বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)-এর একটি সাম্প্রতিক বদলি আদেশ ঘিরে কর্পোরেশনের ভেতরে-বাইরে রাজনৈতিক প্রভাব, শ্রমিক রাজনীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। রাজশাহী থেকে বগুড়ায় বদলি হওয়ার পরও মো. হারুন অর রশিদ কার্যত রাজশাহীতেই বহাল থাকায় বিষয়টি এখন কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
বিএডিসির সংস্থাপন বিভাগ থেকে জারিকৃত অফিস আদেশে সিড টেস্টার পদে কর্মরত মো. হারুন অর রশিদকে উপপরিচালক (পাটবীজ) দপ্তর, বিএডিসি রাজশাহী থেকে একই পদে উপপরিচালক (পাটবীজ) দপ্তর, বিএডিসি বগুড়ায় বদলি করা হয়। আদেশে তা ‘অবিলম্বে কার্যকর’ বলেও উল্লেখ করা হয়। তবে বাস্তবে দেখা যায়, বদলি আদেশ জারির পরও তিনি রাজশাহী অঞ্চলে তাঁর সাংগঠনিক ও প্রভাবশালী অবস্থান ধরে রেখেছেন।
এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—বদলি কার্যকর হলে তিনি কীভাবে এখনও বিএডিসি শ্রমিক-কর্মচারী লীগ (সিবিএ)-এর রাজশাহী জেলা শাখার সভাপতির দায়িত্বে বহাল আছেন। বিষয়টি নিয়ে কর্পোরেশনের অভ্যন্তরে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
বিএডিসির একাধিক অভ্যন্তরীণ সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, মো. হারুন অর রশিদ দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিক রাজনীতিতে সক্রিয় এবং তিনি সাবেক সরকার আমলে জাতীয় শ্রমিক লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ও মাঠপর্যায়ের প্রভাবের কারণেই বদলি আদেশ কার্যত বাস্তবায়ন হয়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

একটি সূত্রের ভাষায়, “বদলি কাগজে হয়, কিন্তু ক্ষমতা মাঠে—হারুন অর রশিদের ক্ষেত্রে সেটাই প্রমাণিত।”
আরেক সূত্র জানায়, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বাইরে তাঁর একটি শক্ত রাজনৈতিক বলয় রয়েছে, যা সহজে উপেক্ষা করা যায় না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে মো. হারুন অর রশিদ জাতীয় শ্রমিক লীগের মিছিল, সভা ও সমাবেশে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন এবং সামনের সারিতে অবস্থান করতেন। এতে তিনি শাসকদলের শ্রমিক রাজনীতির একজন পরিচিত মুখে পরিণত হন। সংশ্লিষ্টদের মতে, সেই সময়ের রাজনৈতিক সক্রিয়তার প্রভাব এখনও পুরোপুরি কাটেনি।
একজন শ্রমিক সংগঠক বলেন, “জাতীয় শ্রমিক লীগের বড় যেকোনো কর্মসূচিতে হারুন অর রশিদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। এই পরিচয়ই তাঁকে এখনও সাংগঠনিকভাবে শক্ত অবস্থানে রেখেছে।”
সূত্রগুলো আরও জানায়, রাজশাহী জেলা শাখায় তাঁর বিকল্প নেতৃত্ব দৃশ্যমানভাবে গড়ে না ওঠায় কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকেও তাঁকে সরানোর বিষয়ে অনীহা রয়েছে। দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক যোগাযোগ ও শ্রমিক-কর্মচারীদের ওপর নিয়ন্ত্রণের কারণে তাঁকে বাদ দিয়ে সংগঠন পরিচালনা ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজশাহী অঞ্চলের শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যেও তাঁর অবস্থান এখনো প্রভাবশালী। কেউ তাঁকে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের নেতা হিসেবে দেখলেও, অনেকেই মনে করেন তাঁর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ক্ষমতা বাস্তবে উপেক্ষা করা কঠিন। এক জ্যেষ্ঠ কর্মচারী বলেন, “তিনি যা বলেন, সেটার পেছনে ওজন থাকে— এটাই বাস্তবতা।”
প্রশাসনিক অন্দরমহলেও বিষয়টি নিয়ে ভিন্নমত নেই বলে জানিয়েছেন একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। তাঁদের মতে, কিছু ক্ষেত্রে বদলি আদেশ কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে, বাস্তব ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রভাব বিবেচনায় রাখতে হয়। মো. হারুন অর রশিদের ক্ষেত্রেও তেমনটাই ঘটেছে।
উল্লেখ্য, মো. হারুন অর রশিদ দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে রাজশাহী অঞ্চলে কর্মরত। তিনি অতীতে বিএডিসি শ্রমিক লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনকালে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে এর আগেও বিভিন্ন সময়ে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মো. হারুন অর রশিদ বলেন, “আমি বিএডিসি শ্রমিক লীগের সভাপতি ছিলাম। তবে কোনো অন্যায় বা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলাম না।”
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিএডিসি রাজশাহীর উপপরিচালক (পাটবীজ) এইচ এস জাহিদুল ফেরদৌসের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্টাফ রিপোর্টার 





















