লোকবলসংকটের কারণে ট্রেনে নিয়মিত টিকিট পরীক্ষা করতে পারছে না বাংলাদেশ রেলওয়ে। ফলে বিনা টিকিটে যাত্রা এবং কম দূরত্বের টিকিট নিয়ে বেশি দূরত্ব ভ্রমণের ঘটনা ঘটছে। এতে রাজস্ব হারাচ্ছে সরকারি এই প্রতিষ্ঠান।
এ পরিস্থিতিতে পূর্বাঞ্চলের তিনটি ট্রেনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে। ট্রেন তিনটি হলো—ময়মনসিংহ–ঝারিয়াজাঞ্জাইল রুটের ঝারিয়া লোকাল, ঢাকা–নারায়ণগঞ্জ রুটের নারায়ণগঞ্জ কমিউটার এবং ঢাকা–নরসিংদী রুটের নরসিংদী কমিউটার।
রেলওয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় টিকিট বিক্রি, পরীক্ষা, ভাড়া আদায় ও হিসাব সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। এতে বিনা টিকিটে ভ্রমণ কমার পাশাপাশি রেলের রাজস্ব বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এ ব্যবস্থায় গেলেও যাত্রীদের ভাড়া বাড়বে না। সরকার নির্ধারিত ভাড়াই বহাল থাকবে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক সুজিত কুমার বিশ্বাস বলেন, রেলওয়েতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক টিকিট পরীক্ষক (টিটিই) নেই। ফলে সব যাত্রীর টিকিট নিয়মিত যাচাই করা সম্ভব হয় না। এতে বিনা টিকিটে যাত্রার সুযোগ তৈরি হচ্ছে এবং রেল রাজস্ব হারাচ্ছে। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়া হলে আগের তুলনায় বেশি রাজস্ব পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, যাত্রীসেবার মান উন্নয়ন ও রাজস্ব আয় বাড়াতে চলতি বছরের এপ্রিলে ছয়টি ট্রেনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তালিকায় ছিল ঝারিয়া লোকাল, নারায়ণগঞ্জ কমিউটার, নরসিংদী কমিউটার, সমতট এক্সপ্রেস, নোয়াখালী এক্সপ্রেস ও নাজিরহাট লোকাল।
তবে বর্তমানে ছয়টির মধ্যে তিনটি ট্রেনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। বাকি তিনটির মধ্যে সমতট এক্সপ্রেস ও নোয়াখালী এক্সপ্রেস ইঞ্জিনসংকটে বন্ধ রয়েছে। আর নাজিরহাট লোকালের বগির মানোন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কাজ শেষ হওয়ার পর ট্রেনটিকেও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ঝারিয়া লোকাল প্রতিদিন চার জোড়া অর্থাৎ আটবার, নারায়ণগঞ্জ কমিউটার আট জোড়া অর্থাৎ ১৬ বার এবং নরসিংদী কমিউটার এক জোড়া অর্থাৎ দুবার চলাচল করে। এসব ট্রেনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বেসরকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগে দরপত্র আহ্বান করেছে রেলওয়ে। আগামী ৫ অক্টোবর পর্যন্ত দরপত্রের ফরম সংগ্রহ এবং ৬ অক্টোবর দরপত্র জমা দেওয়া যাবে।
লোকাল ও কমিউটার ট্রেনে টিকিট পরীক্ষা কঠিন
রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানান, লোকাল ও কমিউটার ট্রেনে যাত্রী ওঠানামার হার বেশি হওয়ায় টিকিট পরীক্ষা করা তুলনামূলক কঠিন। এসব ট্রেন পথে অনেক স্টেশনে থামে এবং প্রতিটি স্টেশনে বিপুলসংখ্যক যাত্রী ওঠানামা করেন।
দীর্ঘদিন ধরে রেলওয়ের বাণিজ্যিক বিভাগে জনবলসংকট রয়েছে। বিশেষ করে টিকিট পরীক্ষকের ঘাটতির কারণে অনেক ট্রেনে নিয়মিত টিকিট যাচাই করা সম্ভব হয় না। ফলে কেউ টিকিট ছাড়াই ট্রেনে উঠে পড়েন, আবার কেউ কম দূরত্বের টিকিট নিয়ে বেশি দূরের গন্তব্যে চলে যান।
রেলওয়ের ধারণা, টিকিট বিক্রি, পরীক্ষা ও যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া আদায়ের দায়িত্ব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হলে বিনা টিকিটে যাত্রা কমানো সম্ভব হবে। এতে রেলের রাজস্বও বাড়বে।
তিন ট্রেন থেকে আয় ৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে নারায়ণগঞ্জ কমিউটার, নরসিংদী কমিউটার ও ঝারিয়া লোকাল থেকে মোট ৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা আয় হয়েছে। একই সময়ে এই তিন ট্রেনে ১০ লাখ ৯৫ হাজার যাত্রী পরিবহন করা হয়েছে।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার পর ট্রেন তিনটি থেকে আগের তুলনায় বেশি রাজস্ব আদায় হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বর্তমানে পূর্বাঞ্চলের আটটি ট্রেনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে। রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার আগে এসব ট্রেন থেকে বছরে আয় হতো ১০ কোটি ৫১ লাখ টাকা। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে সেই আয় বেড়ে ২৬ কোটি ৩৩ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
তবে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ট্রেন পরিচালিত হলেও যাত্রীদের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার সুযোগ থাকবে না বলে জানিয়েছে রেলওয়ে।
এর আগে পূর্বাঞ্চলের কর্ণফুলী কমিউটার, সাগরিকা কমিউটার, বলাকা কমিউটার, তিতাস কমিউটার, মহুয়া কমিউটার, জামালপুর কমিউটার ও দেওয়ানগঞ্জ কমিউটারসহ আটটি ট্রেনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়া হয়েছে।

অনলাইন ডেস্ক 


















