ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী যিনি JRC নামেই বাংলাদেশের বোদ্ধামহলে, শিক্ষিত মানুষজনের কাছে সমধিক পরিচিত। বুয়েটের এই কিংবদন্তি শিক্ষাবিদ ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাক্তন উপদেষ্টা, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি এবং ইউনিভার্সিটি অফ এশিয়া প্যাসিফিকের ভাইস চ্যান্সেলর ; পদ্মাসেতু, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ অগনিত জাতীয় মেগাপ্রোজেক্টের চীফ টেকনিক্যাল এডভাইজার, ছিলেন বুয়েট এলামনাই এসোসিয়েশনের জন্মলগ্ন থেকে উনার জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সভাপতি, বুয়েট গ্র্যাজুয়েটস ক্লাবের পথপ্রদর্শক। এছাড়াও ইন্সটিটিউশন অফ ইন্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন, ছিলেন বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের সভাপতি। একুশে পদকও পেয়েছিলেন JRC Sir ; পেয়েছিলেন জাপান সরকারের সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক পদক – অর্ডার অব দা রাইজিং সান (গাল্ড রেস উইথ নেক রিবন)।
বাংলাদেশে যে গণিত অলিম্পিয়াড শুরু হয়েছিলো কিশোর-কিশোরীদের জন্য সেটারও পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেন জামিল স্যার যার ধারাবাহিকতায় ড. কায়কোবাদ স্যারসহ বুয়েট ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও কয়েকজন শিক্ষক প্রথম আলোর পৃষ্ঠপোষকতায় তা এগিয়ে নিয়ে গেছেন। প্রসঙ্গতঃ বলে রাখি, গণিত অলিম্পিয়াডের দেখানো পথ ধরেই দিনে দিনে বাংলাদেশে ফিজিক্স অলিম্পিয়াড, বায়োলজি অলিম্পিয়াডসহ কিশোর-কিশোরীদের জন্য এ ধরনের আরও বেশ কিছু প্রোগ্রাম চালু হয়েছে।
সবকিছু ছাপিয়ে ইন্জিনিয়ারিং মূলতঃ নিজের বিষয় সিভিল ইন্জিনিয়ারিংয়ে তাঁর গভীর জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা আর সেই সাথে অমায়িক, ইনোসেন্ট, ভদ্রোচিত বিনয়ী এক্সপ্রেশনের যে কোন তুলনাই ছিলো না, সে তাঁকে কাছে থেকে না দেখলেও ইলেকট্রনিক্স/প্রিন্ট মিডিয়ায় কিংবা ডিজিটাল প্লাটফর্মে তাঁর চেহারা যারা দেখেছেন বা তাঁর বক্তব্য যারা শুনেছেন তারাও একবাক্যে স্বীকার করবেন।
আমরা যখন বুয়েটে পড়তাম সেই সময়ই স্যার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হয়েছিলেন কয়েক মাসের জন্য এবং বুয়েটের বাহিরে জাতীয় পরিসরে অনেক গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ইনভল্বড ছিলেন। আর তাছাড়া ব্যক্তিগতভাবে আমি সিভিল ইন্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র না হওয়ায় শ্রেণিকক্ষ কিংবা সিভিল ইন্জিনিয়ারিং বিল্ডিংয়ের লিফটে/করিডোরে স্যারকে খুব কাছ থেকে প্রতিদিন বারবার দেখা অথবা সময় নিয়ে কখনো উনার সাথে কথা বলার সুযোগ হয় নাই । শুধু দূর থেকে কখনো দেখতাম, আর বিভিন্ন মাধ্যমে উনার সম্পর্কে কিছু কথা শুনতাম বুয়েটে পড়ার সময়।
বুয়েট থেকে পাস করে কর্মজীবন শুরু করার পর বুয়েট এলামনাই এসোসিয়েশনের কোন কোন প্রোগ্রামে কিংবা অন্য কোন ইভেন্টে স্যারের সাথে কখনো কোথাও দেখা হলে স্যারকে সালাম দিতাম, কেমন আছেন জিজ্ঞেস করতাম, স্যার উনার স্বভাবসুলভ হাস্যোজ্জ্বল ভঙ্গিতে সালামের উত্তর দিতেন, এই যা।
আগেও বলেছি, স্যারের ব্যাপারে সবকিছুই এর/তার কাছ থেকে শুনেছি আমি ছাত্রজীবন থেকে আজ অবধি, অনেকের স্মৃতিচারণমূলক লেখায়ও পড়েছি। ডঃ জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যার ছিলেন একজন পন্ডিত ব্যক্তি, ছিলেন সার্বজনীন। শেখ হাসিনা, বেগম খালেদা জিয়া, ড. ইউনুস থেকে শুরু করে ডানপন্থী /বামপন্থী সবাই JRC স্যারকে সম্মান করতেন।
স্যারের একমাত্র মেয়ে ড. কারিশমা চৌধুরী বুয়েটে আমাদের ৩ বছরের জুনিয়র ছোট বোন ; সে-ও যথেষ্ট মেধাবী। বুয়েট থেকে আন্ডারগ্র্যাড সম্পন্ন করে যুক্তরাষ্ট্রের MIT থেকে পিএইচডি ও পোষ্টডক শেষ করে কারিশমা এখন অধ্যাপনা করে যুক্তরাজ্যের প্রখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান লীডস্ ইউনিভার্সিটিতে।
জামিল স্যারের একমাত্র জামাতা অর্থাৎ কারিশমার হাজবেন্ড ড. জিয়া ওয়াদুদও একজন মেধাবী মানুষ। জিয়া আমাদের বুয়েট এবং ঢাকা কলেজের বন্ধু । জিয়াও বুয়েট থেকে আন্ডারগ্র্যাড সম্পন্ন করে যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত ইমপেরিয়াল কলেজ থেকে এবং যুক্তরাষ্ট্রের MIT থেকে উচ্চতর শিক্ষা শেষ করে এখন অধ্যাপনা করে লীডস্ ইউনিভার্সিটিতে।
২০২৪ সালের জুনে আমি যখন ফ্যামিলিসহ লন্ডনে গিয়েছিলাম বিজনেস এন্ড হলিডে ট্রিপে তখন জিয়া ও কারিশমার সাথে কমিউনিকেশন হয়েছিলো। কিন্তু লন্ডন থেকে Leeds এর অবস্হানগত দূরত্ব অনেক বেশি হওয়ায় সামনা-সামনি দেখা-সাক্ষাতের সুযোগ হয়নি।
কোভিড অতিমারীর প্রথম প্রহরে JRC স্যার যখন চিরকালের জন্য পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন পরপারে ; আমার মতো বাংলাদেশের ইন্জিনিয়ারিং কমিউনিটির অধিকাংশ মানুষেরই মনে হয়েছিলো, মাথার উপর থেকে অনেক বড় একটা ছাতা সরে গেলো। অথচ কখনো কোনদিন স্যারের সাথে একান্তে কোন আলাপের সুযোগই আমার হয়নি।
কিন্তু খুব কাছে না থেকেও দূর থেকেই কোন কোন মানুষের উষ্ণতা, উপস্থিতি, সান্নিধ্য যে প্রবলভাবে টের পাওয়া যায়, জামিল স্যার তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ; একজন ক্ষুদ্র মানুষ হিসেবে অন্ততঃ আমি আমার অনুভবে তা ভীষণভাবে টের পেতাম, এখনো পাই।
সেজন্যই শুরুতে আমার এই লেখার শিরোনাম দিয়েছি, ” আমি দূর হতে তোমারেই দেখেছি …… “।
মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি, তিনি বাংলাদেশের ইন্জিনিয়ারিং কমিউনিটির এই অসম্ভব মেধাবী মানুষটির বিদেহী আত্মাকে শান্তিতে রাখুন।
———————
লেখকঃ চেয়ারম্যান, পাওয়ারব্রীজ গ্রুপ

আনোয়ার পারভেজ শেফীন 


















