২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণআন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ কার্যত সরকারশূন্য অবস্থার মধ্যে পড়ে। পরবর্তী তিন দিন দেশজুড়ে দেখা দেয় চরম অস্থিরতা ও আইনশৃঙ্খলার অবনতি। বিভিন্ন স্থানে হামলা, সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং কারাগার থেকে বন্দি পালানোর মতো ঘটনা ঘটে।
এরই মধ্যে ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শপথ নেয়। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টাদের শপথ পড়ান।
৫ আগস্ট
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিকে ঘিরে ব্যাপক গণআন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন। পরে তিনি ভারতে চলে যান।
তার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর হাজারো মানুষ গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও জাতীয় সংসদ ভবনে প্রবেশ করে। এসব স্থানে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। ঢাকায় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি পুলিশ সদর দপ্তরসহ দেশের বিভিন্ন থানায়ও হামলা ও সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়।
দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বাড়িঘর, স্থাপনা ও যানবাহনে হামলার ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ও হামলায় পুলিশ সদস্যসহ বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
সেদিন বিকেলে রাজনৈতিক নেতা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠকের পর সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সংবাদ সম্মেলনে জানান, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হবে।
এরপর তিন বাহিনীর প্রধান, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং কয়েকজন ছাত্র প্রতিনিধি বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক করেন।
বৈঠক শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, সংসদ ভেঙে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে।
অন্যদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম জানান, তারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন জাতীয় সরকারের প্রস্তাব দেবেন।
৬ আগস্ট
৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে তিন বাহিনীর প্রধান ও ছাত্র প্রতিনিধিদের বৈঠকের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
একই দিন রাষ্ট্রপতি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। মাত্র সাত মাসের মাথায় বিলুপ্ত হয় এই সংসদ। একই সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দণ্ড মওকুফ করে তাকে মুক্ত ঘোষণা করা হয়।
কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে দায়ের করা বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার আন্দোলনকারী এবং বিএনপি ও জামায়াতের আগে আটক নেতাকর্মীসহ দুই হাজারের বেশি ব্যক্তিকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়।
এদিন ঢাকা বিমানবন্দর থেকে শেখ হাসিনা সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলককে আটক করা হয়।
এর আগের দিনের হামলার পর পুলিশ সদর দপ্তরসহ দেশের বিভিন্ন থানা ও পুলিশ কার্যালয়ে কার্যক্রম অনেকটাই অচল হয়ে পড়ে। পুলিশের অনুপস্থিতিতে বিভিন্ন স্থানে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীকে নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে ট্রাফিক পুলিশের পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা যায়।
পুলিশ সদস্যদের সংগঠন পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতির ঘোষণা দেয়। পুলিশের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতি ও নিরাপত্তাহীনতার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক এলাকায় সাধারণ মানুষ দলবদ্ধ হয়ে রাত জেগে পাহারা দেন।
এদিন পুলিশের মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের চুক্তি বাতিল করে মো. ময়নুল ইসলামকে নতুন আইজিপি নিয়োগ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়েও কয়েকটি পদে রদবদল করা হয়। মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার কথা জানায় আইএসপিআর।
এদিন গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগার থেকে কারারক্ষীদের জিম্মি করে ২০৯ জন বন্দি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে।
এদিকে দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকা কয়েকজন ব্যক্তি ফিরে আসেন। তাদের কেউ কেউ গোপন বন্দিশালায় আটক ছিলেন বলে অভিযোগ করেন।
৭ আগস্ট
৭ আগস্ট সেনাবাহিনী প্রধান জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শপথ ৮ আগস্ট বিকেল বা সন্ধ্যায় হতে পারে। এদিকে ফ্রান্স থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ঘোষিত অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
এদিন শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলায় গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের ছয় মাসের কারাদণ্ডের রায় বাতিল করে শ্রম আপিলেট ট্রাইব্যুনাল।
কুষ্টিয়া জেলা কারাগার থেকে গেট ভেঙে ৯৯ জন বন্দি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। কারারক্ষীরা ফাঁকা গুলি ছুড়লে কয়েকজন বন্দি আবার কারাগারের ভেতরে ফিরে যায়।
ঢাকার নয়াপল্টনে বড় সমাবেশ করে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানায় বিএনপি। দীর্ঘদিন পর ওই সমাবেশে ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে পুলিশের ভূমিকার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন নবনিযুক্ত আইজিপি মো. ময়নুল ইসলাম। তিনি ওই সময়ের ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু তদন্তের প্রতিশ্রুতি দেন।
এদিন এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়। একই সময়ে ঢাকার বিভিন্ন সড়কে ট্রাফিক পুলিশের অনুপস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের যানবাহন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়।
র্যাব মহাপরিচালক, ডিএমপি কমিশনারসহ পুলিশের চারজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়। তবে দেশজুড়ে সহিংসতা ও অস্থিরতা পুরোপুরি থামেনি।
৮ আগস্ট
ফ্রান্স থেকে ঢাকায় ফেরার পর বিমানবন্দরে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে স্বাগত জানান তিন বাহিনীর প্রধান ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা।
দেশে ফিরে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করাই হবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম কাজ। দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা ও আক্রমণের ঘটনা বন্ধ করে সব মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
এর আগে সেনাসদরে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সঙ্গে নৌ ও বিমান বাহিনী প্রধান, নবনিযুক্ত আইজিপি, র্যাব মহাপরিচালক ও ডিএমপি কমিশনারের বৈঠক হয়। বৈঠকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সেনাবাহিনীর সহায়তায় দেশের সব থানার কার্যক্রম পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
দেশজুড়ে অরাজকতা, অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়।
এদিন নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পান মো. আসাদুজ্জামান। একই সময়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশে ভারতীয় ভিসা সেন্টার ও যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনাও ঘটে। কোথাও কোথাও গণডাকাতির খবর পাওয়া যায়।
অবশেষে তিন দিনের অনিশ্চয়তা ও সরকারশূন্য পরিস্থিতির অবসান ঘটে। ৮ আগস্ট বঙ্গভবনের দরবার হলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তাকে শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
একই সঙ্গে ১৩ জন উপদেষ্টাও শপথ নেন। তাদের মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দুই সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াও ছিলেন। মোট ১৬ জন উপদেষ্টার নাম ঘোষণা করা হলেও ঢাকার বাইরে অবস্থান করায় তিনজন সেদিন শপথ নিতে পারেননি।
এভাবেই ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর শুরু হওয়া তিন দিনের অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা ও আইনশৃঙ্খলা সংকটের পর ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে।

অনলাইন ডেস্ক 


















