ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
অধ্যক্ষ এম এ হামিদের ২০ তম মৃত্যুবার্ষিকী

অধ্যক্ষ এমএ হামিদ: কিছু স্মৃতি

blank

পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে এইচ এসসিতে ভর্তি হই ১৯৬৭ সালে। রসায়ন বিভাগের প্রধান ছিলেন অধ্যক্ষ এমএ  হামিদ, তিনি  তখন এডওয়ার্ড কলেজের  অধ্যাপক। এসএসসি পাশের পর বড় মামা বিলসার ইসহাক উদ্দিন আহমদ ছোট মামার সঙ্গে আমাকে ভর্তির জন্য পাঠালেন। বললেন রাজশাহীতে গিয়ে আব্দুস সাত্তার সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ করে দেখবে হোস্টেলে সিট পাওয়া যায় কিনা। নিশ্চয়তা না থাকলে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে গিয়ে এম এ হামিদ সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ করো। আমার বড় মামা খুবই উচ্চভিলাসী ও শিক্ষানুরাগী ছিলেন। আমার নিচের দিকের শিক্ষার মানে খুশি হয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য উৎসাহ দিতেন। তিনি বলতেন হোস্টেলে মেধাবী ও স্বচ্ছল পরিবারের সন্তানরা থাকে। তাদের কাছে পড়াশুনায় সহযোগীতার পাশাপাশি আচার আচরণ শিখতে পারবে যা ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।

রাজশাহী কলেজের হোস্টেলের ব্যাপারে আশ্বাস না পেয়ে পাবনা গিয়ে এম এ হামিদ সাহেবের বাসায় দেখা করলাম। ভর্তির সময় কবে থেকে তা জানিয়ে আমাকে বাড়ী যেতে বললেন। নির্ধারিত সময়ে গেলাম এবং ভর্তি হলাম। তিনি বললেন আমি হোস্টেলের সুপারিন্টেন্ডেন্ট, ওখানেই থাকলে আমি খোঁজ খবর রাখতে পারব। আমি ওনার বাসাতেই কয়েকদিন থাকলাম। প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা । আমি অজ পল্লি থেকে গিয়েছি। সন্ধ্যায় খাল পাড়ি দিয়ে রূপকথা সিনেমা হলের পাশে একটা হোটেল থেকে খেয়ে বাসায় এসে ঘুমিয়ে পড়লাম। হরদমার আব্দুল মালেক ভাই ওখানে থাকতেন। শোবার জায়গা দেখায়ে দিলেন। রাত ৯.০০/৯-৩০ টার দিকে অধ্যাপক সাহেবের ছোট ভাই প্রকৌশলী সোহরাব মামা ডেকে তুললেন। তিনি তখন বুয়েটের শিক্ষক। তিনি সেদিন ওখানে ছিলেন। বললাম খেয়ে নিয়েছি। উনি বললেন ওকথা আর বলবে না। তুলকালাম হয়ে যাবে। চুপচাপ যা পার খেয়ে নাও। বেশ কদিন থাকার পর অধ্যাপক সাহেব নিজে আমাকে টাউন মুসলিম হোস্টেলে নিয়ে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে রেখে এলেন। সেই থেকে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের সম্পর্ক ছিলো অত্যান্ত চমৎকার।

পাবনায় উনার বাসা ছিল চলনবিল অঞ্চলের সবার জন্য অবারিত, থাকা খাওয়ার আশ্রয়স্থল। পড়াশুনা, মামলা মোকদ্দমা কত কাজে যে লোকেরা সেখানে যেয়ে থাকত। শুধু গুরুদাসপুর বা নাটোরের নয়, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, বগুড়া হতে সব আসত, থাকা খাওয়া উনার বাসায়। সে সময় উনি একটি পত্রিকা প্রকাশ করতেন। সব ঐ বাসা থেকে। বাসার নামটাও ছিল চমৎকার “আমার দেশ হোম” বা এ জাতীয়। আমি প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে মাঝে মাঝেই যেতাম। খুব স্নেহ করতেন। চাকুরী জীবনে যখন সাতবাড়িয়া কলেজে ছিলাম তখন বহু গিয়েছি এবং থেকেছি। আমার সার্টিফিকেটসমূহ হাতে নকল করে উনার কাছে সত্যায়ন করার জন্য পাঠাতাম। উনি সত্যায়ন করে নিজ ব্যয়ে ডাকযোগে ফেরত পাঠাতেন অতিযত্নে।

আব্দুল হামিদ সাহেব চাঁচকৈড় শিক্ষা সংঘ এবং সেখান থেকে বার্ষিক ‘অভিযান’ পত্রিকা প্রকাশের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পুরা চলনবিল অঞ্চলের সকল গ্রামই যেন তার নিজ গ্রাম। চলনবিল অঞ্চলের বহু স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ, পোস্ট অফিস প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। কত প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছেন তা বলা সম্ভব নয়। নিজ গ্রাম খুবজীপুরে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে মহাবিদ্যালয়, পোস্ট অফিস, স্টেডিয়াম, মিউজিয়াম সবই তার হাতে গড়া। তাঁর সাথে থাকা চামড়ার ব্যাগটিতে কত অফিসারের যে নাম ঠিকানা আর ফোন নং থাকত তা আল্লাহ আর তিনি জানতেন। যেন চলমান যোগাযোগ মাধ্যম। সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। প্রয়োজন মত তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন কাজ করিয়ে নিতেন। অত্যন্ত রসিক মানুষ ছিলেন তিনি। ‘আমাদের দেশ’ নামক তাঁর প্রকাশিত মাসিক পত্রিকায় ধাঁধাঁ আর হাসির কত কিছুই না থাকত। একদিন তাঁর বাসায় গিয়েছিলাম , তখন পাবনায় পড়তাম । তখন সকাল ৯-৩০/১০.০০টা হবে। বললেন তোমাকে এখন একটা নাস্তা খাওয়াব যা পাবনায় কোথাও তুমি পাবে না। আমি তো মহাখুশী। মেয়েদের নাম ধরে ডেকে বললেন’ নিয়ে এসো’। এসে গেল এক গামলা পান্তা, পেঁয়াজ, মরিচ আর লবন। বললেন খেয়ে নাও। পাবনায় কোন হোটেলে এ খাবার পাবে না। আরেক দিনের কথা। বিকেলে গিয়েছি। বললেন তোমাকে চা”র সাথে এমন জিনিস খাওয়াব যা পাবনায় কোন রেস্টুরেন্টে পাবে না। আবার সেই হাঁক ‘নিয়ে এসো’। চলে এলো কাঁঠালের বিচি ভাজা আর চা। অনেক নিজের মনে করতেন, তাই রসিকতার সঙ্গে এসব খাবার শেয়ার করতে পারতেন। অত্যন্ত সাদাসিধে জীবন যাপন করতেন। পায়জামা পাঞ্জাবী আর কা্লো জুতা। বাড়ীতে এত মানুষ অতিথিসহ খেত। তাই বেশ কস্টও হত। তিনি রেশনের চাউলের ভাত খেতেন। আমাকে বলতেন হোস্টেলের রেশন না তুললে আমাকে তুলে দিও। অথচ বাড়ীতে তার পৈত্রিক অবস্থা কতই না ভাল তখন।

 

blank
অনেক বই তিনি লিখেছেন। পাঠ্য বই থেকে জীবনী, ভ্রমন কাহিনী ইতিহাস বই। তার লেখা ‘চলনবিলের ইতিকথা’, ‘চলনবিলের লোক সাহিত্য’  প্রামাণ্য বই।

চাকুরী জীবনে যখন ঢাকায় থাকি তখন থেকে ঢাকায় এলে অবশ্যই আমার বাসায় আসতেন ও থাকতেন। আমার বড় ছেলেকে খুব আদর করতেন। আমার ছেলেও উনি এলেই ‘দাদু দাদ’ করে পিছে পিছে ঘুরত। একদিন ওনার ব্যাগ থেকে লাল রুমালের একটা পুঁটলি বের করলেন। দেখি তাতে ২টা আম বাঁধা। বললেন বাড়ীতে [পাবনা] গাছে ৬টি আম হয়েছিল, ২টি তোমার ছেলের জন্য আনলাম। উনার ২ জন মেয়ে তখন ঢাকায় থাকত। অথচ আমার ছেলের জন্য তিন ভাগের একভাগ আম নিয়ে এসেছেন। কতটা আদর করলে এটা সম্ভব।

আমি তখন বাগেরহাটের শরনখোলায় কর্মরত। আমার স্ত্রী আর ছেলে শুধু বাসায়। উনি বাসে আসার সময় দিনাজপুরের এক শিক্ষকের সঙ্গে পরিচয় । কোথাও যাবার জায়গা নেই শুনে তাঁকে নিয়ে বাসায় উপস্থিত। ‘বৌমা, মেহমান নিয়ে এলাম’। ২ দিন থাকার পর যাবার সময় বললেন, ‘মেহমানের কাজ শেষ হয়নি। আর ও ২দিন থাকবে, তুমি যত্ন করো’। কতটা সহজভাবে তিনি বললেন। এখনকার সময়ে বিষয়টা এত সহজ নয়। তবু মেয়ের মত ভালোবাসতেন জন্য তাকে বলতে পারলেন। আমার স্ত্রীও সহজভাবে সে ভদ্রলোকের মেহমানদারী করলেন। আরো ২ দিন হাসিমুখে।

মৃত্যুর আগে যখন তিনি  শয্যাশয়ী সে সময় খুবজীপুরের বাড়ীতে কয়েকবারেই গিয়েছি। যে বারই গিয়েছি বলেছেন,  আ: রশীদ, যোগেন্দ্রনগরের ওখানে একটা ব্রিজ আর ওখান থেকে খুবজীপুরের রাস্তার ব্যবস্থা দেখো।

কর্মপাগল এই মানুষটি আর নেই । খুবজীপুর হয়ে বাড়ী যাই। বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও মাঝে মধ্যে খুবজীপুরে যাওয়া পরে। মানে পড়ে তাঁর অভাব। একটা সাধারণ গ্রামকে কতটা ভালবেসে নিজ উদ্যোগ নিয়ে কতদূর নিয়ে গেছেন। আল্লাহ্ তাঁকে বেহেশত নসীব করুন।

—————————

লেখকঃ অবসরপ্রাপ্ত সচিব

জনপ্রিয় খবর
blank

নন্দন বিলে জমজমাট নৌকাবাইচ

অধ্যক্ষ এম এ হামিদের ২০ তম মৃত্যুবার্ষিকী

অধ্যক্ষ এমএ হামিদ: কিছু স্মৃতি

প্রকাশের সময় : এক ঘন্টা আগে
blank

পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে এইচ এসসিতে ভর্তি হই ১৯৬৭ সালে। রসায়ন বিভাগের প্রধান ছিলেন অধ্যক্ষ এমএ  হামিদ, তিনি  তখন এডওয়ার্ড কলেজের  অধ্যাপক। এসএসসি পাশের পর বড় মামা বিলসার ইসহাক উদ্দিন আহমদ ছোট মামার সঙ্গে আমাকে ভর্তির জন্য পাঠালেন। বললেন রাজশাহীতে গিয়ে আব্দুস সাত্তার সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ করে দেখবে হোস্টেলে সিট পাওয়া যায় কিনা। নিশ্চয়তা না থাকলে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে গিয়ে এম এ হামিদ সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ করো। আমার বড় মামা খুবই উচ্চভিলাসী ও শিক্ষানুরাগী ছিলেন। আমার নিচের দিকের শিক্ষার মানে খুশি হয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য উৎসাহ দিতেন। তিনি বলতেন হোস্টেলে মেধাবী ও স্বচ্ছল পরিবারের সন্তানরা থাকে। তাদের কাছে পড়াশুনায় সহযোগীতার পাশাপাশি আচার আচরণ শিখতে পারবে যা ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।

রাজশাহী কলেজের হোস্টেলের ব্যাপারে আশ্বাস না পেয়ে পাবনা গিয়ে এম এ হামিদ সাহেবের বাসায় দেখা করলাম। ভর্তির সময় কবে থেকে তা জানিয়ে আমাকে বাড়ী যেতে বললেন। নির্ধারিত সময়ে গেলাম এবং ভর্তি হলাম। তিনি বললেন আমি হোস্টেলের সুপারিন্টেন্ডেন্ট, ওখানেই থাকলে আমি খোঁজ খবর রাখতে পারব। আমি ওনার বাসাতেই কয়েকদিন থাকলাম। প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা । আমি অজ পল্লি থেকে গিয়েছি। সন্ধ্যায় খাল পাড়ি দিয়ে রূপকথা সিনেমা হলের পাশে একটা হোটেল থেকে খেয়ে বাসায় এসে ঘুমিয়ে পড়লাম। হরদমার আব্দুল মালেক ভাই ওখানে থাকতেন। শোবার জায়গা দেখায়ে দিলেন। রাত ৯.০০/৯-৩০ টার দিকে অধ্যাপক সাহেবের ছোট ভাই প্রকৌশলী সোহরাব মামা ডেকে তুললেন। তিনি তখন বুয়েটের শিক্ষক। তিনি সেদিন ওখানে ছিলেন। বললাম খেয়ে নিয়েছি। উনি বললেন ওকথা আর বলবে না। তুলকালাম হয়ে যাবে। চুপচাপ যা পার খেয়ে নাও। বেশ কদিন থাকার পর অধ্যাপক সাহেব নিজে আমাকে টাউন মুসলিম হোস্টেলে নিয়ে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে রেখে এলেন। সেই থেকে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের সম্পর্ক ছিলো অত্যান্ত চমৎকার।

পাবনায় উনার বাসা ছিল চলনবিল অঞ্চলের সবার জন্য অবারিত, থাকা খাওয়ার আশ্রয়স্থল। পড়াশুনা, মামলা মোকদ্দমা কত কাজে যে লোকেরা সেখানে যেয়ে থাকত। শুধু গুরুদাসপুর বা নাটোরের নয়, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, বগুড়া হতে সব আসত, থাকা খাওয়া উনার বাসায়। সে সময় উনি একটি পত্রিকা প্রকাশ করতেন। সব ঐ বাসা থেকে। বাসার নামটাও ছিল চমৎকার “আমার দেশ হোম” বা এ জাতীয়। আমি প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে মাঝে মাঝেই যেতাম। খুব স্নেহ করতেন। চাকুরী জীবনে যখন সাতবাড়িয়া কলেজে ছিলাম তখন বহু গিয়েছি এবং থেকেছি। আমার সার্টিফিকেটসমূহ হাতে নকল করে উনার কাছে সত্যায়ন করার জন্য পাঠাতাম। উনি সত্যায়ন করে নিজ ব্যয়ে ডাকযোগে ফেরত পাঠাতেন অতিযত্নে।

আব্দুল হামিদ সাহেব চাঁচকৈড় শিক্ষা সংঘ এবং সেখান থেকে বার্ষিক ‘অভিযান’ পত্রিকা প্রকাশের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পুরা চলনবিল অঞ্চলের সকল গ্রামই যেন তার নিজ গ্রাম। চলনবিল অঞ্চলের বহু স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ, পোস্ট অফিস প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। কত প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছেন তা বলা সম্ভব নয়। নিজ গ্রাম খুবজীপুরে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে মহাবিদ্যালয়, পোস্ট অফিস, স্টেডিয়াম, মিউজিয়াম সবই তার হাতে গড়া। তাঁর সাথে থাকা চামড়ার ব্যাগটিতে কত অফিসারের যে নাম ঠিকানা আর ফোন নং থাকত তা আল্লাহ আর তিনি জানতেন। যেন চলমান যোগাযোগ মাধ্যম। সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। প্রয়োজন মত তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন কাজ করিয়ে নিতেন। অত্যন্ত রসিক মানুষ ছিলেন তিনি। ‘আমাদের দেশ’ নামক তাঁর প্রকাশিত মাসিক পত্রিকায় ধাঁধাঁ আর হাসির কত কিছুই না থাকত। একদিন তাঁর বাসায় গিয়েছিলাম , তখন পাবনায় পড়তাম । তখন সকাল ৯-৩০/১০.০০টা হবে। বললেন তোমাকে এখন একটা নাস্তা খাওয়াব যা পাবনায় কোথাও তুমি পাবে না। আমি তো মহাখুশী। মেয়েদের নাম ধরে ডেকে বললেন’ নিয়ে এসো’। এসে গেল এক গামলা পান্তা, পেঁয়াজ, মরিচ আর লবন। বললেন খেয়ে নাও। পাবনায় কোন হোটেলে এ খাবার পাবে না। আরেক দিনের কথা। বিকেলে গিয়েছি। বললেন তোমাকে চা”র সাথে এমন জিনিস খাওয়াব যা পাবনায় কোন রেস্টুরেন্টে পাবে না। আবার সেই হাঁক ‘নিয়ে এসো’। চলে এলো কাঁঠালের বিচি ভাজা আর চা। অনেক নিজের মনে করতেন, তাই রসিকতার সঙ্গে এসব খাবার শেয়ার করতে পারতেন। অত্যন্ত সাদাসিধে জীবন যাপন করতেন। পায়জামা পাঞ্জাবী আর কা্লো জুতা। বাড়ীতে এত মানুষ অতিথিসহ খেত। তাই বেশ কস্টও হত। তিনি রেশনের চাউলের ভাত খেতেন। আমাকে বলতেন হোস্টেলের রেশন না তুললে আমাকে তুলে দিও। অথচ বাড়ীতে তার পৈত্রিক অবস্থা কতই না ভাল তখন।

 

blank
অনেক বই তিনি লিখেছেন। পাঠ্য বই থেকে জীবনী, ভ্রমন কাহিনী ইতিহাস বই। তার লেখা ‘চলনবিলের ইতিকথা’, ‘চলনবিলের লোক সাহিত্য’  প্রামাণ্য বই।

চাকুরী জীবনে যখন ঢাকায় থাকি তখন থেকে ঢাকায় এলে অবশ্যই আমার বাসায় আসতেন ও থাকতেন। আমার বড় ছেলেকে খুব আদর করতেন। আমার ছেলেও উনি এলেই ‘দাদু দাদ’ করে পিছে পিছে ঘুরত। একদিন ওনার ব্যাগ থেকে লাল রুমালের একটা পুঁটলি বের করলেন। দেখি তাতে ২টা আম বাঁধা। বললেন বাড়ীতে [পাবনা] গাছে ৬টি আম হয়েছিল, ২টি তোমার ছেলের জন্য আনলাম। উনার ২ জন মেয়ে তখন ঢাকায় থাকত। অথচ আমার ছেলের জন্য তিন ভাগের একভাগ আম নিয়ে এসেছেন। কতটা আদর করলে এটা সম্ভব।

আমি তখন বাগেরহাটের শরনখোলায় কর্মরত। আমার স্ত্রী আর ছেলে শুধু বাসায়। উনি বাসে আসার সময় দিনাজপুরের এক শিক্ষকের সঙ্গে পরিচয় । কোথাও যাবার জায়গা নেই শুনে তাঁকে নিয়ে বাসায় উপস্থিত। ‘বৌমা, মেহমান নিয়ে এলাম’। ২ দিন থাকার পর যাবার সময় বললেন, ‘মেহমানের কাজ শেষ হয়নি। আর ও ২দিন থাকবে, তুমি যত্ন করো’। কতটা সহজভাবে তিনি বললেন। এখনকার সময়ে বিষয়টা এত সহজ নয়। তবু মেয়ের মত ভালোবাসতেন জন্য তাকে বলতে পারলেন। আমার স্ত্রীও সহজভাবে সে ভদ্রলোকের মেহমানদারী করলেন। আরো ২ দিন হাসিমুখে।

মৃত্যুর আগে যখন তিনি  শয্যাশয়ী সে সময় খুবজীপুরের বাড়ীতে কয়েকবারেই গিয়েছি। যে বারই গিয়েছি বলেছেন,  আ: রশীদ, যোগেন্দ্রনগরের ওখানে একটা ব্রিজ আর ওখান থেকে খুবজীপুরের রাস্তার ব্যবস্থা দেখো।

কর্মপাগল এই মানুষটি আর নেই । খুবজীপুর হয়ে বাড়ী যাই। বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও মাঝে মধ্যে খুবজীপুরে যাওয়া পরে। মানে পড়ে তাঁর অভাব। একটা সাধারণ গ্রামকে কতটা ভালবেসে নিজ উদ্যোগ নিয়ে কতদূর নিয়ে গেছেন। আল্লাহ্ তাঁকে বেহেশত নসীব করুন।

—————————

লেখকঃ অবসরপ্রাপ্ত সচিব