আমাদের ইউরোপ ট্যুরের দ্বিতীয় গন্তব্য ছিল ইতালি। গ্রীস থেকে আকাশপথে রোমে পৌঁছালাম আমরা। তবে রোম ভ্রমণের শুরুতেই ঘটে গেল একটি ছোট্ট কিন্তু ভীষণ আতঙ্কের ঘটনা।
বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার সময় হঠাৎ খেয়াল করলাম, আমাদের মেয়ে আনাবিয়া কোথাও নেই। বের হওয়ার পথে একটি বড় পিলার ছিল, যার এক পাশ থেকে অন্য পাশ দেখা যায় না। আমি ভেবেছিলাম আনাবিয়া তার বাবার সঙ্গে আছে, আর তিনি ভেবেছিলেন মেয়েটি আমার সঙ্গেই আছে। জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর কয়েকটি মুহূর্তের একটি ছিল সেটি। আতঙ্কিত হয়ে আবার ভেতরের দিকে ফিরে যেতেই দেখি আনাবিয়া কান্না করছে এবং একজন বিমানবন্দর কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলছে। সে নিজের নাম, আমাদের নাম এবং যে সে হারিয়ে গেছে—সেটুকু বুঝিয়ে বলতে পেরেছিল। আলহামদুলিল্লাহ, মেয়েকে ফিরে পেয়ে যেন প্রাণ ফিরে পেলাম।
বিমানবন্দর থেকে আমরা রেন্ট-এ-কার নিয়ে রওনা দিলাম পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বড় আপু আয়েশা আপুর বাসার উদ্দেশে। তিনি, তার স্বামী এবং ছেলেকে নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে রোমে অবস্থান করছেন।
বিদেশ-বিভুঁইয়ে এমন আন্তরিক আতিথেয়তা সত্যিই ভোলার নয়। তাদের বাসার অবস্থানও ছিল অত্যন্ত সুন্দর। বাসার সামনে ও পেছনে বিশাল খোলা মাঠ, চারপাশে শান্ত পরিবেশ, আর পাশে প্রয়োজনীয় কিছু দোকানপাট। বিদেশের মাটিতে এমন আপনজনের সান্নিধ্য ভ্রমণকে আরও আনন্দময় করে তুলেছিল।
কলোসিয়াম
প্রথম দিন বিকেলেই বেরিয়ে পড়লাম রোম দেখার উদ্দেশে। ভাইয়া আমাদের মেট্রোরেল ব্যবহারের নিয়ম দেখানোর জন্য নিজেই গাড়ি চালিয়ে স্টেশনে নিয়ে গেলেন। যাওয়ার পথে তিনি আমাদের খাওয়ালেন ইতালির বিখ্যাত জেলাতো (Gelato) আইসক্রিম।
এরপর মেট্রোতে উঠে রোম সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছিলাম। রোমান পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী ৭৫৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রোম নগরীর প্রতিষ্ঠা হয়। প্রায় তিন হাজার বছর ধরে মানুষ বসবাস করে আসছে এই শহরে। রোমকে বলা হয় Eternal City বা ‘চিরন্তন শহর’। প্রাচীন রোমানদের বিশ্বাস ছিল, পৃথিবীতে যা-ই ঘটুক না কেন, রোম চিরকাল টিকে থাকবে। এ কারণেই শহরটি ‘ক্যাপুট মুন্ডি’ বা ‘বিশ্বের রাজধানী’ নামেও পরিচিত।

রেনেসাঁ যুগে একের পর এক পোপ রোমকে বিশ্বের শিল্প ও সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেন। ফলে রোম হয়ে ওঠে রেনেসাঁ, বারোক ও নিওক্ল্যাসিসিজম শিল্পধারার অন্যতম কেন্দ্র। বিশ্বের বহু খ্যাতিমান শিল্পী, ভাস্কর, চিত্রশিল্পী ও স্থপতি এই শহরকে তাদের কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।
মেট্রো থেকে নামলাম কলোসিয়াম স্টেশনে। উপরে উঠতেই চোখে পড়ল ইতিহাসের সেই বিস্ময়—কলোসিয়াম। বহুবার সিনেমায় দেখা এই স্থাপনাটি সামনে থেকে দেখার অনুভূতি সত্যিই ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। বিকেলের সোনালি আলোয় উজ্জ্বল কলোসিয়াম যেন অতীতের গৌরবগাথা শুনিয়ে যাচ্ছিল। আশপাশের ধ্বংসাবশেষ ঘুরে দেখলাম। সন্ধ্যা নেমে এলে আলোকসজ্জায় কলোসিয়ামের আরেকটি মোহনীয় রূপ দেখা গেল। এরপর সেখান থেকেই ফিরে এলাম বাসায়।
রাতে ডিনার করলাম একটি বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আরেক বড় ভাই, জসিম ভাইয়ের সৌজন্যে সেখানে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাজ করার সুবাদে আগে তার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। অনেকদিন পর বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশি মিষ্টির স্বাদ পেলাম। রেস্টুরেন্টটির নাম এখন আর মনে নেই, তবে সেই আপ্যায়নের স্মৃতি আজও অমলিন।
দ্বিতীয় দিন: ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সৌন্দর্যের সন্ধানে
পরদিন সকালে সারাদিনের খাবার-দাবার সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ইতিহাস ও ঐতিহ্যের শহর রোম ঘুরে দেখার জন্য।
সিটি সেন্টারে নেমে হাঁটতে হাঁটতে প্রথমেই পৌঁছে গেলাম রোমান ফোরাম-এ। একসময় এটি ছিল প্রাচীন রোমান সভ্যতার রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। বর্তমানে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। ইতিহাসের প্রতি আমার আগ্রহ বরাবরই বেশি, তাই স্থানটি আমাকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করেছিল। প্রচুর হাঁটাহাঁটি করেছি, কিন্তু ক্লান্তি যেন ছুঁতেও পারেনি।
এরপর হেঁটে গেলাম ক্যাপিটোলাইন মিউজিয়াম-এর দিকে। সময়ের অভাবে ভেতরে প্রবেশ করা হয়নি, তবে এর চত্বরে বেশ কিছুক্ষণ বসেছিলাম। চারপাশের সৌন্দর্য আর শান্ত পরিবেশ মনকে প্রশান্ত করেছিল। আনাবিয়া তখন সিঁড়ির ওপর-নিচে দৌড়াদৌড়ি করে আনন্দে মেতে ছিল।
সেখান থেকে দেখতে দেখতে এগোলাম পিয়াজ্জা ভেনেজিয়া এবং টাইবার নদী ও তার ঐতিহাসিক সেতুগুলোর দিকে। টাইবার নদী প্রাচীন রোমের বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রাণ ছিল। নদীর তীর ধরে হাঁটতে হাঁটতে যেন ইতিহাসের স্পন্দন অনুভব করা যাচ্ছিল।
রোমে বাংলাদেশিদের উপস্থিতি বেশ চোখে পড়ার মতো। ফলে প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে বা সাহায্য চাইতে ভাষাগত কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি।
ইতালি গিয়ে জেলাতো আইসক্রিম, ইতালিয়ান পিৎজা এবং এসপ্রেসো কফির স্বাদ নেওয়ার ইচ্ছা ছিল। জেলাতো ও এসপ্রেসো খাওয়া হলেও কিছু টেকনিক্যাল কারণে বিখ্যাত ইতালিয়ান পিৎজার স্বাদ আর নেওয়া হয়ে ওঠেনি।
ভ্যাটিকান সিটি: বিশ্বের ক্ষুদ্রতম রাষ্ট্রে
দুপুরের খাবার শেষে রওনা দিলাম বিশ্বের ক্ষুদ্রতম স্বাধীন রাষ্ট্র ভ্যাটিকান সিটি-র উদ্দেশে।
গুগলে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, ইতালির রোম শহর দ্বারা বেষ্টিত এই শহর-রাষ্ট্রটি রোমান ক্যাথলিক চার্চের সদর দপ্তর এবং পোপের আবাসস্থল। এখানেই রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক নিদর্শন-সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকা, সিস্টিন চ্যাপেল এবং ভ্যাটিকান মিউজিয়াম।
ভ্যাটিকানের অর্থনীতি মূলত বিশ্বজুড়ে ক্যাথলিকদের অনুদান, ডাকটিকিট ও স্মারকসামগ্রী বিক্রি, জাদুঘরের প্রবেশমূল্য এবং প্রকাশনা থেকে অর্জিত আয়ের ওপর নির্ভরশীল। এখানে কোনো ধরনের আয়কর নেই এবং অনেক পণ্য শুল্কমুক্ত।

সিস্টিন চ্যাপেলের সৌন্দর্য চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। বিশেষ করে মহান শিল্পী মাইকেলএঞ্জেলোর আঁকা ছাদচিত্র সত্যিই বিস্ময়কর। পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্মগুলোর কিছু এখানে সংরক্ষিত রয়েছে।
ভ্যাটিকান সম্পর্কে একটি মজার তথ্য হলো—এখানে কেউ জন্মগ্রহণ করে না, তবুও দেশটির নাগরিক রয়েছে। কারণ নাগরিকত্ব মূলত দেওয়া হয় যাঁরা অফিসিয়াল দায়িত্ব বা চাকরির কারণে ভ্যাটিকানে বসবাস করেন তাঁদের।
ভ্যাটিকানের বিশাল চত্বরে প্রবেশ করতেই এর গাম্ভীর্য ও সৌন্দর্য আমাদের মুগ্ধ করে। আনাবিয়া তখন স্ট্রলারে ঘুমিয়ে পড়েছিল, ফলে আমরা আরও স্বস্তিতে জায়গাগুলো ঘুরে দেখতে পেরেছি। ভ্যাটিকান মিউজিয়াম ঘুরে না এলে রোম ভ্রমণ সত্যিই অপূর্ণ থেকে যেত। সেখানে দীর্ঘ সময় কাটালাম এবং ইতিহাস, শিল্প ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের এক অনন্য সমন্বয় কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেলাম।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে আল্লাহ তাআলার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে করতে ফিরে এলাম আপুর বাসায়। রোমের দুই দিনের অসাধারণ অভিজ্ঞতা হৃদয়ে ধারণ করে পরদিন রওনা হলাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্য-ফ্লোরেন্সের উদ্দেশে।
———————————————–
লেখকঃ এলামনাই, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ
সাসেক্স ইউনিভার্সিটি, ইউকে
ই-মেইলঃ merinabiam25@gmail.com

মোছাঃ মেরিনা আফরোজ 


















