ঢাকা সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
গল্প

পাহাড়ায় কালো বিড়াল

blank
কেহেলের চিৎকারে তার বন্ধুরা এগিয়ে গেল। সেখানে আশপাশ খুঁজে দেখার পর তারা লক্ষ্য করল, একটা খাটিয়াতে অল্প কিছু মানুষ মুর্দা নিয়ে যাচ্ছে। এদের এক বন্ধু, কে মারা গেছে জিজ্ঞেস করতেই, একজন বলল, তুমি কি গ্রামের সবাইকে চেন? তখন কেহেলের অন্য একজন বন্ধু বিষু বলল, আজ এই গ্রামে কেউ মারা গেছে তা’ শুনিনি। কখন মারা গেছে? কোন বাড়ির মানুষ?মূর্দাবহনকারীদের কেউই উত্তর দিল না। তারা শুনতে পেল কি না, তাও বোঝা গেল না! মানুষগুলো কেমন অদ্ভুত! চোখের পলকে তারা চলে গেল। কেহেল ফিরল না।
কিছুতেই কেহেলকে খুঁজে না পেয়ে অগত্য তার বন্ধুরা বাড়ী ফিরে গেল। তারা কেহেলের বাড়িতে গিয়েও দেখলো কেহেল নেই! বিষয়টি থানা পুলিশ পর্যন্ত গড়ালেও সুরাহা হল না, বরং এতে তার বন্ধুদের দিকেই অভিযোগের তীব্র বাতাস বইতে লাগলো। সন্ধ্যার পরে তাদের এখানে আসা উচিৎ হয়নি। আগেই বোঝা উচিৎ ছিল, জায়গাটা বিশেষ ভালো নয়। মুরব্বিদের কথা না মেনে ভুল হয়েছে হয়তো।  কিন্তু, হিসু করার কথা বলে কেহেল গেল কোথায়?
কেহেলদের বাড়িতে এখন অন্য রকম অবস্থা। মা-বাবা কারো চোখে ঘুম নেই। সবাই কেহেলকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে তার বন্ধুরাও বিব্রত। একজন হুজুরকে নিয়ে আসা হল, কিন্তু তিনি কিছু না বলেই চলে গেলেন। তবে সবাই বুঝলো এ সমস্যা এই হুজুরের কাজ নয়।
একদিন মধ্যরাতে কেহেলের মায়ের ঘুম ভেংগে গেল।  তার আওয়াজে সবার ঘুমও চলে গেল। তিনি বললেন, কেহেলকে কারা যেন মারছে! আর তিন দিন মাত্র সময়! এর ভেতরে পাঁঠা বলি দিতে হবে। নতুবা ওরা! তারপর কান্নায় ভেংগে পড়ে মুর্ছা গেল।
আবারও একজন হুজুরকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে আসা হল। উনি অনেক দূর থেকে এসেছেন। বাড়ির চারপাশ ভালো করে ঘুরে বেড়িয়ে এসে স্থির হয়ে বসে পড়লেন। তারপর অনেক সময় পরে মুখ খুললেন। কি হয়েছে তা’ বলার সাধ্য তার নেই। তবে কেহেল কোন এক দুষ্ট ও শক্তিধর জ্বীনের শরীরে প্রসাব করে দিলে বিপত্তি বাধে। এর  বেশি কিছু তার জানা নেই। আর কোন কথা তিনি না বলে হাদিয়া নিয়ে বিদায় হলেন।
ইসলাম ধর্মে বলি দেবার বিধান নেই। কেহেলের বাবা একবাক্যে বলি দেবার কথা অস্বীকার করলেন। আর, কেহেলের মা বেশি ভেংগে পড়েছে বলে তার স্বপ্নকে দু:স্বপ্ন মনে করলেন।  কিন্তু, মায়ের মন বলে কথা। কেহেলের মা তার বাবার বাড়িতে খবর পাঠালেন। কেহেলের মামা এলে তাকে গোপনে পাঁঠা বলি দেবার ব্যবস্থা করার জন্য বলা হল। কিন্তু, কেহেলের বাবা যেন না জানে! কেহেলের মামা আমতা আমতা করছিল। সব বুঝে কেহেলের মা তার ভাইকে সাথে করে বাবার বাড়িতে গিয়ে পাঁঠা বলি দেবার ব্যবস্থা করে তবেই বাড়ি ফিরলেন। যে কোন মূল্য ছেলেকে ফেরত চাই। বলি দেবার পরে তার মা আর স্বপ্ন দেখেনি। দুই বার স্বপ্নে শুধু বলা হয়েছিল বলি দিলেই ছেলেকে ফিরে পাবে।
বিশ্রী স্বপ্ন দেখে কোহেলের বন্ধুর সোহেলের ঘুম ভেংগে গেল! স্বপ্নে দেখলো কেহেলের লাশ পড়ে আছ বারান্দায়!! একটা কালো বেড়াল লাশের পাহাড়ায়।  সে ভোরেই ছুটলো, ততক্ষণে কেহেলের বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে গেছে। কি হয়েছিল? লাশ সেই পোড়াবাড়ির পাশের দীঘি থেকে ভেসে উঠেছে। কোন মতে লাশ চেনা যাচ্ছিল। ওর বন্ধুরা সবাই বলা বলি করছিল, কেহেল সাতার শেখেনি! প্রস্রাব করতে গিয়ে পা পিছলে হয়তো পুস্করিণীতে পড়ে গিয়ে থাকতে পারে। পোস্টমর্টেমে পানিতে ডুবে মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা রয়েছে।
কেহেল পানিতে পড়ে গেল। কখন শব্দ হয়েছিল? কেউ শব্দ শোনেনি? কারো কথা নিরবতা ভেদ করলো না।
কেহেল হিসু করতে যাবে, বলেছিল কাউকে? না কাউকে সে বলে যায়নি! তাহলে কেহেল ছিল কোথায়? কেহেল হিসু করতে যাবে, কেউ শোনেনি তবুও গল্পটা ছড়িয়ে গেছে।
লাশের খাটিয়ায় কে ছিল? এই গাঁয়ে সেদিন কেউ মরেছিল?
এই গ্রামে তিন দিনে কেন? পাঁচ-সাত দিনেও কেউ মারা যায়নি বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বন্ধুরা সবাই চায়ের টেবিলে। আজ কেহেল সাথে নেই। ভাবতেই বুকের ভেতরটা কেমন কেমন করছে। চা ঠান্ডা হয়ে যায়, তবুও কারো মুখে চা ঢোকে না।
—————————–
লেখক: গল্পকার ও সংগঠক
জনপ্রিয় খবর
blank

পাহাড়ায় কালো বিড়াল

গল্প

পাহাড়ায় কালো বিড়াল

প্রকাশের সময় : এক ঘন্টা আগে
blank
কেহেলের চিৎকারে তার বন্ধুরা এগিয়ে গেল। সেখানে আশপাশ খুঁজে দেখার পর তারা লক্ষ্য করল, একটা খাটিয়াতে অল্প কিছু মানুষ মুর্দা নিয়ে যাচ্ছে। এদের এক বন্ধু, কে মারা গেছে জিজ্ঞেস করতেই, একজন বলল, তুমি কি গ্রামের সবাইকে চেন? তখন কেহেলের অন্য একজন বন্ধু বিষু বলল, আজ এই গ্রামে কেউ মারা গেছে তা’ শুনিনি। কখন মারা গেছে? কোন বাড়ির মানুষ?মূর্দাবহনকারীদের কেউই উত্তর দিল না। তারা শুনতে পেল কি না, তাও বোঝা গেল না! মানুষগুলো কেমন অদ্ভুত! চোখের পলকে তারা চলে গেল। কেহেল ফিরল না।
কিছুতেই কেহেলকে খুঁজে না পেয়ে অগত্য তার বন্ধুরা বাড়ী ফিরে গেল। তারা কেহেলের বাড়িতে গিয়েও দেখলো কেহেল নেই! বিষয়টি থানা পুলিশ পর্যন্ত গড়ালেও সুরাহা হল না, বরং এতে তার বন্ধুদের দিকেই অভিযোগের তীব্র বাতাস বইতে লাগলো। সন্ধ্যার পরে তাদের এখানে আসা উচিৎ হয়নি। আগেই বোঝা উচিৎ ছিল, জায়গাটা বিশেষ ভালো নয়। মুরব্বিদের কথা না মেনে ভুল হয়েছে হয়তো।  কিন্তু, হিসু করার কথা বলে কেহেল গেল কোথায়?
কেহেলদের বাড়িতে এখন অন্য রকম অবস্থা। মা-বাবা কারো চোখে ঘুম নেই। সবাই কেহেলকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে তার বন্ধুরাও বিব্রত। একজন হুজুরকে নিয়ে আসা হল, কিন্তু তিনি কিছু না বলেই চলে গেলেন। তবে সবাই বুঝলো এ সমস্যা এই হুজুরের কাজ নয়।
একদিন মধ্যরাতে কেহেলের মায়ের ঘুম ভেংগে গেল।  তার আওয়াজে সবার ঘুমও চলে গেল। তিনি বললেন, কেহেলকে কারা যেন মারছে! আর তিন দিন মাত্র সময়! এর ভেতরে পাঁঠা বলি দিতে হবে। নতুবা ওরা! তারপর কান্নায় ভেংগে পড়ে মুর্ছা গেল।
আবারও একজন হুজুরকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে আসা হল। উনি অনেক দূর থেকে এসেছেন। বাড়ির চারপাশ ভালো করে ঘুরে বেড়িয়ে এসে স্থির হয়ে বসে পড়লেন। তারপর অনেক সময় পরে মুখ খুললেন। কি হয়েছে তা’ বলার সাধ্য তার নেই। তবে কেহেল কোন এক দুষ্ট ও শক্তিধর জ্বীনের শরীরে প্রসাব করে দিলে বিপত্তি বাধে। এর  বেশি কিছু তার জানা নেই। আর কোন কথা তিনি না বলে হাদিয়া নিয়ে বিদায় হলেন।
ইসলাম ধর্মে বলি দেবার বিধান নেই। কেহেলের বাবা একবাক্যে বলি দেবার কথা অস্বীকার করলেন। আর, কেহেলের মা বেশি ভেংগে পড়েছে বলে তার স্বপ্নকে দু:স্বপ্ন মনে করলেন।  কিন্তু, মায়ের মন বলে কথা। কেহেলের মা তার বাবার বাড়িতে খবর পাঠালেন। কেহেলের মামা এলে তাকে গোপনে পাঁঠা বলি দেবার ব্যবস্থা করার জন্য বলা হল। কিন্তু, কেহেলের বাবা যেন না জানে! কেহেলের মামা আমতা আমতা করছিল। সব বুঝে কেহেলের মা তার ভাইকে সাথে করে বাবার বাড়িতে গিয়ে পাঁঠা বলি দেবার ব্যবস্থা করে তবেই বাড়ি ফিরলেন। যে কোন মূল্য ছেলেকে ফেরত চাই। বলি দেবার পরে তার মা আর স্বপ্ন দেখেনি। দুই বার স্বপ্নে শুধু বলা হয়েছিল বলি দিলেই ছেলেকে ফিরে পাবে।
বিশ্রী স্বপ্ন দেখে কোহেলের বন্ধুর সোহেলের ঘুম ভেংগে গেল! স্বপ্নে দেখলো কেহেলের লাশ পড়ে আছ বারান্দায়!! একটা কালো বেড়াল লাশের পাহাড়ায়।  সে ভোরেই ছুটলো, ততক্ষণে কেহেলের বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে গেছে। কি হয়েছিল? লাশ সেই পোড়াবাড়ির পাশের দীঘি থেকে ভেসে উঠেছে। কোন মতে লাশ চেনা যাচ্ছিল। ওর বন্ধুরা সবাই বলা বলি করছিল, কেহেল সাতার শেখেনি! প্রস্রাব করতে গিয়ে পা পিছলে হয়তো পুস্করিণীতে পড়ে গিয়ে থাকতে পারে। পোস্টমর্টেমে পানিতে ডুবে মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা রয়েছে।
কেহেল পানিতে পড়ে গেল। কখন শব্দ হয়েছিল? কেউ শব্দ শোনেনি? কারো কথা নিরবতা ভেদ করলো না।
কেহেল হিসু করতে যাবে, বলেছিল কাউকে? না কাউকে সে বলে যায়নি! তাহলে কেহেল ছিল কোথায়? কেহেল হিসু করতে যাবে, কেউ শোনেনি তবুও গল্পটা ছড়িয়ে গেছে।
লাশের খাটিয়ায় কে ছিল? এই গাঁয়ে সেদিন কেউ মরেছিল?
এই গ্রামে তিন দিনে কেন? পাঁচ-সাত দিনেও কেউ মারা যায়নি বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বন্ধুরা সবাই চায়ের টেবিলে। আজ কেহেল সাথে নেই। ভাবতেই বুকের ভেতরটা কেমন কেমন করছে। চা ঠান্ডা হয়ে যায়, তবুও কারো মুখে চা ঢোকে না।
—————————–
লেখক: গল্পকার ও সংগঠক