বর্ষা এলেই নতুন রূপে সেজে ওঠে দেশের বৃহত্তম জলাভূমি চলনবিল। চারদিকে বিস্তীর্ণ জলরাশি, হালকা ঢেউ, সারি সারি নৌকা আর প্রকৃতির মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন শত শত দর্শনার্থী। বিশেষ করে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার কুন্দইল সেতু এলাকাকে ঘিরে এখন যেন বসেছে বর্ষার মিলনমেলা। সিরাজগঞ্জ, নাটোর, বগুড়া ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে মানুষ ছুটে আসছেন চলনবিলের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে।
তাড়াশ উপজেলা সদর থেকে কুন্দইল সেতুর পথে এগোতেই চোখে পড়ে জলমগ্ন চলনবিলের নয়নাভিরাম দৃশ্য। দীঘি সদগুণা এলাকা পেরিয়ে কামারশোন গ্রামের নৌঘাটে মিলছে ইঞ্জিনচালিত নৌকা, ডিঙিনৌকা এবং নিয়মিত যাত্রীবাহী নৌকার সুবিধা। এখান থেকে কুন্দইল সেতু পর্যন্ত জনপ্রতি ভাড়া মাত্র ২০ টাকা। আর পুরো নৌকা ঘণ্টাভিত্তিক ভাড়া করতে খরচ হয় ১০০ থেকে ২০০ টাকা।
বিলের পানিতে কেউ গোসল করছেন, কেউ নৌকায় চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, আবার অনেকে সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণে ব্যস্ত। কুন্দইল সেতুর ঘাটে পৌঁছালে দেখা যায়, সারি সারি নৌকা, মাঝিদের ব্যস্ততা এবং দর্শনার্থীদের প্রাণচাঞ্চল্যে পুরো এলাকা মুখর হয়ে উঠেছে।
তাড়াশ সদর এলাকার বাসিন্দা হারুনার রশিদ জানান, বর্ষাকাল এলেই তিনি পরিবারকে নিয়ে চলনবিলে ঘুরতে আসেন। তাঁর ভাষায়, প্রকৃতির এত সুন্দর রূপ কাছ থেকে দেখার অনুভূতি সত্যিই অন্যরকম।
স্থানীয় মাঝি আবদুস সালাম বলেন, বর্ষা মৌসুমে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যাত্রী পারাপার ও নৌকাভ্রমণ করাতে ব্যস্ত থাকতে হয়। এই সময়ের অতিরিক্ত আয় তাঁদের পরিবারের জন্য বড় সহায়তা হয়ে ওঠে।
বগুড়ার দুপচাঁচিয়া থেকে পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে চলনবিলে ঘুরতে আসা ব্যবসায়ী ছোটন চক্রবর্তী বলেন, নৌকাভ্রমণ আর চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাঁকে মুগ্ধ করেছে। তাঁর মেয়ে টুসু চক্রবর্তী জানায়, জীবনে প্রথমবার চলনবিল দেখতে এসে নৌকায় ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তার কাছে দারুণ উপভোগ্য মনে হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, আষাঢ় ও শ্রাবণ মাসে চলনবিলে সবচেয়ে বেশি পর্যটকের সমাগম হয়। তবে পানির পরিমাণ ভালো থাকলে ভাদ্র ও আশ্বিন মাস পর্যন্তও দর্শনার্থীদের আনাগোনা অব্যাহত থাকে। এ বছর পর্যাপ্ত পানি এবং তাড়াশ থেকে কুন্দইল পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগের উন্নতির কারণে পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
দর্শনার্থীদের ভিড়কে কেন্দ্র করে বিলপাড়ে গড়ে উঠেছে চা, ভাজাপোড়া, ফলসহ বিভিন্ন অস্থায়ী দোকান। বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় খুশি স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও। এতে চলনবিলকেন্দ্রিক মৌসুমি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
লেখক, গবেষক ও খুলনার উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের অতিরিক্ত পরিচালক খ ম রেজাউল করিম মনে করেন, পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হলে চলনবিলের এই অঞ্চল দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান জানান, চলনবিলে ভ্রমণে আসা মানুষের জন্য আরও উন্নত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।
বর্ষার জলরাশিতে ঘেরা চলনবিল প্রতিবছরই নতুন রূপে মুগ্ধ করে প্রকৃতিপ্রেমীদের। নৌকার দোল, নির্মল বাতাস আর সবুজ প্রকৃতির অপূর্ব মেলবন্ধন যেন বারবার ডেকে আনে ভ্রমণপিপাসু মানুষকে।

অনলাইন ডেস্ক 


















