ঢাকা রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশ ও বিশ্বের অন্যান্য দেশের কোচিং- ছায়া শিক্ষার বাস্তবতা

blank

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কোচিং সেন্টার এখন এক অনিবার্য উপাদান। স্কুল ও কলেজের আনুষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি অতিরিক্ত প্রস্তুতির জন্য শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ কোচিংয়ের উপর নির্ভরশীল। তবে এই প্রবণতা শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়; বিশ্বব্যাপী ’ছায়া শিক্ষা’ বা Shadow Education নামে পরিচিত একটি সমান্তরাল শিক্ষাব্যবস্থা বিভিন্ন দেশে বিস্তার লাভ করেছে। কিন্তু দেশভেদে এর প্রয়োজন, প্রভাব এবং বিস্তারে রয়েছে বড় ধরনের পার্থক্য।

বাংলাদেশে কোচিংয়ের বাস্তবতা
বাংলাদেশে কোচিং সেন্টার মূলত পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার একটি ফল। এসএসসি, এইচএসসি এবং বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে কোচিং সেন্টারের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। পরে প্রাথমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এবং কলেজের একাডেমিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও কোচিং সেন্টারের ব্যপ্তি বেড়েছে।
শিক্ষার্থীরা সাধারণত স্কুলের পাশাপাশি একাধিক কোচিং সেন্টারে অংশগ্রহণ করে। ভর্তি কোচিং, মডেল টেস্ট, বিভিন্ন রকম নিয়োগ পরীক্ষার কেন্দ্রিক কোচিংগুলো সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা কোচিংয়ে ব্যয় করে, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি নিয়মিত অংশে পরিণত হয়েছে। ছাত্র-ছাত্রী পরীক্ষা দেবার জন্য বিদ্যালয়ে যায়। কখনও কখনও বিদ্যালয়ের ক্লাস সময়ে ছাত্র-ছাত্রী কোচিংয়ে যায়। যারা সংক্ষিপ্ত সময়ে শর্টকাট পদ্ধতি ব্যবহার করে ভালো ফলাফলের আকাঙ্খা করে।

শিক্ষাবিদদের মতে, মূল কারণগুলো হলো—
• পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা
• উচ্চ শিক্ষায় সীমিত আসন
• স্কুলে মানসম্মত শিক্ষার ঘাটতি
• মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ঘাটতি
• অভিভাবকদের বাড়তি প্রত্যাশা
• অতিমাত্রায় বাড়ির কাজ
• অধিক জনসংখ্যার ফলে অধিকাংশের ভালো সুযোগের অভাব
• বেকার সমস্যা সমাধানের একটি উপায়
• শেখার ধরন মুখস্থ
• “কোচিং না করলে পিছিয়ে যাবে” — এমন সামাজিক ধারণা
ফলে অনেক ক্ষেত্রে কোচিং সেন্টার শিক্ষার সহায়ক নয়, বরং প্রধান মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

এশিয়ায় কোচিং সেন্টারের আধিপত্য কোথায় সবচেয়ে বেশি
এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কোচিং সেন্টারের ওপর নির্ভরশীলতা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। যেমন— দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, চীন, ভারত এবং বাংলাদেশ-এ কোচিং একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়াতে “হ্যাগওন” (Hagwon) নামে পরিচিত কোচিং প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ। প্রায় ৭০–৮০% শিক্ষার্থী স্কুল শেষে নিয়মিত কোচিংয়ে অংশ নেয় এবং অনেক সময় রাত ১০–১২টা পর্যন্ত পড়াশোনা করে। এ কারণে দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কোচিং-নির্ভর দেশগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত।
জাপানে “জুকু” (Juku) নামে কোচিং সেন্টার পরিচিত। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক হওয়ায় শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত প্রস্তুতির জন্য কোচিংয়ের ওপর নির্ভর করে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সরকার এই কোচিং ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
চীনেও একসময় কোচিং খুব জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু অতিরিক্ত চাপ ও শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে সরকার কঠোরভাবে অনেক কোচিং সেন্টার বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করেছে, বিশেষ করে ২০০১ সালের ‘ডাবল রিডাকশন নীতি’ যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার চাপ ও কোচিং নির্ভরতা—দুটোই কমানোর কথা বলা হয়েছে।
ভারতে কোচিং শিল্প ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। বিশেষ করে প্রকৌশল ও মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য বিশেষায়িত কোচিং সেন্টারগুলো একটি বড় অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে স্কুল ও কোচিং প্রায় একসাথে বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে, এবং ভর্তি পরীক্ষা থেকে শুরু করে বোর্ড পরীক্ষাতেও কোচিংয়ের ওপর নির্ভরশীলতা স্পষ্ট।
অন্যদিকে, বাংলাদেশেও কোচিং সেন্টার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। স্কুল শিক্ষার পাশাপাশি অধিকাংশ শিক্ষার্থী অতিরিক্ত কোচিংয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, বিশেষ করে পাবলিক পরীক্ষা ও ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে।

যে সব দেশে কোচিংয়ের প্রচলন কম
ইউরোপের অনেক দেশে কোচিং সেন্টারের প্রয়োজনীয়তা তুলনামূলকভাবে কম। যেমন— ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, ডেনমার্ক এবং সুইডেন-এর মতো দেশে শিক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক। সেখানে শ্রেণিকক্ষেই শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় সহায়তা পেয়ে থাকে।
এসব দেশে পরীক্ষার চাপ তুলনামূলকভাবে কম এবং মূল্যায়ন পদ্ধতি বহুমাত্রিক। ফলে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত কোচিংয়ের প্রয়োজন খুব কম হয়। হোমওয়ার্কও তুলনামূলকভাবে কম দেওয়া হয় এবং স্কুলেই পাঠদানের বিষয়গুলো কার্যকরভাবে শেখানো হয়। এর ফলে বাসায় পড়াশোনার চাপ কম থাকে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, দক্ষ শিক্ষকতা এবং সুষম মূল্যায়ন পদ্ধতির কারণে এসব দেশে কোচিং সেন্টারের ওপর নির্ভরশীলতা খুবই কম।
অন্য দিকে জার্মানীতে কারিগরী এবং ব্যবহারিক শিক্ষার দিকে গুরুত্ব দিয়ে সকল শিক্ষাথীকে এক দিকে পরিচালিত না করে বিভিন্ন পথের দিকে পরিচালিত করে। তাই কোচিং নির্ভরতা কম।
অন্যদিকে, ওশেনিয়া মহাদেশের অস্ট্রেলিয়াতে কোচিং প্রধানত দুর্বল শিক্ষার্থীদের সহায়তার জন্য ব্যবহৃত হয়। সেখানে পরীক্ষার ফলাফলের পাশাপাশি দক্ষতা ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থী নিয়মিত শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার মাধ্যমেই প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে পারে এবং অতিরিক্ত কোচিংয়ের ওপর নির্ভরশীলতা কম থাকে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, দক্ষ শিক্ষকতা এবং শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক মূল্যায়ন পদ্ধতির কারণে উন্নত দেশগুলোতে কোচিং সেন্টারের প্রয়োজনীয়তা তুলনামূলকভাবে অনেক কম।

তুলনামূলক বিশ্লেষণ
বাংলাদেশ ও অন্যান্য দেশের কোচিং ব্যবস্থার মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলো নিম্নরূপ:
১. নির্ভরতার মাত্রা:
বাংলাদেশে কোচিং প্রায় অপরিহার্য হয়ে উঠেছে, যেখানে ইউরোপের অনেক দেশে এটি ঐচ্ছিক।
২. কারণ:
বাংলাদেশে কোচিং নির্ভরতার পেছনে শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা বড় ভূমিকা রাখে, অন্যদিকে উন্নত দেশগুলোতে এটি মূলত প্রতিযোগিতা বা বিশেষ প্রস্তুতির জন্য ব্যবহৃত হয়।
৩. শিক্ষার ধরন:
বাংলাদেশে মুখস্থ নির্ভরতা বেশি, যেখানে উন্নত দেশগুলোতে বিশ্লেষণধর্মী ও সৃজনশীল শিক্ষার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
৪. সামাজিক প্রভাব:
বাংলাদেশে কোচিং সেন্টার অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়াতে পারে, কারণ সব পরিবার এর খরচ বহন করতে পারে না। উন্নত দেশগুলোতে এই বৈষম্য তুলনামূলকভাবে কম।

প্রভাব ও চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে কোচিং সেন্টার একদিকে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সহায়তা দিলেও অন্যদিকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা তৈরি করছে।
অতিরিক্ত কোচিং শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ বাড়ায় এবং তাদের সৃজনশীলতা কমিয়ে দেয়। এছাড়া কোচিংয়ের কারণে অনেক ক্ষেত্রে স্কুল শিক্ষার গুরুত্ব কমে যাচ্ছে।
অন্যদিকে উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষাব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা স্কুল থেকেই প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারে। ফলে কোচিংয়ের উপর নির্ভরতা কম থাকে এবং শিক্ষার্থীরা আরও স্বতন্ত্রভাবে শেখার সুযোগ পায়।

করণীয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে কোচিং নির্ভরতা কমাতে হলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
প্রথমতঃ স্কুল শিক্ষার মান উন্নয়ন করতে হবে এবং শ্রেণিকক্ষে কার্যকর পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়তঃ পরীক্ষার পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে সৃজনশীল ও বিশ্লেষণধর্মী মূল্যায়ন চালু করতে হবে।
তৃতীয়তঃ উচ্চশিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি করে প্রতিযোগিতার চাপ কমাতে হবে।
চতুর্থতঃ বাড়ির কাজ কমিয়ে দিয়ে বিদ্যালয়ের লেখাপড়া বিদ্যালয়েই শেষ করতে হবে।
পঞ্চমতঃ শিক্ষকদের গতানুগতিক শিক্ষাদান পদ্ধতির বাইরে এসে শিক্ষাদান করতে হবে।
ষষ্ঠতঃ শিক্ষকদের সমসাময়িক জ্ঞানের সাথে সংগতিপূর্ণ থাকতে হবে
সপ্তমঃ অভিভাবকদের কোচিং সেন্টার থেকে কোচিং দৌড়ানোর অভ্যাস পরিহার করতে হবে
অষ্টমতঃ কোচিং সেন্টারের জন্য একটি সুসংগঠিত নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি।

সবশেষে আমরা বলতে পারি যে, বাংলাদেশ ও বিশ্বের অন্যান্য দেশের কোচিং সেন্টার ব্যবস্থার তুলনামূলক বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট যে, কোচিং নিজে সমস্যা নয়; বরং এটি শিক্ষাব্যবস্থার একটি প্রতিফলন।
যেখানে শিক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী ও ভারসাম্যপূর্ণ, সেখানে কোচিংয়ের প্রয়োজন কম। আর যেখানে প্রতিযোগিতা বেশি এবং শিক্ষাব্যবস্থায় ঘাটতি রয়েছে, সেখানে কোচিং সেন্টার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অতএব, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—কোচিং নির্ভরতা কমিয়ে একটি শক্তিশালী, কার্যকর ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

———————–
লেখক:গবেষক ও বিশেষ সংবাদদাতা, 

দৈনিক চলনবিল প্রবাহ
ইমেইলঃ tozammel.dascoh@gmail.com

blank

বাংলাদেশ ও বিশ্বের অন্যান্য দেশের কোচিং- ছায়া শিক্ষার বাস্তবতা

বাংলাদেশ ও বিশ্বের অন্যান্য দেশের কোচিং- ছায়া শিক্ষার বাস্তবতা

প্রকাশের সময় : ১৩ মিনিট আগে
blank

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কোচিং সেন্টার এখন এক অনিবার্য উপাদান। স্কুল ও কলেজের আনুষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি অতিরিক্ত প্রস্তুতির জন্য শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ কোচিংয়ের উপর নির্ভরশীল। তবে এই প্রবণতা শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়; বিশ্বব্যাপী ’ছায়া শিক্ষা’ বা Shadow Education নামে পরিচিত একটি সমান্তরাল শিক্ষাব্যবস্থা বিভিন্ন দেশে বিস্তার লাভ করেছে। কিন্তু দেশভেদে এর প্রয়োজন, প্রভাব এবং বিস্তারে রয়েছে বড় ধরনের পার্থক্য।

বাংলাদেশে কোচিংয়ের বাস্তবতা
বাংলাদেশে কোচিং সেন্টার মূলত পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার একটি ফল। এসএসসি, এইচএসসি এবং বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে কোচিং সেন্টারের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। পরে প্রাথমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এবং কলেজের একাডেমিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও কোচিং সেন্টারের ব্যপ্তি বেড়েছে।
শিক্ষার্থীরা সাধারণত স্কুলের পাশাপাশি একাধিক কোচিং সেন্টারে অংশগ্রহণ করে। ভর্তি কোচিং, মডেল টেস্ট, বিভিন্ন রকম নিয়োগ পরীক্ষার কেন্দ্রিক কোচিংগুলো সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা কোচিংয়ে ব্যয় করে, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি নিয়মিত অংশে পরিণত হয়েছে। ছাত্র-ছাত্রী পরীক্ষা দেবার জন্য বিদ্যালয়ে যায়। কখনও কখনও বিদ্যালয়ের ক্লাস সময়ে ছাত্র-ছাত্রী কোচিংয়ে যায়। যারা সংক্ষিপ্ত সময়ে শর্টকাট পদ্ধতি ব্যবহার করে ভালো ফলাফলের আকাঙ্খা করে।

শিক্ষাবিদদের মতে, মূল কারণগুলো হলো—
• পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা
• উচ্চ শিক্ষায় সীমিত আসন
• স্কুলে মানসম্মত শিক্ষার ঘাটতি
• মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ঘাটতি
• অভিভাবকদের বাড়তি প্রত্যাশা
• অতিমাত্রায় বাড়ির কাজ
• অধিক জনসংখ্যার ফলে অধিকাংশের ভালো সুযোগের অভাব
• বেকার সমস্যা সমাধানের একটি উপায়
• শেখার ধরন মুখস্থ
• “কোচিং না করলে পিছিয়ে যাবে” — এমন সামাজিক ধারণা
ফলে অনেক ক্ষেত্রে কোচিং সেন্টার শিক্ষার সহায়ক নয়, বরং প্রধান মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

এশিয়ায় কোচিং সেন্টারের আধিপত্য কোথায় সবচেয়ে বেশি
এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কোচিং সেন্টারের ওপর নির্ভরশীলতা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। যেমন— দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, চীন, ভারত এবং বাংলাদেশ-এ কোচিং একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়াতে “হ্যাগওন” (Hagwon) নামে পরিচিত কোচিং প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ। প্রায় ৭০–৮০% শিক্ষার্থী স্কুল শেষে নিয়মিত কোচিংয়ে অংশ নেয় এবং অনেক সময় রাত ১০–১২টা পর্যন্ত পড়াশোনা করে। এ কারণে দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কোচিং-নির্ভর দেশগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত।
জাপানে “জুকু” (Juku) নামে কোচিং সেন্টার পরিচিত। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক হওয়ায় শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত প্রস্তুতির জন্য কোচিংয়ের ওপর নির্ভর করে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সরকার এই কোচিং ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
চীনেও একসময় কোচিং খুব জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু অতিরিক্ত চাপ ও শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে সরকার কঠোরভাবে অনেক কোচিং সেন্টার বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করেছে, বিশেষ করে ২০০১ সালের ‘ডাবল রিডাকশন নীতি’ যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার চাপ ও কোচিং নির্ভরতা—দুটোই কমানোর কথা বলা হয়েছে।
ভারতে কোচিং শিল্প ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। বিশেষ করে প্রকৌশল ও মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য বিশেষায়িত কোচিং সেন্টারগুলো একটি বড় অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে স্কুল ও কোচিং প্রায় একসাথে বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে, এবং ভর্তি পরীক্ষা থেকে শুরু করে বোর্ড পরীক্ষাতেও কোচিংয়ের ওপর নির্ভরশীলতা স্পষ্ট।
অন্যদিকে, বাংলাদেশেও কোচিং সেন্টার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। স্কুল শিক্ষার পাশাপাশি অধিকাংশ শিক্ষার্থী অতিরিক্ত কোচিংয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, বিশেষ করে পাবলিক পরীক্ষা ও ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে।

যে সব দেশে কোচিংয়ের প্রচলন কম
ইউরোপের অনেক দেশে কোচিং সেন্টারের প্রয়োজনীয়তা তুলনামূলকভাবে কম। যেমন— ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, ডেনমার্ক এবং সুইডেন-এর মতো দেশে শিক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক। সেখানে শ্রেণিকক্ষেই শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় সহায়তা পেয়ে থাকে।
এসব দেশে পরীক্ষার চাপ তুলনামূলকভাবে কম এবং মূল্যায়ন পদ্ধতি বহুমাত্রিক। ফলে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত কোচিংয়ের প্রয়োজন খুব কম হয়। হোমওয়ার্কও তুলনামূলকভাবে কম দেওয়া হয় এবং স্কুলেই পাঠদানের বিষয়গুলো কার্যকরভাবে শেখানো হয়। এর ফলে বাসায় পড়াশোনার চাপ কম থাকে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, দক্ষ শিক্ষকতা এবং সুষম মূল্যায়ন পদ্ধতির কারণে এসব দেশে কোচিং সেন্টারের ওপর নির্ভরশীলতা খুবই কম।
অন্য দিকে জার্মানীতে কারিগরী এবং ব্যবহারিক শিক্ষার দিকে গুরুত্ব দিয়ে সকল শিক্ষাথীকে এক দিকে পরিচালিত না করে বিভিন্ন পথের দিকে পরিচালিত করে। তাই কোচিং নির্ভরতা কম।
অন্যদিকে, ওশেনিয়া মহাদেশের অস্ট্রেলিয়াতে কোচিং প্রধানত দুর্বল শিক্ষার্থীদের সহায়তার জন্য ব্যবহৃত হয়। সেখানে পরীক্ষার ফলাফলের পাশাপাশি দক্ষতা ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থী নিয়মিত শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার মাধ্যমেই প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে পারে এবং অতিরিক্ত কোচিংয়ের ওপর নির্ভরশীলতা কম থাকে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, দক্ষ শিক্ষকতা এবং শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক মূল্যায়ন পদ্ধতির কারণে উন্নত দেশগুলোতে কোচিং সেন্টারের প্রয়োজনীয়তা তুলনামূলকভাবে অনেক কম।

তুলনামূলক বিশ্লেষণ
বাংলাদেশ ও অন্যান্য দেশের কোচিং ব্যবস্থার মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলো নিম্নরূপ:
১. নির্ভরতার মাত্রা:
বাংলাদেশে কোচিং প্রায় অপরিহার্য হয়ে উঠেছে, যেখানে ইউরোপের অনেক দেশে এটি ঐচ্ছিক।
২. কারণ:
বাংলাদেশে কোচিং নির্ভরতার পেছনে শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা বড় ভূমিকা রাখে, অন্যদিকে উন্নত দেশগুলোতে এটি মূলত প্রতিযোগিতা বা বিশেষ প্রস্তুতির জন্য ব্যবহৃত হয়।
৩. শিক্ষার ধরন:
বাংলাদেশে মুখস্থ নির্ভরতা বেশি, যেখানে উন্নত দেশগুলোতে বিশ্লেষণধর্মী ও সৃজনশীল শিক্ষার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
৪. সামাজিক প্রভাব:
বাংলাদেশে কোচিং সেন্টার অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়াতে পারে, কারণ সব পরিবার এর খরচ বহন করতে পারে না। উন্নত দেশগুলোতে এই বৈষম্য তুলনামূলকভাবে কম।

প্রভাব ও চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে কোচিং সেন্টার একদিকে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সহায়তা দিলেও অন্যদিকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা তৈরি করছে।
অতিরিক্ত কোচিং শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ বাড়ায় এবং তাদের সৃজনশীলতা কমিয়ে দেয়। এছাড়া কোচিংয়ের কারণে অনেক ক্ষেত্রে স্কুল শিক্ষার গুরুত্ব কমে যাচ্ছে।
অন্যদিকে উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষাব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা স্কুল থেকেই প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারে। ফলে কোচিংয়ের উপর নির্ভরতা কম থাকে এবং শিক্ষার্থীরা আরও স্বতন্ত্রভাবে শেখার সুযোগ পায়।

করণীয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে কোচিং নির্ভরতা কমাতে হলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
প্রথমতঃ স্কুল শিক্ষার মান উন্নয়ন করতে হবে এবং শ্রেণিকক্ষে কার্যকর পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়তঃ পরীক্ষার পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে সৃজনশীল ও বিশ্লেষণধর্মী মূল্যায়ন চালু করতে হবে।
তৃতীয়তঃ উচ্চশিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি করে প্রতিযোগিতার চাপ কমাতে হবে।
চতুর্থতঃ বাড়ির কাজ কমিয়ে দিয়ে বিদ্যালয়ের লেখাপড়া বিদ্যালয়েই শেষ করতে হবে।
পঞ্চমতঃ শিক্ষকদের গতানুগতিক শিক্ষাদান পদ্ধতির বাইরে এসে শিক্ষাদান করতে হবে।
ষষ্ঠতঃ শিক্ষকদের সমসাময়িক জ্ঞানের সাথে সংগতিপূর্ণ থাকতে হবে
সপ্তমঃ অভিভাবকদের কোচিং সেন্টার থেকে কোচিং দৌড়ানোর অভ্যাস পরিহার করতে হবে
অষ্টমতঃ কোচিং সেন্টারের জন্য একটি সুসংগঠিত নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি।

সবশেষে আমরা বলতে পারি যে, বাংলাদেশ ও বিশ্বের অন্যান্য দেশের কোচিং সেন্টার ব্যবস্থার তুলনামূলক বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট যে, কোচিং নিজে সমস্যা নয়; বরং এটি শিক্ষাব্যবস্থার একটি প্রতিফলন।
যেখানে শিক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী ও ভারসাম্যপূর্ণ, সেখানে কোচিংয়ের প্রয়োজন কম। আর যেখানে প্রতিযোগিতা বেশি এবং শিক্ষাব্যবস্থায় ঘাটতি রয়েছে, সেখানে কোচিং সেন্টার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অতএব, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—কোচিং নির্ভরতা কমিয়ে একটি শক্তিশালী, কার্যকর ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

———————–
লেখক:গবেষক ও বিশেষ সংবাদদাতা, 

দৈনিক চলনবিল প্রবাহ
ইমেইলঃ tozammel.dascoh@gmail.com