জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক, রাজনীতি বিশ্লেষক এবং জাকসু নির্বাচন–২০২৫-এর প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন অধ্যাপক ড. এম. মনিরুজ্জামান। সাম্প্রতিক জাতীয় রাজনীতি, যুবসমাজ, গণতন্ত্র, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং ছাত্রসংসদ নির্বাচনের ভবিষ্যৎ প্রভাব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন দৈনিক চলনবিল প্রবাহের সাথে । জাকসু নির্বাচনের পরে গত ০৫ ডিসেম্বর,২০২৫ খ্রি. তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দৈনিক চলনবিল প্রবাহের গবেষণা কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুনের সাথে কথা বলেন। তার সাক্ষাতকারের চৌম্বক অংশ নিম্নে তুলে ধরা হলোঃ
চলনবিল প্রবাহ : স্যার, কেমন আছেন। শুরুতে জানতে চাই—বর্তমান জাতীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান: ধন্যবাদ । ২০২৪ সালের গণআন্দোলন আমাদের রাজনীতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। বিশেষ করে ছাত্রজনতার আন্দোলনের ফলে স্বৈরাচার পালাতে বাধ্য হয়েছে—এটা গণতন্ত্রের বিজয়। তবে তাদের দোসর এখনো সক্রিয়, এটিও অস্বীকার করার উপায় নেই।
চলনবিল প্রবাহ: ডাকসু, জাকসু, রাকসু ও চাকসু—একটি সময়ে এতগুলো ছাত্রসংসদ নির্বাচন হয়েছে। আপনি জাকসুর প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন। এসব নির্বাচনের প্রভাব কি জাতীয় নির্বাচনে পড়বে?
অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান: অবশ্যই পড়বে। ছাত্রসংসদ নির্বাচন জাতীয় রাজনীতির প্রতিচ্ছবি। দেশপ্রেমিক ও প্রগতিশীল শক্তি যেভাবে উঠে এসেছে, তা জাতীয় নির্বাচনে ভোটারদের মানসিকতায় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হবে। ছাত্র রাজনীতির জাগরণ জাতীয় রাজনীতিকে নতুন দিক নির্দেশনা দেবে।
চলনবিল প্রবাহ: গবেষণার আলোকে আপনি মনে করেন—আমাদের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে কতটা শক্তিশালী?
অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান: মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল সাত বছর; এখন ষাটোর্ধ্ব। দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতায় বলতে পারি—আমাদের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান কখনো শক্তিশালী হয়েছে, আবার কখনো দুর্বলও হয়েছে। সাম্প্রতিক গণআন্দোলন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি নতুন আস্থা তৈরি করেছে, তবে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
চলনবিল প্রবাহ: নির্বাচনব্যবস্থায় যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছিল, এর মূল কারণ কী?
অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান: মূল দায় বিগত স্বৈরশাসকদের। তারা প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, নিরাপত্তা বাহিনী—সবকিছু ব্যবহার করে নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করেছে। জনমনে আস্থা ফিরে আসতে সময় লাগবে, যদিও এখন ইতিবাচক পরিবর্তন শুরু হয়েছে।
চলনবিল প্রবাহ: শিক্ষা ও রাজনীতির সম্পর্ক আপনি কীভাবে দেখেন? বিশ্ববিদ্যালয় কি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকতে পারে?
অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান: শিক্ষা ও রাজনীতি একে অপরের পরিপূরক। যে দেশে শিক্ষা উন্নত, সে দেশে রাজনীতির মানও উন্নত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়কে পুরোপুরি রাজনীতিমুক্ত বলা অবাস্তব। বরং এটি এমন জায়গা হওয়া উচিত যেখানে যুক্তি, বিতর্ক, সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চা হয়।

চলনবিল প্রবাহ: অনেকে বলেন, যুবকদের মধ্যে রাজনৈতিক অনাগ্রহ বাড়ছে—আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান: দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতি, স্বৈরশাসনের জুলুম এবং তাদের দোসরদের দাপট—এসব কারণে যুবকদের হতাশা তৈরি হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের পর তারা আবার জেগে উঠেছে। আমি দেখছি, তারা এখন সক্রিয় ও সচেতন।
চলনবিল প্রবাহ: রাষ্ট্র পরিচালনায় নীতিনির্ধারণ ও নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কোথায় দেখেন?
অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান: আমাদের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থকে জাতীয় স্বার্থের উপরে রাখা। নীতি–নির্ধারণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা না হলে সমস্যাগুলো থাকবে।
চলনবিল প্রবাহ: আঞ্চলিক রাজনীতিতে ভারত, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্র—এই তিন শক্তির ভূমিকা বাংলাদেশকে কীভাবে প্রভাবিত করছে?
অধ্যাপক ড.মনিরুজ্জামান: এটি অত্যন্ত কৌশলগত বিষয়। তিন দিকে ভারতের উপস্থিতি আমাদের সম্পর্ককে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। চীন অবকাঠামো ও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ও গণতান্ত্রিক নীতি আমাদের বৈদেশিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি ছাড়া এগোনো সম্ভব নয়।
চলনবিল প্রবাহ: সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে রাজনৈতিক মতামতে প্রভাব পড়ছে—আপনার মত কী?
অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান: ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে তথ্য মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে মিথ্যা তথ্যও থাকে। তাই ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকেও দায়িত্বশীল হতে হবে।
চলনবিল প্রবাহ: টেকসই উন্নয়নের জন্য কোন রাজনৈতিক সংস্কারগুলো সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করেন?
অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান: নেতৃত্বে যোগ্য, দক্ষ ও মেধাবীদের জায়গা করতে হবে। মানুষের চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে নীতি নির্ধারণ করতে হবে। দুর্নীতি দমন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
চলনবিল প্রবাহ: শেষ প্রশ্ন—ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গঠনে বিশ্ববিদ্যালয় কী ভূমিকা রাখতে পারে?
অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান: ছাত্রসংসদ নির্বাচন নেতৃত্ব গঠনের অন্যতম প্ল্যাটফর্ম। বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিরা যে গণতান্ত্রিক চর্চা করছে, সমস্যা সমাধান, সিদ্ধান্ত গ্রহণ—এসব দক্ষতা ভবিষ্যতে রাষ্ট্র পরিচালনায় কাজে লাগবে। বিশ্ববিদ্যালয়ই নেতৃত্বের নীরব কারখানা।
চলনবিল প্রবাহ: স্যার, মূল্যবান সময় ও অন্তর্দৃষ্টি দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান: ধন্যবাদ । তোমাদের মতো তরুণ গবেষকদের এগিয়ে আসাই দেশের জন্য বড় আশীর্বাদ

মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন 






















