ঢাকা বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান ও ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি বয়ে চলেছেন

চশমা ছাড়াই কোরআন পড়েন চলনবিলের ১২৩ বছরের আব্বাস

blank

বয়সের হিসেবে ১২৩ বছর। জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসেছেন তিনি। বদলে যেতে দেখেছেন সময়, সমাজ আর মানুষের জীবনযাত্রা। তাঁর জীবনের শৈশব কেটেছে ব্রিটিশ শাসনামলে, যৌবন দেখেছে পাকিস্তান আমল, আর ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়ও পেরিয়ে এসেছেন তিনি। সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছে তাঁর সমসাময়িক অনেক মুখ। কিন্তু এখনো বেঁচে আছেন নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার বিয়াঘাট ইউনিয়নের যোগেন্দ্রনগর গ্রামের আব্বাস প্রামাণিক।

আব্বাস প্রামাণিকের ভোটার আইডি কার্ডে জন্মসাল উল্লেখ রয়েছে ১৯০৩। সেই হিসাবে ২০২৬ সালে তাঁর বয়স দাঁড়ায় ১২৩ বছর। তবে পরিবারের সদস্যদের দাবি, নথিতে উল্লেখ করা বয়সের চেয়েও তাঁর প্রকৃত বয়স আরও বেশি। স্থানীয়দের অনেকেরও ধারণা, তিনি এলাকার সবচেয়ে প্রবীণ জীবিত মানুষদের একজন।

বয়সের ভারে শরীর এখন অনেকটাই নুয়ে পড়েছে। চলতে গেলে লাঠির প্রয়োজন হয়। শ্রবণশক্তিও কমেছে। কিন্তু চোখ এখনো যেন সময়ের কাছে হার মানেনি। চশমা ছাড়াই কোরআন শরিফ পড়তে পারেন আব্বাস প্রামাণিক। খালি চোখে কোরআনের অক্ষর পড়ার এই সক্ষমতা তাঁর পরিবারের কাছে যেমন বিস্ময়ের, তেমনি আশপাশের মানুষের কাছেও কৌতূহলের।

যেখানে তাঁর চেয়ে কয়েক দশক কম বয়সী অনেকেরই চশমা ছাড়া পড়তে কষ্ট হয়, সেখানে শতবর্ষ পেরোনো আব্বাস এখনো নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত করেন। বয়স তাঁর শরীরকে থামিয়ে দিয়েছে অনেকটাই, কিন্তু ধর্মীয় অনুশীলনের অভ্যাসটি এখনো ধরে রেখেছেন তিনি।

শিক্ষকতা থেকে কোরআন শিক্ষা

আব্বাস প্রামাণিক মৃত সদর উদ্দিনের ছেলে। কর্মজীবনে তিনি ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, সে সময় মাত্র ৬০ টাকা বেতনে শিক্ষকতা করেছেন তিনি। শিক্ষকতার পাশাপাশি গ্রামের ছেলে-মেয়েদের বিনা মূল্যে কোরআন শিক্ষা দিতেন।

দীর্ঘ কর্মজীবনে অর্থের চেয়ে মানুষের জন্য কিছু করার বিষয়টিকেই গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। তাঁর পরিবারে রয়েছে দুই মেয়ে ও ছয় ছেলে।

এক জীবনে বহু ইতিহাসের সাক্ষী

আব্বাসের জীবন যেন বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গল্প। তাঁর জন্ম ব্রিটিশ শাসনামলে। এরপর ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পরিবর্তন, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের নানা পরিবর্তন—সবই দেখেছেন তিনি।

তবে দীর্ঘ জীবনের সব স্মৃতি এখন আর তাঁর মনে নেই। বয়সের ভারে অনেক পুরোনো ঘটনা ধীরে ধীরে স্মৃতির আড়ালে চলে গেছে। তবু তাঁর জীবনকথার মধ্যেই যেন একটি শতাব্দীরও বেশি সময়ের ইতিহাসের ছায়া খুঁজে পাওয়া যায়।

বিলাসিতা নয়, সাদাসিধে জীবন

জীবনভর সাদাসিধে জীবনযাপন করেছেন আব্বাস প্রামাণিক। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, গাড়িতে চড়াকেও তিনি একসময় বিলাসিতা মনে করতেন। প্রয়োজনীয় কাজে বেশির ভাগ সময় হেঁটেই যাতায়াত করতেন।

জীবনের একসময় অর্থ-সম্পদও ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই স্বচ্ছলতা কমেছে। বর্তমানে ভাঙাচোরা একটি ঘরেই বসবাস তাঁর। বয়সের কারণে বাইরে যাওয়া-আসা প্রায় বন্ধ। তবু বাড়ির উঠানে লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটার চেষ্টা করেন।

সমবয়সীরা কেউ নেই

আব্বাস প্রামাণিকের স্ত্রী অনেক আগেই মারা গেছেন। এরপর জীবনের দীর্ঘ সময় একাই কাটিয়েছেন তিনি। যাঁদের সঙ্গে তাঁর শৈশব-কৈশোর কিংবা যৌবনের দিনগুলো কেটেছে, তাঁদের প্রায় কেউই এখন আর জীবিত নেই।

তাঁর প্রিয় খাবারের তালিকায় রয়েছে বাতাসা, গরুর দুধ ও মসুর ডাল। পরিবারের সদস্যরা সামর্থ্য অনুযায়ী তাঁর পছন্দের খাবার দেওয়ার চেষ্টা করেন।

নাতি শফিকুল ইসলাম বলেন, “ভোটার আইডি কার্ডে দাদার বয়স ১২৩ বছর। তবে আমাদের ধারণা, প্রকৃত বয়স আরও বেশি। ছোটবেলা থেকেই তাঁকে খুব সাদাসিধে জীবনযাপন করতে দেখেছি।”

তিনি বলেন, তাঁর দাদা অত্যন্ত ধার্মিক ও সহজ-সরল মানুষ। কারও সঙ্গে অন্যায় করেননি। বয়সের কারণে এখন চলাফেরায় কষ্ট হলেও নিজের কাজ নিজে করার চেষ্টা করেন।

আরেক নাতি বেলাল হোসেন বলেন, আব্বাস প্রামাণিকের ছেলে-মেয়েরা সবাই নিজ নিজ সংসার নিয়ে ব্যস্ত। তাই নির্দিষ্টভাবে একজনের পক্ষে সার্বক্ষণিক দেখাশোনা করা সম্ভব হয় না। নাতিরাই নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী তাঁর পাশে থাকার চেষ্টা করেন।

বেলালের ভাষায়, “এই বয়সে তাঁর পুষ্টিকর খাবার ও ভালো পরিবেশ দরকার। কিন্তু সব সময় তা জোগাড় করা সম্ভব হয় না।”

‘এখনো চশমা ছাড়াই কোরআন পড়েন’

আব্বাসের মেয়ে আলিমা বেগমের কাছে বাবার জীবন যেন এক দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। তিনি জানান, মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তাঁর মা মারা যান। এরপর বাবার কাছেই বড় হয়েছেন তিনি।

আলিমা বলেন, ছোটবেলা থেকেই বাবাকে সৎ, সহজ-সরল ও ধর্মপরায়ণ মানুষ হিসেবে দেখে এসেছেন। কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন হলে বাবা হেঁটেই যেতেন। গাড়িতে খুব একটা উঠতেন না।

বাবার চোখের দৃষ্টিশক্তি নিয়ে আলিমা বলেন, “এত বয়স হওয়ার পরও বাবা চশমা ছাড়া কোরআন পড়তে পারেন। আমাদের বয়স অনেক কম হলেও এখন চোখে ঝাপসা দেখি।”

তিনি জানান, বর্তমানে তাঁর বাবা ভাইয়ের ছেলেদের সঙ্গে থাকেন। তাঁরাই মূলত দেখাশোনা করেন। সুযোগ পেলেই তিনি বাবাকে দেখতে যান এবং তাঁর পছন্দের খাবার নিয়ে যান।

প্রশাসনের সহযোগিতা

গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা আফরোজ বলেন, আব্বাস প্রামাণিক উপজেলার প্রবীণ ব্যক্তিদের একজন। বয়সের কারণে তাঁর চলাফেরায় সমস্যা রয়েছে।

তিনি জানান, তাঁর চলাচলের সুবিধার্থে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাড়ির সামনে সিঁড়ি করে দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছে খুবজিপুর প্রবীণ সেবা কেন্দ্র। পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময়ে তাঁকে সহযোগিতা করা হচ্ছে।

একটি জীবন্ত সময়ের গল্প

শতবর্ষ পেরিয়ে আব্বাস প্রামাণিক এখন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছেন। শরীর আগের মতো সায় দেয় না, স্মৃতির পাতাও অনেকটাই ঝাপসা। তবু তাঁর প্রতিদিনের জীবনে এখনো আছে নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত আর নিজের মতো করে বেঁচে থাকার চেষ্টা।

লাঠিতে ভর দিয়ে যখন বাড়ির উঠানে হাঁটেন, তখন হয়তো তাঁর চোখের সামনে ভেসে ওঠে বহু বছর আগের সেই গ্রাম—যে গ্রাম বদলে গেছে সময়ের সঙ্গে। হারিয়ে গেছে পরিচিত মানুষ, বদলে গেছে পথঘাট, বদলে গেছে জীবনযাত্রা।

তবু আব্বাস প্রামাণিক রয়ে গেছেন। তাঁর জীবনের ১২৩ বছর—নথি অনুযায়ী হোক কিংবা পরিবারের দাবিতে তার চেয়েও বেশি—শুধু একটি বয়সের সংখ্যা নয়; এটি একটি দীর্ঘ সময়ের সাক্ষ্য। আর সেই দীর্ঘ জীবনের শেষ অধ্যায়েও চশমা ছাড়াই কোরআন পড়ার দৃশ্যটি যেন তাঁর জীবনের সরলতা, বিশ্বাস ও বিস্ময়কর স্থিতির এক অনন্য প্রতিচ্ছবি।

blank

চশমা ছাড়াই কোরআন পড়েন চলনবিলের ১২৩ বছরের আব্বাস

ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান ও ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি বয়ে চলেছেন

চশমা ছাড়াই কোরআন পড়েন চলনবিলের ১২৩ বছরের আব্বাস

প্রকাশের সময় : ১৩ মিনিট আগে
blank

বয়সের হিসেবে ১২৩ বছর। জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসেছেন তিনি। বদলে যেতে দেখেছেন সময়, সমাজ আর মানুষের জীবনযাত্রা। তাঁর জীবনের শৈশব কেটেছে ব্রিটিশ শাসনামলে, যৌবন দেখেছে পাকিস্তান আমল, আর ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়ও পেরিয়ে এসেছেন তিনি। সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছে তাঁর সমসাময়িক অনেক মুখ। কিন্তু এখনো বেঁচে আছেন নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার বিয়াঘাট ইউনিয়নের যোগেন্দ্রনগর গ্রামের আব্বাস প্রামাণিক।

আব্বাস প্রামাণিকের ভোটার আইডি কার্ডে জন্মসাল উল্লেখ রয়েছে ১৯০৩। সেই হিসাবে ২০২৬ সালে তাঁর বয়স দাঁড়ায় ১২৩ বছর। তবে পরিবারের সদস্যদের দাবি, নথিতে উল্লেখ করা বয়সের চেয়েও তাঁর প্রকৃত বয়স আরও বেশি। স্থানীয়দের অনেকেরও ধারণা, তিনি এলাকার সবচেয়ে প্রবীণ জীবিত মানুষদের একজন।

বয়সের ভারে শরীর এখন অনেকটাই নুয়ে পড়েছে। চলতে গেলে লাঠির প্রয়োজন হয়। শ্রবণশক্তিও কমেছে। কিন্তু চোখ এখনো যেন সময়ের কাছে হার মানেনি। চশমা ছাড়াই কোরআন শরিফ পড়তে পারেন আব্বাস প্রামাণিক। খালি চোখে কোরআনের অক্ষর পড়ার এই সক্ষমতা তাঁর পরিবারের কাছে যেমন বিস্ময়ের, তেমনি আশপাশের মানুষের কাছেও কৌতূহলের।

যেখানে তাঁর চেয়ে কয়েক দশক কম বয়সী অনেকেরই চশমা ছাড়া পড়তে কষ্ট হয়, সেখানে শতবর্ষ পেরোনো আব্বাস এখনো নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত করেন। বয়স তাঁর শরীরকে থামিয়ে দিয়েছে অনেকটাই, কিন্তু ধর্মীয় অনুশীলনের অভ্যাসটি এখনো ধরে রেখেছেন তিনি।

শিক্ষকতা থেকে কোরআন শিক্ষা

আব্বাস প্রামাণিক মৃত সদর উদ্দিনের ছেলে। কর্মজীবনে তিনি ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, সে সময় মাত্র ৬০ টাকা বেতনে শিক্ষকতা করেছেন তিনি। শিক্ষকতার পাশাপাশি গ্রামের ছেলে-মেয়েদের বিনা মূল্যে কোরআন শিক্ষা দিতেন।

দীর্ঘ কর্মজীবনে অর্থের চেয়ে মানুষের জন্য কিছু করার বিষয়টিকেই গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। তাঁর পরিবারে রয়েছে দুই মেয়ে ও ছয় ছেলে।

এক জীবনে বহু ইতিহাসের সাক্ষী

আব্বাসের জীবন যেন বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গল্প। তাঁর জন্ম ব্রিটিশ শাসনামলে। এরপর ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পরিবর্তন, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের নানা পরিবর্তন—সবই দেখেছেন তিনি।

তবে দীর্ঘ জীবনের সব স্মৃতি এখন আর তাঁর মনে নেই। বয়সের ভারে অনেক পুরোনো ঘটনা ধীরে ধীরে স্মৃতির আড়ালে চলে গেছে। তবু তাঁর জীবনকথার মধ্যেই যেন একটি শতাব্দীরও বেশি সময়ের ইতিহাসের ছায়া খুঁজে পাওয়া যায়।

বিলাসিতা নয়, সাদাসিধে জীবন

জীবনভর সাদাসিধে জীবনযাপন করেছেন আব্বাস প্রামাণিক। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, গাড়িতে চড়াকেও তিনি একসময় বিলাসিতা মনে করতেন। প্রয়োজনীয় কাজে বেশির ভাগ সময় হেঁটেই যাতায়াত করতেন।

জীবনের একসময় অর্থ-সম্পদও ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই স্বচ্ছলতা কমেছে। বর্তমানে ভাঙাচোরা একটি ঘরেই বসবাস তাঁর। বয়সের কারণে বাইরে যাওয়া-আসা প্রায় বন্ধ। তবু বাড়ির উঠানে লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটার চেষ্টা করেন।

সমবয়সীরা কেউ নেই

আব্বাস প্রামাণিকের স্ত্রী অনেক আগেই মারা গেছেন। এরপর জীবনের দীর্ঘ সময় একাই কাটিয়েছেন তিনি। যাঁদের সঙ্গে তাঁর শৈশব-কৈশোর কিংবা যৌবনের দিনগুলো কেটেছে, তাঁদের প্রায় কেউই এখন আর জীবিত নেই।

তাঁর প্রিয় খাবারের তালিকায় রয়েছে বাতাসা, গরুর দুধ ও মসুর ডাল। পরিবারের সদস্যরা সামর্থ্য অনুযায়ী তাঁর পছন্দের খাবার দেওয়ার চেষ্টা করেন।

নাতি শফিকুল ইসলাম বলেন, “ভোটার আইডি কার্ডে দাদার বয়স ১২৩ বছর। তবে আমাদের ধারণা, প্রকৃত বয়স আরও বেশি। ছোটবেলা থেকেই তাঁকে খুব সাদাসিধে জীবনযাপন করতে দেখেছি।”

তিনি বলেন, তাঁর দাদা অত্যন্ত ধার্মিক ও সহজ-সরল মানুষ। কারও সঙ্গে অন্যায় করেননি। বয়সের কারণে এখন চলাফেরায় কষ্ট হলেও নিজের কাজ নিজে করার চেষ্টা করেন।

আরেক নাতি বেলাল হোসেন বলেন, আব্বাস প্রামাণিকের ছেলে-মেয়েরা সবাই নিজ নিজ সংসার নিয়ে ব্যস্ত। তাই নির্দিষ্টভাবে একজনের পক্ষে সার্বক্ষণিক দেখাশোনা করা সম্ভব হয় না। নাতিরাই নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী তাঁর পাশে থাকার চেষ্টা করেন।

বেলালের ভাষায়, “এই বয়সে তাঁর পুষ্টিকর খাবার ও ভালো পরিবেশ দরকার। কিন্তু সব সময় তা জোগাড় করা সম্ভব হয় না।”

‘এখনো চশমা ছাড়াই কোরআন পড়েন’

আব্বাসের মেয়ে আলিমা বেগমের কাছে বাবার জীবন যেন এক দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। তিনি জানান, মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তাঁর মা মারা যান। এরপর বাবার কাছেই বড় হয়েছেন তিনি।

আলিমা বলেন, ছোটবেলা থেকেই বাবাকে সৎ, সহজ-সরল ও ধর্মপরায়ণ মানুষ হিসেবে দেখে এসেছেন। কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন হলে বাবা হেঁটেই যেতেন। গাড়িতে খুব একটা উঠতেন না।

বাবার চোখের দৃষ্টিশক্তি নিয়ে আলিমা বলেন, “এত বয়স হওয়ার পরও বাবা চশমা ছাড়া কোরআন পড়তে পারেন। আমাদের বয়স অনেক কম হলেও এখন চোখে ঝাপসা দেখি।”

তিনি জানান, বর্তমানে তাঁর বাবা ভাইয়ের ছেলেদের সঙ্গে থাকেন। তাঁরাই মূলত দেখাশোনা করেন। সুযোগ পেলেই তিনি বাবাকে দেখতে যান এবং তাঁর পছন্দের খাবার নিয়ে যান।

প্রশাসনের সহযোগিতা

গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা আফরোজ বলেন, আব্বাস প্রামাণিক উপজেলার প্রবীণ ব্যক্তিদের একজন। বয়সের কারণে তাঁর চলাফেরায় সমস্যা রয়েছে।

তিনি জানান, তাঁর চলাচলের সুবিধার্থে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাড়ির সামনে সিঁড়ি করে দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছে খুবজিপুর প্রবীণ সেবা কেন্দ্র। পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময়ে তাঁকে সহযোগিতা করা হচ্ছে।

একটি জীবন্ত সময়ের গল্প

শতবর্ষ পেরিয়ে আব্বাস প্রামাণিক এখন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছেন। শরীর আগের মতো সায় দেয় না, স্মৃতির পাতাও অনেকটাই ঝাপসা। তবু তাঁর প্রতিদিনের জীবনে এখনো আছে নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত আর নিজের মতো করে বেঁচে থাকার চেষ্টা।

লাঠিতে ভর দিয়ে যখন বাড়ির উঠানে হাঁটেন, তখন হয়তো তাঁর চোখের সামনে ভেসে ওঠে বহু বছর আগের সেই গ্রাম—যে গ্রাম বদলে গেছে সময়ের সঙ্গে। হারিয়ে গেছে পরিচিত মানুষ, বদলে গেছে পথঘাট, বদলে গেছে জীবনযাত্রা।

তবু আব্বাস প্রামাণিক রয়ে গেছেন। তাঁর জীবনের ১২৩ বছর—নথি অনুযায়ী হোক কিংবা পরিবারের দাবিতে তার চেয়েও বেশি—শুধু একটি বয়সের সংখ্যা নয়; এটি একটি দীর্ঘ সময়ের সাক্ষ্য। আর সেই দীর্ঘ জীবনের শেষ অধ্যায়েও চশমা ছাড়াই কোরআন পড়ার দৃশ্যটি যেন তাঁর জীবনের সরলতা, বিশ্বাস ও বিস্ময়কর স্থিতির এক অনন্য প্রতিচ্ছবি।