোহিঙ্গা ভূমিকা:

 ১৮২৪–২৬ সালের প্রথম এংলো-বার্মিজ যুদ্ধে ব্রিটিশদের সঙ্গে স্থানীয় আরাকান মুসলমানদের সহযোগিতার উল্লেখ পাওয়া যায়। এ সহযোগিতা তাদের পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে, কারণ বার্মিজ বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীরা পরবর্তী সময়ে এটিকে “ব্রিটিশ-ঘনিষ্ঠতার প্রমাণ” হিসেবে প্রচার করে।

 

১৯৬২ সালে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা ও রোহিঙ্গাদের অধিকার সংকোচন:

১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইনের সামরিক অভ্যুত্থানের পর রোহিঙ্গাদের উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়তে থাকে। ক্রমে তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, চলাচলের স্বাধীনতা, চাকরি ও জমির অধিকার সীমিত হয়। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন: আইনগতভাবে রাষ্ট্রহীনতার সূচনা ১৯৮২ সালের Burma Citizenship Law রোহিঙ্গাদের “জাতিগত গোষ্ঠী” তালিকা থেকে বাদ দেয় এবং তাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করে। এর ফলে তারা মিয়ানমারে কার্যত রাষ্ট্রহীন হয়ে যায়—যা ভবিষ্যতের নিপীড়নের কাঠামোকে বৈধতা দেয়।

blank

অস্ত্র সমর্পণ ও নিরাপত্তাহীনতা:

 ১৯৭০–৮০ এর দশকে সরকার-সমর্থিত “অস্ত্র সমর্পণ অভিযান” (disarmament drive)-এর সময় রোহিঙ্গাদের আত্মরক্ষার সামান্য ক্ষমতাও কেড়ে নেওয়া হয়, অথচ তাদের উপর হামলার বিরুদ্ধে কোনো রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা দেওয়া হয়নি।

 

স্বাধীন বিবাহ, পরিবার পরিকল্পনা ও চলাচল নিয়ন্ত্রণ:

রোহিঙ্গাদের বিয়ে করতে হলে বিশেষ অনুমতি নিতে হতো—যা প্রায়ই ঘুষ, হয়রানি ও মাসের পর মাস অপেক্ষার পর মঞ্জুর হতো।

অনেক অঞ্চলে তাদের সন্তান সংখ্যা দুটির বেশি হতে দেওয়া হতো না। রাখাইনে চলাচলের উপর কড়া নিষেধাজ্ঞা, রাতের

কার্ফিউ এবং ভ্রমণ পাস ছাড়া গ্রাম ছেড়ে যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল।

 

স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চনা:

 রোহিঙ্গাদের সরকারি হাসপাতালে ভর্তি, বিশেষ করে বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা নেওয়া প্রায় নিষিদ্ধ ছিল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, পরীক্ষায় অংশগ্রহণ, চাকরি পাওয়া—এসবও ক্রমে কঠোরভাবে সীমিত করা হয়।

 

২০১৭ সালের ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’: জাতিসংঘের ভাষায় “ethnic cleansing”

 ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড পুলিশ ও স্থানীয় মিলিশিয়ারা সমন্বিতভাবে রোহিঙ্গা গ্রামসমূহে হামলা চালায়, যার ফলে ৭ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন এটিকে “textbook example of ethnic cleansing” বলে চিহ্নিত করে।

 

 উপসংহার:

রোহিঙ্গাদের বর্তমান শরণার্থী সংকট কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্মিত এক systematic dehumanization-এর ফল। ইতিহাস, আইন, সামরিক পদক্ষেপ এবং প্রশাসনিক বৈষম্য—সবকিছু মিলিয়ে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার, সামাজিক মর্যাদা ও মানবিক অস্তিত্ব ধ্বংসের এক পরিকল্পিত প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়েছে।

বাংলাদেশ মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দিয়েছে, তবে সংকটের স্থায়ী সমাধান কেবল নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই স্বেচ্ছা প্রত্যাবর্তন-এর মাধ্যমেই সম্ভব।

 

তথ্যসূত্র: আন্তর্জাতিক জার্নাল / পত্রপত্রিকা

লেখকঃ এলামনাই, ডেভলপমেন্ট  স্টাডিজ

সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়, ইউকে

ইমেইলঃ aftabrrrc@gmail.com