ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মতামত

শিশু নির্যাতনের প্রতিবাদ হোক মানবিক ও দায়িত্বশীল

blank

বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা দিন দিন উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিটি ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের বিবেককে নাড়া দেয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম খুললেই আমরা দেখি প্রতিবাদ, ক্ষোভ, মানববন্ধন, পোস্ট ও ভিডিওর বন্যা। অনেক কনটেন্ট ক্রিয়েটার ও সাধারণ মানুষ সচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলছেন। এটি অবশ্যই একটি ইতিবাচক দিক। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, প্রতিবাদের ভাষা ও পদ্ধতি অনেক সময় মানবিকতার সীমা অতিক্রম করছে।

আজকাল দেখা যায়, নির্যাতিত ও ধর্ষিত শিশুদের ছবি, মুখমণ্ডল কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করে পোস্ট দেওয়া হচ্ছে। কেউ কেউ মনে করেন এতে মানুষের সহানুভূতি বাড়বে বা ঘটনাটি দ্রুত ভাইরাল হবে। কিন্তু বাস্তবে এটি শিশুটির জন্য আরও বড় মানসিক আঘাত তৈরি করে। একটি শিশু, যে ইতোমধ্যেই এই বর্বরতার শিকার,তাকে আবার পুরো সমাজের সামনে পরিচয়সহ তুলে ধরা কোনো সচেতনতা নয় বরং এটি আরেক ধরনের দ্বিতীয় নির্যাতন।

একবার ভাবুন, সেই শিশুটি বড় হয়ে যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের সেই অসহায় মুহূর্তের ছবি দেখতে পাবে, তখন তার মানসিক অবস্থার কী হবে? তার ভবিষ্যৎ, আত্মসম্মান ও সামাজিক অবস্থান কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে? সমাজে অনেক মানুষ এখনও ভুক্তভোগীকেই করুণা কিংবা অবহেলার চোখে দেখে। যার ফলে শিশুটি সারাজীবন একটি অপ্রয়োজনীয় সামাজিক চাপ বহন করতে বাধ্য হয়।

অথচ যে মানুষগুলো এই জঘন্য অপরাধ করে, সেই ধর্ষক ও নির্যাতকদের পরিচয় অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। সমাজের সামনে তুলে ধরা উচিত অপরাধীর মুখ, তার বর্বরতা, তার অপরাধ এবং তার শাস্তি। কারণ লজ্জা ভুক্তভোগীর নয়, লজ্জা অপরাধীর। ঘৃণা পাওয়ার যোগ্য নির্যাতিত শিশু নয় বরং সেই নরপশু, যে একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন ধ্বংস করে দিয়েছে।

ধর্ষকদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে তাদের পরিচয়, অপরাধ ও শাস্তির বিষয়গুলো মানুষকে জানানো জরুরি। যেন সমাজ বুঝতে পারে, এই অপরাধ কোনো “ভুল” নয়, এটি জঘন্য মানবতা বিরোধী অপরাধ। ধর্ষকের প্রতি সামাজিক ঘৃণা তৈরি না করে যদি শুধুই ভুক্তভোগীর ছবি ছড়ানো হয়,তাহলে মূল সমস্যাটি আড়ালেই থেকে যায়।

এখানে কনটেন্ট ক্রিয়েটারদেরও বড় দায়িত্ব রয়েছে। সামাজিক সচেতনতার নামে ভিউ, রিচ কিংবা আবেগ নির্ভর জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য নির্যাতিত শিশুদের ছবি ব্যবহার করা কখনোই নৈতিক হতে পারে না। একজন দায়িত্বশীল কনটেন্ট নির্মাতার উচিত সে সকল ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রাখা এবং মানুষের দৃষ্টি অপরাধীর দিকে নিয়ে যাওয়া। সচেতনতা সৃষ্টি করতে হলে তথ্যভিত্তিক আলোচনা, আইনগত বিশ্লেষণ, সামাজিক প্রতিরোধের উপায় এবং অপরাধীর শাস্তির দাবি তুলে ধরা দরকার।

যারা শিশুদের ছবি প্রকাশ করে কনটেন্ট তৈরি করেন, তাদের মনে রাখা উচিত যে একটি ভাইরাল পোস্টের পেছনে একটি শিশুর সারা জীবনের মানসিক ক্ষত তৈরি হতে পারে। মানবিকতা তখনই সত্যিকার অর্থে প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন আমরা ভুক্তভোগীর মর্যাদা রক্ষা করব এবং অপরাধীর বিরুদ্ধে সোচ্চার হব।

আমাদের সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ছড়িয়ে দিতে হবে: “ধর্ষিত শিশুর ছবি নয়, ধর্ষকের মুখ প্রকাশ হোক। ভুক্ত ভোগীকে নয়, অপরাধীকেই সমাজের সামনে লজ্জিত করা হোক।”

একটি সভ্য সমাজ কখনো নির্যাতিত শিশুকে প্রদর্শনের বস্তু বানায় না। বরং তার পাশে দাঁড়ায়, তাকে নিরাপত্তা দেয় এবং অপরাধীকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। তাই আসুন, আমরা এমন একটি সচেতন সমাজ গড়ে তুলি যেখানে – প্রতিবাদ হবে শক্তিশালী, কিন্তু মানবিক; – সচেতনতা হবে জোরালো, কিন্তু মর্যাদাবোধসম্পন্ন। যেখানে শিশুদের সম্মান রক্ষা পাবে, আর ধর্ষকেরা পাবে সামাজিক ঘৃণা ও কঠোর বিচার।

______________

E-mail: mkbpolash@gmail.com

জনপ্রিয় খবর
blank

জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৫: রাজশাহী বিভাগে শ্রেষ্ঠ জেলা প্রশাসক নির্বাচিত নাটোরের আসমা শাহীন

মতামত

শিশু নির্যাতনের প্রতিবাদ হোক মানবিক ও দায়িত্বশীল

প্রকাশের সময় : ৯ ঘন্টা আগে
blank

বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা দিন দিন উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিটি ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের বিবেককে নাড়া দেয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম খুললেই আমরা দেখি প্রতিবাদ, ক্ষোভ, মানববন্ধন, পোস্ট ও ভিডিওর বন্যা। অনেক কনটেন্ট ক্রিয়েটার ও সাধারণ মানুষ সচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলছেন। এটি অবশ্যই একটি ইতিবাচক দিক। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, প্রতিবাদের ভাষা ও পদ্ধতি অনেক সময় মানবিকতার সীমা অতিক্রম করছে।

আজকাল দেখা যায়, নির্যাতিত ও ধর্ষিত শিশুদের ছবি, মুখমণ্ডল কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করে পোস্ট দেওয়া হচ্ছে। কেউ কেউ মনে করেন এতে মানুষের সহানুভূতি বাড়বে বা ঘটনাটি দ্রুত ভাইরাল হবে। কিন্তু বাস্তবে এটি শিশুটির জন্য আরও বড় মানসিক আঘাত তৈরি করে। একটি শিশু, যে ইতোমধ্যেই এই বর্বরতার শিকার,তাকে আবার পুরো সমাজের সামনে পরিচয়সহ তুলে ধরা কোনো সচেতনতা নয় বরং এটি আরেক ধরনের দ্বিতীয় নির্যাতন।

একবার ভাবুন, সেই শিশুটি বড় হয়ে যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের সেই অসহায় মুহূর্তের ছবি দেখতে পাবে, তখন তার মানসিক অবস্থার কী হবে? তার ভবিষ্যৎ, আত্মসম্মান ও সামাজিক অবস্থান কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে? সমাজে অনেক মানুষ এখনও ভুক্তভোগীকেই করুণা কিংবা অবহেলার চোখে দেখে। যার ফলে শিশুটি সারাজীবন একটি অপ্রয়োজনীয় সামাজিক চাপ বহন করতে বাধ্য হয়।

অথচ যে মানুষগুলো এই জঘন্য অপরাধ করে, সেই ধর্ষক ও নির্যাতকদের পরিচয় অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। সমাজের সামনে তুলে ধরা উচিত অপরাধীর মুখ, তার বর্বরতা, তার অপরাধ এবং তার শাস্তি। কারণ লজ্জা ভুক্তভোগীর নয়, লজ্জা অপরাধীর। ঘৃণা পাওয়ার যোগ্য নির্যাতিত শিশু নয় বরং সেই নরপশু, যে একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন ধ্বংস করে দিয়েছে।

ধর্ষকদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে তাদের পরিচয়, অপরাধ ও শাস্তির বিষয়গুলো মানুষকে জানানো জরুরি। যেন সমাজ বুঝতে পারে, এই অপরাধ কোনো “ভুল” নয়, এটি জঘন্য মানবতা বিরোধী অপরাধ। ধর্ষকের প্রতি সামাজিক ঘৃণা তৈরি না করে যদি শুধুই ভুক্তভোগীর ছবি ছড়ানো হয়,তাহলে মূল সমস্যাটি আড়ালেই থেকে যায়।

এখানে কনটেন্ট ক্রিয়েটারদেরও বড় দায়িত্ব রয়েছে। সামাজিক সচেতনতার নামে ভিউ, রিচ কিংবা আবেগ নির্ভর জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য নির্যাতিত শিশুদের ছবি ব্যবহার করা কখনোই নৈতিক হতে পারে না। একজন দায়িত্বশীল কনটেন্ট নির্মাতার উচিত সে সকল ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রাখা এবং মানুষের দৃষ্টি অপরাধীর দিকে নিয়ে যাওয়া। সচেতনতা সৃষ্টি করতে হলে তথ্যভিত্তিক আলোচনা, আইনগত বিশ্লেষণ, সামাজিক প্রতিরোধের উপায় এবং অপরাধীর শাস্তির দাবি তুলে ধরা দরকার।

যারা শিশুদের ছবি প্রকাশ করে কনটেন্ট তৈরি করেন, তাদের মনে রাখা উচিত যে একটি ভাইরাল পোস্টের পেছনে একটি শিশুর সারা জীবনের মানসিক ক্ষত তৈরি হতে পারে। মানবিকতা তখনই সত্যিকার অর্থে প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন আমরা ভুক্তভোগীর মর্যাদা রক্ষা করব এবং অপরাধীর বিরুদ্ধে সোচ্চার হব।

আমাদের সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ছড়িয়ে দিতে হবে: “ধর্ষিত শিশুর ছবি নয়, ধর্ষকের মুখ প্রকাশ হোক। ভুক্ত ভোগীকে নয়, অপরাধীকেই সমাজের সামনে লজ্জিত করা হোক।”

একটি সভ্য সমাজ কখনো নির্যাতিত শিশুকে প্রদর্শনের বস্তু বানায় না। বরং তার পাশে দাঁড়ায়, তাকে নিরাপত্তা দেয় এবং অপরাধীকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। তাই আসুন, আমরা এমন একটি সচেতন সমাজ গড়ে তুলি যেখানে – প্রতিবাদ হবে শক্তিশালী, কিন্তু মানবিক; – সচেতনতা হবে জোরালো, কিন্তু মর্যাদাবোধসম্পন্ন। যেখানে শিশুদের সম্মান রক্ষা পাবে, আর ধর্ষকেরা পাবে সামাজিক ঘৃণা ও কঠোর বিচার।

______________

E-mail: mkbpolash@gmail.com