বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমের সবুজ জনপদ পাবনা জেলা। নদী, খাল, বিল আর উর্বর পলিমাটিতে গড়া এই জনপদ একাধারে উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার এবং ইতিহাসের সাক্ষী। বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতির মানচিত্রে এই জেলার অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালির প্রতিটি অর্জনে পাবনার মানুষের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। ভৌগোলিক ও আর্থ-সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জেলাটি দেশের বৃহত্তম দুগ্ধ উৎপাদনকারী অঞ্চল এবং অন্যতম প্রধান কৃষি হাব হিসেবে স্বীকৃত। বিশেষ করে চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুরের মতো কৃষিপ্রধান উপজেলাগুলোই এই জেলার অর্থনীতির মূল প্রাণশক্তি।
এই গৌরবময় ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক হিসেবে মাটির টানে এবং মানুষের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন এই মাটিরই সন্তান, কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিন। পাবনার সমৃদ্ধ ইতিহাসকে বুকে ধারণ করে যিনি এগিয়ে চলেছেন আগামীর সম্ভাবনাময় নেতৃত্বের পথে।
পাবনা শহরের শিবরামপুর। এখানেই বাস করেন এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবার। ১৯৬৮ সালের ২৪ আগস্ট যাদের কোল আলোকিত করে জন্ম নেন শিশু হাসান জাফির তুহিন। তার পিতা আলহাজ্ব জালালউদ্দিন মোল্লা ছিলেন একজন ধর্মভীরু, ন্যায়পরায়ণ, সামাজিক ব্যক্তিত্ব এবং একজন সফল ব্যবসায়ী। মাতা হামিদা বেগম একজন গৃহিণী, যার মমতা ও সংযম পরিবারের আদর্শ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই আদর্শকে ঘিরেই স্বপ্নবাজ তুহিন তার প্রাথমিক জীবন অতিবাহিত করেন নিজ শহর পাবনায়।

তার শিক্ষার প্রথম পাঠ শুরু হয় বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পাবনা জিলা স্কুলে। ১৯৮৪ সালে মাধ্যমিক শিক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ফলাফলে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি ভর্তি হন পাবনার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ সরকারি এডওয়ার্ড কলেজে। ১৯৮৬ সালে কৃতিত্বের সাথে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য যান দেশের প্রথম বিশেষায়িত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে তিনি কৃষি প্রকৌশল ও কারিগরি অনুষদ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন, যা তার জীবনের এক অনবদ্য মোড়। যে মোড় ঘুরে তিনি হয়ে ওঠেন কৃষির প্রতি আন্তরিক এক নিষ্ঠার প্রতীক।
হাসান জাফির তুহিনের রাজনীতির যাত্রা শুরু হয় আশির দশকের মাঝামাঝি ছাত্র রাজনীতির উত্তাল সময়ে। উচ্চ মাধ্যমিক অধ্যয়নকালে ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৭ পর্যন্ত তিনি পাবনা জেলা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংগঠন গড়ে তোলা, মিটিং-মিছিল আর স্বৈরাশাসনের বিরুদ্ধে তরুণদের জাগিয়ে তোলাই ছিল তার মূল লক্ষ্য। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামী পথে তাকে বারবার কারাবরণ করতে হয়েছে।
১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে হাসান জাফির তুহিনের জীবনগাথায় যুক্ত হয় রাজনীতির দ্বিতীয় অধ্যায়। ছাত্রদলের বৈরী আবহাওয়ায় জাতীয়তাবাদী আদর্শ প্রতিষ্ঠা করার প্রত্যয়ে এগিয়ে যান তিনি। ১৯৯১ সালে হাসান জাফির তুহিন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি প্রকৌশল অনুষদ ছাত্র সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পড়াশোনার পাশাপাশি সহপাঠীদের অধিকার, আবাসন ও শিক্ষার সমস্যার সমাধানে তিনি সামনের সারিতে ছিলেন।
১৯৯২ সালে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বাকসুতে মিলনায়তন সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি এবং সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে তিনি আন্দোলন, হরতাল ও অবরোধের সামনের সারির নেতা হিসেবে সরব উপস্থিত থাকেন। এ সময় অসংখ্যবার গ্রেপ্তার, মামলা ও পুলিশি হয়রানির মুখোমুখি হন। মিথ্যা মামলায় দীর্ঘ এক বছর কারাভোগ করেন এবং শত নির্যাতনের পরও তিনি একই স্লোগানে আবারো ফিরে দাঁড়িয়েছেন।

১৯৯৮ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ঢাকার রাজপথে গণতন্ত্রের সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ঢাকার বিজয়নগরের কেন্দ্রীয় কমিটির মিছিলে পুলিশের নির্মম আক্রমণে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। প্রথমে ঢাকার পিজি হাসপাতাল এবং পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য ব্যাংককের বামরুনগ্রাদসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে দীর্ঘ দুই বছর চিকিৎসা নেন। যে আঘাতের ব্যথা এখনো তাকে নীরবে বহন করতে হয়।
২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিন বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি পাবনা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি কৃষিবিদদের পেশাজীবী সংগঠন অ্যাবের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। মাঠের অভিজ্ঞতা ও ছাত্র রাজনীতির দক্ষতা নিয়ে তিনি সারাদেশের কৃষিবিদ সমাজকে এক প্ল্যাটফর্মে একতাবদ্ধ করেন।
২০১২ সালে তিনি এগ্রিকালচারিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (অ্যাব)-এর কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব নির্বাচিত হয়ে কৃষিবিদদের পেশাগত মর্যাদা, গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ে সেবা বিস্তারে নিরলস কাজ করেন। ২০১৬ সালে কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের জাতীয় কাউন্সিলে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মনোনীত হন। এরপর থেকে বিএনপির পেশাজীবী সংগঠন ও কৃষক রাজনীতির তিন স্তরে সমান্তরালে কাজ করেছেন।
২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি পাবনা শহরে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তিনি আবার পুলিশের আকস্মিক হামলার মুখে পড়েন। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে আসা এই নেতার ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ছোঁড়া বুলেটে তার শরীর রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। প্রথমে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতাল এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ব্যাংককে স্থানান্তরিত করা হয় কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিনকে। সুস্থ হয়ে দেশে ফেরার পর তার রাজনৈতিক অঙ্গীকার, মানবিক নেতৃত্ব ও সংগ্রামী চেতনা আরও দৃঢ় হয়।

শহীদ জিয়ার বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক দর্শন, গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা ও তারেক রহমানের নেতৃত্বে অনুপ্রাণিত কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিন আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকার ও একদলীয় শাসনের বিরুদ্ধে তার কণ্ঠস্বর কখনোই থেমে থাকেনি।
২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের কেন্দ্রীয় সংসদের সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সাফল্যের ভিত্তিতে ২০২১ সালে তিনি নির্বাচিত হন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি পদে, যেখানে তার নেতৃত্ব কৃষক দলের নতুন ইতিহাস লিখেছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সভাপতি কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিনের জীবন মূলত মানুষের পাশে থাকার এক ধারাবাহিক প্রতিশ্রুতি। দরিদ্র, অসহায় ও প্রান্তিক মানুষের দুঃসময়ে তিনি নিয়মিত আর্থিক ও মানবিক সহায়তা প্রদান করেন। তার চলাফেরা সবসময়ই সাধারণ ও মিশুক। চা স্টল, হাটবাজার, গ্রাম্য রাস্তা কিংবা মসজিদের বারান্দা—সর্বত্র তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে বসে কথা বলেন, তাদের সমস্যার কথা শোনেন এবং সমাধানের চেষ্টা করেন।
শিশু ও কিশোরদের প্রতি রয়েছে তার বিশেষ মমতা। শিক্ষা, খেলাধুলা ও সুরক্ষিত বড় হয়ে ওঠার পরিবেশ তৈরিতে তিনি বিভিন্ন সময়ে সহায়তা দেন, বই-খাতা, খেলাধুলার সামগ্রী ও নৈতিক অনুপ্রেরণার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করেন। অসুস্থ মানুষদের দ্রুত চিকিৎসার জন্যও তিনি অনেক সময় নিজ উদ্যোগে অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা, হাসপাতালে ভর্তি ও বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিশ্চিত করে দেন, যাতে আর্থিক অক্ষমতা কারো জীবন রক্ষার পথে বাধা না হয়। তিনি অকাতরে সাধারণ দরিদ্র অসহায়দের মাঝে দান করেন।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানমুখী আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সক্রিয় ও মুখ্য। বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক জোটের দাবিতে তিনি কৃষক দলের পক্ষ থেকে মাঠের কৃষক ও গ্রামীণ জনতাকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করেন। মহাসড়ক থেকে হাটবাজার, উপজেলা সদরের সমাবেশ থেকে শুরু করে রাজধানীমুখী বৃহত্তর কর্মসূচি—সর্বত্র তিনি কর্মীদের সংগঠিত করে দিকনির্দেশনা দেন এবং নিজেও মিছিলে সামনের সারিতে নেতৃত্ব দেন।
সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দমন-পীড়ন সত্ত্বেও তিনি আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়াননি, বরং গ্রেপ্তার, গুলিবিদ্ধ হওয়া, নিখোঁজ ও নির্যাতনের শিকার পরিবারের পাশে গিয়ে সহমর্মিতা ও সাহস জুগিয়েছেন। এই আন্দোলনে তার নেতৃত্ব শুধু দলীয় রাজনীতিতে নয়, বরং গ্রামীণ জনপদের অসন্তোষ ও প্রত্যাশাকে এক সুসংগঠিত গণআন্দোলনের ধারায় প্রবাহিত করেছে। পাশাপাশি দল, দেশ ও জাতির যেকোনো ক্রান্তিলগ্নে তিনি বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে অনুষ্ঠিত টকশোতে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন, সর্বদা কথা বলেছেন সত্য ও গণতন্ত্রের পক্ষে আর রুখে দাঁড়িয়েছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি পাবনা-৩ (চাটমোহর-ফরিদপুর-ভাঙ্গুড়া) থেকে বিএনপির মনোনয়ন লাভ করেন এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। গত ৫ মে পূর্ণ সচিব মর্যাদায় এক বছর মেয়াদে চুক্তিভিত্তিকভাবে কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিনকে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। তার এই গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগে আমরা তাকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও প্রাণঢালা অভিনন্দন জানাই।

মোঃ হাবিবুর রহমান 

















