নাটোরে বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ব্যাংক কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম ও তার আট বছর বয়সী মেয়ে তাসফিয়াসহ ১৪ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে শহিদুল ইসলামের স্ত্রী রুবিনা বেগম ও ১১ বছর বয়সী ছেলে লাবিবও রয়েছে। তারা গুরুতর আহত অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভোর সোয়া ৪টার দিকে নাটোর মহাসড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্গাপূজার ছুটিতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মাগুরা থেকে রাজশাহীতে আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছিলেন শহিদুল ইসলাম। কিন্তু পথেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তিনি ও তার মেয়ে।
নিহত শহিদুল ইসলামের বাড়ি পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার মির্জাগঞ্জ গ্রামে। তিনি মাগুরায় ব্র্যাক ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার স্ত্রী রুবিনা বেগম পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার সুবিদখালী পূবালী ব্যাংক শাখায় চাকরি করেন।
পারিবারিক সূত্র জানায়, সোমবার বিকেল ৪টার দিকে রুবিনা বেগম দুই সন্তানকে নিয়ে মির্জাগঞ্জ থেকে স্বামী শহিদুল ইসলামের কর্মস্থল মাগুরায় যান। সেখান থেকে মঙ্গলবার সকালে পরিবারের সবাই বাসে করে রাজশাহীর উদ্দেশে রওনা হন। পথে নাটোরে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি বালুবোঝাই ট্রাকের সঙ্গে তাদের বহনকারী বাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই শহিদুল ইসলাম ও তার মেয়ে তাসফিয়ার মৃত্যু হয়।
‘হাসপাতালে দেড় ঘণ্টা পরও শয্যা মেলেনি’
দুর্ঘটনায় আহত রুবিনা বেগম ও লাবিবকে উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। মঙ্গলবার দুপুর ১টার দিকে হাসপাতালের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, দুই সারি শয্যার মাঝখানে একটি স্ট্রেচারে শুয়ে আছে আহত লাবিব। হাসপাতালে পৌঁছানোর প্রায় দেড় ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও তখনো তার শয্যার ব্যবস্থা হয়নি।
কিছুক্ষণ পর লাবিব ও তার মাকে সিটি স্ক্যান করানোর জন্য বহির্বিভাগে নেওয়া হয়। সেখানে আরও ৩০ থেকে ৪০ মিনিট কাটানোর পর তাদের আবার ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ফিরিয়ে আনা হয়। দুপুর ২টা পর্যন্তও তাদের জন্য শয্যার ব্যবস্থা হয়নি বলে জানা গেছে।
লাবিবের খালু শহিদুর রহমান সংবাদমাধ্যম সমকালকে বলেন, দুর্গাপূজার ছুটিতে পুরো পরিবার তাদের বাড়িতে বেড়াতে আসছিল। লাবিব, তাসফিয়া ও তার নিজের দুই সন্তান এ নিয়ে খুব আনন্দিত ছিল। ভোরে ঘুম থেকে উঠে শহিদুলকে ফোন করে তাদের অবস্থান জানতে চাইলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফজরের নামাজ শেষে আবার ফোন করলে এক পুলিশ সদস্য দুর্ঘটনার খবর জানান। এরপর তারা নাটোরের উদ্দেশে রওনা হন।
শহিদুর রহমান বলেন, নাটোরে গিয়ে দেখেন, শহিদুল ও তাসফিয়া আর বেঁচে নেই। লাবিব ও রুবিনার অবস্থাও গুরুতর ছিল। তারা কথা বলতে পারছিলেন না, হুঁশও ছিল না। দ্রুত তাদের রামেক হাসপাতালে নিয়ে আসেন। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর দেড় ঘণ্টা পরও শয্যা না পাওয়ার অভিযোগ করেন তিনি। পরে সিটি স্ক্যানের জন্য নেওয়া হয় এবং স্ক্যানের পর শয্যা দেওয়ার কথা জানানো হয়।
তিনি আরও বলেন, লাবিব ও তাসফিয়ার বাবা-মা দুজনই চাকরি করতেন। এ কারণে তাদের খুব বেশি বেড়াতে যাওয়া হতো না। এবারের ছুটি নিয়ে তারা অনেক আনন্দিত ছিল। কিন্তু দুর্ঘটনায় তাদের সেই আনন্দ মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেছে।
নিহত শহিদুল ইসলামের বড় ভাই মো. ফারুক হোসেনও দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, পূজার ছুটিতে সবাই মিলে রাজশাহীতে আত্মীয়ের বাড়িতে আনন্দ করতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু একটি দুর্ঘটনায় সব শেষ হয়ে গেছে। তার ভাই শহিদুল ইসলাম ও ভাতিজি তাসফিয়া ঘটনাস্থলেই মারা গেছেন। অন্যদিকে ভাইয়ের স্ত্রী ও ছোট ছেলে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে।
দুর্ঘটনায় নিহত আরও যারা
বনপাড়া পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) শামীম হোসেন বলেন, বরগুনা থেকে ছেড়ে আসা চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী আরপি পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা বালুবোঝাই ট্রাকের সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই নয়জনের মৃত্যু হয়। আহতদের উদ্ধার করে বড়াইগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে সেখানে আরও পাঁচজন মারা যান।
দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে আরও রয়েছেন জাজিরা উপজেলার আরোব আলী ফকিরের ছেলে সামাদ ফকির (৭০), কাজিরহাট গ্রামের ইউনুস আলীর ছেলে সোহাগ হোসেন (৩০), বড়কান্দি গ্রামের জহুর উদ্দিনের ছেলে জুয়েল রানা (৪০), ডুবি সাহেবের গ্রামের জাহান উদ্দিন মোল্লার ছেলে শালাল মোল্লা (৪৫), কাজিরহাট গ্রামের শাহিন হোসেন (২৫), রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ফরহাদপুর গ্রামের আব্দুল হাকিমের ছেলে ও বাসচালক সোহেল রানা (৪০), বাগমারা উপজেলার কনোপাড়া গ্রামের বাবর আলীর ছেলে আনোয়ার হক (৩০) এবং ফরিদপুরের বাকুন্দা এলাকার অমুল্য চন্দ্রের ছেলে হিমেস (২৮)।
নাটোরের জেলা প্রশাসক সুমনী আক্তার দুর্ঘটনার খবর নিশ্চিত করেছেন। পুলিশ জানায়, দুর্ঘটনার পর সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।

অনলাইন ডেস্ক 


















