“তাকে প্রাচীন যুগের একটি শিলালিপি বলে মনে হয় আমার। তাকে দেখলে বোঝা যাবে না—একটি জীবন্ত ইতিহাস তিনি। তার জানার এতখানি ঔৎসুক্য এবং সৃষ্টির এত উত্তাপ—তিনি বাস করছেন মফস্বল শহরের একটি অজ্ঞাত গলিতে। খ্যাতি এবং প্রতিষ্ঠার কোনো লোভ আজও তাকে স্পর্শ করেনি। তিনি বিশ্বাস করেন, কাজটাই বড়। অতীতকে মনের দর্পণ বলে মনে করেন তিনি এবং সেটাকে সত্যসন্ধানের দৃষ্টিতে নিখুঁতভাবে তুলে ধরতে চান।”
অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ সম্পর্কে এই অসাধারণ কথাগুলো লিখেছিলেন সাংবাদিক জনাব সানাউল্লাহ নূরী। ১৯৬৮ সালের ২০ নভেম্বর দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর লেখায় যে মানুষটির প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছিল, তিনি আর কেউ নন—আমাদের প্রিয় অধ্যক্ষ এম. এ. হামিদ।
জনাব আব্দুল হামিদ শুধু আমার প্রিয় ব্যক্তিত্ব নন; তাঁকে যারা কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁর কর্ম ও আদর্শকে যারা জানেন, তাদের সবার কাছেই তিনি একজন প্রিয়, শ্রদ্ধেয় ও অনুকরণীয় মানুষ। মানুষকে আপন করে নেওয়ার এক অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। তাঁর ব্যক্তিত্বে এমন এক আকর্ষণ ছিল, যা শিক্ষিত-অশিক্ষিত, শিশু-কিশোর, যুবক-বৃদ্ধ—সবাইকে সহজেই কাছে টেনে নিত।
শৈশবের সেই প্রিয় মানুষ
ছোটবেলায় দেখতাম—তিনি বাড়িতে এলে পুরো এলাকায় যেন সাড়া পড়ে যেত। সবাই জানত, “প্রফেসর সাহেব এসেছেন।” দূর-দূরান্তের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিক্ষিত-অশিক্ষিত মানুষ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। ঈদের মাঠে তাঁর উপস্থিতি আমাদের মনে এক অন্যরকম উদ্দীপনা সৃষ্টি করত।
ভোরবেলা থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত তিনি কাজ করতেন। কখনো গাছ লাগাচ্ছেন, কখনো গাছের পরিচর্যা করছেন, কখনো রাস্তা পরিষ্কার করছেন, কখনো ভাঙা রাস্তায় মাটি ফেলছেন। আবার কখনো লাইব্রেরির জন্য বইপত্র সংগ্রহ করছেন। তাঁর চারপাশে থাকত চলনবিল এলাকার একদল প্রাণবন্ত যুবক।
ছোটবেলায় অধ্যক্ষ এম. এ. হামিদের কাছে গিয়ে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ তখনও হয়নি। দূর থেকে তাঁকে দেখতাম আর ভাবতাম -যদি তার মতো সমাজসেবক হতে পারতাম।
একসময় তার সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ হলো, একনিষ্ঠ ভক্তে পরিণত হলাম। তাঁর গুণাবলি নিজের মধ্যে ধারণ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু যতই চেষ্টা করেছি, ততই উপলব্ধি করেছি—এমন বহুমাত্রিক গুণের অধিকারী একজন মানুষকে অনুসরণ করা কত কঠিন!
তিনি ছিলেন একাধারে শিক্ষক, সমাজসেবক, সংগঠক, লেখক, ইতিহাস-অনুসন্ধানী, সাংবাদিক এবং শিশু-কিশোরদের পরম বন্ধু। তাঁর জীবনকে একক কোনো পরিচয়ে আবদ্ধ করা সত্যিই কঠিন।

শিক্ষাজীবন
অধ্যক্ষ এম. এ. হামিদের শিক্ষাজীবন ছিল অত্যন্ত কৃতিত্বপূর্ণ। ১৯৪৫ সালে তিনি চাঁচকৈড় নাজিমুদ্দিন হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৪৭ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে আই.এসসি. এবং ১৯৫০ সালে একই কলেজ থেকে ডিস্টিংশনসহ বি.এসসি. ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন শাস্ত্রে এম.এসসি. ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি দ্বিতীয় শ্রেণিতে পঞ্চম স্থান অধিকার করেন।
বর্ণময় কর্মজীবন
পাবনার ভাঙ্গুড়া হাই স্কুলে শিক্ষকতার মাধ্যমে তাঁর বর্ণময় কর্মজীবনের সূচনা। ১৯৫৩ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত তিনি সাতক্ষীরা, গাইবান্ধা, রংপুর কারমাইকেল কলেজ, পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ এবং যশোর এম. এম. কলেজে অধ্যাপনা করেন। ১৯৭২ সালে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী প্রতিষ্ঠিত মহিপুর হাজী মহসিন কলেজে সরকার নিয়োগপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন এবং প্রায় তিন বছর দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৫ সালে তিনি সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে বগুড়া আজিজুল হক কলেজে যোগদান করেন। ১৯৮০ সালে একই কলেজে উপাধ্যক্ষ হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। একই সঙ্গে অধ্যাপক পদেও পদোন্নতি পান।
১৯৮৪ সালে তিনি অধ্যক্ষ হিসেবে বগুড়া মুজিবুর রহমান মহিলা কলেজে যোগদান করেন। ১৯৮৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। কিন্তু অবসর তাঁর কর্মজীবনের সমাপ্তি ঘটাতে পারেনি। বরং সরকারি চাকরি শেষ হওয়ার পর তাঁর কর্মস্পৃহা যেন আরও বেড়ে যায়। নিজ গ্রামে তিনি একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখানে বিনা বেতনে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে পাবনা ইসলামিয়া কলেজে প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
সমাজসেবী ও প্রতিষ্ঠান-নির্মাতা
অধ্যক্ষ এম. এ. হামিদ আপাদমস্তক একজন নিবেদিতপ্রাণ সমাজসেবী। তাঁর সমাজসেবা ছিল নিঃস্বার্থ, নিরবচ্ছিন্ন এবং বাস্তবমুখী। মাত্র সপ্তম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় তিনি খুবজীপুরে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। তাঁর প্রচেষ্টায় খুবজীপুরে ডাকঘর, সোনালী ব্যাংক, গ্রামীণ ব্যাংক, হাই স্কুল, দাখিল মাদ্রাসা, চলনবিল জাদুঘর এবং খুবজীপুর ইউনিয়ন পরিষদ প্রতিষ্ঠিত হয়। অনুন্নত চলনবিল এলাকার ছেলে-মেয়েদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করার জন্য তিনি নিজ গ্রামে কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। নাটোর সরকারি সিরাজউদ্দৌলা কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন প্রথমদিকের অন্যতম উদ্যোক্তা। বিলচলন শহীদ শামসুজ্জোহা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে কলেজ প্রতিষ্ঠায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। পাবনা ইসলামিয়া কলেজ—বর্তমান শহীদ বুলবুল কলেজ—প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও তিনি প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন।
তার চেষ্টায় গুরুদাসপুর-চাঁচকৈড়-খুবজীপুর-বালসা সড়কটি জেলা বোর্ডের আওতায় আসে। ১৯৬৩-৬৪ সালে খুবজীপুরে একটি পাকা ব্রীজ স্থাপিত হয়। মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী প্রতিষ্ঠিত মহিপুর হাজী মহসিন কলেজ যখন প্রায় মৃতপ্রায় অবস্থায় পৌঁছেছিল, তখন অধ্যক্ষ এম. এ. হামিদ সেখানে নতুন প্রাণসঞ্চার করেন। শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—পাঁচবিবি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, পাঁচবিবি রেলওয়ে শেড নির্মাণসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বগুড়া আজিজুল হক কলেজে তাঁর প্রচেষ্টায় একটি ব্যাংক ও একটি ডাকঘর প্রতিষ্ঠিত হয়।

একজন অসাধারণ সংগঠক
সমাজসেবার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ সংগঠক। ১৯৪১ সালে তিনি গ্রামে যুবক সমিতি ও দরদী পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৪২ সালে বিঘাঘাট ইউনিয়ন পল্লীমঙ্গল সমিতি, ১৯৪৭ সালে চলনবিল মুসলিম ছাত্র সমিতি, ১৯৫০ সালে খুবজীপুর নজরুল প্রগতি সংঘ এবং ১৯৫৪ সালে গুরুদাসপুর থানা শিক্ষা সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৪৮ সালে তিনি পাকিস্তান ন্যাশনাল গার্ড বাহিনীর গ্রাম্য দলের অধিনায়ক ছিলেন। পাশাপাশি সেন্ট জন অ্যাম্বুলেন্স কোর, জুনিয়র রেডক্রস ও কাব স্কাউট আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তিনি জীবন সদস্য ছিলেন।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতি, বাংলা সাহিত্য পরিষদ ঢাকা, বাংলাদেশ ফোকলোর সোসাইটি ঢাকা, বাংলাদেশ বিজ্ঞান উন্নয়ন সমিতি, বরেন্দ্র একাডেমি রাজশাহীসহ বহু প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে তিনি সদস্য, পৃষ্ঠপোষক বা সংগঠক হিসেবে যুক্ত ছিলেন।
লেখক ও ইতিহাস-অনুসন্ধানী এম. এ. হামিদ
তিনি যেমন একজন নিবেদিতপ্রাণ সমাজকর্মী, তেমনি একজন সুলেখক ও ইতিহাস-অনুসন্ধানী। তাঁর লেখনী সম্পর্কে Our Home পত্রিকা যথার্থই লিখেছিল— “Prof. Hamid does not hope to have financial gain out of writing. He uses writing as a means of recording fact for the present generation and for the posterity.” লেখালেখি তাঁর কাছে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম ছিল না; ছিল ইতিহাস, সমাজ ও মানুষের জীবনকে সংরক্ষণ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক মহান দায়িত্ব।
তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
১. চলনবিলের ইতিকথা — ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ যার আশীর্বাণী দিয়েছেন। এটি একটি মূল্যবান গবেষণাগ্রন্থ ও প্রামাণ্য দলিল।
২. চলনবিলের লোকসাহিত্য — বাংলা একাডেমি প্রকাশিত। ড. আশরাফ সিদ্দিকীর মতে, “যারা জেগে ঘুমায় তাদের জ্ঞানচক্ষু দেবে এ গ্রন্থ।”
৩. জ্ঞানের মশাল
৪. রসায়নের তেলেসমতি
৫. কর্মবীর সেরাজুল হক
৬. পশ্চিম পাকিস্তানের ডাইরি
৭. পল্লীকবি কারামত আলী
৮. হজের সফর।
৯. আমাদের গ্রাম — গবেষণামূলক ইতিহাস।
১০. শিক্ষার মশালবাহী রবিউল করিম
১১. বঙ্গাব্দ সমাচার।
১২. দেখে এলাম অস্ট্রেলিয়া
১৩. পল্লী শিক্ষক
১৪. অবিস্মরণীয় প্রাণ — তাঁর পিতার জীবনী।
১৫. পাশ্চাত্যের বৈশিষ্ট্য ।
১৬. উচ্চ মাধ্যমিক রসায়ন।
১৭. Degree Practical Chemistry।

সাংবাদিক এম. এ. হামিদ
সাংবাদিকতাতেও তাঁর পদচিহ্ন অত্যন্ত গভীর। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই কলকাতা থেকে প্রকাশিত মাওলানা আকরম খাঁ সম্পাদিত সাপ্তাহিক মোহাম্মদী এবং হাইস্কুলে পড়ার সময় লাহোর থেকে প্রকাশিত ইংরেজি সাপ্তাহিক The Light-এর গ্রাহক হন। ছাত্রজীবনেই রাজশাহী থেকে প্রকাশিত পল্লীবান্ধব ও নয়া জামানা, কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজাদ-এ প্রবন্ধ ও চিঠিপত্র লিখতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে সাপ্তাহিক সৈনিক, জাহানে নও, দৈনিক আজাদ, ইত্তেহাদ, মিল্লাত প্রভৃতি পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়। ১৯৬৭-৬৯ সালে তিনি দৈনিক পয়গাম পত্রিকার নিজস্ব সংবাদদাতা ছিলেন। ১৯৫৮ সালে পাবনা থেকে তিনি “আমাদের দেশ” নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। “দস্তগীর ভাইয়া” ছদ্মনামে তিনি “নবীনদের শিবির” পরিচালনা করতেন। আমাদের দেশ-এর ইংরেজি সংস্করণ Our Home এবং উর্দু সংস্করণ হামারা ওয়াতন পাকিস্তান থেকে প্রকাশিত হতো। তাঁর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় আরও বহু পত্র-পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে।
ছোটদের প্রিয় বন্ধু
অধ্যক্ষ এম. এ. হামিদের একটি বিশেষ পরিচয় ছিল—তিনি ছিলেন শিশু-কিশোরদের অত্যন্ত কাছের মানুষ। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তিনি শিশুদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে পারতেন। কোনো বাড়িতে বেড়াতে গেলে বড়দের চেয়ে ছোটদের সঙ্গেই যেন তাঁর বেশি সময় কাটত। নিজের বয়স ভুলে তিনি শিশুদের সঙ্গে বসে পড়তেন। কখনো ছড়া, কখনো ধাঁধা, কখনো গল্প—এভাবেই তিনি তাদের সঙ্গে আনন্দে মেতে উঠতেন। অনেক সময় রাত জেগে শিশু-কিশোরদের গল্পও শোনাতেন। তাদের পড়ালেখার ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। কোনো গ্রামের ভালো ছাত্রের সন্ধান পেলেই তিনি তার প্রতি বিশেষ যত্ন নিতেন। পঞ্চম বা অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি, কিংবা ম্যাট্রিক বা ইন্টারমিডিয়েটে ভালো ফলাফলের খবর পেলেই চেনা-অচেনা নির্বিশেষে অভিনন্দন বার্তা পাঠাতেন এবং সঙ্গে পাঠাতেন মূল্যবান বইয়ের একটি সেট। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ থাকত। ইংরেজিতে চিঠি লেখার জন্য তিনি তাদের উৎসাহিত করতেন। বাংলা বা ইংরেজিতে লেখা চিঠিতে ভুল থাকলে তা সংশোধন করে আবার শিক্ষার্থীর কাছে পাঠিয়ে দিতেন। একজন শিক্ষকের জন্য এর চেয়ে সুন্দর শিক্ষাদানের পদ্ধতি আর কী হতে পারে! দরিদ্র মেধাবী ছাত্রদের বৃত্তি দেওয়ার জন্য তিনি গঠন করেন সরদার ফাউন্ডেশন।
সময়ের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা
সময়কে তিনি জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ মনে করতেন। ঢাকায় যাতায়াত করতেন নাইট কোচে—শুধু সময় বাঁচানোর জন্য। কোনো অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা থাকলে নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই পৌঁছে যেতেন। যানবাহনের অনিশ্চয়তা থাকলে প্রয়োজনে পায়ে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছেছেন। একটি মুহূর্তও যেন তাঁর কাছে অপচয় করার মতো ছিল না। বাসে বা নৌকায় যাতায়াতের সময়ও তিনি বই পড়তেন। পথে কোনো কাগজ পড়ে থাকতে দেখলে সেটিও আগ্রহ নিয়ে তুলে নিতেন। প্রয়োজনীয় মনে হলে তা সংগ্রহ করে রাখতেন। চলনবিল জাদুঘর প্রতিষ্ঠার সময় তাঁর এই সংগ্রাহকসত্তার পরিচয় আরও স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। তিনি যেখানেই যেতেন, ইতিহাসের কোনো উপাদান, পুরোনো দলিল, ছবি, বই বা স্মৃতিচিহ্ন পেলে তা সংগ্রহ করার চেষ্টা করতেন।
কাজপাগল এক মানুষ
অধ্যক্ষ এম. এ. হামিদের অভিধানে যেন “অবসর” শব্দটি ছিল না। সাংবাদিক সানাউল্লাহ নূরী তাঁর সম্পর্কে লিখেছিলেন— “সারা শরীরে রাত জাগার ক্লান্তি, হাতে বইয়ের ছাপানো একটি ফর্মা এবং কিছু পাণ্ডুলিপি। বিস্মিত চোখে অধ্যক্ষ হামিদের দিকে তাকাতেই তিনি বললেন—এমনই আমার অভ্যাস। দিনের বেলা সময় পাই না। রাতটাই আমার দিন। রাত জেগে পড়ি-লিখি।” তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল—“একেবারেই ঘুমাননি?” তিনি উত্তর দিয়েছিলেন—ভোরে কিছুটা ঘুম পেয়েছিল, ছাপাখানার টেবিলেই তা সেরে নিয়েছেন। সানাউল্লাহ নূরীর ভাষায়, সাধনার প্রতি এমন নিষ্ঠা ছিল “একান্ত দুর্লভ”। প্রায় প্রতিদিন রাত দুইটা-তিনটা পর্যন্ত তাঁকে লেখালেখি করতে দেখা যেত। প্রতিদিন তাঁর কাছে প্রচুর চিঠি আসত। শত ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি কোনো চিঠি পেন্ডিং রাখতেন না। তাঁর একটি কথা আজও আমার মনে গভীরভাবে দাগ কেটে আছে— “বিশ্রাম একবারেই নেব। এর আগে আর বিশ্রামের প্রয়োজন নেই।” এই একটি বাক্যই যেন তাঁর সমগ্র জীবনদর্শনের সংক্ষিপ্ত পরিচয়।

গুণীজনদের চোখে অধ্যক্ষ এম. এ. হামিদ
সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ ইব্রাহিম খাঁ তাঁর চললাম চলনবিলের তল্লাশে সফরকাহিনীতে লিখেছেন— “দেশের অনেক কৃতিসন্তান অধ্যক্ষ এম. এ. হামিদের গড়া শিক্ষা সংঘ দেখতে এসেছেন। এই দূর পল্লীর দুর্গম স্থানে এরা স্বেচ্ছায় এসেছেন মনে হয় না। সেকালের চলনবিলের ডাকাতেরা পথিক ধরে আনত, একালের অধ্যাপক হামিদ এদের ধরে আনেন।” এই মন্তব্যের মধ্যে যেমন রসিকতা আছে, তেমনি আছে অধ্যাপক হামিদের অসাধারণ সাংগঠনিক ক্ষমতার স্বীকৃতি। দৈনিক ইত্তেফাকের উপ-সম্পাদকীয়তে ৩ জুলাই ১৯৭৮ তারিখে জনাব আক্তার-উল আলম লিখেছিলেন— “পাকিস্তান আমলেও দেখেছি পাবনা ও রাজশাহীর চলনবিল এলাকায় একজন মাত্র লোকের নেতৃত্বে অন্তত ২/৩ ডজন স্কুল, কলেজ ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হয়েছিল… অধ্যাপক হামিদের কথাই বলছি আমি।
শ্রদ্ধা ও অনুপ্রেরণার মানুষ
অধ্যক্ষ এম. এ. হামিদকে আমি যত দেখেছি, যত জেনেছি, ততই বিস্মিত হয়েছি। তিনি শুধু একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেননি—মানুষ তৈরি করেছেন। তিনি শুধু রাস্তা তৈরি করেননি—মানুষের এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করেছেন। তিনি শুধু বই লেখেননি—একটি জনপদের ইতিহাসকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করেছেন। তিনি শুধু কলেজ প্রতিষ্ঠা করেননি—অসংখ্য তরুণের স্বপ্ন দেখার সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। তিনি শুধু শিশুদের গল্প শোনাননি—তাদের মনে জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করেছেন। তাঁর জীবন আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়—একজন মানুষ চাইলে একটি জনপদের ভাগ্য পরিবর্তনের সূচনা করতে পারেন। শহরে থাকার অসংখ্য সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি গ্রামের মানুষ, গ্রামবাংলার শিক্ষা, সংস্কৃতি ও উন্নয়নের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। কাকডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করেছেন। নিজের জন্য নয়, মানুষের জন্য। সরদার আব্দুল হামিদকে তাঁর বয়স কখনো কাবু করতে পারেনি। তিনি ছিলেন কর্মী, ধ্যানী, সাধক, সংগঠক ও সেবক। মনে হয়েছে, তিনি যেন চিরতারুণ্য নিয়েই পৃথিবীতে এসেছেন।

একজন মানুষের চেয়েও বেশি
অধ্যক্ষ এম. এ. হামিদের জীবনকে শুধু একটি ব্যক্তির জীবন হিসেবে দেখলে তাঁর প্রতি সুবিচার করা হবে না। তিনি একটি সময়ের প্রতিনিধি। তিনি একটি জনপদের ইতিহাসের নির্মাতা। তিনি শিক্ষার একজন অক্লান্ত সৈনিক। তিনি সমাজসেবার একজন নিরলস কর্মী। তিনি ইতিহাস সংরক্ষণের একজন নিষ্ঠাবান সাধক। তিনি শিশু-কিশোরদের একজন অকৃত্রিম বন্ধু। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি খ্যাতির পেছনে ছোটেননি; বরং কাজকে অনুসরণ করেছেন। আর সেই কাজই শেষ পর্যন্ত তাঁকে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন দিয়েছে। তাঁর জীবন যেন গভীর রাতের প্রার্থনার মতো পবিত্র, আর তাঁর কর্মস্পৃহা যেন এক প্রাণবন্ত যুবকের মতো অদম্য। জীবনের একটি অধ্যায় শেষ হলে তাঁর সামনে খুলে গেছে আরেকটি নতুন অধ্যায়। সরকারি চাকরি শেষ হয়েছে, কিন্তু তাঁর কর্মজীবন শেষ হয়নি। বরং নতুন উদ্যমে তিনি সমাজ, শিক্ষা, ইতিহাস ও মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। আজ যখন আমরা সমাজসেবা, শিক্ষা বিস্তার, প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও মানবকল্যাণের কথা বলি, তখন অধ্যক্ষ এম. এ. হামিদের মতো মানুষদের জীবন আমাদের সামনে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়ায়।
উপসংহার
মানুষের জীবনের প্রকৃত মূল্য তার পদ-পদবিতে নয়, মানুষের জন্য সে কী রেখে গেছে তার মধ্যে। অধ্যক্ষ এম. এ. হামিদ তাঁর দীর্ঘ জীবনে রেখে গেছেন অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সংগঠন, গ্রন্থ, স্মৃতি, অনুপ্রেরণা এবং সবচেয়ে বড় কথা—একটি আদর্শ। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন— কাজ করতে হয়, পরিচিতির জন্য নয়; মানুষের জন্য। জ্ঞান অর্জন করতে হয়, নিজের জন্য নয়; সমাজের জন্য। সময়কে মূল্য দিতে হয়, কারণ জীবন সীমিত। আর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো—অন্যের জীবনে আলো জ্বালানো। আমার শৈশবের দূর থেকে দেখা সেই মানুষটি আজও আমার কাছে এক অনন্য অনুপ্রেরণা। তাঁর মতো মানুষরা চলে গেলেও তাঁদের কর্ম বেঁচে থাকে। তাঁদের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান বেঁচে থাকে। তাঁদের লেখা বেঁচে থাকে। তাঁদের আদর্শ বেঁচে থাকে মানুষের হৃদয়ে। আর সেই কারণেই— অধ্যক্ষ এম. এ. হামিদ একজন মানুষ নন শুধু; তিনি একটি অনুপ্রেরণার নাম।
————————–
লেখকঃ সচিব (পিআরএল)
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
rahman.saidur66@gmail.com

মোঃ সাইদুর রহমান 



















