ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের বুকে প্রাণের জোয়ার

চলনবিলের কচুগাড়ীতে ব্যতিক্রমী ‘চাড়ি বাইচ’

blank

‘চাড়ি’—শব্দটি আজকের প্রজন্মের অনেকের কাছেই অপরিচিত। অথচ চলনবিলের প্রবীণ মানুষের স্মৃতিতে এই চাড়ি জড়িয়ে আছে একান্ত আপন হয়ে। একসময় গ্রামীণ গৃহস্থালির অতি প্রয়োজনীয় সামগ্রী হিসেবে চাড়ির ব্যবহার ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। ধান ভিজিয়ে রাখা, বিভিন্ন ফসল সংরক্ষণ কিংবা গৃহস্থালির নানা কাজে ব্যবহৃত হতো এই মাটির তৈরি বড় পাত্র। কিন্তু সময়ের স্রোতে আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেই চাড়ি আজ হারিয়ে যেতে বসেছে মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে।
চলনবিলের ইতিহাস মানেই জল, নৌকা আর মানুষের সংগ্রামী জীবনের গল্প। বর্ষা এলেই বিস্তীর্ণ জনপদ ডুবে যেত পানির নিচে। এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রাম, এক পাড়া থেকে অন্য পাড়া কিংবা বাড়ির আঙিনা থেকে প্রতিবেশীর উঠানে যাতায়াতের জন্য নৌকা ছিল অপরিহার্য। যাদের নৌকা ছিল না, তাদের অনেকেই বর্ষার পানিতে চলাচলের জন্য ব্যবহার করতেন এই চাড়ি। ছোট্ট এই গৃহস্থালি উপকরণটিই কখনো কখনো হয়ে উঠত মানুষের যাতায়াতের ভরসা, আনন্দের বাহন এবং জলমগ্ন জীবনের এক অনন্য সঙ্গী।
হারিয়ে যেতে বসা সেই চাড়ির স্মৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এবং চলনবিলের প্রাচীন জলজ ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে  ব্যতিক্রমী এক আয়োজনের উদ্যোগ নেয় কচুগাড়ী মোল্লাপাড়া যুবসমাজ।  সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর)  বিলপাড়ের কচুগাড়ী গ্রামে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী ‘চাড়ি বাইচ’। আর এই আয়োজন ঘিরে গোটা এলাকায় সৃষ্টি হয় উৎসবের আমেজ।

blank
বিলের পানিতে যখন চাড়ি ছুটে চলে, তখন মনে হয়—ফিরে এসেছে সেই পুরোনো দিন। পানির ঢেউ ভেঙে এগিয়ে চলা চাড়ির সঙ্গে মিশে যায় মানুষের উচ্ছ্বাস, করতালি আর আনন্দধ্বনি। নারী-পুরুষ, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা—সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে প্রতিযোগিতাস্থল পরিণত হয় অন্য রকম পরিবেশ । হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে ঘিরে এমন প্রাণবন্ত আয়োজন যেন গ্রামীণ জীবনের বুক থেকে উঠে আসা এক টুকরো ইতিহাস।
চাড়ি বাইচ প্রতিযোগিতায় মোট ছয়জন অংশগ্রহণ করেন। প্রতিযোগিতায় সবাইকে চমকে দিয়ে অনন্য কৃতিত্ব দেখান একই পরিবারের তিন সদস্য। বাবা শামসু ফকির এবং তাঁর দুই ছেলে আলামিন ও আব্দুল্লাহ অংশ নেন প্রতিযোগিতায়। শেষ পর্যন্ত প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয়—তিনটি পুরস্কারই নিজেদের ঘরে তুলে নেন তাঁরা। শামসু ফকির প্রথম, তাঁর ছেলে আলামিন দ্বিতীয় এবং আব্দুল্লাহ তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। একই পরিবারের বাবা ও দুই ছেলের এমন সাফল্যে উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে বিস্ময়, আনন্দ ও উচ্ছ্বাস।
চাড়ি বাইচের পাশাপাশি আয়োজন করা হয় সাঁতার প্রতিযোগিতা এবং খোলা পানিতে হাঁস ধরার প্রতিযোগিতা। এসব আয়োজনে অংশগ্রহণকারীদের প্রাণচাঞ্চল্য ও দর্শকদের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে বিলপাড়ের পরিবেশ। প্রতিযোগিতাগুলো শুধু বিনোদনের আয়োজন ছিল না; বরং এগুলো ছিল গ্রামীণ জীবনের হারিয়ে যাওয়া খেলাধুলা, কৃষ্টি ও ঐতিহ্যকে নতুন করে স্মরণ করার এক আন্তরিক প্রয়াস।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কচুগাড়ী ফকিরবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা মজনু মো. ইসহাক। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সুজন আলম। প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। আয়োজনটির পৃষ্ঠপোষকতায় ছিল অনলাইন বিজনেস প্রতিষ্ঠান ‘জিরো বাজার’।
চলনবিলের বুক থেকে হারিয়ে যেতে বসা চাড়িকে ঘিরে এই আয়োজন যেন প্রমাণ করে—ঐতিহ্য কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না; মানুষের ভালোবাসা ও উদ্যোগে তা আবারও ফিরে আসতে পারে। কচুগাড়ীর চাড়ি বাইচ তাই নিছক একটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার উৎসব, অতীতকে স্মরণ করার উপলক্ষ এবং নতুন প্রজন্মের হাতে গ্রামীণ ইতিহাস তুলে দেওয়ার এক উজ্জ্বল প্রয়াস। বিলপাড়ের সেই দিনটি মানুষের মনে রেখে গেছে অনাবিল আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর শৈশবের মতো নির্মল এক স্মৃতি।

হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের বুকে প্রাণের জোয়ার

চলনবিলের কচুগাড়ীতে ব্যতিক্রমী ‘চাড়ি বাইচ’

প্রকাশের সময় : ৩৮ মিনিট আগে
blank

‘চাড়ি’—শব্দটি আজকের প্রজন্মের অনেকের কাছেই অপরিচিত। অথচ চলনবিলের প্রবীণ মানুষের স্মৃতিতে এই চাড়ি জড়িয়ে আছে একান্ত আপন হয়ে। একসময় গ্রামীণ গৃহস্থালির অতি প্রয়োজনীয় সামগ্রী হিসেবে চাড়ির ব্যবহার ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। ধান ভিজিয়ে রাখা, বিভিন্ন ফসল সংরক্ষণ কিংবা গৃহস্থালির নানা কাজে ব্যবহৃত হতো এই মাটির তৈরি বড় পাত্র। কিন্তু সময়ের স্রোতে আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেই চাড়ি আজ হারিয়ে যেতে বসেছে মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে।
চলনবিলের ইতিহাস মানেই জল, নৌকা আর মানুষের সংগ্রামী জীবনের গল্প। বর্ষা এলেই বিস্তীর্ণ জনপদ ডুবে যেত পানির নিচে। এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রাম, এক পাড়া থেকে অন্য পাড়া কিংবা বাড়ির আঙিনা থেকে প্রতিবেশীর উঠানে যাতায়াতের জন্য নৌকা ছিল অপরিহার্য। যাদের নৌকা ছিল না, তাদের অনেকেই বর্ষার পানিতে চলাচলের জন্য ব্যবহার করতেন এই চাড়ি। ছোট্ট এই গৃহস্থালি উপকরণটিই কখনো কখনো হয়ে উঠত মানুষের যাতায়াতের ভরসা, আনন্দের বাহন এবং জলমগ্ন জীবনের এক অনন্য সঙ্গী।
হারিয়ে যেতে বসা সেই চাড়ির স্মৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এবং চলনবিলের প্রাচীন জলজ ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে  ব্যতিক্রমী এক আয়োজনের উদ্যোগ নেয় কচুগাড়ী মোল্লাপাড়া যুবসমাজ।  সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর)  বিলপাড়ের কচুগাড়ী গ্রামে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী ‘চাড়ি বাইচ’। আর এই আয়োজন ঘিরে গোটা এলাকায় সৃষ্টি হয় উৎসবের আমেজ।

blank
বিলের পানিতে যখন চাড়ি ছুটে চলে, তখন মনে হয়—ফিরে এসেছে সেই পুরোনো দিন। পানির ঢেউ ভেঙে এগিয়ে চলা চাড়ির সঙ্গে মিশে যায় মানুষের উচ্ছ্বাস, করতালি আর আনন্দধ্বনি। নারী-পুরুষ, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা—সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে প্রতিযোগিতাস্থল পরিণত হয় অন্য রকম পরিবেশ । হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে ঘিরে এমন প্রাণবন্ত আয়োজন যেন গ্রামীণ জীবনের বুক থেকে উঠে আসা এক টুকরো ইতিহাস।
চাড়ি বাইচ প্রতিযোগিতায় মোট ছয়জন অংশগ্রহণ করেন। প্রতিযোগিতায় সবাইকে চমকে দিয়ে অনন্য কৃতিত্ব দেখান একই পরিবারের তিন সদস্য। বাবা শামসু ফকির এবং তাঁর দুই ছেলে আলামিন ও আব্দুল্লাহ অংশ নেন প্রতিযোগিতায়। শেষ পর্যন্ত প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয়—তিনটি পুরস্কারই নিজেদের ঘরে তুলে নেন তাঁরা। শামসু ফকির প্রথম, তাঁর ছেলে আলামিন দ্বিতীয় এবং আব্দুল্লাহ তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। একই পরিবারের বাবা ও দুই ছেলের এমন সাফল্যে উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে বিস্ময়, আনন্দ ও উচ্ছ্বাস।
চাড়ি বাইচের পাশাপাশি আয়োজন করা হয় সাঁতার প্রতিযোগিতা এবং খোলা পানিতে হাঁস ধরার প্রতিযোগিতা। এসব আয়োজনে অংশগ্রহণকারীদের প্রাণচাঞ্চল্য ও দর্শকদের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে বিলপাড়ের পরিবেশ। প্রতিযোগিতাগুলো শুধু বিনোদনের আয়োজন ছিল না; বরং এগুলো ছিল গ্রামীণ জীবনের হারিয়ে যাওয়া খেলাধুলা, কৃষ্টি ও ঐতিহ্যকে নতুন করে স্মরণ করার এক আন্তরিক প্রয়াস।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কচুগাড়ী ফকিরবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা মজনু মো. ইসহাক। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সুজন আলম। প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। আয়োজনটির পৃষ্ঠপোষকতায় ছিল অনলাইন বিজনেস প্রতিষ্ঠান ‘জিরো বাজার’।
চলনবিলের বুক থেকে হারিয়ে যেতে বসা চাড়িকে ঘিরে এই আয়োজন যেন প্রমাণ করে—ঐতিহ্য কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না; মানুষের ভালোবাসা ও উদ্যোগে তা আবারও ফিরে আসতে পারে। কচুগাড়ীর চাড়ি বাইচ তাই নিছক একটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার উৎসব, অতীতকে স্মরণ করার উপলক্ষ এবং নতুন প্রজন্মের হাতে গ্রামীণ ইতিহাস তুলে দেওয়ার এক উজ্জ্বল প্রয়াস। বিলপাড়ের সেই দিনটি মানুষের মনে রেখে গেছে অনাবিল আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর শৈশবের মতো নির্মল এক স্মৃতি।