ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফিলিস্তিনি পরিবারের মেয়ে রাশিদা, মার্কিন কংগ্রেসে পঞ্চমবারের বিজয়

blank

দারিদ্র্য, সংগ্রাম, বর্ণ ও ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বৈষম্যের অভিজ্ঞতা পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন রাশিদা তালিব। ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত এই মার্কিন রাজনীতিকের জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ফিলিস্তিনিদের পক্ষে তাঁর আপসহীন অবস্থান।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে আবারও নিজের জনপ্রিয়তার প্রমাণ দিলেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তালিব। ২০২৬ সালের ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে পঞ্চমবারের মতো দেশটির প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ১২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী জেমস হুপারকে পরাজিত করেন রাশিদা। নির্বাচনের ফলাফল তাঁর প্রতি স্থানীয় ভোটারদের দৃঢ় সমর্থনেরই প্রতিফলন।

একজন অভিবাসী পরিবারের সন্তান হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছানো রাশিদার এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। শৈশবের দারিদ্র্য, পারিবারিক দায়িত্ব, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বৈষম্য এবং রাজনৈতিক বিরোধিতা—সবকিছু মোকাবিলা করেই তিনি আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন।

১৯৭৬ সালের ২৪ জুলাই মিশিগানের ডেট্রয়েট শহরে জন্ম নেওয়া রাশিদা হারবি এলাবেদ তালিব ১৪ ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড়। তাঁর বাবা-মা দুজনই ফিলিস্তিনি অভিবাসী। বাবা হারবি এলাবেদ ও মা ফাতিমা পরিবারের ভরণপোষণের জন্য কঠোর পরিশ্রম করতেন। দুজনই যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফোর্ড মোটর কোম্পানির কারখানায় কাজ করতেন।

শ্রমজীবী মা-বাবার ঘরে বেড়ে ওঠা রাশিদা খুব কাছ থেকে দেখেছেন একজন সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম। পরিবারের বড় সন্তান হওয়ায় ছোট ভাই-বোনদের দেখাশোনার দায়িত্বও অনেক সময় তাঁকে নিতে হয়েছে। বাড়িতে তাঁদের কথোপকথনের ভাষা ছিল আরবি। ইংরেজি শেখার পাশাপাশি ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশে নিজের পরিচয় ধরে রেখে বড় হয়েছেন তিনি।

শৈশব থেকেই ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয়ের কারণে নানা ধরনের বিদ্রূপ ও বৈষম্যের অভিজ্ঞতা হয়েছে তাঁর। বিশেষ করে হিজাব পরার কারণে নিজের মাকে অপদস্থ হতে দেখেছেন। এসব অভিজ্ঞতা তাঁর মধ্যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মানসিকতা তৈরি করে।

শিক্ষাজীবন ও আইন পেশায় প্রবেশ

পরিবারের প্রথম সদস্য হিসেবে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা সম্পন্ন করেন রাশিদা। ১৯৯৮ সালে ওয়েইন স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ২০০৪ সালে ওয়েস্টার্ন মিশিগান ইউনিভার্সিটি থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি নেন।

আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে তিনি মিশিগানের ডিয়ারবর্ন এলাকায় আরব কমিউনিটি সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল সার্ভিসেসে (ACCESS) কাজ শুরু করেন। সেখানে আরব অভিবাসী ও নিম্ন আয়ের মানুষের অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।

পরবর্তী সময়ে আইনজীবী হিসেবে সাধারণ মানুষের পক্ষে বিভিন্ন সামাজিক ও পরিবেশগত বিষয়ে কাজ করেন। বিশেষ করে শিল্পকারখানার দূষণ, আবাসিক এলাকার পরিবেশ এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান তাঁকে স্থানীয় মানুষের কাছে পরিচিত করে তোলে।

রাজনীতিতে অভিষেক: ইতিহাস গড়ার শুরু

রাশিদার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় মিশিগান অঙ্গরাজ্যের আইনসভাকে কেন্দ্র করে। ২০০৮ সালে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাথমিক নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর সাধারণ নির্বাচনেও বিজয়ী হন তিনি। এর মধ্য দিয়ে মিশিগান অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় দায়িত্ব পালনকারী প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে ইতিহাস গড়েন।

২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, শ্রমিকের অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা এবং করপোরেট অনিয়মের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন।

ডেট্রয়েটের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সমস্যা সমাধানে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করছিলেন, ডেট্রয়েট নদীর তীরবর্তী এলাকায় জমে থাকা কালো ধুলা বাতাসে ছড়িয়ে তাঁদের বাড়িঘর ও পার্ক দূষিত করছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শুরুতে বিষয়টি গুরুত্ব না দিলেও রাশিদা নিজ উদ্যোগে ধুলার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন। পরীক্ষায় ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি ধরা পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে জোরালো আন্দোলন গড়ে তোলেন তিনি।

এ ছাড়া আবাসিক এলাকার সড়ক থেকে দূষণ ছড়ানো ভারী ট্রাক সরিয়ে নিতে ‘উই হ্যাভ আ রাইট টু ব্রিদ’ (আমাদের শ্বাস নেওয়ার অধিকার আছে) নামে প্রচারাভিযান পরিচালনা করেন। স্থানীয় মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষায় তাঁর এই উদ্যোগ তাঁকে একজন জনবান্ধব রাজনীতিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

ট্রাম্পবিরোধী অবস্থান থেকে কংগ্রেসে যাত্রা

২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণার সময় তাঁর একটি নির্বাচনী সভায় উপস্থিত হয়ে প্রকাশ্যে ট্রাম্পের সমালোচনা করেছিলেন রাশিদা। পরে তাঁকে সেখান থেকে বের করে দেওয়া হয়। মুসলিম অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞাসহ ট্রাম্পের বিভিন্ন নীতির বিরোধিতা তাঁকে জাতীয় পর্যায়ের আলোচনায় নিয়ে আসে।

২০১৮ সালে মিশিগানের ১৩তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাথমিক নির্বাচনে অংশ নিয়ে অল্প ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন তিনি। পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়ে ২০১৯ সালের ৩ জানুয়ারি প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

একই নির্বাচনে মিনেসোটা থেকে ইলহান ওমরও কংগ্রেস সদস্য নির্বাচিত হন। এর মধ্য দিয়ে তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম দুই মুসলিম নারী হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।

রাশিদা তালিবের আরেকটি বিশেষ পরিচয় হলো, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত প্রথম নারী এবং বর্তমানে দেশটির একমাত্র ফিলিস্তিনি-আমেরিকান কংগ্রেস সদস্য হিসেবে পরিচিত।

ফিলিস্তিনি পরিচয় ও গাজা নিয়ে আপসহীন অবস্থান

ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত হওয়ার কারণে নিজের শিকড় ও ঐতিহ্য নিয়ে সব সময় গর্ব প্রকাশ করেন রাশিদা। ২০১৯ সালের ১৩ জানুয়ারি কংগ্রেসে শপথ গ্রহণের সময় তিনি ঐতিহ্যবাহী ফিলিস্তিনি পোশাক ‘থোব’ পরেছিলেন। হাতে রেখেছিলেন পবিত্র কোরআনের একটি ঐতিহাসিক কপি। তাঁর এই উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ফিলিস্তিনি সংস্কৃতি ও পরিচয়ের একটি বিশেষ প্রতীকী প্রকাশ হিসেবে আলোচিত হয়।

ফিলিস্তিনিদের অধিকার, স্বাধীনতা এবং গাজার মানুষের মানবিক বিপর্যয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সরব তিনি। বিশেষ করে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির বিরুদ্ধে তাঁর বক্তব্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

২০২৩ সালের ৭ নভেম্বর মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে নিন্দা প্রস্তাব (Censure) পাস হয়। ইসরায়েল-হামাস সংঘাত নিয়ে তাঁর কিছু বক্তব্যের কারণে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। এর ফলে কংগ্রেসের ভেতরে ও বাইরে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়। তবে এসব বিরোধিতা সত্ত্বেও নিজের নির্বাচনী এলাকার মানুষের কাছে তাঁর জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছেন তিনি।

২০১৯ সালে রাশিদা ও ইলহান ওমরকে ইসরায়েল সফরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। তাঁদের ফিলিস্তিনপন্থী রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।

২০২৬ সালে পঞ্চমবারের বিজয়

২০২৬ সালের ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে রাশিদার জয় তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। মিশিগানের ১২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে তিনি রিপাবলিকান প্রার্থী জেমস হুপারকে পরাজিত করেন। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) তাঁর বিজয় নিশ্চিত বলে ঘোষণা করে। এর মধ্য দিয়ে ২০১৮ সালে শুরু হওয়া কংগ্রেসের যাত্রায় টানা পঞ্চমবারের মতো নির্বাচনী সাফল্য অর্জন করলেন তিনি।

বর্তমানে তিনি প্রতিনিধি পরিষদের ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস কমিটি এবং ওভারসাইট অ্যান্ড গভর্নমেন্ট রিফর্ম কমিটিতে দায়িত্ব পালন করছেন। আবাসন, আর্থিক সেবা, ভোক্তা অধিকার, সরকারি জবাবদিহি ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে কাজ করার সুযোগ রয়েছে এসব কমিটির মাধ্যমে।

ব্যক্তিজীবন ও মাতৃত্ব

ব্যক্তিজীবনেও নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে রাশিদাকে। ১৯৯৮ সালে ফায়েজ তালিবকে বিয়ে করেন তিনি। তাঁদের সংসারে দুই ছেলের জন্ম হয়। ২০১৫ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। তবে বিচ্ছেদের পরও তিনি তালিব পদবি ব্যবহার অব্যাহত রেখেছেন।

নিজের দুই ছেলেকে রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম অনুপ্রেরণা বলে মনে করেন রাশিদা। তাঁর ভাষায়, সন্তানদের এমন একটি সমাজ উপহার দিতে চান, যেখানে ধর্মীয় কিংবা জাতিগত পরিচয়ের কারণে কাউকে প্রশ্নবিদ্ধ বা বৈষম্যের শিকার হতে হবে না।

তাঁর নিজের বক্তব্যে উঠে এসেছে, তিনি ইতিহাস গড়ার জন্য রাজনীতিতে আসেননি; বরং অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলতেই তাঁর এই পথচলা।

জনপ্রিয়তার মূল শক্তি কোথায়?

রাশিদা তালিবের জনপ্রিয়তার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। প্রথমত, তিনি শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনসংগ্রাম কাছ থেকে দেখেছেন। ফলে তাঁদের সমস্যা নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে তাঁর বক্তব্যে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রতিফলন পাওয়া যায়।

দ্বিতীয়ত, ডেট্রয়েটের স্থানীয় বাসিন্দাদের পরিবেশ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় তাঁর দীর্ঘদিনের ভূমিকা তাঁকে সাধারণ মানুষের আস্থাভাজন করেছে। তৃতীয়ত, অভিবাসী, মুসলিম ও ফিলিস্তিনি পরিচয় নিয়ে বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান তাঁকে একটি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পরিচিত করেছে।

সবশেষে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও বিতর্কের মধ্যেও নিজের অবস্থান প্রকাশে পিছিয়ে না যাওয়ার প্রবণতা তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

একজন শ্রমজীবী ফিলিস্তিনি অভিবাসী পরিবারের সন্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠার গল্প রাশিদা তালিবের। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ও অবস্থান নিয়ে বিতর্ক থাকলেও নির্বাচনে ধারাবাহিক সাফল্য প্রমাণ করে, মিশিগানের একটি বড় জনগোষ্ঠীর কাছে তিনি এখনো জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য প্রতিনিধি।

———————-

তথ্যসূত্র: মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের ইতিহাস ও আর্কাইভ, রাশিদা তালিবের সরকারি কংগ্রেস ওয়েবসাইট, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের নির্বাচনী প্রতিবেদন এবং দ্য ডেট্রয়েট নিউজ।

জনপ্রিয় খবর
blank

জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে নওগাঁ জেলা পুলিশের পুনাকের টিকাদান কর্মসূচি

ফিলিস্তিনি পরিবারের মেয়ে রাশিদা, মার্কিন কংগ্রেসে পঞ্চমবারের বিজয়

প্রকাশের সময় : এক ঘন্টা আগে
blank

দারিদ্র্য, সংগ্রাম, বর্ণ ও ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বৈষম্যের অভিজ্ঞতা পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন রাশিদা তালিব। ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত এই মার্কিন রাজনীতিকের জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ফিলিস্তিনিদের পক্ষে তাঁর আপসহীন অবস্থান।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে আবারও নিজের জনপ্রিয়তার প্রমাণ দিলেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তালিব। ২০২৬ সালের ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে পঞ্চমবারের মতো দেশটির প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ১২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী জেমস হুপারকে পরাজিত করেন রাশিদা। নির্বাচনের ফলাফল তাঁর প্রতি স্থানীয় ভোটারদের দৃঢ় সমর্থনেরই প্রতিফলন।

একজন অভিবাসী পরিবারের সন্তান হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছানো রাশিদার এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। শৈশবের দারিদ্র্য, পারিবারিক দায়িত্ব, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বৈষম্য এবং রাজনৈতিক বিরোধিতা—সবকিছু মোকাবিলা করেই তিনি আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন।

১৯৭৬ সালের ২৪ জুলাই মিশিগানের ডেট্রয়েট শহরে জন্ম নেওয়া রাশিদা হারবি এলাবেদ তালিব ১৪ ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড়। তাঁর বাবা-মা দুজনই ফিলিস্তিনি অভিবাসী। বাবা হারবি এলাবেদ ও মা ফাতিমা পরিবারের ভরণপোষণের জন্য কঠোর পরিশ্রম করতেন। দুজনই যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফোর্ড মোটর কোম্পানির কারখানায় কাজ করতেন।

শ্রমজীবী মা-বাবার ঘরে বেড়ে ওঠা রাশিদা খুব কাছ থেকে দেখেছেন একজন সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম। পরিবারের বড় সন্তান হওয়ায় ছোট ভাই-বোনদের দেখাশোনার দায়িত্বও অনেক সময় তাঁকে নিতে হয়েছে। বাড়িতে তাঁদের কথোপকথনের ভাষা ছিল আরবি। ইংরেজি শেখার পাশাপাশি ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশে নিজের পরিচয় ধরে রেখে বড় হয়েছেন তিনি।

শৈশব থেকেই ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয়ের কারণে নানা ধরনের বিদ্রূপ ও বৈষম্যের অভিজ্ঞতা হয়েছে তাঁর। বিশেষ করে হিজাব পরার কারণে নিজের মাকে অপদস্থ হতে দেখেছেন। এসব অভিজ্ঞতা তাঁর মধ্যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মানসিকতা তৈরি করে।

শিক্ষাজীবন ও আইন পেশায় প্রবেশ

পরিবারের প্রথম সদস্য হিসেবে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা সম্পন্ন করেন রাশিদা। ১৯৯৮ সালে ওয়েইন স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ২০০৪ সালে ওয়েস্টার্ন মিশিগান ইউনিভার্সিটি থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি নেন।

আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে তিনি মিশিগানের ডিয়ারবর্ন এলাকায় আরব কমিউনিটি সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল সার্ভিসেসে (ACCESS) কাজ শুরু করেন। সেখানে আরব অভিবাসী ও নিম্ন আয়ের মানুষের অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।

পরবর্তী সময়ে আইনজীবী হিসেবে সাধারণ মানুষের পক্ষে বিভিন্ন সামাজিক ও পরিবেশগত বিষয়ে কাজ করেন। বিশেষ করে শিল্পকারখানার দূষণ, আবাসিক এলাকার পরিবেশ এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান তাঁকে স্থানীয় মানুষের কাছে পরিচিত করে তোলে।

রাজনীতিতে অভিষেক: ইতিহাস গড়ার শুরু

রাশিদার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় মিশিগান অঙ্গরাজ্যের আইনসভাকে কেন্দ্র করে। ২০০৮ সালে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাথমিক নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর সাধারণ নির্বাচনেও বিজয়ী হন তিনি। এর মধ্য দিয়ে মিশিগান অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় দায়িত্ব পালনকারী প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে ইতিহাস গড়েন।

২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, শ্রমিকের অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা এবং করপোরেট অনিয়মের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন।

ডেট্রয়েটের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সমস্যা সমাধানে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করছিলেন, ডেট্রয়েট নদীর তীরবর্তী এলাকায় জমে থাকা কালো ধুলা বাতাসে ছড়িয়ে তাঁদের বাড়িঘর ও পার্ক দূষিত করছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শুরুতে বিষয়টি গুরুত্ব না দিলেও রাশিদা নিজ উদ্যোগে ধুলার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন। পরীক্ষায় ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি ধরা পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে জোরালো আন্দোলন গড়ে তোলেন তিনি।

এ ছাড়া আবাসিক এলাকার সড়ক থেকে দূষণ ছড়ানো ভারী ট্রাক সরিয়ে নিতে ‘উই হ্যাভ আ রাইট টু ব্রিদ’ (আমাদের শ্বাস নেওয়ার অধিকার আছে) নামে প্রচারাভিযান পরিচালনা করেন। স্থানীয় মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষায় তাঁর এই উদ্যোগ তাঁকে একজন জনবান্ধব রাজনীতিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

ট্রাম্পবিরোধী অবস্থান থেকে কংগ্রেসে যাত্রা

২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণার সময় তাঁর একটি নির্বাচনী সভায় উপস্থিত হয়ে প্রকাশ্যে ট্রাম্পের সমালোচনা করেছিলেন রাশিদা। পরে তাঁকে সেখান থেকে বের করে দেওয়া হয়। মুসলিম অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞাসহ ট্রাম্পের বিভিন্ন নীতির বিরোধিতা তাঁকে জাতীয় পর্যায়ের আলোচনায় নিয়ে আসে।

২০১৮ সালে মিশিগানের ১৩তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাথমিক নির্বাচনে অংশ নিয়ে অল্প ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন তিনি। পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়ে ২০১৯ সালের ৩ জানুয়ারি প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

একই নির্বাচনে মিনেসোটা থেকে ইলহান ওমরও কংগ্রেস সদস্য নির্বাচিত হন। এর মধ্য দিয়ে তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম দুই মুসলিম নারী হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।

রাশিদা তালিবের আরেকটি বিশেষ পরিচয় হলো, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত প্রথম নারী এবং বর্তমানে দেশটির একমাত্র ফিলিস্তিনি-আমেরিকান কংগ্রেস সদস্য হিসেবে পরিচিত।

ফিলিস্তিনি পরিচয় ও গাজা নিয়ে আপসহীন অবস্থান

ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত হওয়ার কারণে নিজের শিকড় ও ঐতিহ্য নিয়ে সব সময় গর্ব প্রকাশ করেন রাশিদা। ২০১৯ সালের ১৩ জানুয়ারি কংগ্রেসে শপথ গ্রহণের সময় তিনি ঐতিহ্যবাহী ফিলিস্তিনি পোশাক ‘থোব’ পরেছিলেন। হাতে রেখেছিলেন পবিত্র কোরআনের একটি ঐতিহাসিক কপি। তাঁর এই উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ফিলিস্তিনি সংস্কৃতি ও পরিচয়ের একটি বিশেষ প্রতীকী প্রকাশ হিসেবে আলোচিত হয়।

ফিলিস্তিনিদের অধিকার, স্বাধীনতা এবং গাজার মানুষের মানবিক বিপর্যয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সরব তিনি। বিশেষ করে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির বিরুদ্ধে তাঁর বক্তব্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

২০২৩ সালের ৭ নভেম্বর মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে নিন্দা প্রস্তাব (Censure) পাস হয়। ইসরায়েল-হামাস সংঘাত নিয়ে তাঁর কিছু বক্তব্যের কারণে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। এর ফলে কংগ্রেসের ভেতরে ও বাইরে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়। তবে এসব বিরোধিতা সত্ত্বেও নিজের নির্বাচনী এলাকার মানুষের কাছে তাঁর জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছেন তিনি।

২০১৯ সালে রাশিদা ও ইলহান ওমরকে ইসরায়েল সফরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। তাঁদের ফিলিস্তিনপন্থী রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।

২০২৬ সালে পঞ্চমবারের বিজয়

২০২৬ সালের ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে রাশিদার জয় তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। মিশিগানের ১২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে তিনি রিপাবলিকান প্রার্থী জেমস হুপারকে পরাজিত করেন। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) তাঁর বিজয় নিশ্চিত বলে ঘোষণা করে। এর মধ্য দিয়ে ২০১৮ সালে শুরু হওয়া কংগ্রেসের যাত্রায় টানা পঞ্চমবারের মতো নির্বাচনী সাফল্য অর্জন করলেন তিনি।

বর্তমানে তিনি প্রতিনিধি পরিষদের ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস কমিটি এবং ওভারসাইট অ্যান্ড গভর্নমেন্ট রিফর্ম কমিটিতে দায়িত্ব পালন করছেন। আবাসন, আর্থিক সেবা, ভোক্তা অধিকার, সরকারি জবাবদিহি ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে কাজ করার সুযোগ রয়েছে এসব কমিটির মাধ্যমে।

ব্যক্তিজীবন ও মাতৃত্ব

ব্যক্তিজীবনেও নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে রাশিদাকে। ১৯৯৮ সালে ফায়েজ তালিবকে বিয়ে করেন তিনি। তাঁদের সংসারে দুই ছেলের জন্ম হয়। ২০১৫ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। তবে বিচ্ছেদের পরও তিনি তালিব পদবি ব্যবহার অব্যাহত রেখেছেন।

নিজের দুই ছেলেকে রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম অনুপ্রেরণা বলে মনে করেন রাশিদা। তাঁর ভাষায়, সন্তানদের এমন একটি সমাজ উপহার দিতে চান, যেখানে ধর্মীয় কিংবা জাতিগত পরিচয়ের কারণে কাউকে প্রশ্নবিদ্ধ বা বৈষম্যের শিকার হতে হবে না।

তাঁর নিজের বক্তব্যে উঠে এসেছে, তিনি ইতিহাস গড়ার জন্য রাজনীতিতে আসেননি; বরং অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলতেই তাঁর এই পথচলা।

জনপ্রিয়তার মূল শক্তি কোথায়?

রাশিদা তালিবের জনপ্রিয়তার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। প্রথমত, তিনি শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনসংগ্রাম কাছ থেকে দেখেছেন। ফলে তাঁদের সমস্যা নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে তাঁর বক্তব্যে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রতিফলন পাওয়া যায়।

দ্বিতীয়ত, ডেট্রয়েটের স্থানীয় বাসিন্দাদের পরিবেশ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় তাঁর দীর্ঘদিনের ভূমিকা তাঁকে সাধারণ মানুষের আস্থাভাজন করেছে। তৃতীয়ত, অভিবাসী, মুসলিম ও ফিলিস্তিনি পরিচয় নিয়ে বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান তাঁকে একটি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পরিচিত করেছে।

সবশেষে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও বিতর্কের মধ্যেও নিজের অবস্থান প্রকাশে পিছিয়ে না যাওয়ার প্রবণতা তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

একজন শ্রমজীবী ফিলিস্তিনি অভিবাসী পরিবারের সন্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠার গল্প রাশিদা তালিবের। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ও অবস্থান নিয়ে বিতর্ক থাকলেও নির্বাচনে ধারাবাহিক সাফল্য প্রমাণ করে, মিশিগানের একটি বড় জনগোষ্ঠীর কাছে তিনি এখনো জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য প্রতিনিধি।

———————-

তথ্যসূত্র: মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের ইতিহাস ও আর্কাইভ, রাশিদা তালিবের সরকারি কংগ্রেস ওয়েবসাইট, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের নির্বাচনী প্রতিবেদন এবং দ্য ডেট্রয়েট নিউজ।