ঢাকা সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চলনবিলে দেড় হাজার মানুষ মিলে ধরলেন মাত্র তিনটি বোয়াল

blank

ভোরের আলো ফোটার আগেই পলো ফেলার ঝুপঝাপ শব্দে মুখর হয়ে ওঠে নাটোরের সিংড়া উপজেলার তাজপুর ইউনিয়নের শহরবাড়ি ও কয়রাবাড়ি গ্রাম। শনিবার সকালে চলনবিলে মাছ শিকারে নামেন গাইবান্ধা ও রংপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা প্রায় দেড় হাজার শৌখিন মাছশিকারি।

তাঁদের কারও হাতে ছিল চাক পলো, কারও নেটপলো। আবার কেউ নিয়ে এসেছিলেন ঠেলাজাল, বাদাইজাল ও লাঠিজালসহ মাছ ধরার নানা সরঞ্জাম। দল বেঁধে মাছ ধরার এমন দৃশ্য দেখতে সকাল থেকেই বিলপাড়ে ভিড় করেন স্থানীয় বাসিন্দাসহ হাজারো মানুষ।

দূর-দূরান্ত থেকে শৌখিন মাছশিকারিরা এলেও এবারের আয়োজন শেষ হয়েছে অনেকটা হতাশার মধ্য দিয়ে। প্রায় ১৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ১১টি বাস, সাতটি বড় ট্রাক ও চারটি ছোট ট্রাকে করে তাঁরা এসেছিলেন মাছ ধরতে। দুপুর পর্যন্ত বিলের প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকায় মাছ ধরার পর তাঁদের জালে ওঠে মাত্র তিনটি বোয়াল মাছ। তিনটি মাছের মোট ওজন প্রায় ৯ কেজি।

ভোরে ঘুম থেকে উঠেই স্থানীয় বাসিন্দারা দেখতে পান, হাজারো মানুষ দল বেঁধে চলনবিলে মাছ ধরতে নেমেছেন। কেউ মাজাপানিতে, কেউ বুকসমান পানিতে, আবার কেউ গভীর পানিতে নেমে মাছ ধরার চেষ্টা করছেন। পলো ফেলার ঝুপঝাপ শব্দ, মাছশিকারিদের হাঁকডাক ও পরস্পরের কথাবার্তায় বিলজুড়ে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।

দুপুর পর্যন্ত মাছ ধরার চেষ্টা চালিয়েও কাঙ্ক্ষিত মাছ না পাওয়ায় একপর্যায়ে হতাশ হয়ে বাড়ির পথে ফেরেন শৌখিন মাছশিকারিরা।

মাছ ধরতে আসা গাইবান্ধার পলাশবাড়ির বাসিন্দা শাহাদৎ হোসেন বলেন, তাঁদের সঙ্গে অন্তত দেড় হাজার মাছশিকারি এসেছেন। মাথাপিছু খরচ হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৭০০ টাকা। কিন্তু উল্লেখ করার মতো কোনো মাছ তাঁরা পাননি। তিনি জানান, প্রায় ২০ বছর ধরে দেশের বিভিন্ন উন্মুক্ত জলাশয়ে পলো দিয়ে মাছ শিকার করছেন। তবে চলনবিলে এবারের অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে হতাশাজনক।

বাসুদেবপুর এলাকার সাহেব মিয়া বলেন, দল বেঁধে মাছ ধরতে যাওয়া তাঁদের শখ। মাছ না পেলেও একসঙ্গে পানিতে নেমে মাছ ধরার আনন্দই তাঁদের কাছে বড়। তবে চলনবিলে এসে অনেক মাছ পাওয়ার আশা করেছিলেন। প্রত্যাশা অনুযায়ী মাছ না পাওয়ায় তাঁর মনে হয়েছে, আগের মতো আর মাছ নেই এই বিলে।

গাইবান্ধার পাবনাপুর গ্রামের আবদুল কাদের বলেন, গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর, সুন্দরগঞ্জ, পলাশবাড়ী, গোবিন্দগঞ্জ ও বোনারপাড়া এলাকার লোকজন মিলে তাঁরা চলনবিলে এসেছেন। এর আগে বিভিন্ন হাওরেও পলো নিয়ে মাছ ধরতে গেছেন। এবার শখ করে চলনবিলে এসেছিলেন। মাছ কম পাওয়ায় খারাপ লাগেনি, তবে কিছুটা হতাশ হয়েছেন।

চলনবিল পরিবেশ উন্নয়ন ও প্রকৃতি সংরক্ষণ ফোরামের সভাপতি এস এম রাজ আহমেদ বলেন, প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূর থেকে বাস ও ট্রাকে করে দল বেঁধে এত মানুষকে মাছ ধরতে আসতে আগে কখনো দেখা যায়নি। একসঙ্গে এত মানুষের মাছ ধরার দৃশ্য দেখতে ভালো লেগেছে বলেও জানান তিনি।

তবে চলনবিলের মাছের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা। চলনবিল জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, চায়না জাল ও সোতি জাল দিয়ে নির্বিচারে মাছ ধরার কারণে বিলে মাছের উৎপাদন দিন দিন কমছে। এত মানুষ মিলে দীর্ঘ সময় মাছ ধরেও মাত্র তিনটি বোয়াল পাওয়া বিষয়টি চলনবিলে মাছ কমে যাওয়ার বাস্তবতাকে আবারও সামনে এনেছে।

তবে শৌখিন মাছশিকারিদের মাছ না পাওয়ার কারণ হিসেবে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন মৎস্য বিভাগ। সিংড়া উপজেলার জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা শাহাদৎ হোসেন বলেন, চলনবিলে বর্তমানে পানি বেশি থাকায় গাইবান্ধা থেকে আসা শৌখিন মাছশিকারিরা প্রত্যাশিতভাবে মাছ ধরতে পারেননি।

চলনবিলের এই দৃশ্য একদিকে যেমন গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পলো দিয়ে মাছ ধরার সংস্কৃতিকে মনে করিয়ে দেয়, অন্যদিকে অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক মাছশিকারির হাতে মাত্র তিনটি বোয়াল ধরা পড়া বিলের মাছের বর্তমান অবস্থাও নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে।

জনপ্রিয় খবর
blank

চলনবিলে দেড় হাজার মানুষ মিলে ধরলেন মাত্র তিনটি বোয়াল

চলনবিলে দেড় হাজার মানুষ মিলে ধরলেন মাত্র তিনটি বোয়াল

প্রকাশের সময় : এক ঘন্টা আগে
blank

ভোরের আলো ফোটার আগেই পলো ফেলার ঝুপঝাপ শব্দে মুখর হয়ে ওঠে নাটোরের সিংড়া উপজেলার তাজপুর ইউনিয়নের শহরবাড়ি ও কয়রাবাড়ি গ্রাম। শনিবার সকালে চলনবিলে মাছ শিকারে নামেন গাইবান্ধা ও রংপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা প্রায় দেড় হাজার শৌখিন মাছশিকারি।

তাঁদের কারও হাতে ছিল চাক পলো, কারও নেটপলো। আবার কেউ নিয়ে এসেছিলেন ঠেলাজাল, বাদাইজাল ও লাঠিজালসহ মাছ ধরার নানা সরঞ্জাম। দল বেঁধে মাছ ধরার এমন দৃশ্য দেখতে সকাল থেকেই বিলপাড়ে ভিড় করেন স্থানীয় বাসিন্দাসহ হাজারো মানুষ।

দূর-দূরান্ত থেকে শৌখিন মাছশিকারিরা এলেও এবারের আয়োজন শেষ হয়েছে অনেকটা হতাশার মধ্য দিয়ে। প্রায় ১৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ১১টি বাস, সাতটি বড় ট্রাক ও চারটি ছোট ট্রাকে করে তাঁরা এসেছিলেন মাছ ধরতে। দুপুর পর্যন্ত বিলের প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকায় মাছ ধরার পর তাঁদের জালে ওঠে মাত্র তিনটি বোয়াল মাছ। তিনটি মাছের মোট ওজন প্রায় ৯ কেজি।

ভোরে ঘুম থেকে উঠেই স্থানীয় বাসিন্দারা দেখতে পান, হাজারো মানুষ দল বেঁধে চলনবিলে মাছ ধরতে নেমেছেন। কেউ মাজাপানিতে, কেউ বুকসমান পানিতে, আবার কেউ গভীর পানিতে নেমে মাছ ধরার চেষ্টা করছেন। পলো ফেলার ঝুপঝাপ শব্দ, মাছশিকারিদের হাঁকডাক ও পরস্পরের কথাবার্তায় বিলজুড়ে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।

দুপুর পর্যন্ত মাছ ধরার চেষ্টা চালিয়েও কাঙ্ক্ষিত মাছ না পাওয়ায় একপর্যায়ে হতাশ হয়ে বাড়ির পথে ফেরেন শৌখিন মাছশিকারিরা।

মাছ ধরতে আসা গাইবান্ধার পলাশবাড়ির বাসিন্দা শাহাদৎ হোসেন বলেন, তাঁদের সঙ্গে অন্তত দেড় হাজার মাছশিকারি এসেছেন। মাথাপিছু খরচ হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৭০০ টাকা। কিন্তু উল্লেখ করার মতো কোনো মাছ তাঁরা পাননি। তিনি জানান, প্রায় ২০ বছর ধরে দেশের বিভিন্ন উন্মুক্ত জলাশয়ে পলো দিয়ে মাছ শিকার করছেন। তবে চলনবিলে এবারের অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে হতাশাজনক।

বাসুদেবপুর এলাকার সাহেব মিয়া বলেন, দল বেঁধে মাছ ধরতে যাওয়া তাঁদের শখ। মাছ না পেলেও একসঙ্গে পানিতে নেমে মাছ ধরার আনন্দই তাঁদের কাছে বড়। তবে চলনবিলে এসে অনেক মাছ পাওয়ার আশা করেছিলেন। প্রত্যাশা অনুযায়ী মাছ না পাওয়ায় তাঁর মনে হয়েছে, আগের মতো আর মাছ নেই এই বিলে।

গাইবান্ধার পাবনাপুর গ্রামের আবদুল কাদের বলেন, গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর, সুন্দরগঞ্জ, পলাশবাড়ী, গোবিন্দগঞ্জ ও বোনারপাড়া এলাকার লোকজন মিলে তাঁরা চলনবিলে এসেছেন। এর আগে বিভিন্ন হাওরেও পলো নিয়ে মাছ ধরতে গেছেন। এবার শখ করে চলনবিলে এসেছিলেন। মাছ কম পাওয়ায় খারাপ লাগেনি, তবে কিছুটা হতাশ হয়েছেন।

চলনবিল পরিবেশ উন্নয়ন ও প্রকৃতি সংরক্ষণ ফোরামের সভাপতি এস এম রাজ আহমেদ বলেন, প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূর থেকে বাস ও ট্রাকে করে দল বেঁধে এত মানুষকে মাছ ধরতে আসতে আগে কখনো দেখা যায়নি। একসঙ্গে এত মানুষের মাছ ধরার দৃশ্য দেখতে ভালো লেগেছে বলেও জানান তিনি।

তবে চলনবিলের মাছের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা। চলনবিল জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, চায়না জাল ও সোতি জাল দিয়ে নির্বিচারে মাছ ধরার কারণে বিলে মাছের উৎপাদন দিন দিন কমছে। এত মানুষ মিলে দীর্ঘ সময় মাছ ধরেও মাত্র তিনটি বোয়াল পাওয়া বিষয়টি চলনবিলে মাছ কমে যাওয়ার বাস্তবতাকে আবারও সামনে এনেছে।

তবে শৌখিন মাছশিকারিদের মাছ না পাওয়ার কারণ হিসেবে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন মৎস্য বিভাগ। সিংড়া উপজেলার জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা শাহাদৎ হোসেন বলেন, চলনবিলে বর্তমানে পানি বেশি থাকায় গাইবান্ধা থেকে আসা শৌখিন মাছশিকারিরা প্রত্যাশিতভাবে মাছ ধরতে পারেননি।

চলনবিলের এই দৃশ্য একদিকে যেমন গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পলো দিয়ে মাছ ধরার সংস্কৃতিকে মনে করিয়ে দেয়, অন্যদিকে অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক মাছশিকারির হাতে মাত্র তিনটি বোয়াল ধরা পড়া বিলের মাছের বর্তমান অবস্থাও নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে।